জেগে ওঠ— সুরঙ্গমা সূত্র তৃতীয় অধ্যায়

[পূর্ব প্রকাশিতের পর]

বুদ্ধদেব পুনরায় তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত উজ্জ্বল আলোয় আনন্দের সামনে তুলে ধরলেন, “বলতো আনন্দ, কি উপায়ে আমার মুষ্টিবদ্ধ হাতের ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পাচ্ছে?”

আনন্দ: “আলো উজ্জ্বল, তাই তাকে আমার চোখ দিয়ে দেখি, ও আমার মন দিয়ে এ যে উজ্জ্বল, তা বুঝি।”

বুদ্ধদেব: “তোমার দৃষ্টি কি উজ্জ্বলতার ওপর নির্ভর করে?”

আনন্দ: “উজ্জ্বলতা না থাকলে যে কিছুই দেখতে পাব না।”

বুদ্ধদেব: “মানুষ যখন অন্ধ হয়ে যায়, তখন অন্ধ মানুষ অন্ধকার ভিন্ন কিছুই দেখতে পায় না। এ তার অন্ধত্বের ধারণা, তাতে তার দৃষ্টির ধারণার কোন ক্ষয় হয় নি। অন্ধকার কক্ষে চক্ষুষ্মান মানুষ যা দেখে সেও তাই দেখতে পায়। চোখ বন্ধ কর আনন্দ, তুমি অন্ধকার বাদে আর কি দেখতে পাচ্ছ?”

আনন্দ স্বীকার করলেন যে তিনি কেবল অন্ধকারই দেখছেন ।

বুদ্ধদেব: “অন্ধ মানুষ যদি হঠাৎ দৃষ্টি ফিরে পান, সে যেন হবে হঠাৎ করে অন্ধকার কক্ষে একটি আলোর শিখার প্রজ্জ্বলন। আমরা হয়ত তখন বলব যে মানুষ প্রদীপের সাহায্যে দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু দৃষ্টি, দৃষ্টি ব্যাপারটার বোধ, তা কিন্তু উজ্জ্বলতা, কি অন্ধকার, প্রদীপ কি চোখ, এদের কারোর ওপর নির্ভর করে না। কারণ দেখা, দেখতে পাওয়া, দৃষ্টি, এ তোমার সারাৎসার,আদি, মহতী মনে তার উদয়, তার সৃষ্টি। সারাৎসার সেই মন সমস্ত কিছুর অতীত — সে সর্বত্র বিরাজমান — কার্য কারণ, সবেতে সে বিদ্যমান — ঔজ্জ্বল্য, অন্ধকার, চোখ, প্রদীপ; আবার সে তাবৎ অবস্থা থেকে মুক্ত, যখন যেমন পরিস্থিতির উদয় হয়, দৃষ্টি তাতেই সংবেদনশীল। সমুদ্রের মতন । সমুদ্র তার তরঙ্গের অতীত, অথচ প্রতিটি তরঙ্গে সে বিদ্যমান, যখন যেমন তরঙ্গের উদয় হয়, সমুদ্রও সেইমত সাড়া দেয়। “তাই ঠিক ঠিক বলতে গেলে, তোমার মনের উজ্জ্বলতার ধারণা, বা তোমার চোখ, এরা কেউই আমার উদ্যত মুষ্টি প্রত্যক্ষ করে নি।”

আনন্দ হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। গুরুদেব যদি স্নেহভরে আরেকটু সরল করে বুঝিয়ে বলেন! তিনি শুদ্ধচিত্তে, আরো কিছু শুনতে পাবার অপেক্ষায় উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মহৎ জন, পরম করুণায় আনন্দের মাথায় হাত রাখলেন। রেখে বললেন, “বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি না হলে যে সচেতন প্রাণীগণ সম্যক আলোকপ্রাপ্ত হয় না, তার কারণ, তারা কি প্রপঞ্চ, কি বস্তুনিচয়, এ সবের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণাবশত বিপথে যায়। তারা সবাই তাদের গভীর স্বপ্নে বিভোর। তারা তাদের সৎ চিৎ-এর, সারাৎসার মানসের যে উজ্জ্বল সার্বিক শূন্যতা, যে মানস সর্বত্রগামী, তার যে বাস্তবতা, তাতে আর জেগে উঠতে পারে না। তারা জানেই না যে যা কিছু দেখে তার সব কিছুরই উৎস মন। “মানসের চেয়ে তারা স্বপ্নেই বরং নিবেশিত। “সারাৎসার মানস যেন একটি উন্মুক্ত প্রান্তর। সে অনাদি, সে অনন্ত, সে স্থির, অচঞ্চল। ধুলিকণা যেমন খোলা আকাশের নীচে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে এই আছে এই নেই, সেই রকম আমাদের অস্তিত্বের স্বপ্ন। “সারাৎসার মানস যেন একটা সরাইখানা। কিন্তু আমাদের অস্তিত্বের স্বপ্ন যেন সেই সরাইখানার একরাতের ভবঘুরে পর্যটক ; একরাত থেকে তাকে পাততাড়ি গুটিয়ে আবার চলে যেতে হবে, চরৈবেতি।

বুদ্ধদেব হাত তুললেন, তারপর একবার মুঠো খুললেন, তারপর আবার মুঠো বন্ধ করলেন। করে আনন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কে স্থাবর, কেই বা জঙ্গম, আনন্দ?” আনন্দ দেখলেন মহৎ জনের মুষ্টিবদ্ধ হাত একবার খুলল, একবার বন্ধ হল, তাঁর নিজের ‘দৃষ্টি’ তে কোন চাঞ্চল্য ছিল না। তিনি বললেন, “ভগবন, আপনার আঙুলগুলোতেই গতি, আমার চোখের দৃষ্টিতে তো কোন গতি নেই।”

“আনন্দ”, বুদ্ধদেব বললেন, “যা চলমান, জঙ্গম, পরিবর্তনীয়, আর যা স্থাবর, অপরিবর্তনীয়, এই দুইয়ের চরিত্রগত পার্থক্য কি তুমি বুঝতে পারলে না? শরীর ক্রমশ চলমান, চঞ্চল, পরিবর্তিত হতে থাকে, মন নয়। মন স্থির।

“কেন তুমি বারবার শরীর-মন উভয়ের গতির কথা বলে চলেছ? কেন তোমার মনের চিন্তা ভাবনাকে একবার উঠতে দিচ্ছ, একবার পড়তে দিচ্ছ, তোমার শরীর কেন তোমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, কেন তোমার মানসচেতনা তোমার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে না?”

“কেন ইন্দ্রিয়ের ছলনায় তোমার স্বরূপ মানসকে উপলব্ধি করতে পারছ না? করতে পারছ না বলে অজ্ঞানতার নীতিবলে যে রাস্তায় চলা উচিৎ তার উল্টোরাস্তায় চলছ কেবল, যে পথে শুধুই পদে পদে বিহ্বলতা, যাতনা?

“মানুষ যেমনি তার সৎ চিৎ কে বিস্মৃত হয়, তখনি সে অন্তহীন গভীর মনের একেবারে উপরভাগে যে ছোট ছোট তরঙ্গ উথ্থিত হয়,তাকেই গভীর মন বলে ভেবে নেয়, আয়নায় প্রতিফলিত বস্তুকে সে নিজের সৎ চিৎ বলে ভেবে বসে। এতে করে অনিত্য, চঞ্চলতা জাগে। জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্মের অন্তহীন চক্রে পড়ে সে কেবলই যাতনা ভোগ করে।

“যা কিছু জঙ্গম, যা কিছু সচল, যা কিছু পরিবর্তনশীল, তাকে ধুলিকণার ন্যায় জ্ঞান কোর। যা কিছু স্থির, অচঞ্চল, তাকে তোমার সৎ চিৎ বলে জেনো।” তখন, আনন্দ ও সভামধ্যে উপস্থিত আর সকলে উপলব্ধি করলেন যে, অনাদি অনন্তকাল ধরে জগতের মায়াবী প্রতিফলন দেখতে দেখতে তাঁরা তাঁদের আপন স্বরূপকে বিস্মৃত হয়েছেন, সেই স্বরূপকে উপেক্ষা করে এসেছেন। এ জগৎ কেবলি মানস । যেন একটি ছোট শিশু মাতৃস্তন খুঁজে পেয়েছে, এমনি তাঁদের বোধ হল, তাঁরা অন্তরে বাহিরে প্রশান্তি অনুভব করলেন। তাঁরা ভগবার তথাগতের কাছে প্রার্থনা করলেন তিনি যেন তাঁদের শিখিয়ে দেন শরীর ও মন, সৎ-অসৎ, মৃত্যু-পুনর্জন্মের প্রকাশ ও আমাদের অন্তর্নিহিত অজর অমর অজাত চরিত্রের কি পার্থক্য, সেই বিষয়ে শিক্ষা দেন।

মহারাজ প্রসেনজিৎ উঠে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেবকে অনুরোধ করলেন এমন কিছু শিক্ষা দান করতে যাতে না-মৃত্যু না-পুনর্জন্মের সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। যাতে তিনি মৃত্যু-পুনর্জন্মের কালচক্র থেকে কি করে নিস্তার পাওয়া যায় তা বুঝতে পারেন। বুদ্ধদেব তাঁকে তিনি যুবাবয়সে যেমন দেখতে ছিলেন সে তুলনায় এখন তিনি কেমন দেখতে সে কথা বলতে বললেন। মহারাজ বললেন, “সে আমি কি রকম করে বলব? আমি কেমন করে আমার যুবা বয়স আর এই বয়সের তুলনা করব?” এই বলে বছরে বছরে দিনে দিনে যে ক্ষয়ে যাচ্ছেন সেইসব বলতে লাগলেন। “হ্যাঁ, দিনে দিনে”, এই করে করে একদিন সব শেষ হয়ে যাবে। তখন বুদ্ধদেব জিজ্ঞাসা করলেন প্রথম যখন গঙ্গানদী দেখেছিলেন তখন কত বছর বয়স ছিল, তিন বছর; তারপর যখন দ্বিতীয়বার গঙ্গানদী দেখলেন তখন কত বছর বয়স ছিল, তের বছর; এখন তাঁর কত বছর বয়স, বাষট্টি বছর; গঙ্গানদী এই যে এত বছর ধরে দেখে এলেন,সেই দেখার কি পরিবর্তন হয়েছে, বুদ্ধদেব শুধোলেন। মহারাজ উত্তর দিলেন, “আজকাল চোখে তেমন ভাল দেখতে পাই না, কিন্তু আগেও যা দেখেছি, গঙ্গাকে এখনো তেমনি দেখি।”

বুদ্ধদেব তখন বললেন, “মহারাজ! যুবাবয়স থেকে আজ অবধি আপনার অবয়বে যে পরিবর্তন হয়েছে তাতে আপনি বিষন্ন বোধ করছেন — আপনার চুলে পাক ধরেছে, আপনার আননমণ্ডলে ত্বক কুঞ্চিত হয়েছে, রক্ত চলাচল কমে আসছে, কিন্তু আপনি বললেন, আপনার দৃষ্টির যে চেতনা, তা যুবাবয়সে যেমন ছিল, আজও তেমনই আছে। বলুন মহারাজ, দৃষ্টির চেতনার কি যুবকাল বা বার্ধক্য বলে কিছু আছে?”

“না, ভগবন”

তখন বুদ্ধদেব বললেন, “মহারাজ! যদিচ আপনার মুখমণ্ডল কুঞ্চিত হয়েছে, আপনার দৃষ্টির চেতনায় কোন কুঞ্চন দেখা দেয় নি, বয়সের কোন ছাপ পড়েনি। অতএব কুঞ্চিত মানে পরিবর্তনশীলতা, কুঞ্চিত না হওয়া মানে অপরিবর্তনশীলতা। যা পরিবর্তনশীল তা নশ্বর। তার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। যা অপরিবর্তনশীল, তা মৃত্যু-পুনর্জন্ম হতে মুক্ত।”

তথাগতের মুখে এই সুপ্রাচীন বাণী শ্রবণ করে সভায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা পরম হর্ষ অনুভব করলেন। তাঁদের এই অপূর্ব সত্যের উপলব্ধি হল।

Show your support

Clapping shows how much you appreciated Arin Basu’s story.