ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ও খেলাপি ঋণের বোঝা থাকলেও বিদায়ী বছরে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক (Bank)এ পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

১ জানুয়ারি ‘ব্যাংক হলিডে’-এ সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাবের পর এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকায় ব্যাংকগুলো আগের বছরের চেয়ে বেশি মুনাফা করেছে বলে মনে করছেন শীর্ষ ব্যাংকাররা।
মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরুল আমীন বলেন, “পরিচালন মুনাফা বেড়েছে তবে সেটা প্রত্যাশিত পর্যায়ে হয়নি। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়ছে তা অর্জন হয়নি। সরকারও ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়নি।
“আবার বিদেশ থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ আসছে। এসব কারণে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য থাকছে, যে কারণে প্রত্যাশিত মুনাফা হয়নি।”
তিনি বলেন, পুঁজিবারের বিনিয়োগ, মার্চেন্ট ব্যাংকিং, গ্যারান্টি ইনকাম, সার্ভিস চার্জ বাবদ আয়সহ বহুমুখী আয় রয়েছে ব্যাংকের। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে এসব খাতে আয়ও বেড়েছে।
“এছাড়া খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিসল করার ফলেও কিছু আয় বেড়েছে।”
এবিবির চেয়ারম্যান ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান বলেন, “ব্যাংকিং কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সম্প্রসারিত হচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে নতুন নতুন প্রোডাক্ট আসছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ছে। ফলে ব্যাংক খাতও তার সুফল পাচ্ছে।”
মুদ্রাবাজারে টাকার প্রবাহ প্রায় সারা বছরই বেশি ছিল। ফলে আন্তঃব্যাংক লেনদেন কলমানির সুদ থেকে আয় হয়নি তেমন। করমানি সুদ হার বিদায়ী বছরে ২ শতাংশের নিচেও নেমেছে। ঋণ প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশার তুলনায় ছিল কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে বেসরকারি খাকে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েয়ছে ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।
অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। আর এ সময়ে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৭০ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিভিন্ন সুবিধা দিলেও ২০১৫ সালে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। চলতি বছরের ৯ মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৫৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৮৯ ভাগ।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা ওইসময়ের বিতরণ করা ঋণের ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা ব্যাংকারদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফার তথ্য প্রকাশ করতে পারে না। এজন্য কোনো ব্যাংকই তাদের পরিচালন মুনাফার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করে না।
পরিচালন মুনাফা ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়; নিট মুনাফাই ব্যাংকের প্রকৃত আয়। পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) এবং কর (৪২ দশমিক ৫ শতাংশ) বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হিসাব করা হয়।
এর ওপরও ব্যাংক বিশেষে সাধারণ রিজার্ভ খাতে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়।
ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষা করতে হবে নিট বা প্রকৃত মুনাফার হিসাব পাওয়া পর্যন্ত। আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিট মুনাফা হলেও তার সম্পূর্ণ অর্থ লভ্যাংশ আকারে বিতরণ করা হবে না।
এ কারণে শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ পাওয়ার হিসাব কষতে অপেক্ষা করতে হবে ব্যাংকের এজিএমের আগের পরিচালনা পর্ষদের সভার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত।
বিভিন্ন ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরাবরের মতোই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে। এবছর ব্যাংকটি এক হাজার ৮০৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংকটি ২০১৪ সালে এক হাজার ৭০৩ কোটি টাকা আয় করেছিল।
এছাড়া সাউথ ইস্ট ব্যাংক ৮৩৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে, যা ২০১৪ সালে ছিল ৮৩২ কোটি টাকা।
অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৮৩৩ কোটি, এবি ব্যাংক ৭৬০ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক ৪০৬ কোটি, পূবালী ব্যাংক ৮১০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক ৫৯০ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক ৪১৯ কোটি, ঢাকা ব্যাংক ৫২০ কোটি, ডাচ-বাংলা ৬৭০ কোটি, এক্সিম ব্যাংক ৬৬০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ২২৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৩৬৫ কোটি, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৩০৩ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ৬০৫ কোটি, আল-আরাফাহ ৬৫০ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৫৫০ কোটি, যমুনা ব্যাংক ৪০১ কোটি, শাহজালাল ২৭৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোর জন্য বেশকিছু নিয়ম-কানুন শিথিল করে। এ সুযোগে ব্যাংকগুলো ব্যাপক হারে ঋণ পুনঃতফসিল করে। এতে ঋণগুলো নিয়মিত হয়ে যাওয়ায় সুদ বাবদ অনেক অর্থ আয় খাতে দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এটিও বছর শেষে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
এদিকে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের ২০১৫ সালের ব্যালান্স শিটে ২১৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অর্থাৎ এ বছরে ব্যাংকটির আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় হওয়ায় পরিচালন মুনাফা ঋণাত্মক হয়েছে, যা ২০১৪ সালে ছিল ১১০ কোটি টাকা।
via EBIZ NEWS — ২৪ ঘন্টা অনলাইন ব্যাবসায়িক সংবাদ এবং ই-কমার্স নিউজ — www.ebiz-news.com http://ift.tt/1kAJEfp