ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি আর আমরা

দুটো গল্পয় ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি থেকে আমার শেখা কতগুলো পয়েন্ট

১| ফেলুদা নিজেকে চিনত, সে ফোকাসড সে বড় ছবিটা দেখে।

ফেলুদা “বড় ছবিটা”কে সব সময়ে চোখের সামনে রাখত। জয় বাবা ফেলুনাথ গল্পে মন আছে ঘোষালবাবুকে শেষে বলেছিল যে তাকে ডাকা হয়েছিল চোর ধরতে, শুধু চুরির কিনারা করতে নয়? সে ফোকাসড, তার ফোকাস থেকে তাকে নড়ানো শক্ত। মগনলাল তাকে ২০০০ টাকা দিয়ে কেস থেকে সরে যেতে বলে, ফেলুদা অনায়াসে সেই টাকা মগনলালের মুখে ছুঁড়ে মারতে পারে, কারণ সে এখন জানে তাকে কি করতে হবে।

২| ফেলুদা প্রতিটি ঘটনা খুব খুঁটিয়ে দেখে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়গুলো খুঁজে বার করে

কোন ঘটনাই তার নজর এড়ায় না। যেটা দেখার সেটা সে দেখে, যেটা নেই, সেদিকেও তার সজাগ দৃষ্টি। সোনার কেল্লা গল্পে সে তোপসেকে বলছে মন্দার বোসের জুতোজোড়ার দিকে নজর দিতে, যে লোকটা নিজেকে গ্লোব ট্রটার বলছে, তার পায়ে বাটার সস্তার জুতো। জয় বাবা ফেলুনাথ গল্পে সে তোপসের বাইনোকুলার ধার করে মছলিবাবার উল্কি খুঁটিয়ে দেখছে। আবার জয় বাবা ফেলুনাথ গল্পে সে খুঁজে বার করছে কোন গান শোনার ছিল কিন্তু সে গান প্রোগ্রামে ছিল না। ফেলুদার মত করে ভাবতে শিখতে চাই, এই দারুণ খুঁটিয়ে দেখার ব্যাপারটা দারুণ রকমের দরকারী।

তবে এর সঙ্গে আরো একটা ব্যাপার বলার আছে। যা দেখছি, যে ঘটনাটার কথা শুনছি, তাকে “শুধু তার মতন” করে দেখতে হবে, তার মধ্যে নিজের মনের পূর্বনিধারিত ধারণা নিয়ে গুলিয়ে ফেলা চলবে না। মগনলালের ডেরায় সরবত খাওয়ার ঘটনাটা মনে করে দেখুন। ফেলুদার সামনেও সরবত রাখা আছে, লালমোহনবাবুর সামনেও সরবত রাখা আছে। লালমোহনবাবু ইতস্তত করছেন, কেননা, তাঁর মনে সরবত শুধু সরবত নয়, সরবতটিকে তিনি দেখছেন সন্দিগ্ধ লালমোহনবাবুর চোখে। সরবতের মধ্যে তিনি মগনলালের বজ্জাতি দেখছেন। ফেলুদাকে দেখুন, ফেলুদা সরবতটিকে সরবত বলেই দেখছে, সে সরবত তার পান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ নেই, কারণ সে তার দেখা, তার শোনা, স্বাদ গ্রহণ করাকে কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে না।

৩| ফেলুদা খুব খুঁটিনাটি ব্যাপারের থেকে খুব সহজেই নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বড় সমস্যাটার দিকে মন দিতে জানে

জয় বাবা ফেলুনাথের সেই দৃশ্যটির কথা ভাবুন। রাতের বেনারসের গলি। তিনটি মানুষ হাঁটছেন। লালমোহনবাবু বাড়িগুলো দেখছেন আর “প্রত্যেকটা বাড়ি হন্টেড”, এই কথাটা তাঁর মাথায় আসছে। কারণ তার আগে তিনজনেই (ফেলুদা, তোপসে, লালমোহনবাবু) রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে আটকে গেছে, ব্রেনওয়ভ দরকার। অন্যদিকে ফেলুদাকে দেখুন। সে কিন্তু দিব্যি সুকুমার রায়ের কবিতা আওড়াতে আওড়াতে (“অলি গলি চলিরাম ) আবৃত্তি করতে করতে চলেছে। এই যে সমস্যা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য একটা বিষয়ে মন ঘুরিয়ে দেওয়া, এই দূরত্ব তৈরী করতে পারাটা আমরা ফেলুদার গুরু শার্লক হোমসের মধ্যেও পূর্ণ মাত্রায় দেখেছি। শার্লক হোমসের ডক্টর ওয়াটসনকে “তিন পাইপের” সমাধানের কথা বলতেন। সমস্যায় পড়লে হোমস নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পরপর তিনটি পাইপ টানতেন, নয়ত হাঁটতে যেতেন। আমি নিজেও সমস্যায় পড়লে করে দেখেছি যে সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একদম অন্য একটা কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেলা। হাঁটতে যান, সাইকেল চালান, বাগানে কাজ করুন, যা কিছু। হাঁটতে যাওয়াটা বা ধীরে দৌড়নটা আমার অভিজ্ঞতায় সমস্যা সমাধানে দিব্যি কাজ দেয়। তবে সেই কাজ করার সময় সমস্যার কথা ভাবলে চলবে না, যে ভুলটা বেনারসের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে লালমোহনবাবু করছিলেন, সেটা করা চলবে না। হাঁটা, ছবি আঁকা, গান গাওয়া, এই ধরণের নানা কাজ করতে করতে নিজেকে সাময়িক সমস্যা থেকে সরিয়ে রাখা যায়, ততক্ষণ অবচেতন মন সমস্যা সমাধানের কাজ করতে থাকে।

৪| ফেলুদা যখন সমস্যার সমাধান করে, সে তখন শুধুই “ঘটনা”, “প্রত্যক্ষ” অভিজ্ঞতা গুলোকে ধরে কাজ করে, “আপন মনের মাধুরী” মেশায় না।

এটা একটা মস্ত বড় শিক্ষা। জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রায় কাজে লাগে। মনে করুন ফেলুদা লালমোহনবাবুকে কানপুরের ট্রেনের কামরায় প্রথমবার দেখছে। সে সেই সময়তেই গোয়েন্দাগিরির কায়দায় লালমোহনবাবুকে পড়ছে। কব্জিতে ঘড়ির তলায় ভদ্রলোকের আসল চামড়ার রঙ সে নজর করেছে। সেখান থেকে তার মন বিশ্লেষণ করছে যে ভদ্রলোক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। লালমোহনবাবু ভাল কি মন্দ, কি ছাপোষা বাঙালী এসব সে ভাবে না।

৫| ফেলুদা শেখে, প্রতিনিয়ত শেখে, ওর মধ্যে ওভারকনফিডেন্স ব্যাপারটা নেই

সে রেগে ওঠে না, সাংঘাতিক প্ররোচনার মধ্যেও তার মাথা বরফের মত ঠাণ্ডা থাকে। সে গালাগালি করে না, সে চীৎকার করে অন্যকে থামিয়ে দেয় না, সে মানুষকে অকারণে অপমান করে না। সে জানে তার কোথায় সীমাবদ্ধতা, সে তাই শেখে। তার সিধুজ্যাঠার প্রয়োজন হয়। আমাদেরও। ফেলুদা সবজান্তা নয়, সেও সব জানে না। যখন প্রয়োজন হয়, সে সিধু জ্যাঠার শরণাপন্ন হয়। সে ন্যাশনাল লাইব্রেরী যায়, সে পড়ে।