মেরি ক্রিসমাস ২৪-১২-১৫

প্রত্যেকর বিদ’আ বা নবউদ্ভাবিত বিষয়ের টিকে থাকার জন্য ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞানতা অপরিহার্য। যারা মুসলিম হয়েও ক্রিসমাস উইশ করেন তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুপাতে দুটোই বিদ্যমান। 
.
.
যারা ক্রিসমাস উইশ করতে সমস্যা কি, সেটা বুঝতে পারছেন না তাদের জন্য দুটি তথ্য যথেষ্ট, যদি আসলেই সত্য গ্রহণ করার, স্বীকার করার স্রোতের বিপরীতে যাবার মতো মানসিকতা ও সাহস থাকে। 
.
১। ২৫শে ডিসেম্বর ক্রিস্টানরা নাবী ‘ঈসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের জন্মদিন পালন করে না। তারা এই দিন “God’s only begotten son” -এর জন্মদিন পালন করে। শুধুমাত্র “ঈশ্বরের পুত্র” বললে আসলে “begotten son” বলতে কি বোঝানো হয় সেটা ক্যাপচার করা যায় না। begotten শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝানো হয় এই “সন্তান” কোন “মানসসন্তান” ধরণের কিছু না, বরং প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জন্মানো সন্তান। নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক, আস্তাগফিরুল্লাহিল আযীম। লা হাওলা ওয়ালা কু’আতা ইল্লাহ বিল্লাহ। তারা আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া জাল এর ব্যাপারে যা বলে তা থেকে তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আল সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। 
.
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি
He begetteth not, nor is He begotten;
.
.
খ্রিষ্টানদের এই বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে কুফর এবং অত্যন্ত জঘন্য ধরণের কুফর। এই নোংরা মিথ্যাচার যে কতোটা গুরুতর সেটা সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া জাল আমাদের সূরা মার’ইয়ামে জানিয়েছেনঃ 
.
তারা বলেঃ আর-রাহমান আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।
নিশ্চয় তোমরা তো এক জঘন্য কাজ করেছ।
হয় তো এর কারণেই এখনই নভোমন্ডল ফেটে পড়বে, পৃথিবী খন্ড-বিখন্ড হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচুর্ণ হবে।
এ কারণে যে, তারা আর রাহমান আল্লাহর প্রতি সন্তান আরোপ করে। 
[সূরা মারইয়াম, আয়াত ৮৮-৯১] 
.
.
আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া জালের ব্যাপারে এরকম কিছু বলাটা কি পরিমাণ ঘৃণিত, এই আয়াত থেকে সেটা বোঝা যায়। কুর’আনে আরো অনেক আয়াতে এই জঘন্য মিথ্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে। পাশাপাশি খ্রিষ্টানরা ২৫শে ডিসেম্বর একজন ঈশ্বরের জন্মদিন পালন করে। খ্রিস্টানরা মনে করে ঈশর একের ভেতর তিন, যে তিনের একজন হলেন ‘ঈসা ইবন মারইয়াম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম। এরকম বিশ্বাস কুফর তো বটেই তার পাশাপাশি এটি শিরকও। তাই মূলত ২৫শে ডিসেম্বর তারা ঈশ্বরের সন্তান ঈশ্বরের জন্মদিন পালন করছে।একজন মুসলিমের পক্ষে তাই কোনভাবেই এরকম একটি কুফর ও শিরক বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে উৎসব পালন করা হয়, শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে সেটার সাথে একাত্বতা ঘোষণা করা সম্ভব না। 
.
.
কেউ হয়তো বলতে পারেন, “আমরা এই বিশ্বাসের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করছি না, আমরা শুধু উৎসবের সাথে, আনন্দের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করছি।“। কিন্তু কথাটা আসলে গ্রহণযোগ্য না, কারণ কথাটা যৌক্তিক না। এই উৎসব, আর এই বিশ্বাস আলাদা দুটি বিষয় না। আপনি যদি অন্তর্নিহিত বিশ্বাসটাকে অনুষ্ঠান থেকে আলাদা করেন, তখন বাকি থাকে নিছক কিছু র‍্যান্ডম কাজ মাত্র। ক্রিসমাস পালনের নামে যেসব উৎসব বা অনুষ্ঠান পালন করা হয়, আলাদা আলাদা ভাবে সেগুলো অর্থহীন। এগুলোর সাথে একাত্বতা ঘোষণা করার কোন মানে হয় না। 
.
.
যেমন, বলা হয়ে থাকে, পশ্চিমা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মদ খাওয়া হয় ক্রিসমাস এবং নিউইয়ারের সময়। অর্থাৎ লম্বা ছুটি পেয়ে, দল বেঁধে মদ খেয়ে মাতলামি করা এখন ক্রিসমাস পালনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যদি আমি বলি আমি উৎসবের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করছি, তার মানে কি আমি দলবদ্ধভাবে মদ খেয়ে মাতলামি করার সাথে একাত্বতা ঘোষণা করছি? ক্রিসমাসের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত আরেকটি বিষয় হল কেনাকাটা করা। বছরের সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় ফোর্থ কোয়াটারে, ক্রিসমাস এবং নিউইয়ারের কারণে। এখন চিন্তা করে দেখুন, শুধুমাত্র কেনাকাটার সাথে একাত্বতা ঘোষণা করার কি কোন অর্থ হয়? আর যদি ধরে নেই অর্থ হয়, তাহলে যদি কেউ প্রতি বছর জুন মাসে দলবদ্ধ মদ খাওয়া আর ব্যাপক কেনাকাটা করার প্রথা চালু করে, আমরা কি সেটার সাথে একাত্বতা ঘোষণা করবো?
.
.
ক্রিসমাসের সময় শুধু যে খারাপ কাজ হয়, ভালো কাজ হয় না, এমনো না। বিভিন্ন ভাবে এই উৎসব পালন হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছুকে এক সূত্রে গাথে, সবগুলোকে অর্থ দেয় অন্তর্নিহিত বিশ্বাসটি। তাই আমরা যদি ক্রিসমাস উইশ করি, তখন সেটার অর্থ হল, এই “begotten son” এর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। তাই জেনেশুনে, বুঝে এরকম একটা কথা বলা কুফরের পর্যায়ে পড়ে। আমরা আল্লাহ-র কাছে এরকম চিন্তা এবং কাজ থেকে আশ্রয় চাই। 
.
.
২। ‘ঈসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের জন্ম ২৫শে ডিসেম্বর না। আর “ঈসা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের জন্মের হাজারো বছর আগে থেকে প্যাইগানরা [মুশরিকীন] ২৫শে ডিসেম্বর সূর্য দেবতার জন্মদিন পালন করে আসছে। আর ৩২৪ খ্রিষ্টাব্দের আগে খোদ খ্রিষ্টানরাই ২৫শে ডিসেম্বর “ঈসা আলাইহিস সালামের জন্মদিন পালন করতো না। ২৫শে ডিসেম্বর দিনের ইতিহাসটা আরো পুরনো, এবং এর সাথে ‘ঈসা আলাইহিস সালামের আসলে সম্পর্কই নেই। আসিরিয়ান, ব্যাবলোনিয়ান, পারসিয়ানরা তাম্মুয আর মিথ্রাস-এর পুনরুত্থান দিবস হিসেবে এই দিনে উৎসব করতো। গ্রেকো-রোমানদের মধ্যে এটা রূপ নেয় অ্যাপোলো আর ডাইওনাইসিসের উৎসব হিসেবে। বিভিন্ন সভ্যতা, বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন দেবতার সম্মানে এই উৎসব পালন করলেও, সবক্ষেত্রেই কিছু কমন বৈশিস্ট ছিলঃ
.
১. এই সবগুলো সভ্যতা কোন না কোন ভাবে সূর্যের উপাসনা করতো। এজন্য স্থা-কাল-পাত্র ভেদেও ২৫শে ডিসেম্বর তারিখটি পরিবর্তিত হয় নি, কারণ ২৫শে ডিসেম্বর, অ্যানুয়াল সোলার সাইকেলের সাথে সম্পর্কিত
২. প্রতিটি সভ্যতা, বিশ্বাসের দিক দিয়ে ছিল মুশরিক
৩. প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই দিনে উৎসবের সাথে তারা এমন এক দেবতাকে যুক্ত করতো যে ছি, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত [slain and resurrected] [এ নিয়ে আরো পড়ার ইচ্ছে থাকলে দেখতে পারেন The Two Babylons — Alexander Hislop]
.
আর আপনি যদি বর্তমান খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস এবং আচার-অনুষ্ঠানের দিকে তাকান তাহলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে তারা প্রকৃতপক্ষে হাজারো বছরের পুরনো প্যাইগান আচার-অনুষ্ঠান এবং বিশ্বাসগুলোকে অন্য নামে চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি “ক্রিসমাস ট্রি” থেকে শুরু করে এই উৎসবের সাথে যেসব সিম্বোলজি ব্যবহৃত হয় তার সবকিছুই প্যাইগান অরিজিনের। মডার্ন ক্রিশ্চিয়ানটি শুধুমাত্র রিসাইকেল করে এই হাজার বছরের পুরনো রদ্দি শিরককে নতুন নামে উপস্থাপন করছে। 
.
.
আশা করা যায়, এ লেখা যাদের চোখে পড়বে তাদের ক্ষেত্রে আর অজ্ঞানতার দোহাই প্রযোজ্য হবে না। যদি আপনি ধরে নেন, এই উৎসবের শুরু হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক সূর্য উপাসনা থেকে তাহলেও এটা কুফর এবং শিরক। আর যদি আপনি মনে করেন এটা হল “ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে খ্রিষ্টানদের যে বিশ্বাস, সেটা অনুযায়ী পালিত একটি উৎসব, তাও এটি কুফর এবং শিরক এবং আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া জালের প্রতি জঘন্য মিথ্যাচার। যেভাবেই দেখুন, ক্রিসমাস পালনের শেকড় প্রোথিত কুফর এবং শিরকে।তাই কোনভাবেই একজন মুসলিমের জন্য ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানানো জায়েজ না। এ ব্যাপারে আরো জানার জন্য দেখতে পারেনঃ https://islamqa.info/en/145950 
.
.
অজ্ঞানতা অজুহাত হিসেবে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য হলেও ঔদ্ধত্য কখনোই না। যদি জেনেবুঝেও কেউ জেদ ধরে বসে থাকেন তিনি “ক্রিসমাস” পালন করবেনই, “মেরি ক্রিসমাস” বলবেনই — তবে তার এই ব্যাপারে আল্লাহ্‌ আযযা ওয়া জালের সামনে দাঁড়িয়ে জবাব দেবার প্রস্তুতি নিয়েও রাখা উচিৎ। কালচার, সোসাইটি, সিভিলাযেইশান, “সভ্য মানুষরা”, কোন কিছুই সেদিন কারো পক্ষে ওজর পেশ করতে পারবে না, কারো কাজেও আসবে না, এটাও মনে রাখা দরকার। আমাদের তো শুধু এতোটুকুই সামর্থ্য যে আমরা এই ব্যাপারে মানুষকে সতর্ক করার চেষ্টা করতে পারি। আল্লাহ্‌ সাক্ষী আমরা চেষ্টা করেছি।