লাইভ ফ্রম ঢাকা : উদ্দেশ্য এবং বিধেয়


যা হতে দেখছি তা অত্যন্ত ব্যথিত করছে, কারণ আমাকে যদি কেবল একটি মাত্র বাংলাদেশী সিনেমা নির্বাচন করতে বলা হয় এই মুহূর্তে, যেটি দেখার জন্য প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করছি, সেটি হল আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এর “লাইভ ফ্রম ঢাকা”।

শুরু থেকে শুরু করি।

২০১৬ এর অক্টোবরের শেষে সর্বপ্রথম লাইভ ফ্রম ঢাকা সংবাদে এলো। সিঙ্গাপোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান ফিচার ফিল্ম কম্‌পিটিশান বিভাগে অংশগ্রহণের জন্য সিনেমাটি নির্বাচিত হয়েছে। প্রযোজক/পরিচালক মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর মিসলিডিঙ গ্লোরিফিকেশানের ব্যান্ডওয়্যাগনে সবাই লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে উঠে পড়লেন।

“লাইভ ফ্রম ঢাকা” সিনেমার একটি দৃশ্য

. . মিসলিডিঙ গ্লোরিফিকেশান?

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়া কেন? ক্ল্যারিটির সহিত দেখলে এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বৈষয়িক। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্য প্রাথমিকভাবে, সিনেমার বাণিজ্য করা। একটি সিনেমা নিয়ে এর প্রযোজক একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে যোগ দেবেন এই প্রয়োজনে যে তিনি এক বা একাধিক দেশের এক বা একাধিক পরিবেশকের কাছে এক বা একাধিক প্রদর্শন মাধ্যমের জন্য সিনেমাটি তথা এর পরিবেশন স্বত্ব বিক্রয় করবেন।

পরিবেশকেরও রকমফের আছে। ইনফেরিওর পরিবেশকদের ব্যয় ক্ষমতা এবং পরিবেশন যোগ্যতা উভয়ই সীমিত। অপরদিকে সুপেরিওর পরিবেশকেরা আকর্ষণীয় মূল্য এবং চুক্তিতে সিনেমা ক্রয় করবেন এবং নিজ-স্বার্থেই ক্রয়-কৃত সিনেমার উজ্জ্বল বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন, এবং তাদের সে সামর্থ্যও ফরমিডেব্‌ল।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশকেরা বছর জুড়ে এত এত উৎসব, এত ব্যস্ততার মধ্যে কেবল গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোতেই মনোযোগ দেন, অংশগ্রহণ করেন। এবং সিনেমার বাণিজ্যের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই শ্রেণীর পেশাদার তথা ফিল্ম পাব্‌লিসিস্ট ও সেইল্‌স এজেন্টদেরও কর্মপদ্ধতি একই। অর্থাৎ সকল “কাজের” মানুষই কেবল গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেই গুরুত্ব দেন।

বলছিলাম প্রাথমিক উদ্দেশ্যের কথা। আর একটু এগোলে,

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানের আরেকটি উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, চলচ্চিত্র ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, অভিজ্ঞতা অর্জন, ভবিষ্যৎ কো-প্রোডাকশানের সম্ভাবনা জাগানো ইত্যাদি, একেবারে সরলভাবে বললে লিয়াজোঁ স্থাপন। এক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি, সকল “কাজের” মানুষ কেবল গুরুত্বপূর্ণ উৎসবেই অংশগ্রহণ করেন।

আরও একটি উদ্দেশ্য হতে পারে, একাধিক আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের অর্জনের তালিকা ভারী করা, যেটি পরবর্তীতে বিভিন্ন ল্যাব কিংবা ফান্ডের জন্য আবেদন, এমনকি ক্রাউডফান্ডিঙয়ের মত ইত্যাদি নানা তরিকায় পরবর্তী সিনেমা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের প্রয়োজনে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই, সকল “কাজের” মানুষই কেবল গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকেই গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ,

ইট অল কাম্‌স ডাউন টু এ্যটেন্ডিঙ প্রেস্টিজাস রেপুটেব্‌ল ইন্টারন্যাশ্‌নাল ফিল্ম ফেস্টিভাল্‌স। এই ২০১৭ সালে এসে, একটি নন-ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম এর জন্য, দ্যা অল্টারনেটিভ ইজ এ্যবসোলুটলি ইয়্যুজলেস।

কিন্তু গভীর বিস্ময়ের সাথে সংবাদে পড়লাম, লাইভ ফ্রম ঢাকার পরিচালক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ এর বক্তব্য,

আমরা দেড় মাস আগে ছবিটির একটি রাফকাট ফেস্টিভালে পাঠিয়েছিলাম

প্রথমত, রাফকাট?

একজন পরিচালক, যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোন নির্মাতা নন, আন্তর্জাতিক ফেস্টিভাল সার্কিটে যার কোন পূর্ব অর্জন দূরের কথা পূর্ব উপস্থিতিই নেই, তিনি একটি উৎসবে বিবেচনার জন্য তার “প্রথম” সিনেমার “অসমাপ্ত” একটি রূপ, একটি রাফকাট পাঠিয়ে দিলেন? কেন? সিঙ্গাপোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো এত নিতান্তই অগুরুত্বপূর্ণ উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য এই অদ্‌ভূতুড়ে মরিয়া পনা কেন?

এবং দ্বিতীয়ত, সিঙ্গাপোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো এত নিতান্তই অগুরুত্বপূর্ণ উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য এই অদ‌্ভূতুড়ে মরিয়া পনা কেন?

হতে পারে তিনি মনে করেননি সিনেমাটি প্রথম সারির উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা রাখে। হয়তো তার এ্যমবিশান সীমিত। কিন্তু, প্রিঃসাইস্‌লি সিঙ্গাপোর এর মত দুই টাকার উৎসবই কেন? এবং, আশ্চর্য! প্রথম সারির উৎসবগুলোতে চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি? তার হারানোর কি আছে? তৃতীয় শ্রেণীর একটি উৎসবে, তাও আবার রাফকাট পাঠানো, ইট জাস্ট ডাজ্‌ন্ট কম্‌পিউট!

ওদিকে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী, যিনি একসময় বুসান চলচ্চিত্র উৎসব কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতে করতে সংবাদমাধ্যমে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন কারণ তিনি বুসানে যেতেন তার সিনেমা নিয়ে, তিনি এবার সিঙ্গাপোর উৎসব কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে জ্ঞান দিতে লেগে পড়লেন।

যারা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গন সম্পর্কিত যে কোন সংবাদ/জ্ঞানের জন্য গুগ্‌ল ফেলে ওস্তাদের ফেইসবুকের দিকে চেয়ে থাকেন তীর্থের কাকের মতন, তারা “তাঁর” সবুজ সঙ্কেত পেয়ে জয়ধ্বনিতে লেগে গেলেন। মরার উপর খাড়ার ঘা হিশেবে সিঙ্গাপোর এ লাইভ ফ্রম ঢাকার পরিচালক আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ সেরা পরিচালক এবং অভিনেতা মোস্তফা মনোয়ার সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয় করে বসলেন। আবারও মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সবুজ সঙ্কেতে সকলের মনে হল বাংলাদেশের সিনেমা বিশ্ব জয় করেই ফেললো শেষ পর্যন্ত!

হায়!

আমাকে ভুল বুঝবেন না। আই এ্যম হ্যাপি ফর দ্যা টিম, ইফ দে দেমসেলভ্‌স আর হ্যাপি। কিন্তু অকার্যকর, কোনওরকম ব্যবহারিক উপযোগিতা বিহীন এইসব অর্জনের অন্ধ গ্লোরিফিকেশান বরং তাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিঙয়ের জন্যই ক্ষতিকর, এবং ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের জন্য ভুল বার্তা প্রদানকারী।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা জরুরী। ওয়ান শুড্‌ন্ট সেট্‌ল ফর লেস। প্রথম সারির আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ফেলে প্রাথমিকভাবেই ছোটখাটো অগুরুত্বপূর্ণ উৎসব এইম করা একটি দুঃখজনক অপচয়। যে কোন উৎসবেই “রাফকাট” জমা দেয়া অবিশ্বাস্য রকম নির্বুদ্ধিতা।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে বোঝা জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় উৎসবের তফাৎ বোঝা জরুরি এবং এইসব উৎসব এ্যপ্রোচ করার সঠিক কার্যকরী পদ্ধতিও জানা জরুরি।

সিঙ্গাপোর উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের পরে লাইভ ফ্রম ঢাকা কোন অর্থপূর্ণ অর্জন ছাড়াই তার “প্রিমিয়ার স্ট্যাটাস” হারাল। এরপরে সিনেমাটি যোগ দিল রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ব্রাইট ফিউচার বিভাগে, কিন্তু এর অন্তর্গত হিভোস টাইগার কম্‌পিটিশানের জন্য নির্বাচিত হল না।

একসময় গুরুত্ব থেকে থাকলেও-বা, প্রতি বছর সানড্যান্স ও বার্লিনের মত হাই-প্রোফাইল উৎসবের মাঝের এক ফালি সময়টুকুতে আয়োজিত, ২০১৫তে অবসর নেয়া ফেস্টিভাল ডিরেক্টর রুট্‌গার উল্‌ফসনের পরিচালনা সময়কালে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক উৎসবে পরিণত হওয়া রটারড্যামের এখন আর কোন গুরুত্ব নেই। সাম্প্রতিক সময়ে উৎসবটিকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা চলছে-মাত্র।

রটারড্যামে, প্রদর্শনীতে উপস্থিত দ্যা ডেইলি স্টারের রাফি হোসেইন “সাদ মিসিঙ ইন রটারড্যাম” শিরোনামে লিখলেন, I feel proud to declare that the audience enjoyed the film from the beginning to the very end. এই বাক্য আমার মনোজগতে একই সাথে আনন্দ এবং বিষাদের জন্ম দিল।

আমার বিশ্বাস, লাইভ ফ্রম ঢাকা এর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের যোগ্য ছিল। ইয়্যু মে নেভার নোও। এ্যন্ড নাও, উই ওন্ট এভার।


আর এখন,

পিনপতন নীরবতা। রটারড্যাম এর পরে লাইভ ফ্রম ঢাকা আরও কয়েকটি উৎসবে যোগ দিয়েছে। সর্বশেষ, এই মাসের শুরুতে কোরিয়ায় একটি উৎসবে সিনেমাটির প্রদর্শনী হয়েছে। কোন সংবাদ হয়নি।

আর সিনেমাটির ফেইসবুক পেইজেরও এই দশা কেন? হাও হার্ড ইজ ইট টু রান আ ফেইসবুক পেইজ স্মার্টলি? সোশাল মিডিয়ার উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, নতুন দর্শক সৃষ্টি করা, দর্শককে সিনেমার প্রসঙ্গে মুখর করা, মুক্তির আগ পর্যন্ত দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা কি অত্যন্ত দূরহ কর্ম? গুগলে খোঁজ লাগালেই সিনেমার প্রচার-প্রসারে সোশাল মিডিয়া স্মার্টলি হ্যান্ডেল করার প্রয়োজনীয়তা, কার্যকারিতা এবং উপায় সম্পর্কিত কত কত “হাও টু” মিলে যাবে। আর দিনের শেষে, অল ইয়্যু নিড ইজ আ স্টাডি অফ সিমিলার কেইসেস এ্যন্ড কমন সেন্স!

এমন নয় যে বাংলাদেশের সীমিত সংখ্যক সিনেমা হলগুলোতে সারা বছর সিনেমা চলে। জাজ মাল্টিমিডিয়ার যৌথ প্রযোজনার জোয়ারে, সাফটা চুক্তির আওতায় কোলকাতার সিনেমার মুক্তি বৃদ্ধিতে এবং বাংলাদেশের ড্রামাটিক সিনেমার বিগ নেম নির্মাতাদের আকস্মিক সচলতায় দিনে দিনে মৌসুমি সিনেমার চাপ বাড়ছে, বাড়তে থাকবে। লাইভ ফ্রম ঢাকা স্টার সিনেপ্লেক্স এবং ব্লকবাস্টার সিনেমাস, আর হয়তো শ্যমলী সিনেপ্লেক্স ছাড়া আর কোথায় মুক্তি পেতে পারে? কিন্তু সিনেপ্লেক্স আর ব্লকবাস্টারেও দিনে দিনে এ্যমেরিকান টেন্টপোল সিনেমার চাপ বাড়ছে, সাথে দেশীয় বাণিজ্যিক সিনেমা তো আছেই।

এছাড়াও, মানুষের মনোযোগের ব্যাপ্তিরও তো সীমা আছে!

এ্যন্ড দেন দেয়ার ইজ দ্যাট ইশু অফ করাপ্‌শান এ্যন্ড সেন্সর।

প্যানোস কৎজাথ্যানাসিস নামক এক ব্যক্তি পরিচালিত একটি অনলাইন প্রকাশনা এশিয়ান ফিল্ম ভল্ট এ প্রকাশিত আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ এর একমাত্র বিশদ সাক্ষাতকারটিতে কৎজাথ্যানাসিস এর একটি প্রশ্ন ছিল, How is the financial and social situation in Bangladesh at the moment? Why do so many people want to leave? Is there as much corruption as you portray in the film?

সিনেমায় যেমনটি দেখিয়েছেন এতটাই কি দুর্নীতি বিরাজমান?

প্রশ্নটির সাথে সাথে, সিনেমার গল্পে শেয়ার বাজার ধস এবং নেশাসক্ত একটি ব্যক্তি এবং স্ট্রঙ ল্যাঙ্গুয়েজ এর উপস্থিতি রয়েছে এগুলো বিবেচনায় নিলে, মনে ভাবনা জাগে, লাইভ ফ্রম ঢাকার সেন্সর ছাড়পত্র পেতে বেগ পেতে হবে কি না। সিনেমার ট্রেইলারেই বাস্তব রায়ট, পুলিশি চার্জ, বন্দুক বাগিয়ে ধাওয়া এবং ঠেঙানির ফুটেজ রয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি না কেটেছেটে আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ তার সিনেমা দর্শকের কাছে উপস্থাপন করতে চাইবেন।

এমনকি, শেষ পর্যন্ত লাইভ ফ্রম ঢাকার গন্তব্য যদি কোন টেলিভিশন চ্যানেল হয়ে ইয়্যুটিউবও হয়, ইট কুড হ্যাভ বিন মেইড টু ওয়ার্ক ইন ইট’স এ্যডভান্টেইজ।

যা হতে দেখছি, এমনটি হওয়া অনিবার্য ছিল না। ইট কুড হ্যাভ বিন হ্যান্ডেল্‌ড বেটার। ওয়ে ওয়ে বেটার। স্রেফ আন্ডারস্ট্যান্ডিঙয়ের অভাবে এখানে গড়াচ্ছে।

সিনেমার প্রতি ভালবাসা, উন্নত সিনেমা নির্মাণের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, ওয়ান হ্যাজ টু আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যা ওয়ে অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড।


লাইভ ফ্রম ঢাকার জন্য কেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি?

কারণ বাংলাদেশের ড্রামাটিক সিনেমা মানেই ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাওয়া, স্রেফ হাসানো এবং কাঁদানোর চেষ্টা করা। এমন সিনেমা নেই যেটি মানব চরিত্রের, মানব জীবনের আন্তরিক এক্সপ্লোরেশান, একটি অন্টোলজিকাল এক্সপ্লোরেশান।

লাইভ ফ্রম ঢাকার ট্রেইলার দেখে এবং এশিয়ান ফিল্ম ভল্টে পরিচালক আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ এর সাক্ষাতকারটি, যেটি আমার পড়া জীবিত যে কোন বাংলাদেশী পরিচালকের দেয়া সেরা সাক্ষাতকার, পড়ে আমার মনে হয়েছে, লাইভ ফ্রম ঢাকা তেমন একটি সিনেমা, মানব চরিত্রের এবং জীবনের এক্সপ্লোরেশান।

এবং ট্রেইলারটির মান।

সঠিক জানি না, আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ট্রেইলারটি আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ এর সম্পাদনা করা, কারণ অতি স্বল্প বাজেটের এই সিনেমাটির সম্পাদকও তিনি। এ্যন্ড ইট গিভ্‌স এ্যন অরা অফ কম্‌পিটেন্স এ্যন্ড স্মার্ট্‌স।

বেতার ধ্বনির মত সংলাপে, “কার্নিভাল” এর “আমোর” এর সঙ্গীতে, সম্পাদনার ছন্দে, সাদাকালোর কাব্যে, ট্রেইলারটি সিম্‌লেস, হোলসাম। নির্মাতা সাদ এর ক্র্যাফ্টস্‌ম্যানশিপের একটি প্রাথমিক প্রমাণ।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এশিয়ান ফিল্ম ভল্টে সাদ এর সাক্ষাতকারটি, যেটি, আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, আমার পড়া জীবিত যে কোন বাংলাদেশী পরিচালকের দেয়া সেরা সাক্ষাতকার। এই সাক্ষাতকারটি হাজার গুণে আগ্রহী করে তুলেছে আমাকে সিনেমাটির প্রতি।

এর সাথে সামান্য একটি ব্যক্তিগত কারণও জড়িত।

সাক্ষাতকারটির শেষে, প্যানোস কৎজাথ্যানাসিস এর একটি প্রশ্ন, Which are your most important influences as a director? এর উত্তরে সাদ এর বক্তব্য আমাকে বেশ চম্‌কে দিয়েছে।

সাদ বলেছেন,

I think my biggest influence came from Milan Kundera. His novels made me feel very different about understanding film as an art medium.

আমি নিজে মিলান কুন্ডেরার এভিড পাঠক। তার সকল উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ আমার পড়া। তার উপন্যাস এবং মূলত প্রবন্ধগুলো আমার নিজেরও সিনেমা দেখায় এবং বোঝায় গভীর প্রভাব রেখেছে, রাখছে। তাই সাদ এর উত্তরটি আমার জন্য চমকপ্রদ ছিল।

যেহেতু সামগ্রিকভাবে, সাক্ষাতকারটিতে সাদ এর দেয়া বক্তব্যে সততা রয়েছে বলে আমার অনুভূত হয়েছে, তাই, এই প্রভাবের কতটুকু প্রতিফলন তার নির্মাণে দেখা যাবে এর এন্টিসিপেশান আমাকে ভীষণরকম কৌতূহলী করে তুলেছে।

লাইভ ফ্রম ঢাকা যদি মুক্তি পায়, যে মাধ্যমেই মুক্তি পাক, সিনেমাটি দেখার পরে আমি অত্যন্ত আগ্রহের সহিত পরিচালকের সাথে আলোচনা করতে ইচ্ছুক, সিনেমাটি নিয়ে।

এর আগে কোন জানাশোনা না থাকা সত্বেও কেবল লেখার মাধ্যমেই একাধিক পরিচালকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছিল, তা থেকে ধারণা করেছি আমার পাঠকদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছেন চলচ্চিত্রাঙ্গনে যাদের যোগাযোগ ভাল। তাই এবার এ্যক্টিভ্‌লি এই অনুরোধটি উপস্থাপন করছি –

আমার পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ যথাসময়ে আব্দুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ সাদ এর সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারেন, কৃতজ্ঞ থাকবো।


এই লেখাটি যখন লিখছি, ওদিকে খবরে প্রকাশ, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে ছবিয়ালের ১২টি সিনেমা বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে!

ভাবছি আমার চেয়ারের নিচে পাকাপাকি ভাবে একটি কম্বল রেখে দেব, যাতে বারবার উল্টে পড়ে গিয়ে ব্যথা না পাই।

*

সিনেমা দেরীতে