ইসলাম কি শুধু আখিরাতের জন্যই?

মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহর ‘ইসলাম ও পশ্চিমা সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ বইটা পড়ছিলাম। সেখানে তিনি ‘যুক্তিবাদের প্রতারণা-এক’ এই শিরোনামের অধীনে তাঁর কাছে লেখা এক চীন প্রবাসী ভদ্রলোকের চিঠির কিছু অংশ তুলে ধরেন, সে লোক আবার নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবী ও করে থাকেন। চিঠির কিয়দংশ আমি তুলে ধরছি-
.
“খোদার সৃষ্ট এই বেশুমার সুখী-সমৃদ্ধ মানুষগুলোকে দেখে আমার মন কিছুতেই সায় দেয়না যে, মাত্র কয়েক বছর পরই এরা দোযখের পরিণত হবেন- যেনো এদের সৃষ্টির পেছনে খোদার এই একটিমাত্র উদ্দেশ্যই নিহিত রয়েছে। তাছাড়া এদের জনকয়েক ছাড়া বাদবাকি সবাই যদি কাফির ও মূর্তিপূজক হয়, তবে তাদের দোযখে নিক্ষেপের জন্য এটাই কি অপরাধ বলে গণ্য হবে যে, তারা খোদার দুনিয়াকে সমৃদ্ধ ও সুশোভিত করেছে?”
.
পশ্চিমা সভ্যতার গুনকীর্তনকারী বা তাদের মানসিক দাসত্বের ভয়াবহ শিকার কিছু মুসলিম ও জেনেটিক্যালি পশ্চিমের নির্ভেজাল দাসদের মুখ থেকে মাঝেসাঝে বের হয়ে আসে এক প্রশ্ন যা আরকি বেশ পুরাতন তবে চিন্তার জগত থেকে ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যে এই অস্ত্রটি সবসময় কিছু মানুষের জন্য কাজ করে থাকে। ‘ইসলাম তো শুধু আখিরাত আখিরাত করে, ইসলামে দুনিয়ার যেন কোনো দামই নেই, কিন্তু দুনিয়া না করলে কি চলে, তাহলে আল্লাহ দুনিয়ায় পাঠালেন কেন? অথবা ‘ইসলাম তো দুনিয়ার উন্নয়ন-উন্নতির পথে বাঁধা’ অথবা ‘ইসলাম তো শুধু আখিরাতের জন্যই, দুনিয়ার সাথে এর কি সম্পর্ক?’ আসলেই কি এমনটা?
-
-
(১) ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়া একটি পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ এই আসমান জমিন সৃষ্টি করে মানুষকে তাঁর খলীফারুপে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, পরীক্ষার জন্য, কে ভালো আর কে মন্দ আমল করে তা পরীক্ষা করার জন্য। সংক্ষেপে এটাই দুনিয়ার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। এখন দুনিয়ার সাথে ধর্মের সম্পর্কহীনতার এই শয়তানী আইডিয়া সর্বপ্রথম শয়তানের পরে মনে হয় চার্বাক আর গ্রীকদের(সবাই না অবশ্য) পরে হাল আমলের পশ্চিমা সভ্যতা ছাড়া আর কেউ জানত না। বর্তমান অক্সিডেন্টাল সভ্যতা তাদের পুরো সভ্যতার বুনিয়াদ যেই ধারনার উপর তা হলো ‘ধর্ম আর জীবন আলাদা, ধর্ম আখিরাতের বিষয়, পরকালের বিষয়, পরকাল আর এই সংক্রান্ত বিষয়, এ ছাড়া ধর্মের আর কোথাও কোনো নাক গলাগলি চলতে পারে না’ এককথায় সেক্যুলারিজম যাকে বলে আরকি। তাই সবার আগে বুঝতে হবে এই আইডিয়াটিই স্বয়ং বাতিল বা মিথ্যা। আখিরাত আর দুনিয়াকে আলাদা করে ফেলার যেই চিন্তাচেতনা থেকে এই প্রশ্নের উদ্ভব তা না বুঝলে সমস্যার গোড়ায় যাওয়া যাবেনা। আর এতে সমাধানের আশা করা সুদুর পরাহত। তাই মাথায় ভালোভাবে গেঁথে নেওয়াটা ফরয যে এই প্রশ্নের ভিত্তিই হলো বাতিল।
-
-
(২) ‘উন্নয়ন’ ‘উন্নতি’ এই প্রতিটি শব্দই কিছুটা ব্যাখ্যার দাবী রাখে। কেননা আমাদের মাঝে এই শব্দগুলো কেমন জানি নেগেটিভ রুপ পেয়েছে বা আমরা নেগেটিভ বানিয়ে ফেলেছি। ‘উন্নয়ন’ ‘উন্নতি’ বলতে মূলত কোনদিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে তা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কারন সেক্যুলার লিবারেল সভ্যতায় কোটি টাকা ব্যয় করে পতাকা টাঙাণো বিরাট উন্নতির পরিচায়ক যদি ও কমলাপুরের বস্তির কোনো সুরাহা না হয়; তাদের কাছে সুদৃশ্য ব্রীজ আর অপ্রয়োজনীয় সংস্কার আর সাজসজ্জায় উন্নয়ন বেয়ে বেয়ে পড়লে ও সকল মানুষের তাদের ভাষায় ‘মৌলিক চাহিদা’ পূরণ করা যেন কোনো উন্নয়নের মধ্যেই পড়েনা। গোঁজামিল দিয়ে হ্যান্ডসাম আমাউন্টের মাথাপিছু আয়ে খুব ডেভেলপমেন্ট হয় ইনাদের, যদিওবা দেশের দিকে তাকালে সব মাথাপিছু আয়ের ধারনা সব ব্রেইন আউট হয়ে যায়। সেক্যুলারদের কাছে আত্মিক উন্নয়ন কোনো উন্নয়নই না তাদের কাছে উন্নতি মানেই হলো নজরকাড়া বস্তুবাদী উন্নয়ন। তবে ইসলাম ‘ বা ‘উন্নয়ন’ উন্নতি’ শব্দকে ঠিক এভাবে ডিফাইন করতে রাজী নয়। ইসলামে উন্নয়ন ও উন্নতির সংজ্ঞা আরো গভীর ও মহান।
-
-
(৩) ইসলামে দুনিয়ার কথা নেই কথাটা কত হাস্যকর তা বুঝতে একজন আলেম বা তালেবে ইলম হওয়ার দরকার নেই, যে ১ মাস ও ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেছে সে ও বুঝতে পারবে এই কথাটা জোকসের থেকে কোনো অংশেই কম নয়। একটু বুঝুন-
.
ইসলামের অন্যতম একটি রুকন হলো যাকাত। যাকাতের মূলত দুনিয়াবী বিষয়, এর সাথে আল্লাহর হকের সম্পর্ক নেই। এটা পুরোটাই মানুষের হক। তারপরে কুরআনের দিকে তাকালে বুঝা যায় আল্লাহ জমিজমার বিধান দিয়েছেন, ঋণ লিখে রাখার জন্য বিরাট এক আয়াত নাযিল করেছেন, সুদ সম্পর্কে বলেছেন, বিয়ে-সাদীর বিষয়ে বলেছেন, অর্থনৈতিক বিষয়ে আয়াত নাযিল করেছেন। আর হাদীছ-ফিকহ-ফতোয়ার কিতাব খুললে তো সেক্যুলারদের মাথা ঘুরে যেতে পারে, মাঝেমধ্যে এটা কোনো ‘রিলিজিয়াস বুক’ নাকি কোনো ‘আইন এর বই’ তা নিয়েই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়া লাগবে। একটা বিখ্যাত ঘটনা মনে পড়ছে। হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ইমাম ও ইমাম আযম আবু হানীফার বিখ্যাত ছাত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শায়বানী রাহিমাহুল্লাহর। তাঁকে কেউ এসে একবার জিজ্ঞাসা করলেন,
.
“আপনি না এত বড় আলেম? তো আপনি যুহদ( দুনিয়া ত্যাগ বা দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি) নিয়ে কোনো কিতাব কেন লিখেন না।”
“আমি তো ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে কিতাব লিখেছি।”
“তো! তা তে কি হয়েছে?”
“কারন, যুহদের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে লেনদেনের সততার উপর।”
.
প্রপোগান্ডার কারনে আমাদের মনে হয়েছে ইসলাম বুঝি অন্যান্য ধর্মের মতই আখিরাতসর্বস্ব যাতে দুনিয়ার কোনো অংশই নেই। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে অন্য কিছু বুঝিয়ে দেয়। ইসলাম এক পূর্ণাঙ্গ দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। ইসলামে কিছু ফরয বিধান আছে যেগুলো পালন না করে যতই বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে আল্লাহর ইবাদাত করা হোক না কেন সেই ইবাদাতই হয়ত কিয়ামতের দিন মুখে ছুঁড়ে মারা হবে।
-
সারাদিন মসজিদে পড়ে থাকলেন আর আপনার বোনদের বা মেয়েদের পর্দার ব্যাপারে আপনার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে এই সারাদিন মসজিদে থাকাই আপনাকে জান্নাতে প্রবেশ বাঁধা দেবে, কারন আপনি সম্ভবত একজন দাইয়ুস।
-
আপনার অসুস্থ মাকে রেখে আপনি এদিকে ওদিকে দাওয়াত দিয়ে বেড়াচ্ছেন তবে জেনে রাখুন এই দাওয়াত তাবলীগ আপনার জন্য ঘোর অমানিশার কারন হবে হিসাবের খাতায়।
-
আপনি নফল ইবাদাত করে বেড়াচ্ছেন কিন্তু বাইরে বের হলে আপনার মুখ দিয়ে মিথ্যার তুবড়ি ছোটে তাহলে আল্লাহ না করুন আপনি না মিথ্যাবাদী হয়ে কিয়ামতের দিন উঠেন।
-
খুব আল্লাহওয়ালা লোক! কিন্তু বাড়ির মেয়েদের বা বোনদের জমিজমায় হক আল্লাহর শরীয়াত মোতাবেক দেন নি! তবে পাক্কা একদিন এই সম্পত্তির হিসাব দিয়ে তবেই জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে। এর আগে কোনোমতেই না।
-
ঠিকঠাকমত যাকাত দিচ্ছেন না? দিলে ওই রমযান মাসে ফিনফিনে কিছু যাকাতের শাড়ি দিয়ে দায় সারা টাইপ যাকাত দেওয়া হচ্ছে? মনে রাখবেন এই সম্পদ একদিন আপনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
-
এতক্ষন এই ভয়ানক সংবাদগুলো একটা ও নফল ইবাদাতের বা জিকির থোড়াসা কম করার জন্যে বলা হয়নি, এই সবগুলোই দুনিয়াবী কারনে, দুনিয়াবী কাজে আল্লাহর শরীয়াতের লংঘন করার জন্যে। মূলত ইসলামে আখিরাত নির্ভর করেই কিছু পিউর দুনিয়াবী কাজের শরীয়তমাফিক বিশুদ্ধতার উপরে। যেগুলোর অনুপস্থিতিতে কেউ সমাজের দৃষ্টিতে হয়ত পরহেজগার বলে খ্যাতি লাভ করবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে যে সে পরহেজগার নয় এটা নিশ্চিত। তাই ইসলামকে শুধু আখিরাতের সাথে সম্বোধিত করা এটা স্রেফ শয়তানী চাল ছাড়া আর কিছু নয়। ইসলাম অন্যান্য বাতিল সো কল্ড রিলিজিয়ন-বিলিফ সিস্টেম-ধর্ম নয় যে দুনিয়াকে বাদ দিয়ে শুধু স্রষ্টার সাথে সম্পর্কের মিথ্যে বাণী শোনানো। সারাদিন খেটে খাওয়া মানুষটার কষ্ট না দূর করে শুধু জিকিরের ফযীলত শোনাবে এমন নয়। কারন এই দ্বীন তো মানুষের বানানো নয় এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন তাঁর বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতে কি প্রয়োজন, তাই ইসলামের বিধান ও পুঁতির মালার মত সাজানো ও সুশৃঙ্খল। ইসলামের মূল সার্থকতাই হলো এটা তাঁর অনুসারীদের অন্তরে গেঁথে নেওয়া যে, ‘জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চলার মাধ্যমে পরিপূর্ণ ভাবে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করাই হলো প্রকৃত ইসলাম’; ইসলামের সাথে সেক্যুলারিজম-লিবারেলিজমের চিরন্তন দ্বন্দ্ব এখানেই।
-
-
হ্যাঁ ইসলাম দুনিয়ায় সবক্ষেত্রেই আখিরাতকে প্রাধান্য দেওয়াকে পছন্দ করে। দুনিয়ার পিছনে মাত্রাতিরিক্ত লোভাতুর হওয়া, দুনিয়াবী কাজে মাত্রাতিরিক্ত সময় দেওয়া যার কারনে আখিরাতকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া, এর কারনে আখিরাত থেকে গাফেল হয়ে যাওয়া, ইসলামে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সম্ভবত সেক্যুলাররা এই কারনেই ইসলামের উপর ক্ষেপা যে ইসলাম তাদেরকে দুনিয়ায় খামখেয়ালীপনাকে চিরতরে উচ্ছেদ করেছে, নফসের খাহেশাতের অনুসরণকে হারাম করেছে। মূলত এটিই দুনিয়াকে আরো সুন্দর করার গভীর চেতনা।
