একটি লাভজনক ব্যবসা!
প্রায়ই আমি বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায় ইনভেস্ট করি সুযোগ পেলেই। খুব অল্প ইনভেস্ট, এই ধরেন পঞ্চাশ একশো টাকা এরকম। এই সেদিন বাসে করে অফিসে আসছিলাম। এক হুজুর এসে বসলো পাশের সিটে। আমার কাঁধের ব্যাগে সবসময় দু একটা বই থাকে। তখন ছিল শাইখ খালিল আল হোসেনানের লেখা “রাসূল (সঃ) এর ১০০০ সুন্নত” বইটা। আমাকে পড়তে দেখে মুরব্বি হুজুর বেশ আগ্রহ নিয়ে বইটার দিকে তাকালেন, আমার থেকে চেয়ে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ উলটে পাল্টে দেখলেন, দাম জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞেস করলেন, বুঝলাম খুব পছন্দ হয়েছে। বাস থেকে নামার সময় বইটা হুজুরকে হাদিয়া দিয়ে আসলাম।
.
খুব ছোট একটা ইনভেস্ট, যদিও দুনিয়াতে হয়তো তেমন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এই ছোট ব্যবসাটাও বেশ দামী, কারণ ব্যবসাটা স্বয়ং আল্লাহর সাথে। এই হুজুর ভাই এই বইটা পড়ে যা আমল করবে সেটা তো সে পাবেই, আর ফ্রীতে আমার আমলনামাতেও যোগ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বইটা যদি হারিয়েও যায়, উনি যদি সেখান থেকে পাঁচটা আমলও কন্টিনিউ করেন, যতজনকে সেই আমল শেখাবেন, তারা যতজনকে শেখাবে, তারা যতজনকে শেখাবে……সব চক্রাকারে একটা অংশ আমার কাছেও চলে আসবে। সুবহানআল্লাহ! এটা তো গেল তাদের আমলের শেয়ার, আল্লাহর কাছ থেকেও তো আছে, সেটা আবার দশগুণ। আল্লাহ বলেন,
.
مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
“যে একটি সৎকাজ করবে, সে তার দশগুণ পাবে এবং যে, একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” (সূরা আন’আমঃ আয়াত ১৬০)
.
আমরা সবাই ব্যবসা করি, সুযোগ খুঁজি কোন জায়গায় ব্যবসা করলে ভালো লাভ হবে, কোন জায়গায় ইনভেস্ট করলে সত্যিকার অর্থেই আমাদের ভবিষ্যৎ সিকিউরড হবে। অথচ আল্লাহর সাথে কেউ ব্যবসা করতে চাইনা। চাইনা আখিরাতে আমাদের জীবনটা সিকিউরড থাকুক। মানুষকে এসব বললে আরো হাসে, কৌতুক করে।
.
আল্লাহর সাথে ব্যবসা করেছিলেন সাহাবী আবু দারদা (রাঃ)। একবার রাসূল (সঃ) এর কাছে এক এতিম এসে বলল, ইয়া রাসূলুলাহ! আমার একটি বাগান আছে, আমি সেই বাগানের চারদিকে দেয়াল দিতে চাই। কিন্তু আমার বাগানের সীমায় আরেক ব্যক্তির একটা খেজুর গাছ পড়েছে যার জন্য আমি দেয়াল দিতে পারছি না। সে খেজুর গাছটি আমাকে বিক্রিও করছে না। রাসূল (সঃ) সে লোককে ডাকলেন, সে ছিল একজন মুনাফিক। রাসূল (সঃ) তাকে বললেন, তুমি গাছটি আমাকে বিক্রি করো আমি তোমাকে জান্নাতে একটি গাছের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যে গাছের ছায়ায় হাঁটতেও ১০০ বছর সময় লাগবে। কিন্তু সে বিক্রি করলো না। এ সময় রাসূলের সাথে ছিলেন আবু দারদা (রাঃ)। তিনি রাসূলকে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! যদি আমি গাছটি কিনি তাহলে আমার জন্যও কী জান্নাতে এমন একটি গাছ থাকবে? রাসূল (সঃ) জবাব দিলেন, হ্যাঁ তোমার জন্যও একটি গাছের প্রতিশ্রুতি দিলাম।
.
আবু দারদা (রাঃ) সেই লোকের কাছে গিয়ে গাছটি কিনতে চাইলেন। মুনাফিক জবাব দিল, আমি আল্লাহর নবীকে যে গাছ বিক্রি করিনি এখন সেটা তোমাকে বিক্রি করবো? আবু দারদা বললেন, তুমি কী আমাকে চেনো? লোকটি বলল, তোমাকে কে না চেনে, তোমার বিশাল বাগানের কথা কে না জানে, ৬০০ গাছ, সুমিষ্ট পানীয়, বাড়ী। আবু দারদা বললেন, তুমি যদি আমাকে গাছটি বিক্রি করো তাহলে আমার পুরো বাগানটিই তোমার। লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, আপনি আমার সাথে মজা করছেন? আবু দারদা বললেন, না আমি সত্যি বলছি, তুমি আমার পুরো বাগানের বিনিময়ে গাছটি আমাকে বিক্রি কর।
.
এই ঘটনা রাসূল ওহীর মাধ্যমে জেনে গেলেন। তিনি আবু দারদাকে বললেন, আমি তো তোমাকে একটি গাছের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আমি দেখছি তোমার পুরো জান্নাত খেজুর গাছে ভরে গেছে। আবু দারদা সেসময় তাঁর স্ত্রীর কাছে গেলেন। তাঁর স্ত্রী বাগানে কাজ করছিলেন। আবু দারদা বললেন, বাগান থেকে বেরিয়ে আসো, এই বাগান আমি জান্নাতের একটা গাছের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি, যে গাছের ছায়া ধরে হাঁটতেও ১০০ বছর লাগবে। আবু দারদার স্ত্রী বললেন, কি উত্তম ব্যবসা! কি উত্তম ব্যবসা! উলামারা বলেন, এরপর আবু দারদা আর তাঁর স্ত্রী খুব গরীব হয়ে গিয়েছিলেন, এরপরও তারা আনন্দিত থাকতেন তাদের জন্য প্রতিশ্রুত জান্নাতের কথা ভেবে। আল্লাহু আকবর!
.
আজ আমাদের সমস্ত কিছু দুনিয়াকে কেন্দ্র করে। আমাদের ধন, সম্পদ, আমাদের সঞ্চয়, আমাদের অট্টালিকা সব দুনিয়াতেই। যে কারণে আমরা কেউ মরতে চাইনা, মৃত্যুকে ভয় পাই।
.
খলিফা সুলায়মান ইবনে আবদুল মালিক একবার এক তাবিয়িন আলেমের সাথে ছিলেন। তিনি আলেমকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই কেন? কেন কেউ মরতে চাইনা?
.
আলেম উত্তর দিলেন, ইয়া আমিরুল মুমিনীন! আমরা সবাই দুনিয়াতেই আবাদ করি, আর আখিরাতকে আবাদশূন্য ফেলি রাখি, দুনিয়া বিনির্মাণ করি আর আখিরাতকে করি ধ্বংস। সেজন্যই আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই। কারণ কেউ যা নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ফেলে যা সে নিজের হাতে ধ্বংস করেছে সেখানে যেতে চায়না।
.
আমরা পুরো একটা জীবন খরচ করি এই দুনিয়ার পেছনে, এই দুনিয়ায় সিকিউরড থাকার পেছনে, আরামে থাকার পেছনে। আমাদের স্বপ্নের প্রাসাদ নির্মাণ হয়েছে এই দুনিয়াতে, আর আখিরাতে আমাদের কিছুই নেই। পক্ষান্তরে যারা তাদের অর্থ, সম্পদ, সময়, সবকিছু খরচ করেছে আখিরাতে তাদের প্রাসাদ নির্মাণে, যারা আবু দারদার মত জান্নাতে বাগান কিনেছে, যারা উমরের মত জান্নাতে হীরার বাড়ী কিনেছে তারা সবসময় উদ্রীব থাকে কবে এই দুনিয়া ছাড়বে, কবে তাদের নির্মিত প্রাসাদে যাবে, কবে আখিরাতে তাদের অর্জিত সম্পদ ভোগ করবে। বিলাল (রাঃ) যখন শেষ সময়ে তখন উনার কষ্ট দেখে উনার স্ত্রী বলে উঠলেন, আহা! কী কষ্ট আপনার! জবাবে বিলাল (রাঃ) বলেছিলেন, কিসের কষ্ট! বরং আজ তো আমার আনন্দ! একটু পরেই আমি আমার রাসূলের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছি, আমার সাথীদের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছি। রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু।
.
আল্লাহ যেন আমাদেরকেও আবু দারদার মত লাভবান ব্যবসা করার তৌফিক দেন। আমাদের অন্তরগুলোকে যেন আখিরাতের সাথে বেঁধে দেন। আমাদের যেন আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করার, আখিরাতে প্রাসাদ বানানোর তৌফিক দেন। আমীন।