পথের সন্ধানে এক সন্ধ্যায়

অনেকটা আকস্মিকভাবে গত বছরের (২০১৩) সামারের শেষে ইতালি আসা। যখন এসে পৌঁছেছি তখন মাঝরাত। খুব দ্রুত ‘মারকো পোলো’ বিমানবন্দর থেকে যখন বের হয়েছি ততক্ষণে “ ট্রেনটো” যাবার শেষ ট্রেনটা ছেড়ে চলে গেছে। প্লান ছিল ওই ট্রেনটা ধরব, সেভাবেই সব আয়োজন করে রেখেছিল ওয়ার্কশপ অরগানাইজার । ওই শহরে যেতে হাই স্পীড ট্রেনে করে আড়াই ঘণ্টা মত লাগবে। শেষ ট্রেনটা মিস করাতে কিছুটা ঝামেলায় পড়লাম। তবে ফ্লাইট যখন দেরি করছিল তখন এয়ারপোর্ট এ বসে আসে পাশে থাকার ব্যাবস্থা দেখে নিয়েছিলাম। নিজের ব্যাংক কার্ড ছিল না তাই এক ফ্রেন্ড এর মাধ্যমে একটা হোটেল বুকিং দেইয়েছিলাম। সুবিধা ছিল যে পেমেন্ট করতে হবে চেক ইন এর সময়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি বাস এর জন্য, হোটেল এ যাব। বাস আসার নাম নেই, মানুষ জন ও বেশি নেই। বাস এর টিকেট কোত্থেকে কাটব বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যে একটা বাস এসে দাঁড়াল। একজন যাত্রীকে জিজ্ঞেস করে উঠে পড়লাম। মন খুত খুত করছিল টিকেট কাটিনি বলে। আমার কি দোষ? আমি তো কাটতেই চেয়েছি, খুঁজে পাইনি। মিনিট ৩৫ লাগল পৌছতে। হাতে গোনা অল্প কয়েকজন নামল। বাস থেকে নামতেই গা জুড়ে একটা ঠাণ্ডা শিহরন হল। সেটা হালকা শিশির মাখা বাতাসে নাকি স্বপ্নের শহর ভেনিস আসার কারণে- জানার চেষ্টা করলাম না। ভাসমান ভেনিস কে দেখে তখন সব ভুলে গিয়েছি।

গ্র্যান্ড ক্যানাল এর পানিতে পুরানো প্রাসাদ গুলিতে লাগানো নতুন বাতিগুলির প্রতিচ্ছবি চকচক করছে। ভেনিসে শুটিং করা অনেক মুভি আছে, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে জনি আর জোলি অভিনীত “টুরিস্ট” । প্রতিটা বাড়ির জানালা দিয়ে হয়ত জল ছোঁয়া যাবে। ছোটছোট খালের উপড়ে সারি সারি সেতু। ম্যাপে দেখে এসেছিলাম কি করে হোটেল পর্যন্ত যেতে হবে। কিন্তু ম্যাপের দেখা রাস্তা আর রাতের এই রাস্তা দেখে অচেনা মনে হল। সামনে এগোতেই তিনটা ব্রিজ । কোনটা নিব, ইতস্তত করছিলাম। সব থেকে চওড়া যেটা সেটা নিলাম।

জলের পাশ ঘেঁষা পথ ধরে হেঁটে চলেছি। সাজিয়ে রাখা গণ্ডলার গায়ে পরিশ্রান্ত ঢেউ আছড়ে পড়ছে। এতটা জার্নি করে আমারও ইচ্ছা হচ্ছিল কোথাও গা ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু হোটেল ই তো খুঁজে পাচ্ছি না। সাথে থাকা ক্যারি অন লাগেজ টা টানছি। পাথুরে পথে ব্যাগের চাকার শব্দে মনে হচ্ছে রোড রোলার চালাচ্ছি। আসে পাশের মানুষের ঘুম ভাঙবে ভেবে ভারি ব্যাগটা হাতে করেই এগোতে লাগলাম। এর মধ্যে ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। এত ব্যস্ততার মাঝে অসুস্থ হবার সুযোগ নাই। একটা বন্ধ দোকানের সামনের শেড এ দাঁড়ালাম। ব্যাগে ছাতা আছে। কে বের করবে এখন? খেয়াল করলাম পাশে একটা গলি মতন চলে গেছে। উকি দিতেই দেখি ঃ হোটেল। বাহারি কোন সাইনবোর্ড এর বালাই নেই। এখানকার সব দোকানপাট, হোটেল গুলো এমনই । বাড়তি প্রচারণার প্রয়োজন পড়ে না। “ভেনিস” নিজেই ভ্রমণ বিলাসীদের মন ভোলায়। চেক ইন করেই ব্যাগ রেখে বেড়িয়ে পড়লাম। ক্ষুধা লেগেছে খুব। তার উপর সকাল সাড়ে পাঁচ টার প্রথম ট্রেন টা ধরতে হবে। বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে। শুধু ঝাপটা বাতাস চারিদিকের শুনশান নীরবতা ভেঙ্গে দিচ্ছে। যেদিক থেকে এসেছি সেদিকের সব দোকানপাট বন্ধ, তাই অন্য দিকটা তে যেতে লাগলাম। কিছুদূর যেয়ে বন্ধ হবে হবে এমন একটা পিজ্জারিয়া খোলা পেলাম। বলল টাদের কাছে যা ছিল সব শেষ। আমাকে চিন্তিত দেখে জানাল যে ফ্রিজে একটা পিৎজা আছে, তৈরি করে দিতে পারে। আমি মহাখুশি, সাথে দেড় লিটার পানি নিলাম। তারা সফট ড্রিঙ্ক অফার করছিল, কিন্তু আমার এর প্রতি কোন সফট কর্নার নাই। তিন পিছ পিৎজা আর অর্ধেক বোতল পানি খেয়ে মোবাইলে পাঁচ মিনিট পরপর তিনটা অ্যালার্ম সেট করে সটান হয়ে শুয়ে পড়লাম।

যখন উঠে বেরিয়েছি তখনো অন্ধকার, স্টেশনের লোকজন ধোয়ামোছা করছে, কাউন্টার খোলে নি। টিকেট নিয়ে প্লাটফর্ম এ দাঁড়ানো ট্রেন এ বসে রইলাম। এক কোচে আমি একাই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ট্রেনের ট্র্যাক, কখনো পাহাড় এর মধ্যে দিয়ে, কখনো পাহাড়ের গা বেয়ে চলছে। আসে পাশের গ্রাম গুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গ্রাম গুলোর মতই সরলতা। যখন পৌঁছলাম তখন ওয়ার্কশপ শুরু হয়ে যাওয়ায়, হোটেলে চেক ইন না করেই ভেন্যুতে যেতে হল। সাতদিন সমান ব্যাস্ততার মাঝে শেষ হল, একটু এদিক সেদিক বের হবারও সুযোগ মিলল না। ওয়ার্কশপ এ ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ জন এসেছে, নন ইউরোপিয়ান তিনজন- আমি আর দুই জন পাকিস্তানি । এমনই একজন “ইউহা” — ফিনল্যান্ড এর আলতো ইউনিভারসিটি থেকে এসেছে। ওয়ার্কশপ এ এক টিম এ থাকায় এই কদিন এ বেশ জানা শোনা হয়েছে। তার ফ্লাইট ছিল শুক্রবার সন্ধ্যায় আর আমার ছিল শনিবার এ । শুক্রবার সকালের মধ্যে ওয়ার্কশপ শেষ হয়ে যাওয়াতে পুর বিকালটা আমাদের দু’ জনার ই খালি। আমরা আসে পাশে ঘুরে দেখার প্লান করলাম লাঞ্চ এর পর। সাথে আর একজন জুটে গেল সুইডেন এর। তার ওইদিন ই বিকালে ফ্লাইট থাকায় আমাদের সাথে অল্প সময় থাকবে।

তিনজন মিলে প্রথমে ক্যাবল কারে করে প্রথমে পাহাড়ের উপরে যেয়ে এক নজরে পুরো শহরটা দেখে নিব ঠিক করলাম। একদমই ভিড় নাই। তার উপর দুপুর বেলা। আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউ উঠল না। খুব দ্রুতই উপড়ে উঠতে লাগলাম। মাঝে মাঝে কানের পর্দা আটকে যাওয়ায় উচ্চতা আসলে কম না। দেখে নিলাম শেষ রাইডের সময়টা যাতে পাহাড়ের উপড়ে আটকে না পড়ি। হাতে সময় বেশি নেই। নিচ থেকে বোঝা না গেলেও উপরে বেশ কিছু বিল্ডিং আছে, রেস্ট হাউস মত। আমার সাথের দু’ জনেরই DSLR থাকায় তারা ছবি তোলায় ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। মাঝে মাঝে মনে হয় একটা DSLR কিনি। কিন্তু এত বড় একটা বস্তু বহন করাটা আমার কাছে বোঝা মনে হয়। কোথাও ঘুরতে গেলে এটা সামলাবো নাকি ঘুরব? তাই এখন পর্যন্ত পয়েন্ট শুটার আর মোবাইল ক্যামেরাতেই সীমাবদ্ধ । তবে সামর্থ্য থাকলে কোনকালে লাইট ফিল্ড ক্যামেরা কিনব। এখন পর্যন্ত Lytro একমাত্র বাজারে থাকায় দামটা চড়া। একপর্যায়ে তাদের ছবি তোলার জন্য ক্যামেরাম্যান হতে হল। সূর্য তখনো অনেক উপরে। পাহাড়ে সূর্যাস্ত দেখতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু সূর্যাস্তের বেশ দেরি। উপর থেকে একটা বেশ চওড়া রাস্তা চলে গেছে নিচে। সম্ভবত এই পথেই রেস্ট হাউসে মানুষজন আসে । সুইডিশ ফ্রেন্ড কে শুভবিদায় দিয়ে আমরা শুনশান সেই রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, গল্প করছি, ওয়াইন ইয়ার্ড দেখছি। আঙ্গুরের ভারে গাছের মাচাগুলো বোঝাই। বুড়ো মত একজন নুয়ে নুয়ে সেগুলো নিখুঁত কিনা নিরিখ করছিলেন। ইউহা সমানে ছবি তুলে যাচ্ছে। একসময় দেখলাম ডানদিকে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে। ওখানে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবছিলাম যে কোন রাস্তাটা নিব। এর মধ্যে বয়স্ক মত দুজন মহিলা যাচ্ছিলেন, তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কোন পথে হেঁটে যাওয়া যাবে ট্রেন স্টেশন। তারা ইংলিশ বুঝল কিনা বোঝা গেল না, আমাদেরকে সেই সরু রাস্তা ধরে যেতে বলল। আমরা সে মতে এগোতে লাগলাম। সময়ের সাথে সাথে সেই সরু পথ আস্তে আস্তে গাছের পাতার তলায় হারিয়ে যেতে লাগল। এ পথে কেউ আসে বলে মনে হয় না। দুপাশ জুড়ে লম্বা লম্বা গাছের সারি। একটা সময় আমাদের মনে হল আমরা বোধ হয় পথ হারিয়ে ফেলেছি। এমন ঘন গাছের কারণে সূর্য ডুবে গেছে মনে হল অথচ ঘড়ির কাঁটা সেটা বলল না। সময় চেক করতে যেয়ে মোবাইলে দেখি নেটওয়ার্ক নাই। মনের মধ্যে খুত খুত করতে লাগল যে কারো কাছে হেল্প এর জন্য ফোন করতে পারব না। চটজলদি দুজন মিলে যুক্তি করে নিলাম যে একজনের ফোন অফ করে রাখি ব্যাটারি বাঁচানোর জন্য। আরেকজনের টা ফ্লাইট মোডে রাখলাম, টর্চ লাইট ব্যাবহার করার জন্য। চলতে লাগলাম সামনে, পেছনে ফেরার উপায় নেই। অনেকপথ পার করে এসেছি, ওই পথে ফেরত গেলে রাত হয়ে যাবে, ইউহা ফ্লাইট মিস করবে। পথের ছবি তুলতে তুলতে এগোতে লাগলাম।

এক সময় ক্যামেরা লো ব্যাটারি সিগন্যাল দিতে শুরু করল। দুজন মুখ চাওয়া চাওই করলাম। টেনশনে ফ্যাকাশে হয়ে গেছি আমরা। ক্যাবল কারে ওঠার আগে আমরা জুস আর পানি নিয়েছিলাম, সে ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। ঢালু পথে পা আটকে আটকে নামাতে গোড়ালি ধরে আসছিল। খানিকক্ষণ চলার পর গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে দুরে কোথাও লাইটের আলো আমাদের কে পথ ফিরে পাবার আসার আলো দেখাল। পায়ের pain এর কোথা ভুলে গিয়ে আমরা দ্রুত দৌড়াতে লাগলাম। অবশেষে রাস্তার দেখা মিলল, মুহূর্তের মধ্যে একটা বাস ও এল। ইউহা তড়িঘড়ি করে উঠে পড়ল। তাকে বিদায় জানাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ায় আমি ভুলে গেলাম যে আমরা নিজেদের contacts information শেয়ার করা হয়নি। বিদায় দিয়ে আমি ফের আপন ট্র্যাকে হোটেলে ফেরার জন্য পা বাড়ালাম।

Like this:

Like Loading…


Originally published at khanreaz.net.

Like what you read? Give Khan Reaz a round of applause.

From a quick cheer to a standing ovation, clap to show how much you enjoyed this story.