On the way to Norway

কিল, অসলো, বার্লিন,

৬ অক্টোবর ২০১৪

কুরবানির ঈদ না করেই ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট ফিরলাম। এর আগের বছর ঠিক উল্টা হয়েছিল- ঈদের পরেই প্যারিস পাড়ি জমিয়েছিলাম। ফ্রাঙ্কফুর্ট ফাইনাল গন্তব্য নয়, যেতে হবে বার্লিন। কিন্তু ট্রেনের টিকেট হল পরদিন সকালের। রাতে থাকার জন্য এক ফ্রেন্ড তার জার্মান প্রবাসী মামাকে বলে রেখেছিল। তিনি অনেক বছর ধরে পরিবার নিয়ে এখানে থাকেন। এরাইভাল গেইট এ মামাকে আমি খুঁজে বের করলাম- যদিও কোনদিন দেখিনি, উনি আমাকে দেখেও বোধহয় সংশয় করছিলেন।

তার বাসায় যখন ফিরেছি ততক্ষণে বিকেলের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। Suburb এ বাসা বলে আরও নির্জীব। জানালা দিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্টের স্কাই লাইন দেখে যাচ্ছে। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে মামা খেতে ডাকলেন। মামী অনেক পদ রান্না করে ফেলেছেন। ওনাদের জানা নেই যে আমি হাল্কা খেয়ে থাকা মানুষ- এত কষ্ট না করলেও পারতেন। দুটো খেয়ে চোখ বন্ধ করলাম ঘণ্টা দুয়েকের জন্য। দুবাই থেকে বিশাল বপু’র Airbus A380 তে আরামে এলেও, যাত্রা পথে ঘুম হারাম হয়ে যায়। মামা কাজে চলে গেলেন, ওনার রাতের শিফট। মামী আর বাচ্চারা ও বেড়িয়ে পড়ল। পরদিন ঈদ বলে কমিউনিটির সবাই মিলে মেহেদি সন্ধ্যা করছে। মামী আর বাচ্চারা ফিরে এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে চা করে দিলেন। টিভি ছেড়ে চা এ চুমুক দিতে দিতে চাঙ্গা লাগল। সব দেখি বাংলাদেশি চ্যানেল, U.K থেকে রিলে হয়।

খুব সকালের ট্রেন বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পরলাম। সকালে মামার ডাকে ঘুম ভাঙল। দেখি উনি নিজেই পরাটা ডিম ভাজি আর ব্ল্যাক কফি করে রেখেছেন। মামী আর বাচ্চারা তখনো ঘুমুচ্ছে। গাড়ি করে বেরিয়ে পড়লাম। মামা আমাকে পোঁছে দিয়ে ঈদের জামায়াত ধরবেন। সরাসরি বার্লিনের ট্রেন বলে নিশ্চিন্তে পাঁচ ঘণ্টা পার করার প্লান। ট্যাবে মুভি শুরু করলাম। কেবিন ওয়ালা ওয়াগেন এ বসেছি- অনেকটা আয়েশ করে- হাত পা ছাড়িয়ে। সকালের ট্রেন বলে ধরে নিলাম কেউ আর আসবে না, আবার বাদামি চামড়া দেখে অনেকে হয়তো এসে বসবে না পাশে।

খানিক বাদে বাদে বৃষ্টি পড়ছে। এদিকের বৃষ্টি আমাদের দিককার মত না। ঝম ঝম করে ঝরে না, দমকা হাওয়া হৃদয়ে দোল দেয় না। মুভিটা গতানুগতিক- টেনে টেনে শেষ করতে চাইলাম। এরপর কিছু একটা পড়ার চেষ্টা করব। তার আগে চা- কফি কিছু একটা নিয়ে আসা দরকার। বৃষ্টি, বই এসবের সাথে চা- কফি টাইপ না হলে যাত্রা জমে না। ট্রেনের ক্যাফেটেরিয়া তে গেলে পাওয়া যাবে, দাম চড়া এই যা। দেখতে গেলাম আসলে কত- একটা klein (ছোট) kaffe macchiato নিলাম। কেবিন এ ফিরে দেখি আরও দুজন যাত্রী যোগ হয়েছেন। একজন প্রৌঢ় মত, অন্য জনকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি সটান হয়ে মুখের উপর বই চেপে শুয়ে আছেন। বয়স বোঝা যাচ্ছে না। এখানকার মানুষজনের বয়স চেহারা দেখেই বুঝা যায় না, জামাকাপড় সাঁজগোজ দেখে বুঝা আরও দায়। থুড়থুড়ি বুড়ি ও দেখা যাবে কড়া লিপস্টিক, নেইল পলিশ আর হাই হিল পরে হরদম সাইকেল চালাবে। নিজেকেই তখন বুড়ো মনে হয়।

ট্রেন বেশ জোরে যাচ্ছে। ফোনে চেক করে দেখি ২৮০ কিমি/ঘণ্টা। মজার ব্যাপার হচ্ছে বিমান কিন্তু এর থেকে বহু গুন জোরে যায়, তখন আমরা গা করি না কত জোরে যাচ্ছে। বরং গাড়ি — আর বাইক করে যেতে গেলে আমরা মাইল মিটার দেখতে উৎসুক হই। পাশের সহযাত্রী খানিক বাদে ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করে খাওয়া শুরু করলে আমার ব্যাগে রাখা স্যান্ডউইচ এর কথা মনে পড়ল। বাজেট ট্রাভেল করি বলে ব্যাগে খাবার বইতে হয়। তাতে আপত্তি করি না, ঘুরতে গেলে চোখের খিদা মেটে বলে পেটের ক্ষুদা পাত্তা পায় না।

বার্লিন মেইন স্টেশনে এসে নামলাম পড়ন্ত দুপুরে। যাত্রা তখন বাকি, কিল যাব। কিল হল জার্মানির একেবারের উত্তরের একটা শহর। উদ্দেশ্যঃ সী ওয়ে তে নরওয়ে যাওয়া। সঙ্গে যাবে সুশান। সে কিল এ থেকে মাস্টার্স পড়ছে। কয়েক মাস আগে থেকে সস্তায় বুকিং করা ছিল। cruise ship এর প্যাকেজ। কিল- অসলো- কিল। বার্লিন থেকে কিল পর্যন্ত বাসে ওয়াইফাই তেই কাটিয়ে দিলাম। স্টেশনে পৌঁছে খানিক দাঁড়াতেই সুশান চলে এলো। বাসায় ব্যাগ রেখে সুপার মার্কেট দোউড়ালাম দুজন। কিছু কেনাকাটা করতে হবে পরের দিনের ভ্রমণ ভোজন নিবারণে।

পরদিন দেরি করে উঠে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। সময়ের বেশ আগে জেটিতে পৌঁছলাম। colour line company এর cruiseship। এর আগে cruiseship দেখেছি কিন্তু যাওয়া হয়নি কোথাও। বছর কয়েক আগে একবার ক্যারিবিয়ান cruiseship গুলোতে যাব ভাবছিলাম, যাওয়া হয়নি। লম্বা সময় নৌ যাত্রা বলতে মনে পরে ছোট বেলায় স্টিমারে করে খুলনা থেকে বরিশাল যাওয়া। সে কি লম্বা সময় লাগত!

কমদামী টিকেট বিধায় জানালা বিহীন কেবিন। ১১ তলা শিপ এ ঢুকতে বিশাল লাইন। ৮ টা এলিভেটর থাকলে ও তিন চার বার এর আগে চান্স পাওয়া গেল না। কেবিনে ঢুকে ব্যাগপত্র রেখে সোজা উপরের ডেকে। দেখি বেশ দেরি করে ফেলেছি। সবাই সেখানে। চেয়ার তো দূরের কথা রেলিং এর কাছে ভিড়বার জো নাই। তিন কাতার দূরে দাঁড়িয়েই দূরের দালান কোঠায় ঠাঁসা বাসাবাড়ি দেখতে লাগলাম। সমুদ্র তখনো বহু দূর, চ্যানেল পার হয়ে সমুদ্রের সাক্ষাত পেতে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। বিকট করে দুবার হুইসল বাজল। বুঝলাম সময় হয়েছে তরীর তীর ছাড়বার। পন্টুন এর পাটাতন ক্রমে সরে যাচ্ছে। যাত্রী রা যার যার মত হাত নেড়ে বিদায় নিচ্ছে। বুঝতে পারছি না কে কাকে বিদায় দিচ্ছে। মনে হচ্ছে টাইটানিক চড়েছি। দোয়া কালাম যা মনে আছে পড়ে নিলাম। শিপের পাশে পাশে অনেক গুলো sailing boat পাস কাটিয়ে যাচ্ছে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ প্রেমিক — প্রেমিকা কে নিয়ে সময় কাটাতে। সাথে বাক্স ভর্তি বিয়ার। পানিতে ভেসে ভেসে পান করার তৃপ্তি বোধ হয় আলাদা। বে এরিয়া বলে beach বিনোদনের একটা বড় অংশ। তাছাড়া অসলো থেকে কিল পর্যন্ত এই cruising ferry বেশ পপুলার দু পক্ষের কাছে।

বিমানের মত করে ক্যাপ্টেন সংভর্থ্যনা জানালেন। ডেকের কোনায় কোনায় থাকা স্পিকারে মৃদু ছন্দ বাজছে। বেশ একটা উৎসব উৎসব আবহাওয়া। যেতে যেতে সাবমেরিন ডকইয়ার্ড দেখলাম। ভেড়ানো আছে একটা। দেখতে মনে হচ্ছে বড় সড় ডলফিন বেঁধে রাখা। পানির উপরে জাহাজে চড়তেই ভয় লাগে, ডুবোজাহাজে করে ডুবে জল খাওয়ার কথা ভাবতে গা শিরশির করে উঠল। শিরশির করার আরও কারণ আছে। fall এর শেষের দিক, তার উপর সমুদ্রের জল ভেজা বাতাস। ধীরে ধীরে চ্যানেল চওড়া হতে হতে আমাদের যাত্রার গতি বেড়ে গেল। দূরের তীরের মত ডেকের মানুষ ক্রমশ কমে যেতে শুরু করল। সঙ্গী রইল এক পাল বক সাদা গাংচিল- আমি বলি সমুদ্র সৈনিক । সৈনিকের মত এরাও দল বেঁধে থাকে আর তালে তাল মিলিয়ে ডানা ঝাপটে মার্চ করে সমুদ্র টহল দেয়।

বাতাসের তোড়ে আর দাঁড়িয়ে থাকা গেল না। পুরো ডেকটা একবার ঘুরে দেখলাম। মাঝে সুইমিং পুল- গোটা কয়েক পোলাপান নেমে পরেছে। পিছনে খুব সাবধানে গিয়ে রেলিং ধরে ডাবল প্রপেলারের পানিতে দাপাদাপি দেখে নিলাম। সকালে খুব কিছু খেয়ে বের হইনি। রুমে ফিরে গোসল সেরে কিছু খেয়ে একটা ঘুম দিয়ে নিতে হবে। সেই ঢাকা থেকে এখন পর্যন্ত থেমে থেমে চলেছি। বিছানায় শুয়ে হাত বাড়িয়ে রিমোট নিয়ে টিভি অন দেখলাম কি দেখায়। শিপ এর কোথায় ক’টায় কি প্রোগ্রাম আছে সেটার একটা চ্যানেল, আমরা কোন পথে যাচ্ছি তার লাইভ ক্যামেরা ফীড, সঙ্গে ম্যাপ, স্পীড আর নানা info. দেখলাম ২০ knots/hr এ যাচ্ছি। সেখান থেকেই এই লেখার শুরু। সঙ্গে থাকা সুশান অবশ্য ডেকে ডেকে ঘুরছে আর ছবি তুলছে। বোঝাপড়া ভালো এমন কারো সাথে ঘুরতে গেলে সুবিধা। সারাক্ষণ আঠার মত চিপকে থাকে না। যে যার মত দেখব, ঘুরব। না হলে হাজারটা ব্যপার মিলিয়ে চলতে হয়। আমরা কেবল একটা মেলালাম। রাতের খাবার টা food court এর ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে করব।

সন্ধ্যার পর পুরো শিপ শপিং মল এ রূপ নিল। মিউজিক, লাইটিং আর লোকজনের গমগম। বাচ্চাকাচ্চা রা ছুটো ছুটি করছে। উঠতি বয়সী গুলো কোনায় কোনায় জটলা পাকাচ্ছে। মধ্য বয়সী রা বসে মদ্য পানে মত্ত আর প্রবীণ রা হাত ধরাধরি করে প্রমোদতরীর এ দোকান সে দোকান ঘুরছে। ডিনার শেষে আবার উপরে গেলাম। এবারে সমুদ্রের অন্য সাঁজ। শীতল একটা অন্ধকার ঘিরে আছে। চাঁদের ক্লান্ত আলো জলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। ডেকের সামনের দিকটা ঢেকে একটা Bar মত করে নিয়েছে। খুব ভিড় নেই। সবাই নিচের আয়োজনে জমায়েত। লেখার নোটবুক টা সাথে করে নিয়ে এসেছি। একটা ফ্রুট পাঞ্চ নিয়ে কোনার দিকের কাঁচে ঘেরা টেবিল টা তে জায়গা করে নিলাম। তরী শান্ত পানি চিরে তর তর করে চলছে, পাশে আলো হয়ে আছে আধখানা চাঁদ।

<গুন গুন করছি>
এই রুপালি চাঁদে
তোমারি হাত দু’টি…

Show your support

Clapping shows how much you appreciated Khan Reaz’s story.