এক টেলিস্কোপ পোলিং এজেন্টের ভোটের দিন

আমার হাত ঘড়ি নাই, মোবাইলে সময় দেখি। কেন্দ্রে মোবাইল নেয়া নিষেধ; তাই বলতে পারতেছি না ঠিক কয়টার সময়ে আমি কেন্দ্রে ঢুকি। আনুমানিক আটটা হবে। ঢুকার সময়ে দেখলাম জনা দশের লাইন। সবাই মুরুব্বী; আমার জেনারেশন মনে হয় ঘুম থাইকা উঠতে পারে নাই! তাদের সামনে দিয়া টেলিস্কোপের পোলিং এজেন্ট পরিচয় দিয়া ঢুইকা পড়লাম। এতগুলা লোকরে এড়ায়া এই যে ঢুইকা পড়লাম, হেভি লাগল! মনে মনে ভাবলাম, অথরিটির তাইলে এইই মজা। এইসব ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে দেখলাম যে পোলিং এজেন্টদের একটা কার্ড নিতে লাগে। নেওয়া হইল। যে কক্ষে পাঠাইলেন প্রিজাইডিং অফিসার, সে রুমে যাইয়া দেখি বসার কিছু নাই। ছোট কইরা দুইটা স্কুলের বেঞ্চি দুই জন হায়েস্ট বসা যায়। যারা ইব্রাহিমপুরের চেরী গ্রামারের সাথে পরিচিত আছেন, তাঁরা জানেন কত ছোট একটা দালান। রুমগুলাও ছোট ছোট। আমি যাইয়া অফিসাররে কইলাম যে, স্যার বসার কিছু নাই। তিনি কইলেন আমি কী করব বল তো, অথরিটি যা দেয় তাই তো দিছি! তিনি মাঝ বয়েসি, চিকন-খাট কইরা একজন লোক। আমি হাসলাম, কইলাম তাও ঠিক। রুমে ঢুইকা দাড়ায়া গেলাম।

আমার গলায় ঝুলতাছে সাকি ভাইয়ের ছবিওয়ালা একটা কার্ড। আমার দেইখাই একটু নইড়া উঠলেন দুই নারী-পুরুষ পোলিং অফিসারের পুরুষজন আর ঘড়ি মার্কার এজেন্ট। আমারে নিয়া বেশ উৎসাহী হইয়া উঠলেন তিনারা। বিএনপির এজেন্ট দেখলাম বেশ ছোট একটা ছেলে। ২০-২১-২২ হবে। তাঁর কোন আগ্রহ নাই আমারে নিয়া। বেশ বিরক্ত সব কিছু নিয়া। অন্য দিকে, অনেক প্রশ্ন ঘড়ির এজেন্টের। সাকি ভাইয়ের দলের নাম জিগাইলেন তিনি। কইলাম। তিনি নিজেই কইলেন কমিউনিস্ট তো আপনেরা, সিপিবি-বাসদের ভিত্রে নাকি আপনেগো দল? আমি হাসতে হাসতে কইলাম না ভাই। আমরা আলাদা। পোলিং অফিসারের দিকে তাকায়া উনি কইলেন যে খুব কম সময়ে সাকি ভাই আগায়া গেছেন, ভাল নাম পাইছেন। খুব ভাল দল। পোলিং অফিসার মাথা নাড়ান। আমি তাকাইলাম কক্ষের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের দিকে। তিরিশোর্ধ একজন নারী। তেমন আগ্রহ দেখাইলেন না এই আলাপে।

ভোট তো চলতাছে সাইড দিয়া। আমি খাড়াইয়াই আছি। আমার দিকে তাকায়া আওয়ামী লীগের ঘড়ির এজেন্ট কইলেন যে, বস আপনের তো খুব কষ্ট হইতেছে। আমি কইলাম সমস্যা নাই। তিনি কইলেন যে, সমস্যা নাই আমি বাইরে গেলে আমার সিটে বইসেন একটু। আমি ধন্যবাদ জানাইলাম। দেখলাম যে, শুরু টাইমে মুরুব্বী জেনারেশন বেশি আসতেছেন। ভোট বেশ ভালই হইতেছে। কোন গ্যাঞ্জাম নাই। লোকজন আইসা আইসা ভোট দিতাছেন। মাঝে মাঝে ভীড়, মাঝে মাঝে হালকা এমনেই চলছে। প্রিজাইডিং অফিসারও হাঁটাহাঁটি করতেছেন, মাঝে মাঝে নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে থাকা প্রধান পুলিশ কর্মকর্তাও আছেন। তিনি যখন প্রথমবার আমারে দেখলেন, কন যে আপনে ভোটার? দাড়ায়া আছেন কেন? আমি কই যে না, পোলিং এজেন্ট। তিনি কন, ওহ সিট পান নাই? কোন টুলমুল নিয়া বসেন। আমি কইলাম টুল নাই। তিনি কইলেন যে, ও আচ্ছা, একটু কষ্ট করেন তাইলে।

তখন প্রায় এগারোটার মত, দেখলাম সকালে পানি কম খাওয়ার ফল, শরীল জ্বলতাছে আর গলা কাঠ। আমি ঘড়ির এজেন্টরে কইলাম, বস পানি আছে নাকি? তিনি কন যে, না। বাইরে থিকা খাইয়া আসা লাগব। আমি কই যে, কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার যে কইল ৪ টার আগে বাইর হওয়া যাইব না। উত্তরে ঘড়ি কয়, ধুর মিয়া! যান খাইয়া আসেন। কে কী কইব। আমি বাইর হইলাম। ইতিউতি তাকাইতেছি। বাইরের হাবভাব বুঝবার চেষ্টা করতেছি। যেদিকে তাকাই খালি ঘড়ি আর ব্যাডমিন্টন(আওয়ামী লীগের কাউন্সিলরের জন্য মনোনীত প্রার্থী)। মনে হইল যে, খালি তিনারাই খাড়াইছেন। এরই মধ্যে দেখলাম, আমার কক্ষের ঘড়ির এজেন্ট বাইরে আসছেন। আমারে দেইখা আগায়া আসলেন। জিগাইলেন কই থাকি, নাম কী, কী করি। একে একে উত্তর দেওয়ার পর দেখলাম আরো প্রশ্ন থাকার চান্স আছে তাঁর। আমি নগদে কইলাম, ভাই সামনে যামু একটু খাইয়া আসি।

সামনে হাটতে হাটতে দেখলাম একই সিন। মার্কা একটাই এই বসুন্ধরা বুকে। সিঙ্গারা খাইলাম, হোটলের মালিকও দেখি ঘড়ি গলায় ঝুলায়া বইসা আছেন! পানির বোতল কিনা ভিত্রে ঢুকলাম। দেখলাম লোকজন একেবারে কম। বিএনপির এজেন্টরে কইলাম, ঠিক আছে তো সব কিছু? সে বিরক্ত মুখ নিয়া মাথা সামনে পিছে করে। আমি আমার প্যাড বাইর কইরা নোট নিতাছি, যেহেতু আমি এজেন্টদের ঐ ভোটারের ডিটেইলসের কাগজটা আনি নাই। আমার প্যাডে লিখা শুরু করা দেইখা, দেখলাম পোলিং অফিসার একটু জড়সড় হইলেন। ঘড়ির এজেন্ট পাত্তা দিলেন না আর তাবিথ আউয়ালের এজেন্ট এইবার আগ্রহী হইয়া রীতিমত খাড়ায়া আমার প্যাডে উকি দিলেন। কী লিখতেছি জানতে চাইলেন। আমি কইলাম, আমার কাম করতেছি। তিনি আরো আগ্রহী হইয়া কইলেন যে, কী কাম? কবিতা লিখেন? আমি বেশ জোরে হাইসা দিলাম।

আমি এ রুম ও রুমে ঘোরাঘুরি করি। দেখি, একই অবস্থা। আইসা আমার কক্ষের দরজায় খাড়ায়া আছি। আমি পাশেই বেঞ্চি। কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ট্রাক্টর মার্কার এজেন্ট বসা অইখানে। আমার হাঁটুতে টোকা দিলেন। আমার কার্ডের দিকে তাকায়া কইলেন, এই প্রার্থীর নাম যেন কী? আমি কইলাম জোনায়েদ সাকি। তিনি কইলেন, চেহারাটা দেখলেই বুঝা যায়, অনেক শিক্ষিত। ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, তাই না? আমি কইলাম যে, হ ভর্তি হইছিলেন! পরে তাঁর লগে আলাপ জমল। তিনি এক গার্মেন্টসে লেবারের চাকরি করেন। বয়স জানেন না, তবে একাত্তরে হাফপ্যান্ট পড়তেন এইটা মনে আছে। তিনি জানাইলেন যে, সমাজটাই নষ্ট হইয়া গেছে। শিক্ষিত মাইনষের দাম নাই। তাঁর গ্রামে এক শিক্ষিত পোলা, বিএ পাশ চেয়ারম্যান পদে ইলেকশনে খাড়াইছিল। কিন্তু মাইনষে পাশ করাইছে এক মূর্খরে, তার উপর আবার হাত কাটা! সমাজটাই নষ্ট! পরে আমারে সাকি ভাইয়ের ছবিতে আঙ্গুল দিয়া কইল যে, এই পোলা একদিন অনেক সামনে যাইব। চেহারা দেইখাই বুঝা যায়! এরপর নিজের পরিবারের কথা কইতে থাকেন তিনি। এরই মাঝে এক মাঝবয়েসি শিক্ষিত চেহারার আঙ্কেল আমারে কন যে, সাকির লোক নাকি আপনি? আমি আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়া কই, জি। পিছের লোক তার চেনাজানা। তারে কন, এই জোনায়েদ সাহেব অনেক ভাল কাজ করতেছেন। আমি তারেও একটা হাসি দেই। হেভি লাগতেছিল। এই হেভি লাগা আরো বাইড়া গেল, যখন একটু পরে আরো দুইজন তিরিশের কাছে থাকা শিক্ষিত বড় ভাই আমারে (সাকি ভাইয়ের ছবি) দেখায়া কইতেছিলেন যে, এই লোক সেইই মাল! টকশোতে যখন কথা কন, কারু খাওয়া থাকে না। নগদে ট্রাক্টরের এজেন্ট আমারে ধইরা কন, দেখছেন? দেখছেন? কইছিলাম না? আমি হাসি।

এমন ভাল লাগার ঘটনা একটু পরে আবার ঘটে। আমি তখনও দরজার পাশে দাঁড়ানো। পাশের কক্ষে থাকা এক কাউন্সিলর প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট আমার দিকে এত ক্ষন ধইরা একটু পর পর তাকাইতেছিলেন, পাশের এজেন্টের লগে কানে মুখে কথাও কইতেছিলেন। তিনি দেখলাম, উইঠা কাছে আইসা আমার কানে ফিসফিস কইরা কইলেন যে, ভাই মেয়র পদে আমার ভোটটা কিন্তু আমি সাকি ভাইরেই দিমু। হ্যায় ভাল লোক। আমি এইবার আরও আপ্লুত হইয়া পড়লাম। তার দিকে কোনমতে তাকায়া বুড়া আঙ্গুল তুইলা থাম্বস আপ দিলাম। একটা হাসি দিলাম।

অইদিকে ১ টার মত বাজে। আমার খিদা লাগছে ম্যালা। ভাবলাম, খাইয়া আসি। বাইর হইলাম। কেন্দ্র থেকে বাসা দূরে না। বাসায় আইসা শুনি, আব্বা কইতেছেন যে, বিএনপি তো উইথড্র করছে আর কাফরুলে প্রচুর মারামারি হইছে। তোর কী অবস্থা? কিছু হয় নাই তো? আমি কই যে, না। আমার কেন্দ্রে অইসব এখনও হয় নাই। ফোনে হালকা ফেসবুকে গেলাম। দেখলাম যে, পোলিং এজেন্টদের বাইর কইরা দিতাছে। টিভি খবরের ফুটেজে জাল ভোট মারার দৃশ্য। আগামীর ঢাকা পেইজে দেখলাম টেলিস্কোপের এজেন্টদের বাইর কইরা দেওয়া হইছে। বুঝলাম যে আমার কেন্দ্রে এখনও বাতাস আইসা লাগে নাই। এই করতে করতে খাওয়া শেষ করলাম। খাইয়া ভাবলাম, নিজের ভোটটা দেয়া উচিত। পানির বোতলটা নিয়া, বাইর হইয়া গেলাম একেবারে।

আমার ভোট দিবার কেন্দ্র পড়ছে যেখানে, অইটা আবার আমি চিনি না। একটু খোঁজাখুঁজি কইরা পাওয়া গেল। বেশি দূরে না, আমার চেরী গ্রামার থাইকা। একটু উত্তেজনা টের পাইলাম। বুঝলাম পয়লা ভোট দিমু, তাও আবার সাকি ভাইরে। মজা লাগতেছে। কেন্দ্রে ঢুকলাম। তখন দেড়টার মত বাজে। কোন রুমেই ভোটার নাই। এজেন্ট-অফিসার-পুলিশ সবাই একাকার হইয়া গল্প করতেছেন, খাইতেছেন। বিরানীর গন্ধে আমার আবার খিদা লাইগা গেল। আমি রুমে উপস্থিত হইলাম। উনারা কইলেন আমি হইলাম তাগো রুমের ১০০ নম্বর ভোট! আমারে এই মর্মে কংগ্রাচুলেশেন জানাইলেন তাঁরা। পোলিং অফিসার আরও সরেস। যখন আঙ্গুলে ছাপ দিতেছিলাম, তিনি আমারে জিগাইলেন আমি বিয়া করছি কিনা! আমি হো হো কইরা হাসলাম। ভাবি যে, কি রে ভাই। এত হাসাহাসি হইতেছে ক্যান আজকে।

ভোট দিয়া, চিপায় খাড়ায়া একটা সিগ্রেটের হাফ টাইনা দৌড় দিলাম আমার কেন্দ্রে। কেন্দ্রে আইসা দেখলাম যে, একই সিন চলতাছে। ভোটার আর তাবিথ আওয়ালের এজেন্ট নাই। সব অলস বইসা আছে। আমি ভিত্রে সবার লগে একটু আড্ডা দেয়ার চেষ্টা করি, পরিবারের কথা জিগাই, বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম যে হেভি খেলতাছে ইদানিং এইসব নিয়াও বিস্তারিত আলাপ করি। মাঝখানে আবছা আবছা ভোটার আসেন, আবার আসেন না। আমরা বিরক্ত হই। আমি কেন্দ্রের বাইরে যাইয়া খাড়াই। দেখি, কেন্দ্রের দ্বায়িত্বে থাকা প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা বইসা আছেন। আমারে জিগান যে, সাকি ভাইয়ের দেশের বাড়ি কই? আমি তো আর তা জানি না। কইতে পারলাম না। আমি খাইছি নাকি জিগাইলেন। আমি কইলাম যে, হ বাসা এইখানেই, বাসাতেই খাইছি। তিনি খাইছেন নাকি এইটাও আমি জিগাইলাম। তিনিও খাইছেন!

আমি ভাবতেছিলাম যে কী ব্যাপার, মারামারি হবে না এখানে? ভোট জালিয়াতি? ঢাকায় কি তাইলে ‘বিচ্ছিন্ন’ভাবে অইসব ঘটনা ঘটছে? এইসব ভাবতেছি আর কক্ষের দরজায় আইসা দাড়াইছি। হুট কইরা দেখলাম, কেন্দ্রের ভিত্রে ঘড়ির আইডি গলায় ঝুলানো লোকের আনাগোনা বাইড়া গেছে। মানে অ-এজেন্ট প্রচুর আসতেছেন। দৌড়াদৌড়ি করতেছেন। তাগো পাশে, প্রিজাইডিং অফিসার। তখন এক অনেক স্মার্ট আর সেই রকম চুলবড় মাস্কিউলার ড্যামকেয়ার চেহারার এক লম্বা সুন্দর ভাইয়া সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছ থাইকা টান দিয়া ব্যালট পেপারটা নিলেন, নিয়া পর্দার ভিতরে চইলা গেলেন ও সিল মারতে থাকলেন। আমি চুপচাপ দাড়ায়া আছি। আমারে অগ্রাহ্য করলেন তাঁরা।

আমার কক্ষে ফিরা আসলাম, দেখলাম যে কক্ষের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালট বেঞ্চির নিচে লুকায়া রাখছেন। ঘড়ির লোকেরা আসলেন, বললেন যে আপা ব্যালট পেপার গুলা কই? তিনি কইলেন যে, স্যার (প্রিজাইডিং অফিসার) আছেন, স্যারকে বলেন। উনি বললে আমি দিচ্ছি। উনারা ফেরত গেল। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার দেখলাম যে, কাপছেন। কইতে থাকলেন, এমন সিচুয়েশনে তিনি কোনদিনও পরেন নাই। ঘড়ির এজেন্ট কন যে, আপা এইটা তো কিছুই না! এইটাই এই দেশের নিয়ম। আগে দেখেন নাই অনেক জায়গায় বন্দুক টেবিলের উপর রাইখা ভোট মারত সমানে? এইটা কোন ব্যাপারই না। তার পাশে থাকা এক অ-আওয়ামী কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট বসা। তিনি বেশ বয়স্ক মানুষ। তিনি ঘড়িরে কইলেন যে, চোখের সামনে এমন অন্যায় দেখলাম। প্রতিবাদ করতে পারলাম না। এইটা তো কোন নিয়ম হইতে পারে না। ঘড়ি তারে বুঝ দেয়। যে দেশের যে নিয়ম। একটু চুপ থাকেন, আস্তে কথা কন। ভাই শুইনা ফেলব আবার।

ঝড়ের বেগে এক পোলা ঢুকল এরপর। পোলা লম্বা আছে, টিংটিঙ্গা স্বাস্থ্য। খুব বেশি হইলে ক্লাস টেনে পড়ে। সে নাকি ভোটার। আই ডি কইল, চেহারায় মিল নাই আইডির লগে। বাপের নাম কইল। অনেক ক্ষন চিন্তা করতাছে দেইখা, আমি আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলের এজেন্টরে কইলাম যে, বস, নামটা ঠিকমত মুখস্থ করায়া দিবেন না! সে ফিক কইরা হাইসা দিল। আমিও হাসলাম। ঘড়ির এজেন্ট সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররে কইলেন যে, দিতে দেন আপা, শেষ সময়ে আইসা আর এমন কইরেন না। পর্দার আড়ালে না যাইয়া ওয়ালের উ্প্রে কাগজটা সাটায়া ধইরা ঘড়িতে সিল মারল। আনিসুল হকের এজেন্ট খেকায়া উঠেন, আরে ব্যাটা ভিত্রে যায়া মার। পোলার হাত দেখি কাঁপে। এজেন্টসহ রুমের সবাই হাসে, লগে আমিও।

এরপরে ঢুকেন সেই ড্যাম স্মার্ট লম্বা সুন্দর ভাইয়াটা। এইবার আর লুকাইতে পারলেন না ঐ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার। নিয়া পর্দার ভিত্রে ঢুইকা সিল মারতে থাকলেন। পরে ব্যালট বাইর কইরা ঘড়ির এজেন্টরে ডাক দিয়া কন যে, ঐ তুই পাতার পিছনে সিল মার। এই কইয়া চইলা গেলেন। ব্যালট টেবিলে পইড়া আছে। আমরা সবাই তাকায়া আছি। বেশ কিছুক্ষন চুপ। দেখলাম যে, ঘড়ির এজেন্টও ইতস্তত করতেছেন। তিনি ঐ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে কন, আপা আপনে মারেন। আপা চুপ। ঝিম মাইরা বইসা আছেন। আস্তে কইরা কইলেন যে, আপনে মারেন। আমি নিজের হাতে এইসব করতে পারব না। ঘড়ির এজেন্ট দেখলাম, পাশে বসা আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর পদ প্রার্থীর এজেন্টরে গুতাইতেছেন যাওয়ার জন্য। তিনিও ইতস্তত করতেছেন। এরপর নিজেই যাইয়া মারতে শুরু করলেন সিল ব্যালট পেপারের পিছনে। আমি আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর পদ প্রার্থীর এজেন্টের কাছে সময় জানতে চাইলাম। ৪ টা বাজতে অল্প কিছু সময় বাকি। আমি বাইর হইয়া আসলাম।

রাস্তা দিয়া হাটতেছি। ভাবতেছিলাম যে, এইসব দেখার সময়ে রাগে ক্ষোভে ফাইটা পড়ার কথা। কিন্তু আমার তেমন একটা রাগ উঠে নাই। সম্পূর্ণ সময়টা একটা সার্কাসের ভিতরে ছিলাম যেন। সার্কাস চলতেছে। হাসছি প্রচুর। মানুষের লগে কথা কইছি। “লীগ ভাই করি না, কিন্তু ওরাই জিতব। দুইটা টেকা পামু এর লাইগা ইলেকশনে কাম কইরা দিতেছি”- এমন বয়ানে থাকা অনেক মানুষের সাথে কথা হইছে ঐ দিন। আমি এদের কারু উপ্রে রাগ আনতে পারতেছি না। এমনকি ঐ ড্যাম স্মার্ট লম্বা সুন্দর ভাইয়া-টিংটিঙ্গা লম্বা পিচ্চি পোলা-ঘড়ির এজেন্টকেও আমার ভালবাসার বাইরে ফালাইতে পারতেছি না।

আমি গণসংহতি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নই, কিন্তু ২০১১ সাল থাইকা তাগো লগে সম্পর্ক আছে। আমার কাজের এরিয়া অন্য দিকে। সে দিকেই আমি সময় বেশি দেই। কম সময় দেবার পরেও এই ইলেকশনে সাকি ভাই খাড়ানোর পর, অনেক অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়া আমি নিজেই গেছি। আমার পরিচয় হইছে ইব্রাহিমপুরের হিমন, সালাহউদ্দিনদের সাথে। এরা সাকি ভাইরে আগেই চিনত, আর ভাই ইলেকশনে খাড়াইছে দেইখা নিজেরাই ফেসবুকে যোগাযোগ কইরা সাকি ভাইয়ের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়। তাদের এই পুরা ইলেকশন ধইরা অক্লান্ত পরিশ্রম আমারে প্রেরণা দেয়। আরও প্রেরণা দেয় যখন দেখি মনিপুর স্কুলসহ আমাগো সব কেন্দ্রে টেলিস্কোপের ভোটের হিশাব না মিলার পরেও হিমন-সালাহউদ্দিনরা ভাইঙ্গা পড়তাছে না, বরং তীব্র ক্ষোভ নিয়া সংগঠিত হইবার প্রত্যয় জানায়। সাকি ভাইয়ের নির্বাচনী মিছিলে অংশ নিয়াও আমি দেখি কী দারুণ প্রতিক্রিয়া জনগণের।

আমি দেখছি কীভাবে সাকি ভাই প্রতিদিন কত খানি হাটছেন। লং মার্চ করা জোনায়েদ সাকির দুই ঠ্যাং হয়রান হয় না, হয়রান হয় না পিছে থাকা লিফলেট বিলানো-স্লোগান দেওয়া অসংখ্য মানুষ। বুঝি আমাগো মানুষ বাড়তেছে, বাড়তেছে সংহতি। এই যে নতুন সংহতি, ঠিকই খুইজা নিবে অতীতের মত বারবার এর লড়াইয়ের ভাষা, উপ্রে বইসা থাকা নিরঙ্কুশ ক্ষমতারে তুচ্ছ করার শক্তি। উদাম রূপান্তর আর পরিবর্তনের অনন্ত সম্ভাবনা জারি থাকে জনগণের এই সংহতির ভিত্রে দিয়া। আমার ভয় লাগে, দ্বায়িত্ব বাড়তাছে আমার। নিতে পারমু তো? উপায় নাই। পারতেই হবে।

মোহাইমিন লায়েছ

ইব্রাহিমপুর

২৯ এপ্রিল, ২০১৫

Like what you read? Give Mohymeen Layes a round of applause.

From a quick cheer to a standing ovation, clap to show how much you enjoyed this story.