পটচিত্র - মৈনাক বিশ্বাস

শান্তিনিকেতনে পৌষমেলায় বাংলার দূরের গ্রাম থেকে পটুয়ারা আসেন। তাঁদের মধ্যে অনেক মহিলাকেও দেখা যায় যারা এই পট আঁকায় পারদর্শী। বলতে গেলে, তাঁরাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বর্তমান ইলেক্ট্রনিক্সের যুগে লোকশিল্প প্রায় লুপ্ত। আর তার মাঝেই অক্লান্ত পরিশ্রম, ধৈর্য ও শৈল্পিক মন দিয়ে তাঁরা এই পটচিত্র এখনও মানুষের কাছে তুলে ধরছেন।

‘পটচিত্র পটে অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্র। সংস্কৃত পট্ট (কাপড়) শব্দ থেকে পট শব্দের উৎপত্তি, আর এই পটে অঙ্কিত চিত্রই হচ্ছে পটচিত্র। প্রাচীন বাংলায় যখন কোন দরবারি শিল্পের ধারা গড়ে ওঠেনি তখন পটচিত্রই ছিল বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। আর এ চিত্র যারা অঙ্কন করতেন বা এখনও করছেন তাঁদের বলা হয় পটুয়া।

পটচিত্রকর্ম বংশানুক্রমিক পেশা রক্ষার উপায়। এ শিল্পশৈলীর উত্তরাধিকার এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষে বর্তায়। পটুয়া, পটিদার ও পট- এ সব নামে একজন চিত্রকর সাধারণত পরিচিত।

পটচিত্র বাংলার লোকশিল্পকলার সকল ঐতিহ্যিক উৎকর্ষে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ শিল্পকলা সাংস্কৃতিক সমজাতীয়তায় ও মূর্তির সাথে নিবিড় সম্পর্কিত এক জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে নিবেদিত। পটচিত্র সাধারণত কাগজ বা মাড়যুক্ত কাপড়ে আঁকা হয়।

কালীর পট
মনসার পট

পটের বিষয়বস্ত্ত হয় সাধারণত ধর্মীয়, সামাজিক ও কাল্পনিক। পটুয়াদের তুলিতে মানুষের ভাবলোক ও আধ্যাত্মিক জীবন সহজ-সরলভাবে প্রতিফলিত হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আট শতক থেকে বুদ্ধদেবের জীবনী-সংক্রান্ত জাতকের গল্পসম্বলিত মস্করী নামক পট প্রদর্শন করতেন। পরবর্তী সময়ে হিন্দুধর্ম ও পুরাণ হয় পটের প্রধান বিষয়। হিন্দুদের বিভিন্ন দেবদেবী, যেমন: দুর্গা, কালী, মনসা, অন্নপূর্ণা, লক্ষ্মী, যম, চন্ডী, দশ অবতার প্রভৃতি; পৌরাণিক কাহিনী, যেমন: রামলীলা, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদি, এমনকি কৈলাস, বৃন্দাবন, অযোধ্যা ইত্যাদি পবিত্র স্থানসমূহও এতে মূর্ত হয়ে ওঠে। এছাড়া জাদু, গাজী এবং হিতোপদেশমূলক চিত্রপটও অঙ্কিত হতে দেখা যায়। হিন্দুধর্মের শিব-পার্বতীলীলা, মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল, বৈষ্ণবধর্মের শ্রীগৌরাঙ্গলীলা ইত্যাদি পটের আকর্ষণীয় বিষয়। রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী, যেমন: রামের বনবাস, সীতাহরণ, রাবণবধ, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদিও পটে অঙ্কিত হয়।

মুসলমানদের গাজীর পটে গাজীকালু-চম্পাবতীর কাহিনী কিংবা গাজী পীরের বীরত্বব্যঞ্জক বিভিন্ন অলৌকিক কর্মকান্ড অঙ্কিত হয়।এতে গাজীকে কখনও দেখা যায় সুন্দরবনের রাজার সঙ্গে লড়াই করতে; কখনও ব্যাঘ্রপৃষ্ঠে সমাসীন; কখনও মাথায় টুপি অথবা রাজমুকুট, পরনে রঙিন পাজামা কিংবা ধুতি, এক হাতে চামর বা ত্রিকোণ পতাকা এবং অন্য হাতে তলোয়ার বা মুষ্টিঘেরা জ্যোতি। গাজীর পটে মানিকপীর, মাদারপীর, সত্যপীর, কালুফকির, বনবিবি প্রভৃতি সম্পর্কে নানা অলৌকিক ক্রিয়াকর্মের ছবিও প্রদর্শিত হয়। এরূপ ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নানা কৌতুক, রঙ্গরসসম্বলিত কাহিনী, ব্যঙ্গচিত্র এবং সামাজিক দুরবস্থার চিত্রও অঙ্কিত হয়। কখনও কখনও প্যাঁচা, বানর, গরু, বাঘ, সাপ, কুমির এবং গাছপালাও স্থান পায়। লোকধর্মে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ অনেক সময় পটুয়া এবং পটচিত্রকে ঝাড়ফুঁকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। অনেকে গৃহে পটচিত্র সংরক্ষণ করাকে কল্যাণ এবং দৈব-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় বলেও মনে করে।’

পটচিত্র
পটচিত্র
পটচিত্র
পটুয়া

পটচিত্র অতি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। পটচিত্র মানুষের কথা বলে, মানুষের জীবনের রঙ-বেরঙের ছবি তুলে ধরে। পটচিত্র কোনো লাভজনক ব্যবসা না হওয়ায় সেই পটুয়ারা রঙ-তুলি রেখে পেটের দায়ে অন্য জীবিকার সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ছেন।

ছবিঃ মৈনাক বিশ্বাস

[তথ্য উৎসঃ http://bn.banglapedia.org]