ট্রাভেল ব্লগ ০১ | দূর্ঘটনা| নোনাপানি | ক্যামেরা


ঘটনার সময়কাল ফেব্রুয়ারি ২০১৪


-আমরা ঘাটেই যাই।
- ঘাটে না, লঞ্চের লোকজন বলতেছে লঞ্চের গায়ে ভিড়াইতে।
-
-কেউ উঠিস না। বসে থাক।
নাহ, লঞ্চের নিচের বর্ধিত অংশটা মাথায় বাড়ি খাবে, যা গতি তে যাচ্ছি, আমি দাড়ায়ে হাত দিয়ে চেষ্টা করতে লাগলাম যেন ট্রলার টা ঐটার নিচে চলে না যায়। পারলাম না। উপর থেকে কে যেন হাত বাড়াল, আমি ধরে উঠে গেলাম, উঠতে না উঠতেই দেখি ট্রলার একসাইড পানির নিচে চলে যাচ্ছে।
আমার নিচেই ছিল আতিক। এক হাত দিয়ে ঝুলে ছিল, কোনরকমে তুললাম ওকে, ওর পা ধরে ছিল কেউ একজন, মনে পড়তেছে না, ওকেও টেনে তুললাম একটা লোকের সহযোগীতায়।
আমার আশে পাশে ব্যাচ-১০ এর ফাহাদ ভাই, জাফর ভাই, উপরে নোভা আপু কে দেখে আমি অবাক, বুঝতে পারলাম তারাও ঢাকায় যাচ্ছে। নিঝুম দ্বীপে থাকাকালে আমদের দেখা হয় নি।
কুণ্ডু পরে বলতেছিল, “ আমার মনে হচ্ছিল মরে গেছি, না হয় কেন হটাৎ ভাইয়া আপুদের চেহারা দেখব?”
এরমধ্যে দেখতেছি ব্যাগ গুলা পানিতে ভাসতেছে, আর মানুষ গুলা ডুবতেছে। বনি অনেক কে ঠেলে লঞ্ছের কাছে নিল। লোকজন যে যেভাবে পারতেছে নিচ থেকে টেনে তুলার চেষ্টা করতেছে। বনি আমার হাতের কাছে ছিল, ধরতে পারলাম না, ও চলে যাচ্ছে। এর মধ্যে ও কয়েকজন কে ঠেলে লঞ্চের কাছে ভিড়ানোর চেষ্টা করেছে…ও ট্রলার এর এক মাথা ধরে ভেসে ছিল, আমি হাত বাড়ায় তাকায় ছিলাম। ও দূরে চলে যাচ্ছে। অবশেষে একজন আমার পাশ থেকে লাফ দিল, বনির কাছে গেল।
এ দিকে তাকায় দেখি, পীউ এর ফেস পানির উপরে, সাউনি আর কে কে যেন, আতঙ্কিত, কান্না চেহারা, উপল,বিনিতা, দৃষ্টি, ইরফান আমার মত আগে উঠে গেছে।
ব্যাগ গুলা আর মানুষগুলা পানিতে ভেসে যাচ্ছে। আমি দাঁড়ায় আছি, এক মাথা থেকে আরেক মাথায় দোউড়াচ্ছি। কিছু করতে পারছি না, দূরে পাড়ে কিছু মানুষ দাঁড়ায় আছে, ভেসে যাওয়া সৌম্য, পলাশ, কুণ্ডু পাড়ের ওই মানুষগুলাকেও ছাড়ায় চলে গেল ভাসতে ভাসতে । লঞ্চ থেকে প্রায় ৮০-১০০ মিটার দূরে চলে গেছে… আমি, সাদ, ইফতি, উপল লঞ্চের সামনে যাই একবার পিছে যাই একবার, লঞ্চ থেকে পাড়ে নামার সিড়ি উঠায় ফেলছে।
তন্নীকে দেখছিস? তন্নী কই? উপল চিল্লাচ্ছে। তন্নী কই মানে? 
কে যেন বলল ওকে পাওয়া যাচ্ছে না, একটু পর একজন বলল পাড়ে ২ টা মেয়েকে উঠানো হইছে। একটু পর শিউর হলাম, তন্নী পাড়ে উঠছে। পরে জানতে পারলাম, ও লঞ্চের নিচে চলে গেছিল।
লঞ্ছ থেকে নামার সিড়ি নাই পাড়ে, অনেক চিল্লা চিল্লি করে সিড়ি নামায় নিচে নামলাম, সামনে গেলাম মোটামুটি সবাই উঠছে, মানুষ জন সব ব্যাগও উঠাইছে, সবশেষে উদ্ধারকারী ট্রলার পাড়ে এসে ৩টা ব্যাগ আর সৌম্যকে কে নামাল।
-সবাই উঠছে? তন্নী কই? আমকে জড়ায় ধরে পুরা কেদে দিল ছেলেটা। সবাইকে নিয়ে লঞ্চের কাছে গেলাম, উঠলাম। কোত্থেকে এসে আতিক জড়ায় ধরে বলতেছে, দ্যাট ওয়াজ আ ক্লোজ কল, বলে পুরাই কেদে দিল। উপরে উঠে দেখি, পলাষ তখনো সামলাতে পারে নাই, চোখ ফুলে গেছে কাদতে কাদতে, পলাশ অনেককে সাপোর্ট দিছে এরপর নিজে আর পারে নাই। ভেসে গেছে, অনেক দূর, কুন্ডুও সাতার পারতো, ওই স্রোতে কেউ পারে নাই সামলাতে।
লঞ্চে উঠারপর ব্যাচ-১০ এর ভাইয়া আপুরা এবং লঞ্চের স্টাফরা গরম কাপড়, লুঙ্গী, শুকনা খাবার দিয়ে আর বিশেষ করে ভাইয়া আপুরা অনেক মেন্টাল সাপোর্ট দিয়ে সাহায্য করেছে, ওইটার কৃতজ্ঞতা ধন্যবাদ জানায় শেষ করা সম্ভব না।
রাতে ঘুমাতে অনেক দেরী হল, যারা ডুবে যাচ্ছিল, কেউ ঘুমাতে পারছিল না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় ডুবে যাচ্ছে, ওদের অনুভুতিটা কি, আমিও বুঝব না।
শেষ পর্যন্ত শক্ত ছিলাম, এখন পোস্ট লিখার সময়ে যখন পুরা ঘটনাটার ডিটেইলস চোখের সামনে আসতেছে, চোখের পানি ধরে রাখা যায় না।
ঐ মুহুর্তুটা খুব অসহায় লাগে, দাঁড়ায় আছি। প্রিয় মুখ গুলা ভেসে চলে যাচ্ছে।
আল্লাহর অশেষ রহমতে কোন জানের ক্ষতি হয় নি, আপাতত মালের ক্ষতি নিয়ে দৌড়াচ্ছি। ব্যাগ গুলাতে থাকা ডিএসএলআর এর ৮টা বডি এবং ১৩ টা লেন্স এখন ওরিয়েন্ট এর মাহতাব আঙ্কেলের বাসায়। বাশার আঙ্কেল ও দেখতেছেন। লবন পানি ঢুকায় সবগুলার অবস্থা খারাপ। ২-৩ দিনের আগে বলা যাচ্ছে না, কোন্টার কি অবস্থা হয়।
-
-
-
-
-
পুরো ট্যুরটার প্রতিটা পদক্ষেপ কেটেছে অপ্রত্যাশিত সমস্যা দিয়ে। সর্বশেষ ঘটনাটা সব কিছুকে হার মানিয়ে দিল।
আমরা স্থাপত্য বিভাগের ব্যাচ-১১ থেকে ২৬ জন ছিলাম, নিঝুমদ্বীপ থেকে হাতিয়া ফিরছিলাম, ঢাকাগামী লঞ্চ ধরব বলে।
দূর্ঘটনার সময় ঃ বেলা ১।১৫, ১৭-২-১৪।
যারা ছিল ঐ ট্রলারে…
1.kundu 2.atique 3.smith 4.palash 5.shetu 6.abid 7.sajid 8.saad 9.homaira 10.lishan 11.porag 12.irfan 13.tonny 14.upal 15.soumi 16.shauni 17.iftee 18.bony 19.punam 20.maruf 21.binita 22.peau 23.safat 24.saumya 25.tashrif 26.dristi
পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ট্রলারটার সাইজ একটু ছোট ছিল। উঠার পর থেকেই এটা ডানে বামে দুলতেছিল। চলতি পথে আমরা খানিকটা মজা করে স্কেচ বুকের পেজ ছিড়ে ছিড়ে কলম দিয়ে সবাই এক লাইন করে ডেথ নোট লিখতেছিলাম। মৃত্যুর আগে কার কি ইচ্ছা… অনেকে অনেক কথা লিখেছিল, আমি সিরিয়াস কিছু না লিখে একটা কার্টুন একেছিলাম, একটা নৌকার ২ দিকে ২ জন, একদিকে নিচু আরেকদিন উচু, নিচের জনের স্যাড ফেস, উপরের স্মাইল। এরপর পেজ গুলা একটা প্লাস্টিকের বোতলে ভরে লাগায় দেয়া হয়েছিল।
ব্যাগগুলার সাথে ওইবোতলটাও আমরা পেয়েছিলাম, যার উপরে মাস্কিং টেপ এ লেখা ছিল-
সমান্তরাল-১১
a group of hope
These were written right before the accident
photo : Nishat Subah Peau

শেষমেশ আমরা যখন লঞ্চে উঠলাম তখন দেখলাম মানুষগুলা তো বেচে উঠেছেই, লোকাল মানুষ এবং অন্য একটি ট্রলার এর কল্যাণে আমাদের সমস্ত ব্যাগ গুলোও উঠে এসেছে। কাবিন এ যেয়ে সমস্ত ব্যাগ সার্চ করে সব ইলেকট্রিক যন্ত্রাদি একসাথে করলাম। এসি তে শুকাব বলে। আমি আর পিউ ঢাকায় ফোন দিতে লাগলাম ক্যামেরা বিশেষজ্ঞের খোঁজে। ওরিয়েন্টের মাহতাব আঙ্কেল বললেন খুলে রাখতে, ব্যাটারি এবং যা যা পারা যায়, আর কোনো পাওয়ার অন না করতে বললেন। কিন্তু উনাকে জানায় হয় নাই যে যে পানি তে আমরা নাকানি চুবানি খেয়েছি সেটা লবনপানি ছিল।

সকালে যখন আঙ্কেলের বাসায় গেলাম, তখন উনি লবণ পানি শুনে অবাক। কখনো ভাবি নাই এরকম দৃশ্য দেখতে হবে। ক্যামেরার ৮টা বডি আর ১৩টা লেন্স লবন ছাড়ানোর জন্য পানিতে ওয়াশ করা হচ্ছে, মাহতাব আঙ্কেল কে অনেক থ্যাঙ্কস, সাত সকালে বন্ধের মধ্যে উনার বাসায় এগুলা নিয়ে বাশার আঙ্কেল সহ বসার জন্য।


আমাদের ৮টা বডি এবং ১৩ টা লেন্সের মধ্যে ১২টা লেন্স এবং ২টি বডি পুরোপুরি ঠিক হয়েছে, ঐ ২টা বডি তে অনেক কাপড় বা ব্যাগের কারণে কম পানি ঢুকেছে। বাকি ৬টি বডি ঠিক করা সম্ভব হয় নি।

মেমোরি কার্ড থেকে পাওয়া ট্যুরের কিছু ছবি


এবার আসি আমরা যারা উপকূল এলাকায় ক্যামেরা/মোবাইল নিয়ে ঘুরতে যাই তাদের জন্য কিছু পরামর্শ বা আমাদের এইট্যুর থেকে পাওয়া কিছু শিক্ষা নিয়ে কথা বলি।

  • ক্যামেরা/মোবাইল পানিতে পড়লে সাথে সাথে সেটার ব্যাটারি খুলে যতটুকু সম্ভব পার্টস খুলে শুকাতে দিতে হবে।
  • কোন অবস্থাতেই পাওয়ার অন্য করে দেখা যাবে না, ক্যামেরা ঠিক আছে কিনা দেখার কোন দরকার নাই। একবার পাওয়ার অন্য হলে শর্ট সার্কিট হয়ে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।
  • যদি এটা উপকূল এলাকা হয়, অর্থাৎ। পানি লবণাক্ত হয়, তবে প্রথম কাজ হল ব্যাটারি খুলে পার্টস খুলে সব কিছু পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলা।
    লবণ সার্কিট বোর্ড এর পার্টস গুলোর সাথে বিক্রিয়া করে সাথে সাথে বিনষ্ট করে ফেলে, মরিচা ধরে যায়।
  • যতটা সম্ভব লবণ মুক্ত করে এরপর গ্যেজেটগুলো শুকাতে হবে।
ঢাকায় ক্যামেরা সারানো, কেনাকাটা, যেকোনো পরামর্শএর জন্য নিচের ফোন নাম্বার গুলো দেয়া হল।
১. মাহতাব ভাই, ওরিয়েন্ট ক্যামেরা: 01817042440
২. মাসুদ ভাই, ক্যামেরাজোন: 01819237293
৩. রুবেল ভাই, ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড: 01718600004
৪. একরাম ভাই, এস.এস.ক্যামেরা: 01711107880
৫. মোহসীন ভাই, নিউ ক্যামেরাওয়ার্ল্ড: 01721728636
৬. ফাহিম ভাই, ক্যামেরা হাউজ: 01717433728
৭. ডিজিটাল সপ, আলা উদ্দিন আহমেদ 1715–054169
ক্যামেরার সব অসুখ সারাতে নিচের ক্যামেরার ডাক্তারদের দেখান:
১. খোকন ভাই, মামুন ইলেকট্রনিকস: 01911353414
২. বিদ্যুৎ ভাই, বিদ্যুৎ ক্যামেরাঘর: 01711249140
৩. জিতু ভাই, জিতু ক্যামেরা: 01718188242