যে দশদিনের ভালো কাজ জিহাদের চেয়ে প্রিয়

যুল-হিজ্জাহ মাসের গুরুত্ব, করণীয় এবং কুরবানির আধ্যাত্মিক দিক

ছবি: পেক্সেলস.কম

জিহাদ নিয়ে বহুল প্রচলিত দুটো কথা আছে।

- মনের জিহাদ বড়ো জিহাদ।

- জ্ঞানীর কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে দামি।

দুটো কথাই মনগড়া। জিহাদের মর্যাদাকে ছোটো করার অপচেষ্টা। তবে জিহাদ নিয়ে কিন্তু একটি বিশুদ্ধ হাদীস আছে যেখানে বলা হয়েছে ভালো কাজ জিহাদের চেও আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কেবল যুল-হিজ্জাহ মাসের প্রথম দশ দিনে।

‎‎নবিজি ‎ﷺ বলেছেন, “এই দশদিনের ভালো কাজগুলো অন্য সবদিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।”

সাহাবিরা বললেন, “এমনকি আল্লাহর জন্য জিহাদও না?”

“না, আল্লাহর জন্য জিহাদও না। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে যেলোক নিজের জান-মাল দিয়ে লড়াই করতে গেছে, কিন্তু কিছু নিয়েই আর ফিরে আসেনি।” [স়াহ়ীহ় বুখারি, ২:৪৫৭]

যুল-হিজ্জাহ মাসের শুধু যে এই দশদিন মর্যাদাময় তা না, পুরো মাসটিই মর্যাদাময়।

আপনারা কী জানেন ১৪২৮ বছর আগে এই যুল-হিজ্জাহ মাসের ৯ তারিখ, মানে আরাফাতের দিন, ইসলামের সর্বশেষ সংস্করণ পাঠানো হয়েছিল?

মানবজাতির প্রতি আল্লাহর দয়া ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তিনি সেদিন এই দীনকে পূর্ণ ঘোষণা করেছিলেন। এরপর সব অফিশিয়াল আপডেট বন্ধ। কাজেই এরপর কেউ যদি নিজের খায়েশ মতো দীনের মৌলিক বিষয়ে নতুন কিছু যোগবিয়োগ করে তাহলে তার জান্নাতের গ্যারান্টি বাতিল। কাজেই বুঝতেই পারছেন কী গুরুত্বপূর্ণ দিন এটি।

যে চারটি মাসকে আল্লাহ বিশেষভাবে উল্লেখ করে সম্মানিত করেছেন তার মধ্যে যুল-হিজ্জাহ একটি। পবিত্র মাসগুলোতে জাহিলি বা অজ্ঞতার যুগেও মানুষ মারামারি করত না। অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকত। সেদিক থেকে আমরা যখন এখন ইসলামের মধ্যে আছি, তখন কিন্তু ছোটখাট খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকাটা আমদের জন্য বেশি করে খাটে। আবার সম্মানিত মাস বলে এই মাসে করা ছোটখাট যেকোনো ভাল কাজও অনেক মূল্যবান।

মূল্যবান এই মাসে কীভাবে আমরা আমাদের সাওয়াবের পয়েন্ট তরতর করে বাড়াতে পারি চলুন দেখি।

১. নিয়মিত ফার্দ় (ফরজ) সালাতের পাশাপাশি কুরআন অর্থসহ বুঝে পড়া সবচে ভালো কাজ হবে। কুরআন বুঝে পড়লে ঈমান বাড়ে মারাত্মকভাবে। সাওয়াব তো থাকছেই। প্লেস্টোরে গ্রিনটেকের আল-কুরআন নামে একটা অ্যাপ আছে। আজীবন কাজে লাগার মতো একটা অ্যাপ। অনেকগুলো অনুবাদের পাশাপাশি আছে নির্ভরযোগ্য তাফসীর। চলতে ফিরতে এখানে ওখানে যেতে আসতে হাতের মুঠোয় এমন উপকারী অ্যাপ বেশ কাজে আসবে ইনশা’আল্লাহ। বিশেষ করে “সময় পাই না” বলে অজুহাত দেন যারা, সুযোগ পেলেই তারা কিন্তু ফেইসবুক, ইউটিউবের জন্য ঠিকই “সময়” করে নেন। বেকার নষ্ট না করে এ ধরনের ভালো ভালো অ্যাপ ইউজ করে আমরা স্মার্টফোনের স্মার্ট ব্যবহার করতে পারি।

২. সালাত আদায় আর কুরআন বোঝার পর সিয়াম পালন হবে সবচেয়ে বেশি সাওয়াবের কাজ। যাদের রামাদানের কোনো সিয়াম ছুটে গিয়েছিল এবং এখনো সেটার ক়াদ়া আদায় করা হয়নি তারা এই দিনগুলোর সুব্যবহার করুন। আর বিশেষ করে আরাফাতের দিনের সিয়াম কোনোভাবেই ছাড়বেন না। এই দিন নিয়ে নবিজি ﷺ বলেছেন:

“এটা আগের ও পরের এক বছরের অপরাধ মাফ করে।” [স়াহ়ীহ় মুসলিম ৬:২৬০৩]

আরাফাতের দিন হচ্ছে যেদিন হাজিগণ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। সেটা আমাদের দেশের যুল-হিজ্জাহ মাসের হিসেবে ৮ যুল-হিজ্জাহ। কেউ কেউ যদিও স্থানীয়ভাবে যেদিন ৯ যুল-হিজ্জাহ সেদিন আরাফাতের সিয়াম পালনের কথা বলেন। তবে বেশিরভাগ আলিম বলেন হাজিগণ যেদিন আরাফাতের ময়দানে জড়ো হন, সেদিন সিয়াম পালন করতে। যাহোক এনিয়ে ক্যাচালের প্রয়োজন নেই। সিয়াম পালনটাই আসল বিষয়।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে এই মাফগুলো কিন্তু শুধু ছোট বা স়াগীরাহ অপরাধের জন্য। ছোট বলে এগুলোকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। বিন্দু বিন্দু জল মিলেই যে সাগর তৈরি হয়। বড় বা কাবীরাহ অপরাধের জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা বা অনুশোচনা করতে হয়। এবং আবার সেই অপরাধ করব না এ ধরনের মানসিকতা থাকতে হয়। নাহলে সেগুলো মাফ হয় না। কেউ কেউ আন্তরিক এবং সঠিক মানসিকতা নিয়ে তাওবা করার পরও আবার ভুল করে বসেন। সেক্ষেত্রে পুনরায় তাওবা করতে হবে। কিন্তু তাই বলে এই দুষ্টুচক্রে পড়া যাবে না। আল্লাহর সাথে তো আর দুই নম্বরি চলে না, তাই না?

৩. আমাদের বেশিরভাগ কর্মব্যস্ত চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী বা গৃহরানী। সারাদিন তাই লাগাতার ইবাদাতের সুযোগ হাজিদের মতো কখোনোই পাব না। সেক্ষেত্রে যিক্‌র্‌ বা আল্লাহর স্মরণে জিহ্বা ভেজা রাখাটা হতে পারে চমৎকার বিকল্প। ছোট ছোট বিভিন্ন যিক্‌রের মাধ্যমে এই দিনগুলোর প্রায় প্রতিটা মুহূর্ত কাজে লাগাতে পারি অভাবনীয়ভাবে।

৪. দান করা এই মাসের অন্যতম ভালো কাজ। আমদের দেশে এখন বন্যা চলছে। যুল-হিজ্জাহ মাস না হলেও আমরা অনেকে দান করতাম। তবে যুল-হিজ্জাহ মাসের আলাদা মর্যাদা থাকায় আমাদের সামান্য দানও এখন অপরিসীম সাওয়াব নিয়ে আসবে। তাছাড়া দান করলে সম্পদ বাড়ে, মুশকিল দূর হয়। ব্যক্তিগতভাবে প্রমাণ আছে। আর আমাদের ইসলামের ঐতিহ্যে এমন উদাহরণ অসংখ্য।

৫. যুল-হিজ্জাহ মাসের অন্যতম কাজ কুরবানি। অন্যান্য ধর্মের বলি উৎসবের সাথে এর মিল শুধু পশুর গলায় ছুড়ি চালানোতেই। বাকি সবকিছুই আলাদা। কুরবানির পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহ খান না। খাওয়াদাওয়ার মতো তুচ্ছ বিষয় থেকে তিনি পবিত্র। আল্লাহর কাছে পৌঁছায় আমাদের তাকওয়া — তাঁর ব্যাপারে আমাদের কে কতটা সচেতন, দীন পালনে কে কতটা আন্তরিক — এসব।

ইদানিং শুনছি কোনো কোনো ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ কুরবানির টাকা নাকি বন্যার্তদের দান করে দিতে বলছেন। যার কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য আছে তার কি দান করার টাকা নেই? কয়েক বছর আগে যখন “রানা প্লাজা” ধসে ভয়ানক মানবিক বিপর্যয় হলো তখন “মেরিল-প্রথম আলো” পুরস্কার অনুষ্ঠান হয়েছিল। তখন এই ‘মৌসুমি শুভাকাঙ্ক্ষীরা’ কিন্তু প্রোগ্রাম বাতিল করে পুরো টাকাটা পীড়িত মানুষদের দান করতে বলেনি। একদিকে মনমর্জিমতো নাচগান আর ফুর্তি করেছে, অন্যদিকে পীড়িত মানুষদের জন্য টাকা সংগ্রহ করে দান করেছে। মানুষের দুর্দশার সাথে কী নির্মম পরিহাস।

ছবি: পিক্সাবে.কম

কুরবানির আধ্যাত্মিক দিক

যন্ত্র শুধু নগরজীবনের না, আমাদের প্রাণও কেড়ে নিয়েছে। আমাদের সব কাজেই এক ধরনের লৌকিকতা ভর করেছে। দুনিয়াবি ফায়দা না থাকলে মুখে হাসি ফোটাতেও যেন কিপটেমি। কিছুটা জানাশোনার ঘাটতি, আর কিছুটা বাইরের সংস্কৃতির ছোঁয়ায় আমাদের কুরবানিও অনেকটা আচারি হয়ে গেছে। কী করছি তাই শুধু ভাবি। কেন করছি, কী জন্য করছি তা নিয়ে ভাবি না।

কুরবানিতে আমরা আসলে কী করি? কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে সুন্দর একটা পশু কিনে আল্লাহর নামে জবাই করি। আপনারা যারা ছোটবেলায় পশুপাখি পেলেছেন তারা বুঝবেন প্রিয় পোষা প্রাণীর মৃত্যু কী কষ্টের। গ্রামে যারা পশু পালেন বা হাটে যারা পশু বিক্রির উদ্দেশ্যে আসেন এদের অনেকেই ব্যবসায়ী না। গরু বা ছাগলটাকে তারা আপন মনে করে পালে। খুব যত্নে রাখে। তারপর জীবনজীবিকার প্রয়োজনে পশুটা তারা বিক্রি করে দেয়। এর পেছনে কত চাপা কষ্ট, আর অশ্রু লুকিয়ে থাকে তা আল্লাহ ভালো জানেন। সত্যি বলতে কুরবানি না দিয়েও এই লোকগুলোই আসলে কুরবানি দেন। নিজের প্রিয় সম্পদটা বিলিয়ে দেন। ঠিক যেন ইবরাহিম আলাইহিস-সালামের মতো।

তাঁকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজের ছেলেকে কুরবানি দিতে। অনেক জীবন পরে অনেক দু’আর পর পাওয়া ছেলে ইসমাইল ছিল তার প্রাণপ্রিয়। কিন্তু আল্লাহর হুকুম মানতে তিনি দুবার ভাবেননি। আর তাঁর ছেলেকেও দেখেন। ইসমাইলও রা করেননি। ত্যাগের এই শিক্ষাটাই আসল।

আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য নিজের প্রিয়জনকে কিংবা নিজেকে কুরবান করব। তাকওয়ার এই অনুপম পরাকাষ্ঠাটাই কুরবানির আসল দিক। কিন্তু আফসোসের বিষয় দুনিয়ার ভাইরাস এর উপরও প্রবল। আর তাই আমাদের অনেকের কুরবানি হয় টাকার গরম, লোকে কী বলবে, ইজ্জত পাংচার ইত্যাদি সব লৌকিক কারণে। আগের বছর গরু দিয়ে পরের বছর ছাগল দিলে যেন জাত চলে চাবে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আমরা দেখি কত মানুষ দেশের জন্য সব ছেড়েছুড়ে যুদ্ধ করেছেন। কত বাবা-মা তার সন্তানকে দেশের জন্য কুরবানি দিয়েছেন। দেশের প্রতি ভালোবাসাটা কোন পর্যায়ে থাকলে এরকম “কুরবানি” দেওয়া যায়?

আল্লাহর প্রতি, তাঁর দীনের প্রতি, তাঁর রাসূলের ‎ﷺ প্রতি আমাদের ভালোবাসার মাপকাঠি আমাদের কুরবানি।

গান না শুনলেই না। সিনেমা না দেখলেই না। কিন্তু আল্লাহর জন্য এগুলো ছেড়ে দিলেন। নিজের মনের খারাপ ইচ্ছাগুলোকে কুরবানি দিলেন।

অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন বিয়ে না করে। আল্লাহর জন্য অবৈধ ভালোবাসা কুরবানি দিলেন। দুই নাম্বারি করা কুরবানি দিলেন। ডিশ দেখা কুরবানি দিলেন। আমাকে তো আমার ছেলেকে কুরবানি দিতে হচ্ছে না। আমার স্ত্রীকে, আমার কন্যাকে বা আমার বাবা-মাকে কুরবানি দিতে হচ্ছে না। নিজেকেও না। তারপরও কেন কুরবানির মেসেজটা হৃদয়ে নিতে পারছি না?

কুরবানির বাহ্যিক দিকটার সাথে সাথে যদি এই অভ্যন্তরীণ দিকগুলোর মেলবন্ধন ঘটাতে পারি, তাহলে আমরা আধ্যাত্মিকতার এক অন্য পর্যায়ে পৌঁছে যাবো, ইনশা’আল্লাহ। কুরবানি তখন আর শুধু লৌকিক কাটাকুটি, মাংস ভাগাভাগিতে আটকে থাকবে না। তাকওয়ার প্রতিরূপ হয়ে পৌঁছে যাবে আল্লাহর কাছে।

)

মাসুদ শরীফ

Written by

প্রকাশক, নিনাদ প্রকাশ। অনূদিত বই: হালাল বিনোদন, বি স্মার্ট উইথ মুহাম্মাদ ﷺ, মনের উপর লাগাম, দু‘আ: বিশ্বাসীদের হাতিয়ার, ‘উমার: জীবন ও শাসন (সাল্লাবি)

Welcome to a place where words matter. On Medium, smart voices and original ideas take center stage - with no ads in sight. Watch
Follow all the topics you care about, and we’ll deliver the best stories for you to your homepage and inbox. Explore
Get unlimited access to the best stories on Medium — and support writers while you’re at it. Just $5/month. Upgrade