বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে কেন কোন রহমত-বরকত নাই

পয়লা যেই ব্যাপারটা আমাদের ক্লিয়ার হতে হবে তা হইল, বিশ্ববিদ্যালয় তার সমগ্র দেশের মানচিত্রের বাইরে বিচ্ছিন্ন কোন গ্রাম না। ফলে নগর পুড়লে ‘বিশ্ববিদ্যা’লয় রক্ষা পাবে তা চিন্তা করা একধরণের স্বমৈথুন বৈ কিছু না। ফলে বনে আগুন লাগলে তাপ মনে পর্যন্ত লাগবে তাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আশার কথা ছিল, অন্তত বাংলাদেশের চারটা বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনত ‘নগরের’ বাইরে রাখার এক ধরণের আয়োজন কিছুটা হলেও বাংলাদেশের জন্মের পরপর করা হইছিল। ৭৩ এর অধ্যাদেশ টা তারই প্রতিফলন। যেখানে রাষ্ট্র পয়সা দিবে, চালাবেন আপনি; তবে অবশ্য শেষে আবার ঘুড্ডির নাটাই-টা রাষ্ট্র নিজের পকেটে নিসে। তথা প্রথমত চ্যান্সেলর তথা রাষ্ট্রপ্রতির হাতে; আবার অইদিকে সংবিধানমতে তার নাটাই আবার প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এত কিছুর ফাঁকেও অন্তত রাষ্ট্র এই পাবলিকের ঘামের টাকার ভার্সিটিগুলারে কিছুটা স্বাধীনতা দিসে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুগের আগের দিঙ্গুলোতে বলে বেচে গেছে।
এই বিদ্যাপিঠগুলার নামে হাজার হাজার তরুণ-উচ্ছল মনের সমাহার ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের স্বাধীন নরম মাটির ঢেলাগুলা সমাজে ছাইড়া দেয়া হইসে। উল্লেখ্য যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্রের নাম নিলেই আমাদের দেশে অটোমেটিক ‘হিজ এক্সিলেন্সি’ বলার মত কইরা ‘মেধাবি’ ট্যাগ দেয়ার একটা বাজে-হীনমন্য-আত্মপ্রচারের মোলায়েম বিকার আছে। গ্রামসি যেমন মনে করতেন, প্রত্যেকেই বুদ্ধিজীবি। তেমনি প্রত্যেকটি মানুষ মেধাবি, সৃজনশীলও বটে, তার নিজ নিজ জায়গায়। যাক, ছিলাম মাটির ঢেলায়; এখন কারবারটা হইসে যে মাটির নরম ঢেলাগুলা পড়সে কতগুলা ইবলিশের হাতে। এবার ইবলিশ সেই নরম মাটির ঢেলা দিয়া তার শিব বানানোর কথা ছিল, বানাইতাসে চাঁছাছোলা বান্দর।
যেহেতু বাংলাদেশের কারিকুলামে স্কুল-কলেজে একটা ছাত্রকে তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে সুযোগ দেয়া হয় না। এখানকার স্কুল-কলেজগুলা দূর থেকে দেখলে লাগে, মাথা-ছাটাই করা বাগানের মত, কোন ফুলকে নিজের মত বাড়তে দেয়া হয় না। ফলে কেউ কেউ এইসব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ‘weapons of mass-instruction’ বলে থাকে। ফলে এখনকার প্রাথমিক-মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই পঠন-পাঠন পদ্ধতি, সেখানে ক্লাসের সবচেয়ে এভারেজ-বাধ্যগত ছেলে-মেয়েটিই সবচেয়ে ‘মেধাবী’। সেই ‘ইনস্ট্রাকশন’ এর যাদুতেই খুব দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউকে শিব থেকে বাঁদর বানিয়ে ফেলা সম্ভব। তার চেয়ে বিপজ্জনক হল, এই ‘বাধ্যগত বাঁদর’ হওয়াটাকেই ইটসেলফ আরেক কামেলিয়াত বা সফলতা হিসেবে দেখানো। ফলে চিন্তার স্বাধীনতা বলে ব্যক্তিমানসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এলিমেন্ট সেটি এই ডিগ্রিপ্রাপ্তদের অধিকাংশের থাকেনা। ফলে এই ডিগ্রিধারী বাঁদর ছাত্র/শিক্ষক/ভিসির রুপে যেকোন ফ্যাসিবাদী ডুগডুগির তালে নাচবেই, স্লোগান দিবেই এটাই হওয়ার কথা ছিল।
এর সাথে যুক্ত হয় তীব্র ক্লাস-সাবকনশাসনেস। অর্ধেক নিরক্ষর জনতার বাংলাদেশের রিকশা চালকের টাকায় প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মেহনতি ঘরের ছেলে-মেয়ের দীর্ঘ ১২ বছর পড়াশোনার দীর্ঘ কাঁটার পথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এখনো সংগ্রামের। সে সংগ্রামে জিতেও প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা একটি ছেলে এসেই শুনে এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ফরমাল ড্রেস, ফরমাল পলিশড শ্যু ইত্যাদির কারবার। আচ্ছা শিক্ষকরা এসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট দেয়ার আগে কখনো জানতে চায় কার কার কম্পিউটার নেই, কে মাইক্রসফটের ওয়ার্ডে লিখতে পারো না? আবার শহরে এসে মেহনতি ঘরের সেই ছেলেটিকে একটা টিউশোনি করেও নিজের চলতে হয়। ফলে এই বিদ্যায়তনিক পড়াশোনায় তাকে নিতে হয় বাড়তি অনেক বিড়ম্বনা। ফলে সে পিছিয়ে যায়, যেতেই থাকে, শেষমেষ হয়ে পরে কর্নার্ড। এগিয়ে যায় সুবিধাপ্রাপ্ত মধ্যবিত্তের নিম্ন ভাগ এবং উচ্চভাগ মানে উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত। ক্লাসে তারাই ভাল করে, দামি ফোনে নোট উঠায়, ল্যাপটপে গুছিয়ে এসাইনমেন্ট করে। অন্যদিকে উচ্চবিত্তরাতো এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারেকাছে আসেইনা, আর নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেটির খাবারের টাকা জুটাইতে আর দ্রুত বেগমান মধ্যবিত্তময় পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতেই ক্লান্ত। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার অভিজ্ঞতা এবং তুলনামূলকভাবে দুপাচ বছরে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গন্ডি পেরিয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতাও আশা করি এক হবে। একে তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো মেহনতি ঘরের সন্তানদের আসার জন্যে অত মসৃন পথ নাই, আর সংখ্যাটাও কম। এতে একটি ক্লাসে ঢুকলে শিক্ষকের মনেই আসবেনা যে এখানে সরব মধ্যবিত্তের প্রিভিলাইজড শ্রেনীর বাইরে কোন শ্রেনী আছে। একেই আমি বলতে চেয়েছি ক্লাস সাবকনশাসনেস বা শ্রেনীভ্রম। তখন শিক্ষকরা এই ভ্রম থেকেই সেন্ট মার্টিন ট্যুরের নোটিশ দেয়, যার নেট খরচ ৪ হাজার। যেটি কৃষকের লড়াকু ছেলের একমাসের খোরাকির খরচের সমান। অথচ ১০ টাকার হল, ২০ টাকার বেতনের বিশ্ববিদ্যালয়টি করা হয়েছিল আমাদের কৃষক-মজুর-শ্রমিকের ছেলেদের জন্যই। ফলে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলা আসলে শিক্ষার নামে দিনকেদিন শ্রেনী বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলার কাজটাই করে।
এর আরেকটি নমুনা দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং মিডিয়াম ইংরেজি করার জিহাদে। এই বাদড়শ্রেনী ইংরেজি বলতে পারারে শিক্ষিত হওয়া মনে করে। ফড়ফড় কেউ চারটা ইংরেজি এক দমে পড়ে গেলে, মধ্যবিত্তের দুটিই স্তরেরই মাথা ঘুরে বিনাশ। সেকারণে দেখবেন, ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলে বাচ্চাদের পড়ানোর একটা তীব্র আকাংখা-চেষ্টা বা কোন ক্ষেত্রে লড়াই আকারে থাকে। ইংরেজি জানাটা কোন জ্ঞানের মাপকাঠি হলে আমেরিকার ক্লাস টু এর একটি সাধারণ বাচ্চার চেয়ে এখানকার বাংলায় পিএইচডি করা লোক কম শিক্ষিত। সেলুকাস! এতে মাতৃভাষায় চিন্তা করা যেটি সবচেয়ে বেশি ‘ইনহেরেন্ট’ সেটিতে ভাবতে পারার অক্ষমতা কখনো এই আধা-বাঙ্গালি কাটিয়ে উঠতে পারেনা। এতেও গ্রাম থেকে আসা ছেলেটিও পড়ে বিপত্তিতে। গরিবের সব জায়গায় জ্বালা! সে স্বভাবতই গ্রামে ভাল ইংরেজি শিক্ষক পায়নি, গ্রামার-বেইজড ইংরেজি লেখে সে হয়ত কোনমতে এ+ উঠিয়েছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সে এসেই দেখে, ইংরেজিতে লিখতে পড়তে এবং বলতে পারতে হবে। শহরে নতুন এসে এটাও তার আরো অনেক সংগ্রামের সাথে লিস্টিতে যুক্ত হয়। আমি ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখার গুরুত্বকে অস্বীকার করছিনা। ভাষা হিসেবে আমরা কেউ কেউ ফরাসি শিখি, কেউ আরবী। সেটা আমরা যেভাবে শিখি, ইংরেজিও আমাদের সেভাবে ভাষা হিসেবে শেখার কথা ছিল। তার সাথে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এটি চালানোর কোন যৌক্তিকতা নজরে আসেনা। আমাদের এখানে পারলে বাংলাটাকেও ইংরেজিতে শেখাতে চায়। ৯৯% লোকের ভাষা যেখানে বাংলা, সেখানে ইংরেজি মাধ্যম থাকা সিরফ ভাষার সাথে, রাষ্ট্রের সাথে বেইমানি বৈ কিছু না।
আর এটার সুবিধাও নেয় শহুরে ভাল স্কুল-কলেজে আর ভাল মাশটারের কাছে পড়া মধ্যবিত্ত। ফলে কৃষক-মেহনতি মানুষের জন্যে করা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা দিনকে দিন অপাংক্তেয় হইতে থাকে। আর মেহনতি ঘরের ধণ দেখে একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনী আরো সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সে তখন প্রতিশোধ নিতে চায়, শ্রেনী বদলের সিড়িতে সেও উঠতে চায়, লাগলে বাকিদের টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে। সর্বশেষ বুয়েটের ভ্যানগাড়ি চালকের ছেলে আকাশের নমুনা আমাদের সামনেই আছে। এর আগে দেখেছি, ‘মাঝির ছেলে রাখাল বালক’ এর সংগ্রাম থেকে সে কিভাবে ব্যাংক ডাকাতিতে হাত মিলিয়েছে। এটার একটা সুন্দর নাম দিসিল আফ্রিকান থিংকার মাহমুদ মামদানি; ভিক্টিমস বিকাম কিলার্স, তার কন্টেক্সট অবশ্য আলাদা। কিন্তু যেকোন ভিক্টিম আগামিদিনে থ্রেট হিসেবে ফিরে আসতে পারে সেটা আমরা কখনো আমলে নেইনা।
আর মধ্যবিত্ত তো বিশ্ববিদ্যালয়েই আসেই তার শ্রেনির উন্নতি ঘটাইতে। উচ্চবিত্ত হওয়া, দামি গাড়ি, ভাল চাকরি, কালচারাল ক্যাপিটাল হিসেবে ভাল জায়গায় বিয়ে, ছেলেমেয়েদের ভাল স্ট্যাবলিশমেন্ট এমনকি তাদের সন্তানকে আবৃত্তি শেখানোর মধ্যেও তার সুক্ষ্ম শ্রেনিমান উন্নয়নের চেষ্টা থাকে। এসবই তার জীবনের লক্ষ্য। সে তো বাদড়ের আখড়াতেও তাই দেখেছে। ‘জ্বি স্যার’ দুবার জোরে বললে টিউটোরিয়াল নাম্বার বাড়ে, কাল আরো জোরে বললে স্যালারি বাড়বে পরশূ বাড়বে প্রমোশোন। ছাত্রনং জ্বি-স্যারং তপং!
উপরের এত কথা বলার উদ্দেশ্য হল যে, আমি অংশত দেখাতে চেয়েছি, কিভাবে রাষ্ট্রের তাবেদারি মেশিনে শ্রেনীফারাক বাড়িয়ে প্রতিনিয়ত ‘সুবোধ কেরাণি’ সাপ্লাই দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলা। কেরাণী শুধু বেতনভুক্ত হয় তা নয়, ক্ষমতার কেরানি হয়, চিন্তার কেরানী হয়। আর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি শ্রেনী মানে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তকে এভাবেই বিদ্যমান স্ট্যাটাস-ক্যু’র মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী ফুয়েল হিসেবে নানা স্তরে ব্যবহার করা হয়। একটি ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ শ্রেনিকে খালি সুবিধার পর সুবিধা দিয়ে আর অপরশ্রেনীটির নিত্যদিনের পিছিয়ে পরাকে পুজি করে বেড়েই যাচ্ছে শ্রেনী বৈষম্য। ফলে সারা দুনিয়ার লুটেরা শ্রেনীর আরো ধনী হওয়ার নিয়মকেই যেন দুধকলা দিয়ে বড় করছে বিদ্যাপীঠগুলা। বাড়ছে শ্রেণী দূরত্ব, বাড়সে দুনিয়াবি হতাশা, দেখছি খবর চাকরি না পেলে আত্মহত্যার। ফলে এখানে নীতিনৈতিকতার কোন বুলি কপচানো কাজ করছে না, শিক্ষার্থীরা নীতির এলাকাটাই মাড়াচ্ছেনা। ফলে এটিকেই কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের এদুটি শ্রেনীকেই আবার নতুন ফ্যাসিবাদের জ্বালানি উতপাদনে ভিসিরুপে, টিচার রুপে, কর্মচারি রুপে, ছাত্রনেতা রুপে আমাদের মধ্যে রিইনস্টল করা হচ্ছে। ফলে আমরা যখন ভিসির পদত্যাগ চাই, ছাত্রনেতাদের বিচার চাই, যাই করি; এরা বারেবারে আখতারুজ্জমান-ফারজানা রুপে ফিরে আসবেই। আর এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলাতে কোন রহমত-বরকত ফলছে না। অনেকেই এসব শুনে বলে, বিশ্ববিদ্যালয় ভাল জিনিসও উতপাদন করছে। হ্যা করছে হয়ত। কিন্তু একজন জ্ঞানী লোক একবার বলেছিলেন, “এক বস্তা আলুতে দুইটা ধান থাকলে সেটা ধানের বস্তা হয়ে যায়না, আলুর বস্তাই থাকে”।
