ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে …

রুহ সে বেহতি হুয়ি ধুন ইয়া ইশারে দে
কুছ মেরে রাজ তেরে রাজ আওয়ারা সে
খো গয়ে হাম কাহাঁ, রঙ্গো সা ইয়ে জাহান

শহরেরও মন থাকে। কথা থাকে। শহরের বুকে কান পাতলে, বা নাড়ি চেপে ধরলে বা স্টেথোস্কোপ লাগালে শুনতে পাওয়া যায় বুকের ধুকপুকানি, শুনতে পাওয়া যায় ফিসফিসে গলায় চাপা ইচ্ছে। ছেলেটার কানে এসেছিল সেই আওয়াজ। দিদার ঠাকুরঘরে প্রথমবার এক কানে পুজোর শাঁখটা চেপে ধরে যেভাবে শুনেছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ, কোন এক পুরনো বিকেলে যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিল রুপুদের চিলেকোঠায় আর মায়ের ডাকে সাড়া দিতে ভুলে গিয়েছিল, সেই ভাবে সেদিন কানে এসেছিল শহরের ডাক। বাড়ির পেছনের সবেদা গাছটার পাশে একটা টেলিফোন বুথ আছে তার, কেউ জানেনা সেটার খবর। ছেলেটা ডায়াল ঘোরায়, ফোন করে মেয়েটাকে। জানায় তার শহরের ইচ্ছের কথা। মেয়েটাকে প্রশ্ন করে সেও শুনতে চায় কিনা।

আজকেই সেই দিন। আজকে কয়েকটা মুহূর্ত কাটাতে চায় মেয়েটার সাথে। তার প্রিয় শহর, প্রিয় মানুষ, ও সে, এই ৩ জনের জন্য সে বরাদ্দ করে রেখেছিল আজকের বিকেলটা। শহরেরও আজ খুশির শেষ নেই। বিকেলভর বৃষ্টি ও হাওয়ার দাপটে সবাই নাজেহাল। ছেলেটিও ভিজে গেছে প্রায়। ছাতাটাও প্রায় উলটে গেছে। কিন্তু সে খুশি আজ। মেয়েটি তার জন্য অপেক্ষমান। হয়তো বা ভিজেও গেছে। কিন্তু সে জানে আজকের বিকেলটা, সন্ধ্যেটা শুধু তাদের।

গোপন কথাটি গোপন থাকেনি। দুজনের মধ্যে গোপন থাকেনি। ছেলেটা ট্যাক্সি খুঁজছে হন্যে হয়ে। মেয়েটা একটা বাস-স্ট্যান্ডে একা দাঁড়িয়ে, ভেজা-না ভেজার মাঝখানে। আজ কি হবে? কথা? আরো কথা? কথার জাল পেরিয়ে আরো বেশি কিছু? সব চিন্তা ভেদ করে একটা আওয়াজ শোনা যায়…

– ‘ট্যাক্সি! যাবেন?’

টেড়ে মেড়ে রাস্তে হ্যাঁয়
জাদুয়ি ইমারতেঁ হ্যাঁয়
ম্যায় ভি হু, তু ভি হ্যাঁয় ইয়াহা

শহর জুড়ে বৃষ্টি। কাঁচ-বন্ধ ট্যাক্সিতে তিনজন। ঝিমঝিম-ঝমঝম শব্দের মধ্যে তিনজন। আস্তে আস্তে এগোচ্ছে। কখনও ৪০, কখনও ৮০ কিমি প্রতি ঘন্টায় এগোচ্ছে। রাস্তা বেঁকে যাচ্ছে, ভেঙেচুরে যাচ্ছে, উঠছে, নামছে, আবার বেঁকে যাচ্ছে… এরকম সময়ে হাতেরা হাতেদের খুঁজে পায়। একলা কিছু দীর্ঘশ্বাস হঠাৎ কিছু সঙ্গী পায়। দুরের বহুতলগুলো রঙিন হয়ে ওঠে। সামনের বাদুড়ঝোলা বাস, হঠাৎ রাস্তার মাঝে এসে পড়া বেহিসেবী পথচারী, কোথাও থেকে ভেসে আসা চটুল ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি…’, রাস্তা-পাশের বিজ্ঞাপন থেকে মিথ্যে কথা বলা সুন্দরীরা — আজ সব মাফ, আজ সবাই মাফ। দুজন মানুষ বালির মধ্যে তাদের পছন্দরঙের কিছু নুড়িপাথর খুঁজে পেয়েছে। কিছু আঙুল কিছু আঙুলদের খুঁজে পেয়েছে।

খোয়ি খোয়ি সড়কো পে
সিতারোঁ কে কান্ধো পে
হাম নাচতে, উড়তে হ্যাঁয় ইয়াহা

দুদিকের কাঁচই বন্ধ। দুজনেই কাঁচের ওপারে তাকিয়ে থাকে, দেখার চেষ্টা করে, কিছুই দেখা যায়না, তাও দুজনেই তাকিয়ে থাকে। আঙুলরা দমবন্ধ ভাবে একে অপরকে জড়িয়ে থাকে, মাঝে মাঝে ছাড়িয়ে নেয় শ্বাস নেওয়ার জন্য। শরীরের আনাচে কানাচে খবর পৌঁছে যায়। মুহূর্তের মধ্যে, যেমন ভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে শুকনো পাতাদের মাঝে। আঙুলদের থেকে খবর পায় পায়ের পাতারা, পায়ের পাতাদের থেকে খবর পৌঁছোয় কাঁধে, কাঁধ থেকে খবর ছড়ায় মুখে মুখে, মুখেদের থেকে খবর পায় ঠোঁটেরা। ঠোঁটেদের ভিড়ে বাকি সব আওয়াজেরা হারিয়ে যায়। সময় থেমে যায়, শহরে আরো জোরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।

সো গয়ি হ্যাঁয় ইয়ে সাঁসে সভি
অধুরি সি হ্যাঁয় কহানি মেরি

তিনজনে এগিয়ে যায়। ড্রাইভার ও ওরা দুজন। ড্রাইভার যেন শহর নিজে — নিরুত্তাপ, নিঃশব্দ, অবিচল। তার কাছে এরকম মুহূর্ত যেন নতুন কিছু না। সে যেন এরকম উত্তেজক ‘বুকের-মধ্যে-ঝড়’ আগেও অনুভব করেছে। এরকম তো আগেও হয়েছে নাকি? সেই যেবার ছেলেটা চিলেকোঠায় পাওয়া কিছু বইতে প্রথম স্বাদ পেল নিষিদ্ধ রসের, বা যেবার সন্ধ্যেবেলা একটা ফোন এল — ‘এই তুই আমার বন্ধু হবি?’ বলে, বা এই কিছুদিন আগে যখন সব বন্ধুরা ঘর বন্ধ করে লুকিয়ে দু’একটা সিনেমা দেখলো, সেই সব সময়ে শহরই তো ছিল তার পাশে, তার প্রিয় সাথী হয়ে।

নাকি এরকমটা আগে হয়নি? মনের মধ্যে নইলে এরকম অস্বাভাবিক ওঠাপড়া কেন? কিছু এরকম নতুন মুহূর্ত আগেও ছিল — যেবার প্রথমবার ১টা সুপুরি গাছ বাজ পড়ে পুড়ে গেল, কুট্টুস যেদিন পাশের বাড়ির তন্নির কলতলায় স্নান করার দৃশ্য ছেলেটাকে বলল, সেই সময়টা, সেই সময়গুলো তো শহরের কাছেও নতুন।

তাই হবেও বা, নতুনই হবে হয়তো, স্মৃতিরা তো নইলে নিশ্চয়ই সাড়া দিত। এতগুলো বছর হতে চলল, এরকম আগে হয়েছে বলে তো তার মনে পড়ছে না। ছেলেটার বুকের মধ্যে একরাশ ঝড়। মেয়েটার মধ্যে তুমুল ঢেউ। টের পাচ্ছে, শহর সবকিছু টের পাচ্ছে। ছেলেটা বহু বছর আগে সমুদ্রে গেছিল। অতল, অন্ধকার, হাতছানিচিঠি, অনিশ্চয়তা শব্দবন্ধের প্রতি মোহ, ভয়, বিস্ময় তার ছোটবেলা থেকেই। তাদের ১১৬ ছাতিমতলা লেন’এ একখানা পোড়ো বাড়ি ছিল, লোকে বলত ‘ভূতের বাড়ি’ — রোজ রাতে পড়া শেষ করে সে ছাতের কার্নিশে গিয়ে দাঁড়াত, তাকিয়ে থাকত ওই বাপ-মা-হারা বাড়িটার দিকে। ভয় নয়, আরো অনেক কিছু মনে হত। অন্ধকার, অতল, অজানাকে চেনার চেষ্টা তার ছোটবেলা থেকেই… ঠিক এই সময়েই তার সমুদ্রের অতলের কথা মনে পড়তে লাগলো — শব্দহীন এক অস্তিত্ব — চারপাশে শুধু জল আর সেই মেয়েটি। সে যেন আর সে নেই। সে যেন মিশে গেছে সেই নোনা জলে। ঠোঁটে জিভ বোলাতে এক অজানা স্বাদ তাকে স্বাগত জানালো।

ফিসল যায়ে ভি তো ডর না কোই
রুক জানে কি জরুরত নহি

মেয়েটার বাঁদিকে শহর। ডানদিকে একজন মানুষ। মাঝখানে কিছু মানুষের সমষ্টি। বাঁদিকে তাকাতে দেখল কেমন করে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বাসে করে, উড়ালপুলের ওপর দিয়ে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখল কেমন করে সময় থমকে আছে এই মানুষটার মুখের ওপর, চোখের ওপর, ঠোঁটের ওপর, কাঁধের ওপর। একবার হাত দিয়ে ছুঁল, ছুঁতে চাইল সময়টাকে, মুহূর্তগুলোকে। কিছুটা হাতে লেগে রইল, হয়তো বা লেগেও থাকবে আজন্মকাল। থাক! কি বা করা যাবে, আধুনিক সভ্যতা শিখিয়েছে কিছু দাগ নাকি স্বভাবে ভালো।

কাগজ কে পরদে হ্যাঁয়
তালে হ্যাঁয় দরওয়াজো পে
পানি মে ডুবে হুয়ে
খোয়াব আলফাজো কে

ওরা আর কিছুক্ষন পরেই ট্যাক্সিটা থেকে নেমে যাবে। ট্যাক্সি বেছে নেবে পরের যাত্রী, হয়তো মনে রাখবে কিভাবে নীরাকে ছুঁয়েছিল একটা হাত, হয়তো জানবে কিভাবে সেই হাত আর অন্য নারী ছুঁয়ে দেখতে পারবে না সেই একই ভাবে।

ছেলেটার কানে ভেসে আসছে গানের কলি — দূরে কাছে কোথাও কে যেন গাইছে ‘তেরে রুখ সে আপনা রাস্তা মুড়কে চলা…’ ছেলেটার মন কেমন করতে থাকে, ক্ষনস্থায়ী মুহূর্তদের জলের মত হাতের তালুর ওপর ধরে রাখতে চায়, পারে না, যেমন পারেনি আজ পর্যন্ত সঠিক ঠিকানায় কোন চিঠি পৌঁছে দিতে, ঠিক সেই ভাবেই।

বুঝতে পারে রাস্তা শেষ হয়ে আসছে। এইসব কথা তার মাথায় ঘুরতে থাকে — এক সময় সমুদ্রের জল আবার ঢুকে পড়ে স্মৃতিতে।

মেয়েটি চারপাশে তাকিয়ে দেখে ট্যাক্সির ছাদ, কাঁচের শার্সি, সিট সব কেমন ভিজে ভিজে যাচ্ছে, দেখে ড্রাইভারের পাশে একটা বালি-ঘড়ি কে বা কারা যেন রেখে দিয়েছে। দূরে দেখতে পায় জল বেড়েছে, কিছু বহুতল আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে। শুনতে পায় ড্রাইভার ঘাড় না ঘুরিয়েই বলছে — ‘আপনারা চিন্তা করবেন না, আমি ঠিক পৌঁছে দেব’, সে চোখ বন্ধ করে।

ছেলেটি চোখ খোলে শেষবারের মত, বুঝতে চায় স্বপ্ন ছিল না সত্যি।

দুজনের আঙুলেরা একা বোধ করে, তাদের কান্না পায়। আঙুলরা একে অপরকে খুঁজে নেয়, শেষবারের মত।

ঘড়িতে তখন রাত ১১:৫৯।

খো গয়ে হাম কাহাঁ, রঙ্গো সা ইয়ে জাহান…
One clap, two clap, three clap, forty?

By clapping more or less, you can signal to us which stories really stand out.