“Comparison is the death of joy.” 
Mark Twain

তুলনামূলক; বাস্তব বাদ

বহুকাল আগের কথা — তখন কুমার শানু ছিল অরিজিৎ সিং, গান বলতে আশিকি আর জান তেরে নাম - তো সেরকমই এক রাম-রাজত্বের সময় কুড়িয়ে পাওয়া ও বাড়ি বয়ে নিয়ে যাওয়া জ্ঞানের নুড়ি-পাথরের মধ্যে একখানা ছিল তুলনায় না যাওয়া। মানে ব্যাপারটা এরকম — ধরুন — পরীক্ষা দিয়ে বেরলাম — মা জিজ্ঞেস করল কিরকম হল — এবার আমাদের তো বিরাট কোহলি ছিল না, দাদাও ৯৬’এর আগে সিনে নেই — তো অজয় জাদেজাই তখন কোহলি, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ’এর তর্জনীই তখন কোহলি। সেই কোহলি-ময় বাগানে কলার তোলার সুযোগ এই সমস্ত সময়ে জুটে যেত। যাগগে, হাল্কা বিচ্যুতিগুলো থাক — তো পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েই বলতাম ফাটিয়ে দিয়েছি, ৮০’এর কম দেবে সেরকম শিক্ষিকা (বা পক্ষান্তরে শিক্ষক) এই স্কুলে তো পড়ায় না। মা’ও খুশি, সন্ধ্যাবেলা বাবা’ও খুশি, পরের রোববার দাদু-দিদা’ও খুশি। না, তুলনায় এখনো আসিনি। এবার আসব।

তো ফলাফল বেরনোর পর পটভূমি-মানচিত্র- হাওয়ামোরগ সব কিছুর পালাবদল ঘটত। আমাদের তো তখন এক্সিট পোল ছিল না, বর্তমানের ভয়হীন অস্তিত্বই আমাদের কাছে সব। সেই সময় একে একে ফলাফল ঘোষণা মানে প্রায় ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হওয়ার মত। তার সঙ্গে সারা-বাংলা- মা-সমিতি তো আছেই খবর চালাচালির জন্য।আমি অঙ্ক খাতা পাওয়ার আগে মা যে কি করে খবর পেত, তাও ল্যান্ডলাইন নামক কুহেলিকাটি আসার আগে, তা বোধহয় সচিন’ও (আমাদের তো তখন একটাই ভগবান) জানত না।

এবার খাতা — রেজাল্ট — নম্বর সব তো মায়ের পায়ে জবাফুলের মত পড়ল। মা কিন্তু ততক্ষনে হেমা মালিনী থেকে মুন্ডমালিনী হয়ে গেছে। প্রথম প্রশ্ন — এই যে বললি ৮০ পাবি? হ্যাঁ, এবার তুলনায় ঢুকব - আমি থতমত খেয়ে ততক্ষণে লং অনে ক্যাচ তুলে হাঁটা দিয়েছি প্যাভিলিয়নের দিকে — বলেছিলাম বটে, কিন্তু এইখানে silly হাওয়া ছু গয়ি, ওখানে LHS RHS মেলাতে গিয়ে স্টেপ জাম্প আছে, আর ওইখানে ওইটা out-of- syllabus ছিল আর ওইটা ভেবেছিলাম ঠিক হবে, মানে সবমিলিয়ে হিসেবে ভুল হয়ে গেছে।এইসব বলছি আর মাথায় ঘুরছে এসব ক্ষেত্রে কি বললে এই চামুণ্ডা ভাস কে কাবু করা যায় — ২/৪টে কথা বলতে বলতে দুম করে বলে ফেললাম — কিন্তু X, Y, Z আর F তো (মানে ক্লাসের মাথারা আর কি) ৫৫-৬০ পেয়েছে — আমি আর কি বাজে পেলাম — এবারে খাতাটাই বাজে দেখেছে। বলার পর বুঝলাম কেন আগুন নেভাতে বালি ব্যাবহার করে, কেন জল মাঝে মাঝে কাজ করে না।

যাইহোক, অগ্নিকান্ডের পর জ্ঞানের নুড়ি-পাথর সিরিজে সেই দিন মা বললেন (এইখানে আপনি সম্বোধনে যাব) যে তুলনা করাটা উচিত নয়, সেটা যে পরিস্তিতিতেই হোক। কারন দিনের শেষে ফলাফল হয়ত এক, কিন্তু পরিস্তিতি আলাদা থেকেই যায়। তুলনার মধ্যে বাস্তববর্জিত একটা ব্যাপার আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা একটা ভুল premise’এর জন্ম দেয়, একটা মিথ্যে rhetoric’এর উৎপত্তি ঘটায়।

— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —

তুলনা সম্বন্ধে একালে সবাই দেখছি বাইনারির শিকার। আমির খান, শাহরুখ খান থেকে বিরাট-অনুষ্কা হয়ে বুরহান অব্দি, সবই আলোচনার পরিধি থেকে বেরিয়ে তুলনার মধ্যে চলে আসছে। এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ — পুরোটাই বাইনারি কিন্তু। হয় শুন্য বা এক। হয় সাদা বা কালো। হয় ডান বা বাম। হয় সিপিএম বা টিএমসি। হয় দেশপ্রেমী অক্ষয় কুমার নয়ত মেয়েবাজ হাশমি। হয় গরুপ্রেমী নয়তো গোমাংস-ভক্ষক। হয় মিলিটারী নয়ত পাকিস্তান-প্রেমী। হয় গৈরিক নয়ত গণিকা। হয় জাতীয় পতাকা নয়ত বেইমান। হয় মিথ্যে নয়তো সত্যি। হয় ভকত নয়তো আদর্শ লিবেরাল। আলোচনা বন্ধ, তুলনা শুরু। এর সাথে যোগ করুন কিছু গ্লোবাল ওয়রমিং’এর মত গ্লোবাল ব্যারাম — মনোযোগ কমে আসা, ধৈর্য কমে আসা, স্তিতধি না থাকা, টি আর পি নামক মোহন দস্যু, চটজলদি কোনো এক উপসংহারে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা ও আরো এরকম কয়েক গুচ্ছ মনোহরণকারী বিষ বিশেষ — যাতে আলোচনার রাস্তা ক্রমে ক্রমে তুলনায় বদলে যাচ্ছে। কিছু আলোচনা আজকাল শুরুই হচ্ছে তুলনা দিয়ে — কই এত যে সৈন্য মারা যাচ্ছে তা নিয়ে তো কেউ কিছু বলছে না, কই কান্দিল মারা যাওয়াতে ভারত তো কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি, কই সেবার যখন পথের পাঁচালি নিয়ে জলঘোলা হল তখন তো কাউকে টেবিল চাপড়াতে দেখিনি, কই সেবার যখন কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ঘরছাড়া হল সেবার তো কাউকে এরকম মড়াকান্না কাঁদতে দেখিনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

তুলনায় না ঢুকলে বা আলোচনার পথে, পর্যবেক্ষণের পথে না হেঁটে, সোজা তুলনায় ঢুকলে, সমস্যা ২টিঃ

১-

পরিস্থিতি বা বর্তমান স্থান-কাল নামক বস্তুটিকে নাকচ করে দেওয়া। উদাঃ সচিন বনাম ব্র্যাডম্যান — বা সেওয়াগ (আনন্দবাজার মানি না) বনাম স্যার ভিভ বা অশ্বিন বনাম প্রসন্ন — এরকম তুলনা টানলে আমরা যে জিনিসগুলি ভুলে যাই, তার মধ্যে পড়ছে —

- অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বনাম শুধু পুরনো খেলার রেকর্ডিং, কোন সময়ে তাও না

- খোলা পিচ বনাম ঢাকা পিচ

- বিপক্ষের টিম বনাম বিপক্ষের টিম

এবং আরও ছোট বড় ব্যাপার যা কিনা পুরো ছবিটাকে সম্পূর্ণ করে তোলে।

২-

অহেতুক জলঘোলা করে মূল প্রসঙ্গটা থেকে দূরে সরে যাওয়া।

উদাঃ মনে করুন প্রত্যেকবার আপনি দাদাগিরি-কত- ভাল-অনুষ্ঠান বললেই আমি যদি আমেরিকাস-গট-ট্যালেন্টের সঙ্গে তুলনা করি বা গেম-অফ- থ্রোন্স নিয়ে দু কথা বললেই যদি আপনি ফ্রেন্ডস নিয়ে আসেন, তাহলে আসল প্রসঙ্গটা নিয়ে কথাই বলা হয় না, তুলনা করার জন্য মুখোমুখি সমরে নামতে হয়। আরো সোজা ভাষায় বলতে গেলে মা’এর কাছে ফেরত যেতে হয়। ক্লাসের থার্ড হওয়া ছেলেটারও অঙ্কে ৫৬ পাওয়ার তুলনা দিয়ে আমার কোন লাভ হবে না যতক্ষণ ও কেন ৫৬ পেয়েছে, ৮৫ বা ৯৭ না পেয়ে, সেটা না জানা যায়। তুলনা করব বলেই মঞ্চে নামার এই প্রবণতা জানিনা আমাদের মধ্যে কবে থেকে জন্মায়। কিন্তু এই প্রবণতা যে এ হাত থেকে ও হাত চালান হয়ে আজকে মহামারীর আকার ধারণ করেছে, সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই।

পরিশেষে (সবকিছুরই শেষ থাকে সলমন খান ছাড়া) — তুলনা করার এই রীতিতে বাস্তব ক্রমেই বাদ পড়ে যাচ্ছে, বাদ পড়ে যাচ্ছে আলোচনা-পর্যালোচনার অবকাশ, বাদ পড়ে যাচ্ছে মুদ্রার ওপিঠ নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা। তৈরি হচ্ছে উপসংহারে পৌঁছনোর এক প্রবৃত্তি, কে-কেন- কি না জেনেই।

সেই দিনটার পর থেকে আর তুলনা করিনি — মা’এর সামনেও না, পেছনেও না। পরের পরীক্ষায় অঙ্কে ১০০’য় ৮ পেয়েছিলাম, ক্লাসের সর্বনিম্ন (স্কুলেরও হবে বোধহয়), প্রি-টেস্টে রসায়নে ফেল করেছিলাম, কিন্তু প্রতেকবার আশ্রয় নিয়েছিলাম আত্মনিরিক্ষনের কাছে, তুলনার কাছে না। এটুকুই চাই, সব আলোচনা যেন তুলনারহিত হয়ে পর্যবেক্ষণ হয়ে উঠুক।

P.S. তুলনা টেনে আনতাম শুধু প্রশংসা করার সময়, তাও সুমনের “তোমার তুলনা আমি খুঁজি না কখনো…” শোনার পর, সেটাও বন্ধ।