দি আই মেকার (প্রথম পরিচ্ছেদ)
দি আই মেকার
লেখক: ডঃ ডেভিড উইলসন টেলার
অনুবাদঃ প্রদীপ সেনগুপ্ত
প্রথম পরিচ্ছেদ: অন্ধের দেশে
সাঁওতাল পরগণার এক গন্ডগ্রাম বামদার জঙ্গল হাসপাতালের দায়িত্ব আমি যেদিন হাতে পেলাম সেদিন স্থানীয় সাঁওতাল আর্দালিরা তাদের পুরোন ডাক্তার সাহেবকে গাঁদাফুলের মালা পরিয়ে বিদায় জানালো। কিন্তু হিন্দু রুগীরা খুব সঙ্গত কারণেই কান্নাকাটি জুড়ে দিলো। ডাক্তারকে তার অপেক্ষমান গাড়ির কাছ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে দিতে তারা বারংবার তাদের পুরোনো ডাক্তারের পায়ে ধরে আর্জি জানাচ্ছিল যে তিনি তাদেরকে যেন এই অর্বাচিনের হাতে ছড়ে দিয়ে না যান।
এটা ১৯৩১ সাল, আমার বয়স ২৩, আর আমি সদ্য পাশ করেই এই হাসপাতালের দায়িত্ব নিতে এসেছি। কাজেই আমাকে দেখার পর ওই লোকগুলোর মুখে চোখে যে ভীতির ছাপ ফুটে উঠেছিলো তা বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে, নতুন ডাক্তার মানেই নতুন কবরখানা, সেটা বোধ হয় এরাও জানে।
এতদিন পর্যন্ত যা যা জেনারাল সার্জারির কেস এসেছে সব সেরে রেখেছি, বলে পুরোনো ডাক্তারবাবু আমার পিঠ চাপড়ে একমুখ হাসি হাসলেন, আমাকে উৎসাহিত করার জন্যই বোধ হয়।
কিন্তু ব্যাপারটা আসল একেবারেই অন্যরকম। এটা একটা চোখের হাসপাতাল, এবং বছরে প্রায় কয়েক হাজার লোকের দৃষ্টি ফেরানো হল এই হাসপাতালের কাজ। বছরে প্রায় দু হাজার ছানি অপারেশন- শীতের সময় দিনে প্রায় ত্রিশটা করে। ডাক্তার খুব ঠান্ডা মাথায়, অনেকটা কারখানার সাপ্লাইয়ের দৈনিক তথ্য দেওয়ার মত করে, ব্যাপারটা আমার কাছে পেশ করলেন। আমাদের দেশে একজন আই সার্জেন আন্ততঃ দশ বছর প্র্যাক্টিস করার পর এতগুলি অপারেশন একদিনে করার কথা ভাবতে পারেন। পরে আমি যখন আমার এই দিনগুলির অভিজ্ঞতা লোকেদের বলেছি তারা অবজ্ঞার হাসি হেসে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেছে। আমি তাদেরকে বিশ্বাসই করাতে পারিনি আমার ম্যারাথন অপারেশনগুলির গল্প।
আমি মনে মনে বুঝতে পারছিলাম সামনে কি বিশাল চ্যালেঞ্জ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ চোখের সার্জারি যে শুধু অতি সূক্ষ্ম ব্যাপার তাই নয়, ডাক্তারী পড়ার সময় এ বিষয়ে প্রায় কিছুই শেখানো হয় না।
এখানে এসে আমি মাত্র ছয় সপ্তাহ সময় পেলাম সব কিছু বুঝে নেওয়ার জন্য। অত্যন্ত অল্প সময়। কিন্তু কিছুই করার নেই, কারণ পুরোনো ডাক্তারের শরীর ভালো যাচ্ছেনা। ওনার অবসরের সময়ও পেরিয়ে গিয়েছে। তবে যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি স্তম্ভিত করে দিল তা হল এই হাসপাতালে একটিও শিক্ষিত নার্স নেই এবং সব ব্যবস্থাই খুব নিম্ন মানের, অর্থাৎ যেটুকু না হলেই নয়।
আজকের দিন হলে এই রকম একটা চাকরি কেউ নিতেই চাইতোনা। কিন্তু সেই সময়, বিশেষ করে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস তৈরি হওয়ার আগে স্পেশালাইজেশনের সুযগ খুব কম ছিল, আর নিজে নিজে স্পেশালাইজ করে জীবিকা অর্জন করতে গেলে সারা জীবন পার হয়ে যেত। কাজেই নতুন ডাক্তাররা অনেকে অন্য কোনওভাবে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য নতুন কিছু হাতে পেলেই তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তা সত্বেও বলব আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই সৃষ্টিছাড়া, একটা বিরাট চোখের হাসপাতালের একা সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া।
আমি কেন যে এই চাকরিটা পেলাম সেটাও একটা রহস্য। আমি সিলেকশন বোর্ডের কোনো মেম্বারকে চিনতামনা। হয়তো আর কোনো ক্যন্ডিডেট ছিলনা অথবা আমার নিয়তিই আমাকে এই পথে টেনে এনেছে।
আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময় ভারতবর্ষে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ অন্ধ। সারা দেশে প্রায় এক ডজন চোখের হাসপাতাল রয়েছে, অবশ্যই শহরে। দেশের সাত লক্ষ গ্রামের কথা কেউ ভাবে না। যদিও এই অন্ধত্বের বেশিরভাগই ছানিজনিত, যা অপারেশন করলেই আশ্চর্যজনকভাবে সেরে যায়। কাজেই বুঝে দেখুন এই গন্ডগ্রামের মধ্যে এইরকম একটা হাসপাতাল থাকলে তার জনপ্রিয়তা কতদূর ছড়াতে পারে। এই হাসপাতালটা তৈরি হয়েছিল মূলতঃ এখানকার সাঁওতাল আদিবাসীদের জন্য। কিন্তু কালে দিনে প্রায় সমগ্র উত্তর ভারতের থেকে রুগীরা এখানে এসে ভীড় করতে লাগল। আর যা হয় এই হাসপাতালে এসে সব ধর্ম, বর্ণ , জাতপাতের বিভেদ ঘুচে গেল। এমনকি উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও প্রাণের দায়ে অস্পৃশ্য বুনোদের হাত থেকে সেবা নিতে দ্বিধা বোধ করতো না।
আমাকে চার্জ বুঝিয়ে দেওয়া হয়ে গেলে বড় ডাক্তারের গাড়ি ধুলো উড়িয়ে আমার সামনে দিয়ে চলে গেল। এই হাসপাতালের চারপাশে যারা ঘোরাঘুরি করছে তাদের দেখে মনে হতে লাগাল আমি একটা অন্ধের দেশে এসে পড়েছি। এদের হাত থেকে যে করেই হোক আমাকে পালাতে হবে। আমার পূর্বসূরির গাড়ি ধুলো উড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমিও মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম যে উনি তাঁর চেনা রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন আর আমাকে একা ফেলে রেখে যাচ্ছেন সাঁওতাল অধ্যুসিত এক গ্রামে। এখানে সঙ্গী নেই বন্ধু নেই এমনকি সময় কাটানোর জন্য রেডিও বা টেলিফোনও নেই। এদের ভাষাও আমি জানিনা। খব নিয়েছি আমার মতন আর এক হতভাগা ইউরোপিয়ান এখানেই আছে। কিন্তু তার সাথে দেখা করতে গেলে একটা নদী পেরিয়ে পঞ্চাশ মাইল যেতে হবে।
আমি বাংলোর বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারের উপার বসে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একটা চুরুট ধরালাম। কোন মহাপুণ্যের ফলে এই জায়গায় এসে পড়লাম, মনে মনে তারই একটা হিসাব কষতে লাগলাম।
দেশ থেকে কলকাতায় আসার সময় আমার সঙ্গে ছিল একগাদা ডাক্তারি বই আর এমন সব জামাকাপড় যা এদেশে একেবারেই অচল।
ডাইরির পাতা থেকে
২৪ মে ১৯৩১ বামদা পোস্ট, ভায়া শিমুলতলা
হঠাৎ করে বিদেশে চলে আসা নিয়ে আমার মনের ভিতরে কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছিলোনা। এতাও জানতাম যে কলকাতায় আমাকে যার সাথে দেখা করতে হবে তিনিও আমার অপরিচিত। কিন্তু দেখা গেল উইলি সামারভিল নামে এই ভদ্রলোক এখানে স্কটিশচার্চ কলেজে শিক্ষক হলেও এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এঁর সাথে আমার একবার আলাপ হয়েছিল।
কলকাতা হল লন্ডনের পরেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শহার। সুন্দর সব চক আর সাজানো বাণিজ্যিক এলাকা। যে কোনও বড় শহরের মতই ব্যাস্ত। সেদিন কলেজে একটা টেনিস টুর্ণামেন্ট ছিল। সেখানে অনেক লোকের সাথে আলাপ হল। সবাই আমাকে বেশ সাদরেই স্বাগত জানালো। আমার কাছে সেটাই প্রথম একটা ব্রিটিশ উপনিবেশের স্বাদ অনুভব।লক্ষ্য করলাম প্রতি মূহুর্তে একজন ভারতীয় ওয়েটার সর্বদাই পাশে রয়েছে আর হুকুম করলেই চা নিয়ে আসছে।
সেখানে মিসেস নট নামে একজন মহিলা আমাকে পরের দিন প্রাতরাশে নিমন্ত্রণ করলেন। নিমন্ত্রণের পক্ষে সময়টা খুবই উপযুক্ত, আমার ভালই লাগল। খুব সুন্দরভাবে সেদিন সকালটা কাটালাম। সেখানে আবার মিস রিচির সাথে এখা হল। এনাকে আমি এডিনবরায় থাকতেই একটু একটু চিনতাম। তিনি আমাকে একটা সিনেমা হলে নিয়ে গেলেন যেখানে লেখা রয়েছে এয়ার কুলিং অ্যাপারেটাস। ভিতরে ঢুকতেই ঠান্ডা হাওয়ার পরশে শরীর জুড়িয়ে গেল। সিনেমা হল অর্ধেকই খালি। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম হলে যারা সিনেমা দেখতে এসেছে তারা সবাই ইউরোপিয়ান এবং অধিকাংশই পুরুষ।
তখন কি আর জানি যে এই সামাজিক জীবন থেকে বহু দূরে একেবারে বিপরিত এক অদ্ভুত একাকীত্ব আর বিচ্ছিন্নতার মধ্যে আমার আগামী দু বছর কাটবে? পরদিন আমাকে একটু কেনাকাটার জন্য বেরোতে হল। কলকাতার প্রিন্সেপ স্ট্রীটকে এরা বলে চৌরঙ্গী।
যাই হোক আমার সুখের সময় অচিরেই শেষ হল। আমাকে রওনা হতে হল অচেনা দেশ বামদার উদ্দেশ্যে।
কলকাতার প্রায় দুশো মাইল উত্তরপশ্চিমে দু দিন আর দু রাতের রেল যাত্রার শেষে যে স্টেশনে এসে নামলাম তার নাম শিমূলতলা। বামদায় পৌঁছাতে হলে আরও ষোলো মেইল ধুলোভরা পথে গাড়ি করে যেতে হবে।
এখানে ভারতের রেলযাত্রার একটু বর্ণনা না দিলে আমার অভিজ্ঞতার সম্যক উপলব্ধি হবে না। রেলে প্রথমতঃ রয়েছে ফার্স্ট ক্লাস (কেবলমাত্র পয়সাওলা ইউরোপিয়ানদের জন্য), আছে সেকেন্ড ক্লাস (অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, কম পয়সা ওলা ইউরোপিয়ান এবং শিক্ষিত ভারতীয়দের জন্য)। এরপর রয়েছে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস (ট্রেনের বেশিরভাগটা জুড়ে রয়েছে এই ক্লাস) আর থার্ড ক্লাস ,যার কথা না বলাই ভাল। আর একটা সুন্দর বিকল্প ব্যবস্থা আছে। সেটা হল বিনে পয়সায় প্রাণ হাতে করে ট্রেনের বাইরে ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া। তবে ট্রেনের ভিতরেও বিনে পয়সায় যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে সেক্ষেত্রে ট্রেনের কর্মচারীদের হাতে কয়েক আনা পয়সা গুঁজে দিতে হয়।
আমি ইন্টারমিডিয়েটের যাত্রী ছিলাম।
আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় আমার কলকাতার গৃহকর্ত্রী বললেন কপাল ভালো থাকলে আশা করি তুমি সব কিছু ম্যানেজ করতে পারবে। তার কথাতে একটুও আশ্বস্ত হলাম না। বরং মনে হল তিনিও যেন খুব একটা ভরসা দিতে পারছেন না।
শিমূলতলা আসার পথে যে সব স্টেশন চোখে পড়ল তার সব কটিই ভীড়ে ঠাসা আর চরম বিসৃঙ্খল। দেখে মনে হয় ভারতের সব লোকই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে, কিন্তু কেউ জানেনা কোথায় যাবে। বিয়ের বরযাত্রী, তীর্থযাত্রী, ছাই মাখা সাধু, শেকলে বাঁধা কয়েদি নিয়ে পুলিশ, কোমরে ছুরি গোঁজা আফগান, সবাই স্টেশনে গাড়ি থামতেই হুড়মুড় করে নেমে ছুটছে জল নিতে। সব স্টেশনেই বিশাল জলসত্রের গায়ে লেখা আছে হিন্দুর জল, মুসলমানের জল। আমি ভেবে দেখলাম শুধু আমার জন্যই কোনো জলের ব্যবস্থা নেই।
ট্রেন ছাড়তেই আবার সব কটি লোক হুড়মুড় করে ছুটে ট্রেনে এসে বসছে। কেউ বা পাদানিতে আবার কেউ সটান বাঁদরের মত ঝুলতে ঝুলতে ট্রেনের ছাদে চড়ে বসছে। তখনও কিন্তু আমি উপলব্ধি করতে পারিনি যে এরাই হল সেই ধরণের মানুষ, আমার জঙ্গল হাসপাতালে একদিন যাদের চিকিতসা করতে হবে।
শিমুলতলা স্টেশনে খাকি পোশাক পরা আমার চিফের সাথে দেখা হল। স্টেশনের ধারে কাছে শহরের কোনো চিহ্ন নেই। আমার চিফ আঙুল দিয়ে পাশের কয়েকজন লোককে দেখালেন, যাদের তিনি সম্প্রতি দৃষ্টি দান করেছেন। তিনি বললেন রেলের অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান গার্ডরা হাসপাতালটা খুব ভালো করেই জানে। তারাই মাঝে মাঝে ট্রেন থেকে ভবঘুরে ঘরছাড়া অন্ধদের এই স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যায়।
ষোলো মাইল ধুলোয় ভরা পথে দুটো শুকনো নদী পেরোতে হল, পথের দুধারে লম্বা লম্বা শালের বন। সাঁওতালদের কাছে শাল গাছ বড় পবিত্র। অবশেষে এই বনভূমির প্রান্তে একটা মস্ত মাঠের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাঠের শেষে একটা সাদা বাংলো, সামনে ছায়ায় ঢাকা বারান্দা। আমরা সেই দিকে এগিয়ে চললাম। বাংলোয় ঢোকার পথটা ছায়ায় ঢাকা। দুধারে সাদা সোনালী ফুলে ঢাকা স্বর্ণচাঁপা গাছের সারি। এই গাছকে প্যাগোডা ট্রিও বলে। অষ্টাদশ শতকে একজন ফরাসী পর্যটক যখন অর্থের সন্ধানে অ্যাডভেঞ্চার করতে বেরিয়েছিলেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল চাঁদের আলোয় এই গাছটিকে ঝাঁকাতে। গাছ থেকে সোনা ঝরবে। তিনি ঝাঁকিয়েছিলেন, কিন্তু সোনার বদলে পেয়েছিলেন সোনালী ফুলের পাপড়ি দিয়ে গড়া এক ফুলের কার্পেট। আমার ভাগ্যেও বোধ হয় তাই আছে। আর এক ধরণের গাছ এখানে আছে, যাকে এরা বলে পলাশ (বনের আগুন)। এর পত্রহীন শাখাগুলো আগুনরাঙা ফুলে ভরে আছে। এর একটা ফুলকে আলাদা করে দেখলে তত সুন্দর মনে হবে না। মনে হবে রক্তে রাঙানো হাতের আঙুল। হিন্দুরা এই ফুল দিয়ে তাদের দেবী কালীর আরাধানা করে।
আমার প্রথম সপ্তাহের কাজের শেষে আমি টের পেলাম, আমাকে ডাক্তারির বাইরেও বেশ অনেকগুলো কর্তব্য সম্পাদন করেতে হবে। কাজগুলো হাতে নেবার পর বুঝলাম এগুলো আমাকে এখানকার কাজের একঘেয়েমি থেকে অনেকটাই মুক্তি দেবে। তবে অচিরেই বুঝতে পারলাম কিছু কিছু কাজ অনেক ক্ষেত্রেই বেশ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমার অতিরিক্ত কাজের ফিরিস্তি হল:১. আমি ষাটটা গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ের পরিদর্শক। এই স্কুলগুলো সরকার থেকে অনুদান পায় এবং এখানকার লোকেদের মধ্য থেকে অশিক্ষা দূর করার জন্য তৈরি হয়েছে। ২. আমি স্থানীয় একটি কোওপারেটিভ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, যার কাজ হল সূদখোর মহাজনদের হাত থেকে স্থানীয় সাঁওতালদের রক্ষা করা। ৩) আমি একজন স্থানীয় বিচারক। বারান্দায় বসে আমাকে বিভিন্ন বিবাদের মিমাংসা করতে হবে যেগুলি অনেক ক্ষেত্রেই বেশ রক্তাক্ত।
এখানে একজন প্রাইমারি পাশ সাঁওতাল পোস্ট মাস্টার আছে। তার অফিস একটা কুঁড়ে ঘরের মধ্যে, যেখানে কোনও আসবাব নেই। সে মাটির মেঝেতে চিঠি ছড়িয়ে বসে পোস্টমাস্টারি করে। যেগুলি ফার্স্ট ক্লাস মেইল সেগুলি শুধু সে বাঁ পায়ের ফাঁকে ধরে রাখে। ওটাই তার চিঠির র্যাক। চিঠিগুলি সর্ট হয়ে গেলে সে তার ডান পা দিয়ে চেপে ধরে সেগুলি সাজায়।
পোস্টমাস্তারের পায়ের কাজ দেখতে দেখতে বেশ অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার চিন্তা ব্যহত হল বারান্দায় মোংরা টুডুর আগমনে। মোঙরা এই হাসপাতালের হেড আর্দালি। আবছা অন্ধকারে সাদা পোষাক পরা অস্পষ্ট চেহারা তার হাতের লন্ঠনের আলোয় সামান্যই দেখা যাচ্ছিল। সে আমাকে দেখে “জোহার” বলে সেলাম করে সটান দাঁড়িয়ে রইল। সাঁওতালরা তাদের নিজেদেরকে উঁচুস্তরের মানুষ বলে গণ্য করে, আর হিন্দুরা যে হাঁটু গেড়ে সাহেবদের সম্মান জানায় সেটাকে অসম্মানজনক মনে করে।
মোংরা টুডুর পিছনে আর একটি ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল। মোংরা তাকে ইশারায় এগিয়ে যেতে বলাতে সে এগিয়ে এসে আমার হাতে একটা চিরকুট তুলে দিল। তাতে লেখা-
মাননীয় ডাক্তার সাহেব,
ছানি অপারেশনে আপনার অনেক নাম শুনেছি। আমি প্রভুর কাছে ৪০ জন অন্ধকে পাঠাচ্ছি আমার গ্রামের থেকে। দয়া করে এদের দৃষ্টি দান করুন।
আপনার বিনীত ভৃত্য
রামদাস
অন্ধ রুগিদের সাথে একজন পাচক এবং তাদের দেখাশোনা ও খাওয়ানোর জন্য একজন পরিচারকও সাথে এসেছে। সঙ্গে বস্তাভর্তি চাল ও বাসনপত্র।
হাসপাতাল ইতিমধ্যেই রুগিতে ঠাসা, তার উপর এতগুলি নতুন অতিথি, আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। আসলে এরা আমার আগের ডাক্তারের কাছেই এসেছে। রামদাস জানতনা যে ডাক্তারবদল হয়েছে। কিন্তু এখন এ অবস্থায় এদের ভার নেওয়া আমারই কর্তব্য। আমি মোংরা টুডুকে বললাম এদের জন্য হাসপাতাল কম্পাউন্ডে একটা ছায়াঘেরা জায়গা ঠিক করে দিতে, যেখানে এরা ছাউনি করে থাকতে পারবে। মোংরা টু্ডুকে দেখলাম, প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করে তারপর রাজি হয়ে গেল। আমি পরে জেনেছিলাম রামদাস এক বছর আগেও এই রকম এক অন্ধের দল পাঠিয়েছিল। তারা ভালো হয়ে গ্রামে ফেরার পর সে হাসপাতালের ডাক্তারকে আর একটা চিঠি পাঠায়। তাতে অনুরোধ ছিলো ব্রিটিশ সম্রাটের দেওয়া খেতাবের আগামী লিস্টে তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য যেন সুপারিশ করা হয়।
