The Eye Maker

by Dr. Robert Taylor

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ- জংগল হাসপাতাল

জঙ্গলের হাসপাতাল

৮ই জুন ১৯৩১

আমি এখন একেবারে একা। নিঃসঙ্গতার দু একটা মূহুর্ত ছাড়া আমি আমার কাজটাকে উপভোগ করছি। গরমটাও সয়ে এসেছে। এখানে গরম শুকনো। যতদিন না পূব দিক থেকে হাওয়া বইবে ততদিন ঘাম হবে না।

আমার প্রথম রাতের ঘুম হয়েছে ছাড়া ছাড়া। ঘুম ভেঙে শুনতে পাচ্ছিলাম কোথায় যেন একটানা মাদলের বাদ্যি বেজেই চলেছে।। মনে হচ্ছিল আমার শেষের দিন বুঝি অবশেষে এসেই পড়েছে।

কিছুক্ষণ পরেই মাদলের বাদ্যির রহস্য আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। গরমের জন্য সে রাত্রে আমি ঘুমোতে গিয়েছিলাম বাংলোর ছাদে। বিছানায় শুয়ে গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে লক্ষ্য করলাম সেটা চন্দ্রগ্রহণের রাত। পৃথিবীর ছায়া এসে চাঁদকে ঢেকে দিচ্ছে। সাঁওতাল আর হিন্দুদের মধ্যে একটা বিশ্বাস আছে যে গ্রহণের সময় একটা দানব এসে চাঁদকে গিলে ফেলে। তাই মাদল বাজিয়ে আর চিৎকার করে তাকে ভয় দেখাতে হয়, যখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের গা থেকে সরে যায় তখন এরা স্বস্তির নিঃশাস ফেলে ভাবে দানবকে অবশেষে তাড়ানো গেছে। আমি কিছুক্ষণ ধরে গ্রহণ দেখলাম, তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে মনে হল হাসপাতালটা আশ্চর্যরকমের শান্ত। কালকের সেই ছানিওলা মানুষের দল একটা বিশাল বট গাছের তলায় তাদের ছাউনি বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই সে রাত্রে চুপি চুপি হাসপাতাল থেকে কেটে পড়েছে। তার কারণ চন্দ্রগ্রহণ হতে পারে আবার আমার মতন এক অর্বাচিন ডাক্তারের হাতে প্রাণটা সঁপে দেওয়ার ভয়ও হতে পারে।

তবে মংরা টুডু আমাকে আশ্বস্ত করে জানালো যে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার। কোনও একটা উৎসবের দিন হলেই হাসপাতাল খালি হয়ে যায়। তার উপর হোলি বা দিওয়ালি হলে তো কথাই নেই। কাজেই দিন একটু গড়াতেই দেখা গেল রুগিরা একে একে ফিরে আসছে। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম যে এরা আমার সম্মান রেখেছে।

প্রতিদিন সকালবেলা ভ্রমণের সময় এই সব রুগিদের দঙ্গলের সামনে পড়ে অজস্র প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে হয়। আমাকেও এক নাগাড়ে বলে যেতে হয়, “পিছে — পিছে”, মানে পরে এসো। এদের অধিকাংশই অন্ধ, সাথে হয়তো একটু সক্ষম কোনো আত্মীয় রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় রুগির সাথে পুরো একটা পরিবার চলে এসেছে। এরা কেউ এসেছে নেপাল , তিব্বত অথবা আরও দূর আফগানিস্তান থেকে। আজ সকালে দেখলাম আমার বাঁয়ে একজন অন্ধ মুসলমান আসন পেতে নমাজ পড়ছে আর আমার ডাইনে কপালে ছাই মাখা এক হিদু সাধু আমাকে দেখেই নমস্কার করে বলল গরীব পরওয়ার, যার অর্থ আমি গরীবের উদ্ধারকর্তা।

আমার ঠিক পিছনেই শুনতে পেলাম চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ, ফিরে তাকাতেই দেখি একদল পর্দানশীন মহিলা আমাকে ইশারায় জানাচ্ছে তারা আমাকে একটু নিভৃতে দেখাতে চায়। আমি কিছুক্ষণ পরে তাদের সারি দিয়ে বারান্দায় বসিয়ে বললাম শুধু মাত্র একটা চোখের থেকে এক ইঞ্চি কাপড় সরিয়ে আমাকে চোখটা দেখাতে। তারা এক মূহুর্তের জন্য একবার কাপড় সরিয়েই আবার চোখ ঢেকে দিল। আমার মনে পড়ে গেল এক চিনা ডাক্তারের কথা। তিনি তাঁর স্টেথিস্কোপের নলটা এত বড় রেখেছিলেন যে সেটা দিয়ে পাশের ঘরের পর্দানশীন মহিলার বুক পরীক্ষা করতে পারতেন।

এর মধ্যে এক অবসরপ্রাপ্ত ডোগরা সিপাই আমাকে দেখাতে এলো। তার পরণে খাকি পোষাক, বুকে কয়েকটা মেডেল ঝুলছে। সে ব্রিটিশ রাজের অধীনে সেনাদলে চাকরি করতে পারার জন্য খুব গর্বিত। আমার সামনে এসেই সে মার্চ করে দু কদম এগিয়ে এলো। তারপর সশব্দে অ্যাটেনশন হয়ে এক লম্বা সেলাম ঠুকলো। কলকাতার এক উকিলবাবুও চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তিনি আমাকে নানা রকম ধর্মের উপদেশ দিয়ে বললেন যে আমি এখানে ডাক্তারি করে যে পুণ্যলাভ করছি সামান্য আর্থিক দক্ষিণা দিয়ে তিনি তার মাহাত্ব নষ্ট করতে চান না।

তবুও এরা আসে। গঙ্গাজলের কলস নিয়ে আসে পুণ্যার্থী মহাজনেরা, যারা এই সংসারের বন্ধন থেকে মুক্তির আশায় রয়েছে। গান্ধী টুপি পরা রুগিরা আসে স্লোগান দিতে দিতে, বিদেশী শৃঙ্খল চূর্ণ কর। আসে হাতে রাইফেল নিয়ে ঢোলা পাজামা, আচকান পরা আফগান যোদ্ধা। কখনওবা হাজির হয় কুকরি হাতে কোনও গোর্খা সিপাই, আবার আসে হাত দুটো প্রায় গলে গিয়েছে এমন কুষ্ঠ রুগিও। সবাই যে ছানি কাটাতে আসছে তা নয়। একদিন এক হাতে টানা ঠেলাগাড়ি চড়ে এক বুনো সাঁওতাল এসে হাজির, তার মুখটা ভালুকের নখের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।

এর পরের মাসগুলি ধরে আমাকে নানা ধরণের চোখের চিকিৎসা করতে হল। অবশ্য সবগুলিকেই ঠিক চিকিৎসা বলা যাবেনা। আমি আমার বাকি জীবনে এরকম ধরণের রুগি আর পাবো বলেও মনে হয় না। এদের বেশিরভাগের রোগের কারণ হল অপুষ্টি অজ্ঞতা বা চিকিৎসার সুযোগের অভাব। আমি এদের মধ্যে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে ভুলেই যেতাম সুস্থ চোখ কাকে বলে। এমনও হয়েছে আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখ দেখে সুস্থ চোখ কেমন হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করেছি। আজ এত বছর পরেও আমার চোখের সামনে সেই সব অসুস্থ চোখগুলো ভেসে ওঠে। আমি লোকগুলোর নামও মনে করতে পারি।

এই হাসপাতাল থেকে অনেক সময় খুব গভীর দুঃখজনক সিদ্ধান্তও নিতে হয়, একদিন আমাকে খুব দোটানায় পড়ে যেতে হয়েছিল একটা সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য একটি শিশুকে কি অন্ধ করে দেওয়া উচিত? লক্ষ্মী নামে এই মেয়েটির ডান চোখে দেখা যেত একটা সবুজাভ আলোর ঝলক। খুব স্পষ্ট। এর কারণ গ্লিওমা টিউমার। একে যদি এভাবে ফেলে রাখা হয় তবে তা মস্তিষ্কে সংক্রামিত হবে। তার দুটো চোখকেই যদি অপারেশন করে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় তবে সে প্রাণে বেঁচে যেতে পারে। ওর বাবা মা শিক্ষিত। আমার এই টানাপোরেন তাঁরা বুঝতে পারলেন। কিন্তু হায়রে পূবদেশের ভাগ্যনির্ভরতা! ওঁরা বললেন, এটা লক্ষ্মীর পূর্বজন্মের পাপের ফল, যা হবার তা হবে। তাঁরা ঠিক করলেন, কিছুই করতে হবেনা। যা কপালে আছে তাই হবে।

৭ই জুন ১৯৩১

এই সপ্তাহে আমি একজন ভারতীয় ডাক্তারের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম, “ আমি একজন মহিলাকে পাঠাচ্ছি, এর স্বামী এর হাত কামড়ে দিয়েছে। আমি দেখলাম সেপটিক হয়ে গিয়েছে। এর আত্মীয়রা এত বোকা যে পনের দিন দেরি করেছে আমার কাছে আনতে। হাতের অনেকটা জায়গা জুড়েই গ্যাংগ্রীন দেখা দিয়েছে। এটা অ্যাম্পুটের কেস। কিন্তু আমি একা হাতে এই কাজ করতে চাইছিনা”।

কাজেই, অগত্যা আমি আমার জীবনের প্রথম অ্যাম্পুটের কেসটি করলাম। কিন্তু সমস্যা হল আমি অপারেশন শুরু করতেই তার আত্মীয়রা তাদের অনুমতি তুলে নিল। বাধ্য হয়ে তখন একজন দোভাষীর সাহায্য নিয়ে আমাকে ওদের সাথে অনেক্ষণ বকবক করে যেতে হল। ওদিকে ক্ষতটা খোলা পড়ে আছে আর মহিলার যেই জ্ঞান ফিরে আসছে আবার তাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে রাখতে হচ্ছে। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার।

যেখানে এতসব নাটক ঘটছে সেই জংগল হাসপাতালে রয়েছে ইঁটের তৈরি এক সুউচ্চ মিনার, বহু দূর থেকে একে দেখা যায়। আর রয়েছে একটা অপারেশন থিয়েটার, এটা একজন পয়সাওলা মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী দান করেছেন। আর রয়েছে একটা আউট পেসেন্ট সার্জারি কাম ডিসপেনসারি। বাকিদের জন্য রয়েছে কয়েক সারি ছাউনির মতন যেখানে শোবার ব্যবস্থা বলতে রয়েছে কয়েকটা পাথরের চাতাল। শৌচাগার বলতে কোনো বস্তুর অস্তিত্ব নেই। তবে অধিকাংশ রুগি এবং তাদের পরিবারের লোকেরা গাছের নীচে বা তাবুতে থাকাই পছন্দ করে। কাজেই এই হাসপাতালের ব্যবস্থাগুলি একটা শহরের হাসপাতালের ধারেকাছেও নয়। বরং একে একটা স্থায়ী আই ক্যাম্প বা ফিল্ড হাসপাতালের সাথে তুলনা করা যায়। এটা গড়ে ওঠার পিছনে কোনো পরিকল্পনা নেই। সবটাই যখন যেমন দরকার হয়েছে তখন এলোমেলোভাবে গড়ে উঠেছে। এত অব্যবস্থা আমার সহ্য হতনা। একে আমার বয়স কম তার উপর সদ্য মেডিকাল কলেজ থেকে পাশ করে এসেছি। কাজেই আমি আমার নিয়োগকর্তাদের গরম গরম চিঠি পাঠাতাম।

২৭ শে ডিসেম্বর ১৯৩১

মাঝে মাঝে, যারা আমাকে এখানে পাঠিয়েছে তাদের উপর রাগ হত।আমার মনে হয়না এখানকার অবস্থা কেমন তা তাঁরা জানেন। আমিও যদি জানতাম তা হলে এর দিকে ফিরেও তাকাতামনা।

পরে আমি অন্যদিকটাও ভেবে দেখলাম। সব ধরণের কর্মচারীসহ একটা সর্বাঙ্গসুন্দর ৫০০ বেডের হাসপাতাল বানানোর খরচ বিশাল। আর সেই হাসপাতাল এখানকার স্থানীয় মানুষদের ততটা আকর্ষণ করবেনা, কারণ এরা কোনও দিন ঐ সুসজ্জিত হাসপাতালের বেডে শোয় নি। বরং গ্রামের মানুষদের জীবনযাত্রার কাছাকাছি এই হাসপাতালের পরিবেশ এই রুগিদের অনেকটা সহজ হতে সাহায্য করে। ফলে আশ্চর্যজনকভাবে তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি এত সস্তা হওয়ার কারণে বিপুল সংখ্যক রুগি এখানে আসতে পারে।

এই রকম ভবঘুরে আবাসের মত পরিবেশ হওয়ার কারণে এখানে কারা যে ভর্তি হওয়া রুগি আর কারা যে আউট পেশেন্ট তা তফাৎ করা মুশকিল হত। তাই হাসপাতালে নিয়মমাফিক রাউন্ড দেওয়ার ব্যাপারটা হত না। কাজেই প্রত্যেক রুগির পোষাকের কোনায় এক টুকরো কার্ড আটকে দেওয়া হত, যার মধ্যে রুগির নাম আর রোগের ইতিহাস লিখে রাখা হত।

সান্ধ্য সার্জারি

সান্ধ্য সার্জারি ব্যাপারটা হাল অনেকটা খোলা দরবারের মত, সেখানে যা খুশি প্রশ্ন করা যায়, রুগিদের কতটা উন্নতি হচ্ছে তা নোট করা হয় আর যে কোনও সমস্যা তৎক্ষণাৎ সমাধান করে ফেলা হয়। তবে এক্ষেত্রেও কিছু অতি উৎসাহী ও ঘ্যানঘ্যানে লোক এসে জোটে যাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমার কাছে এমন কিছু আশ্চর্য ওষুধ আছে যা আমি রাজা মহারাজদের জন্য তুলে রেখেছি। একটু তোষামদ করলে বা ঘুষ দিলেই আমি সেটা বের করে দেব।

সন্ধ্যার পর যদি কোনো বিশেষ রুগিকে দেখার জন্য হাসপাতালে যেতে হয় তা হলে একজন সাঁওতাল আর্দালি খুব সন্তর্পনে আমাকে ছাউনির পাশ দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, যাতে আমি ধরা পড়ে না যাই। যেতে যেতে দেখি আমার চার পাশে তখন ছোট ছোট আগুনের কুন্ড ঘিরে ছায়া ছায়া মানুষগুলো বসে রয়েছে। তাদের রাতের রান্না হচ্ছে, তেল মশলা আর লঙ্কার তীব্র গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। রাত গভীর হলে, শীত আরও ঘন হলে এই মানুষগুলি আগুনের শিখার আরও কাছে চলে আসে, যে আগুনের শিখার আলো তাদের চোখে ধরা পড়ে না।

আমার প্রথম কয়েকটা মাসের প্রতিটি মূহুর্তই ছিল ভয়ঙ্কর আকস্মিকতায় ভরা। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু কিছু ঘটনা ঘটত যা আমার মন কিছুক্ষণের জন্য হলেও, ভালো করে দিতো। একবার এলো এক বাজিকরের দল, আমার কাছ থেকে পরামর্শ আর এক বোতল ওষুধ পেয়ে ফিস হিসাবে হাসপাতালের মাঠে তাদের কসরত দেখিয়ে গেল। মাঝে মাঝে দু একজন ডাকাত এসে হাসপাতালে ভর্তি হত, যাতে পুলিশ তাদের ধরতে না পারে। এত সব উদ্ভট ঘটনার মাঝেও আমাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হত যাতে আমি একজন দক্ষ জেনারেল সার্জেন এবং চোখের সার্জেন দুটোই হয়ে উঠতে পারি।

আমার জন্মের একযুগ আগে যে স্কট ডাক্তার এখানে প্রথম এসেছিলেন তিনি তাঁর প্রথম রুগিকে অপারেশন টেবিলে শোয়ানোর জন্য নিজের পকেট থেকে তাকে ফিস দিয়েছিলেন। আমার ভাগ্য ভালো যে আমাকে আস্থা অর্জনের জন্য এত খরচসাপেক্ষ রাস্তা নিতে হয়নি।

আমি কিছুদিনের মধ্যেই চোখের অপারেশনের ব্যাপারে একেবারে পটু হয়ে গেলাম। আমার আঙুলগুলোও যেন তৈরি হয়ে গেল। তা নইলে এই সূক্ষ্ম অপারেশন, যেখানে এক মিলিমিটারের ফারাকও একজনের চোখ অন্ধ করে দিতে পারে তারজন্য আমি — — এতদিন পরে এখন মনে হয় আমার চরিত্রের সাথে চোখের অপারেশন খাপ খেয়ে গেছে।

এখানে অনেক রুগিই যে সাধারণ কয়েকটি অসুখে ভোগে তার প্রধান কারণ দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং দেখা যায় তাদের অবিলম্বে অপারেশন করা দরকার। কিন্তু কোনো ধরণের এক্স রে মেশিন ছাড়া এবং কোনো ল্যাবরেটারিতে পরীক্ষা না করে অপারেশন করা হবে কিনা, রুগির মরণ বাঁচনের এই সিদ্ধান্ত কিন্তু সম্পূর্ণভাবে এই অর্বাচিনের স্কন্ধেই ন্যস্ত রয়েছে। তাই রাতের বেলা আমি মোটা মোটা রেফারেন্স বই খুলে অপারেশনের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি সাজাতাম। তাবে সৌভাগ্যক্রমে সেই সময় আমার হাতে আর একজন জঙ্গলের ডাক্তার আলবার্ট সোয়ার্ৎসনাইগারের“ মোর ফ্রম প্রিমিভাল ফরেস্ট” বইটা এসে পড়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই বইটা আমার কাছে প্রায় বাইবেল তুল্য হয়ে উঠল, কারণ তাতে প্রথমেই লেখা আছে, “যে হাত শক্ত হাতে অপারেশন করে — -“

অপারেশন করব এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবার পর আমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে চলে যেতাম। পরদিন সকালে আমি নিজের হাতে সার্জিকাল ইন্সট্রুমেন্টগুলি আমার রান্নাঘরেই ফুটিয়ে নিতাম। এর পরেও আরো অনেক বাধা থাকত যেগুলি শক্ত হাতে পার করতে হত আমাকে। এমনও হয়েছে যে অপারেশনের সব কিছু ঠিক ঠাক, কিন্তু অপারেশনের টেবিলে উঠে আমার রুগি বেঁকে বসলেন অথবা অপারেশনের প্রথম ছুরি বসাবামাত্র তার ঠাকুমা ছুটে এসে তার অনুমতি তুলে নিল। অথবা রুগি এসে জানালো যে তার জ্যোতিষী তাকে বারণ করেছে সময়টা অলক্ষুনে বলে।

এসব অবস্থায় আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম জ্যোতিষীর কথা ঠিক বলে মেনে নেওয়াই বোধ হয় ভালো। শেষ পর্যন্ত রুগি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি মনে মনে স্বস্তিই অনুভব করতাম।

ডাইরির পাতা থেকে

কোথাও বৃষ্টির কোনো চিহ্নমাত্র নেই, গরম চলেছে একটানা। দিনের পর দিন একইভাবে কেটে যাচ্ছে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় যেমন হয়- সময়ের কোনো বোধই থাকে না। সূর্য ওঠে অস্ত যায়, আবার ওঠে আবার অস্ত যায়, মাঝে মাঝে চাঁদ এসে উঁকি মারে। কোন দিন আকাশের কোন কোনা থেকে চাঁদ প্রথম উঁকি দেবে আমার মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। ঘড়ি বলতে রয়েছে বাংলোতে, হাসপাতালে আর স্কুলে। আমি মাঝে মাজে সূর্য দেখে সময় বোঝার চেষ্টা করি। সাঁওতালদের সাথে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার সময় আমি আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলি সুর্য যখন আকাশের ওইখানে আসবে তখন আমি তোমার সাথে দেখা করব।

তৃতীয় পরিচ্ছেদের লিঙ্ক এখানে ক্লিক করুন

    Pradip Kumar Sengupta

    Written by

    Geologist, environmentalist, writer, ecologist