ই-গভর্নেন্স সেক্টর ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি

Md Shariful Islam
Nov 19, 2018 · 11 min read
Image source : Internet

সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশ বিগত ৮-১০ বছরে ই-গভর্নেন্স সেক্টরে প্রভূত অগ্রগতি অর্জন করেছে। open এবং connected government সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য এছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। বিভিন্ন নাগরিক সেবাকে ই-সেবায় উন্নীতকরণ ও সরকারী সংস্থাগুলির back-office সিস্টেমের অটোমেশন বর্তমানে বেশ ভালোভাবেই লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে যে সকল ডেটা/তথ্য ই-সেবা বা back-office সিস্টেমে সংরক্ষিত হচ্ছে তার নিরাপত্তার বিষয়টিও চিন্তা করতে হবে। ডিজিটাল উপায়ে বিপুল পরিমাণ ডেটা/তথ্য যেমন দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ কর সম্ভব, ঠিক তেমনি যথোপযুক্ত উপায়ে নিরাপত্তা বিধান না করা হলে সেই ডেটা/তথ্য চুরি হয়ে যেতে পারে। যা পরিণতিতে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বর্তমান সময়ে ইলেক্ট্রনিক উপায়ে সংরক্ষিত ডেটা/তথ্যের নিরাপত্তায় বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্লকচেইন (Blockchain) হচ্ছে সেরকম একটি প্রযুক্তি। এ নিবন্ধে আমাদের দেশের ই-গভর্নেন্স সেক্টরে এ প্রযুক্তির বাস্তবায়ন বিষয়ে আলোচনা করব।

ব্লকচেইন নিঃসন্দেহে আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে এমন মানুষের কাছে এ বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রযুক্তিগুলির একটি । আসলে বিটকয়েনকে বাদ দিয়ে আমরা ব্লকচেইনের আলোচনা শুরু করতে পারি না । ২০০৮ সালে সাতোশি নাকামতো (একজন তথাকথিত অজানা ব্যক্তি যার ছদ্দনাম) কর্তৃক বিটকয়েনের ধারনা প্রদান এবং ২০০৯ সালে তার কার্যকরী বাস্তবায়নের সাথে ব্লকচেইন প্রযুক্তি শুরু হয়েছিল । শুরুটা ডিজিটাল মুদ্রা (currency) দিয়ে হলেও বর্তমানে এই প্রযুক্তি ব্যাবহার করে আমাদের বিদ্যমান অনেক সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে ।

ব্লকচেইন কি ?

ব্লকচেইন হচ্ছে একটি বিকেন্দ্রীভূত(decentralized), ডিস্ট্রিবিউটেড (distributed) এবং পাবলিক ডিজিটাল লেজার (public digital ledger) পদ্ধতি যেখানে প্রতিটি তথ্য ব্লক আকারে থাকে। প্রতিটি ব্লকে সাধারণত একটি পূর্ববর্তী ব্লকের একটি লিঙ্ক হিসাবে একটি হ্যাশ পয়েন্টার(hash pointer), একটি টাইমস্ট্যাম্প(timestamp) এবং লেনদেনের তথ্য রয়েছে । এভাবে একটার পর একটা ব্লক সংযুক্ত ব্লকচেইন তৈরি হয়। সর্বপ্রথম ব্লকটাকে বলা হয় জেনেসিস ব্লক (genesis block) । যেহেতু এটি একটি ডিস্ট্রিবিউটেড (distributed) লেজার, তাই ব্লকচেইন সাধারণত একটি peer-to-peer নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত হয় । প্রতিটি peer কে এক একটি নোড (node) বলা হয় । আর নেটওয়ার্কের প্রতিটি নোডে ব্লকচেইনের একটি অনুলিপি (কপি) থাকে । একবার তথ্য রেকর্ড করা হলে, যে কোনও ব্লকের তথ্য পরবর্তী সমস্ত ব্লকগুলির পরিবর্তন না করে এবং নেটওয়ার্কের ঐক্যমত্য (consensus) ছাড়া পরিবর্তন করা যায় না।

Image source : Internet

বিটকয়েন ও ব্লকচেইন

বিটকয়েন ও ব্লকচেইন এক বিষয় নয় ।

বিটকয়েন, ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রথম বাস্তবায়ন(implementation) । বিটকয়েন একটি ইলেকট্রনিক মুদ্রা (crypto currency) যা ইন্টারনেটে পণ্য ও পরিষেবাদির জন্য অর্থের বিনিময়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাস, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা সমস্যার সমাধান করার জন্য তৈরি হয়েছিল।

বিটকয়েন হচ্ছে পাবলিক ডিস্ট্রিবিউটেট ( distributed) ব্লকচেইন । এটি নিশ্চিত করে যে বিটকয়েন নেটওয়ার্কটিতে অংশগ্রহণকারী সকলের সমস্ত লেনদেনের অ্যাক্সেস (access) রয়েছে এবং এভাবে প্রত্যেকেই সেই সমস্ত লেনদেনের সাথে একমত হয়। উপরন্তু, ব্লকচেইন অপরিবর্তনীয়, তাই কেউ এটি পরিবর্তন করতে পারে না।

যেহেতু বিটকয়েন ব্লকচেইন বিটকয়েন নেটওয়ার্কের সকল অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, তাই এটি কোন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর করে না। আর ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সমস্ত লেনদেন বেনামী হয়। এখানে জেনে রাখা ভাল বাংলাদেশে সব ধরনের ইলেকট্রনিক মুদ্রা (crypto currency) লেনদেন আইনত দণ্ডনীয় ।

ব্লকচেইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য সমূহ

  • বিকেন্দ্রীভূত (decentralized ) - একটি নির্দিষ্ট লেনদেন সম্পাদিত হবে কিনা তা নিয়ন্ত্রণ করে এমন কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থা নেই। এটি ব্লকচেইনে সমস্ত নোডগুলির মধ্যে ঐক্যমত্যের মাধ্যমে সমাধান করা হয়।
  • ডিস্ট্রিবিউটেট (distributed) - ব্লকচেইন ডেটা নেটওয়ার্কের প্রতিটি অংশে অনুলিপি করা হয়। তাই তথ্য হারিয়ে যাবার ভয় থাকে না।
  • অপরিবর্তনীয়তা (Immutability) – ব্লকচেইন পদ্ধতিতে তথ্য কখনই পরিবর্তন করা সম্ভব না। এখানে কেবল নতুন তথ্য যোগ হতে পারে ।
  • অধিকর স্বচ্ছতা (transparency) - ডিস্ট্রিবিউটেট লেজার পদ্ধতিতে সকল ব্যবহারকারীদের কাছে সমস্ত তথ্য এবং লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ থাকে । ব্লকচেইনের তথ্য সকল ব্যবহারকারীদের কাছে সম্পূর্ণ, সঠিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে ।
  • উন্নত নিরাপত্তা (security)– নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রতিটি লেনদেন ক্রিপ্টোগ্রাফি (cryptography )ব্যবহার করে যাচাই করা হয়, তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়।
  • উন্নত নিরীক্ষণ সক্ষমতা (traceability) – এ পদ্ধতিতে খুব সহজেই কোন তথ্যের মূল উৎস খুজে বের করা সম্ভব । এজন্য ব্লকচেইন supply chain এ অনেক সহায়ক একটি প্রযুক্তি ।
  • কম লেনদেনের খরচ - ব্লকচেন ব্যবহার করে একটি লেনদেন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই সম্পন্ন হয় ফলে লেনদেনের খরচ কমে যায় ।
Image source : Internet

ব্লকচেইন ধরণ ও প্লাটফর্মসমূহ

আমরা বিভিন্নভাবে নিজেদের জন্য ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক তৈরী করতে পারি । কিছু জনপ্রিয় ব্লকচেইন সফ্টওয়্যার প্ল্যাটফর্মের নামে নিচে দেওয়া হলঃ-

  • Ethereum
  • Hyperledger Fabric
  • Quorum
  • Multichain
  • BigchainDB
  • OpenChain

এবার আসা যাক আমরা কি ধরনের ব্লকচেইন তৈরী করতে চাই । ব্লকচেইন প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে :-

১) পাবলিক ব্লকচেইন (Public Blockchain)

২) প্রাইভেট ব্লকচেইন (Private Blockchain):

) কনসোর্টিয়া ব্লকচেইন (Consortium Blockchain)

পাবলিক ব্লকচেইন (Public Blockchain): পাবলিক ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক সবার জন্য সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত । যে কেউ পাবলিক ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক চলমান ক্রিয়াকলাপগুলিতে অংশগ্রহণ করতে , পড়তে, লিখতে ও নিরীক্ষা করতে পারে, যা সাধারণত ব্লকচাইনের স্ব-শাসিত (self-govern) প্রকৃতি বজায় রাখতে সহায়তা করে। এ ধরনের ব্লচকচেইনে অংশগ্রহণের জন্য কোন অনুমতি (permission) লাগে না । তাই একে public permissionless blockchain বলা হয়ে থাকে । বিটকয়েন (Bitcoin), Ethereum ইত্যাদি হচ্ছে এ ধনের ব্লকচেইন ।

প্রাইভেট ব্লকচেইন (Private Blockchain):প্রাইভেট ব্লকচেইন পাবলিক ব্লকচেইন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সাধারণত এ ধরনের ব্লকচেইনের জন্য প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যাবহার করা হয় যাতে অন্য কারো নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার থাকে না। প্রাইভেট ব্লকচেইন permissionless permissioned উভয় ধরনের হতে পারে ।

  • Private Permissionless Blockchain : এ ধরনের ব্লকচেইন প্রাইভেট নেটওয়ার্কে চললেও একই নেটওয়ার্কের যেকোনো হোস্ট কম্পিউটার অনুমতি ছাড়াই ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ করতে পারে । যেমন: আমরা চাইলে Ethereum ব্লচকচেইন সফটওয়্যার নিজের কম্পিউটারে ডাউনলোড করে ব্লকচেইন নোড শুরু করতে পারি । একই নেটওয়ার্কের অন্য একটি কম্পিউটার থেকে সেই নোডে কোন permission ছাড়াই কানেক্ট (connect) করা যাবে ।
  • Private Permissioned Blockchain: এ ধরনের ব্লকচেইনে একই নেটওয়ার্কের যেকোনো হোস্ট কম্পিউটার অনুমতি ছাড়াই ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ করতে পারে না । ব্লকচেইনে কানেক্ট (connect) হতে সেই হোস্ট কম্পিউটার যথোপযুক্ত অনুমতির দরকার হয় । এবং কেবলমাত্র নিবন্ধিত হোস্ট কম্পিউটারাই এ ধরনের ব্লকচেইনে অংশগ্রহণ করতে পারে । সাধারণত ডিজিটাল সার্টিফিকেট (Digital certificate) এর মাধ্যমে এ ধরনের নিবন্ধন করা হয়ে থাকে । Hyperledger Fabric, Quorom ব্লকচেইন সফ্টওয়্যার প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এ ধরনের ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক তেরী করা যায় ।

কনসোর্টিয়া ব্লকচেইন (Consortium Blockchain): কনসোর্টিয়াম ব্লকচেইন আংশিকভাবে প্রাইভেট ব্লকচেইন । প্রাইভেট ব্লকচেইন সাধারণত একটি সংস্থা (organization) এর জন্য হয়ে কিন্তু কনসোর্টিয়াম ব্লকচেইন একাধিক সংস্থা নিয়ে হতে পারে । যেমনঃ দুই বা ততোধিক ব্যাংক নিজেদের মাঝে লেনদেনের জন্য একটি কনসোর্টিয়াম ব্লকচেইন গঠন করতে পারে Hyperledger Fabric, Quorom দিয়ে এ ধরনের ব্লকচেইন গঠন করা যায় ।

বাংলাদেশে কোথায় ব্লকচেইন ব্যবহার করতে পারি?

উপরোক্ত আলোচনায় কয়েক প্রকারের ব্লকচেইন অবকাঠামোর উল্লেখ আছে। কিন্তু ই-গভর্নেন্স সেক্টরে পাবলিক ব্লকচেইন সিস্টেম ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রথমেই বাদ দেওয়া যায়। কারণ সরকারী ডেটা/তথ্য কোন পাবলিক সার্ভার/সিস্টেমে সংরক্ষণ করা আমাদের দেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বা আইসিটি আইন দ্বারা সিদ্ধ নয়। সুতরাং, এ নিবন্ধের পরবর্তী অংশে 'ব্লকচেইন' শব্দটির ব্যাখ্যা প্রাইভেট ব্লকচেইন হিসেবেই নিতে হবে।

বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্স সেক্টরে ব্লকচেইন ব্যাবহার করা যায় এমন ক্ষেত্র (use case) আছে । এখানে কিছু ক্ষেত্র (use case) নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলঃ-

রেলওয়ে টিকেট সিস্টেমঃ
বাংলাদেশে জনসাধারণের যোগাযোগের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও আরামদায়ক মাধ্যম হল রেলওয়ে পরিবহন । কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, অধিকাংশ সময়ই টিকেট পাওয়া অতটা সহজ নয়। আর বিশেষ উৎসবগুলোতে যেমনঃ ঈদ, দুর্গাপূজা ইত্যাদিতে ট্রেনের টিকেট পাওয়া প্রায় অসম্ভব বলা চলে । আর এসবের অন্যতম প্রধান কারন হল বিভিন্ন পর্যায়ে টিকেট বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব । যেমন,

  • অনলাইন টিকেটের ক্ষেত্রে যখন চাহিদা বেশি থাকে তখন দেখা গেল সার্ভার ডাউন (down) থাকে । কিছুক্ষণ পর যখন সার্ভার আপ (up) হয় তখন দেখা যায় অলনাইন টিকেটের কোটা (quota) বিক্রি হয়ে গেছে। এই আপ (up) ও ডাউন (down) এর মাঝামাঝি সময় টিকেটগুলো কোথায় বিক্রি হয় তা জনগণের কাছে একরকম প্রশ্ন থেকে যায়।
সুত্রঃ bangla.bdnews24.com
  • এরপর হল কাউন্টারে গিয়ে টিকেট কাটা । অনেক সময়ই দেখা যায় যে জনগণ আগের দিন রাত থেকে টিকেটের জন্য স্টেশনে রাত কাটায় পরদিন টিকেট পাবার আশায়। কিন্তু দেখা গেল যে টিকেট দেয়া শুরু হবার কিছু সময়ের মধ্যেই টিকেট শেষ হয়ে যায়। কাউন্টার থেকে বলা হয় টিকেট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আদৌ টিকেট শেষ হয়ে গেছে কিনা সেটা জনসাধারণের জানার কোন উপায় থাকে না।
সুত্রঃ প্রথম আলো
  • কাউন্টারে টিকেট পাওয়া না গেলেও ঠিকই কালবাজারে টিকেট পাওয়া যায় । শেষে কোন উপায় না দেখে জনগন বাধ্য হয়ে বেশি দামে কালাবাজার থেকে থেকে টিকেট কাটতে বাধ্য হয়। তাহলে টিকেট যদি কাউন্টারে না –ই থাকে তাহলে কালোবাজারে টিকেট এলো কিভাবে ? হতে পারে বাক্তিগত লাভের আশায় কাউন্টারের টিকেট কালোবাজারে বিক্রি করেছেন কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাক্তি।

উপরে উল্লেখিত সমস্যা গুলোর প্রতিটি সমস্যা আমরা ব্লকচেইনের সাহায্যে সমাধান করতে পারি । প্রতি টিকেট বুকিং এর তথ্য আমার ব্লকচেইনে রাখতে পারি এবং চলমান সময়ে(real time) বিভিন্নভাবে (ওয়েবসাইট, বড় ডিজিটাল পর্দা ইত্যাদি ) আমরা বিভিন্ন ট্রেনে বিদ্যমান অবিক্রিত টিকেটের সংখ্যা জনগণকে প্রদর্শন করতে পারি । যা জনসাধারণের মাঝে বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি করবে । যেহেতু আমরা এখানে ট্র্যাক করতে পারব কে কতটি টিকেট ক্রয় করেছে সেহেতু আমরা কালবাজারকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারব ।

জমি রেকর্ড (Land Record)
বর্তমান বিদ্যমান পদ্ধতিতে কোন জমি কেনা-বেচার সময় ক্রেতাকে ওই জমির আসল মালিক নিশ্চিত হতে অনেক কস্ট করতে হয় । এজন্য অনেক সময় ক্রেতারা দালালদের মাধ্যমে জমি কিনে প্রতারিত হয় । তাই জমি রেকর্ডে / রেজিস্ট্রেশনে ব্লকচেইন ব্যাবহার করা গেলে খুব সহজেই কোন জমির আসল ট্র্যাক করা সম্ভব হবে । যখনই কোন জমির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তখন ক্রেতা ও বিক্রেতার বিভিন্ন তথ্য, জমির খতিয়ান, মৈাজা, ম্যাপ প্রভুতি ব্লকচেইনে রাখা যেতে পারে । এই লেনদেনের হ্যাশ (transaction hash) নতুন ক্রেতাকে দিয়ে যেতে পারে যাতে পরবর্তীতে এই হ্যাশ দিয়ে খুব সহজেই জমির বর্তমান মালিককে ট্র্যাক করা যায় । যেহেতু সারা দেশের জমি রেকর্ড অফিসগুলো একটি ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে কানেক্টেড থাকবে তাই দেশের যেকোনো জমি রেকর্ড অফিস থেকে যেকোনো জমির তথ্য ট্র্যাক করাও সম্ভব হবে ।

সার্টিফিকেট নিবন্ধনঃ
শিক্ষাক্ষেত্রে ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ / শিক্ষাগত সার্টিফিকেটের জালিয়াতি প্রতিরোধ করবে । এটি পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি (ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন), বিসিসি (বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল) প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের চাকুরীর সার্টিফিকেট যাচাই করার জটিলতা হ্রাস করবে।সার্টিফিকেট ব্লকচেইন রিপোজিটরিতে সংরক্ষিত হবে। হার্ডকপি সার্টিফিকেটে রেফারেন্স হ্যাশ যোগ করা হবে (যেমন QR কোড)। স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন / ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে হ্যাশ যাচাই করা যাবে ।

হার্ডকপি সার্টিফিকেট সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র একটি রেফারেন্স হ্যাশ বা ইউনিক সংখ্যা (unique number) দেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থীরা এই রেফারেন্স নম্বরের দিয়ে চাকরি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য আবেদন করবে। কর্তৃপক্ষ ব্লকচেইন ভিত্তিক সিস্টেমে সার্টিফিকেট যাচাই করবে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট সত্যায়িত করার দরকার পরবে না ।

টেন্ডার /দরপত্রঃ
সরকারী অনেক কাজ দরপত্রের মাধ্যমে করা হয় । ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেন্ডার জালিয়াতি প্রতিরোধ ও চলমান দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে ।

নির্বাচন পদ্ধতিঃ
যেকোনো ধরনের নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্লকচেইনের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এটা সম্ভব ব্লকচেইনের বিকেন্দ্রিত (decentralized) ও ডিস্ট্রিবিউটেট প্রকৃতির কারনে । এ পদ্ধতিতে যখনি কোন ভোট কাস্ট (vote cast) হবে সাথে সাথে তার রেকর্ড সব প্রার্থীর কাছে চলে যাবে । আর অপরিবর্তনীয়তা(Immutability) বৈশিষ্ট্য এর কারনে সবাই ভোট কাস্ট (vote cast) দেখতে পেলেও কেউ তা পরিবর্তন করতে পারবে না । যদি কোথাও কোন জাল বা অবৈধ ভোট দেয় সেটাও ট্র্যাক করা সম্ভব । কারণ ব্লচকচেইনে সংরক্ষিত তথ্য কোনভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব না । সুতরাং জাল ভোট কে দিল সেটা বের করা সম্ভব। এ পদ্ধতির মাধ্যমে চলমান সময়ে (real time) এ ভোট গণনা করা যায় তাই খুব দ্রুত ফলাফল জানা সম্ভব । যেহেতু এটা permissioned private blockchain এ কাজ করবে তাই এটাতে হ্যাকিং এর সুযোগ নেই। যা সাধারণ যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে অধিক বেশি সুরক্ষা প্রদান করবে ।

উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলো ছাড়াও আরও অনেকভাবে আমরা ব্লকচেইন থেকে উপকার নিতে পারি । যেমনঃ কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, জন্ম, বিবাহ, এবং মৃত্যুর সার্টিফিকেট, সাপ্লাই চেইন (supply chain), Govt. procurement ইত্যাদি ।

ব্লকচেইন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা

ব্লকচেইন নিয়ে আমরা অনেকে অনেকভাবে ভেবে থাকি । অধিকাংশই বিটকয়েন এবং ব্লকচেইনকে এক জিনিস মনে করে ভুল করে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিটকয়েন ও ব্লকচেইন পুরোপুরি ভিন্ন জিনিস ।

ব্লচকচেইনের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে যার ফলে ডাটা নিরপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে — এরকম ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক । এটা মতেও সত্য নয় । তথ্য (data) উন্মুক্ত থাকবে কি থাকবে না তা নির্ভর করে ব্লকচেইনের ধরনের(type) উপর। অবশ্যই আমরা ডাটা –এর নিরাপত্তা বিবেচনা করেই ব্লকচেইনের ধরন(type) নির্বাচন করব ।

আবার কেউ কেউ ব্লকচেইনকে MySQL, MongoDB, Oracle এর মত ডাটাবেজ হিসেবে মনে করে । আসলে এ ধারনাটাও একেবারে ঠিক না। ব্লকচেইনে তথ্য নিজস্ব অভ্যন্তরীণ স্টোরেজে Encryption পদ্ধতির মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে । তাই স্বভাবতই তুলনামুলকভাবে ব্লচকচেইনে তথ্য (data) লেখা ও পড়া একটু হলেও ধীর গতি হবে । ব্লকচেইন কোন বিদ্যমান ডাটাবেজ সিস্টেমের বিকল্প নয় ।

কারো কারো মনে হয় যে, কিভাবে আমি আমার বিদ্যমান সিস্টেমকে ব্লকচেইন দিয়ে পরিবর্তন করব? আসলে আমার মতে বিদ্যমান সিস্টেমকে পুরোপুরিভাবে ব্লকচেইনে পরিবর্তন করার দরকার নেই । কারণ টা খুব সহজেই অনুমেয় । সেটা হচ্ছে ব্লচকচেইনে তথ্য (data) লেখা ও পড়া তুলনামুলকভাবে ধীর গতি সম্পন্ন । আমরা কিছু অংশে ব্লকচেইন ইন্টিগ্রেট করতে পারি যেখানে ব্লকচেইন প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ দরকার । তাছারা সিস্টমের বাকি অংশ আগের মত থাকবে ।

বাংলাদেশে ব্লকচেইনের বাস্তব প্রয়োগ

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেমনঃ ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, কোরিয়া তে ব্লকচেইনের ব্যাবহার ব্যাপকভাবে শুরু হলেও বাংলাদেশ সেদিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে বলা যায় । বাহরাইন, দুবাই, এস্তোনিয়া, জিব্রাল্টার, আমেরিকা (কিছু অংশ) প্রভুতি দেশের সরকার ইতোমধ্যে তাদের জাতীয় পর্যায়ে ব্লকচেইন নিয়ে কাজ করতেছে। প্রযুক্তি কোম্পানি গুলো যেমনঃ আইবিএম(IBM), গুগল (Google), মাইক্রোসফট ইত্যাদি তাদের নিজস্ব ব্লকচেইন প্রযুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে ।

আবারো উল্লেখ্য, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ও ই-গভর্নেন্স সেক্টরের বাস্তবতার নিরিখে প্রাইভেট ব্লকচেইন অবকাঠামো স্থাপন ছাড়া পাবলিক ব্লকচেইন ব্যবহারের সুযোগ নেই বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রাইভেট সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্লকচেইন নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে, কিন্তু ব্যাপকভাবে তা এখনও দৃশ্যমান নয়। সরকারি কোন অফিস/সংস্থায় এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে খুশির খবর হল, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (BCC) এলআইসিটি(LICT) প্রকল্পের অধীনস্থ ন্যাশনাল ডিজিটাল আর্কিটেকচার (NDA) টীম গত বছরখানেক ধরে ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর কাজ করে যাচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণে একটি ব্লকচেইন প্লাটফর্ম স্থাপন করা এবং এটিকে NDA ফ্রেমওয়ার্কের আওতাধীন জাতীয় ই-সার্ভিস বাস ভিত্তিক অবকাঠামোতে সংযুক্ত করা যাতে সরকারী সংস্থা গুলি তাদের ডেটা/তথ্যের নিরাপত্তার জন্য প্লাটফর্মটি সহজে ব্যবহার করতে পারে।

ইতোমধ্যে NDA টীম কর্তৃক বিসিসিতে একটি প্রাইভেট ব্লকচেইন অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে এবং পাইলট ভিত্তিতে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিসিসির অনলাইন নিয়োগ সিস্টেম (e-recruitment system) এর ডেটা/তথ্যের নিরাপত্তার জন্য ব্লকচেইন অবকাঠামোটি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রসঙ্গতঃ অনলাইন নিয়োগ সিস্টেমের (erecruitment.bcc.gov.bd) মাধ্যমে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যাবলী সহজে ও নিরাপদে করা যায়। বিভিন্ন সরকারী মন্ত্রণালয়/অফিস/সংস্থা/প্রকল্পে জনবল নিয়োগের কাজে সিস্টেমটি বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সিস্টেমের মাধ্যমে গত এক বছরে প্রায় ১৫টি সরকারী সংস্থার ৭০+সংখ্যক পোস্টে ৩০+টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ১,১০,০০০+ অনলাইন আবেদন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষার অংশ হিসেবে এ সিস্টেম থেকে ইলেকট্রনিক উপায়ে admit card আবেদনকারীর কাছে পাঠানো হয়। নিয়োগ পরীক্ষার সময় আবেদনকারী admit card টির একটি প্রিন্ট কপি নিয়ে আসে যা ম্যানুয়াল উপায়ে যাচাই-বাছাই করা হয়। এটি খুব ঝামেলাপূর্ণ এবং সবসময় সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করাও সম্ভব হয়না। অনেক সময় দেখা গেছে, admit card এ নাম/ছবি পরিবর্তন করে একজনের পরীক্ষা আরেকজন দেওয়ার চেষ্টা করে। এ ধরণের প্রতারণামূলক চর্চা বা জালিয়াতি প্রতিরোধ করার জন্য ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে আবেদনকারীকে পাঠানোর আগে admit card টি ব্লকচেইনে সংরক্ষণ করা হয় এবং ব্লকচেইন থেকে প্রাপ্ত হ্যাশ QR code এর মাধ্যমে admit card এ যুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর নিয়োগ পরীক্ষার সময় বিশেষায়িত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে admit card এর প্রিন্ট কপিটি স্ক্যান করলে সহজেই বোঝা যায় কোন তথ্য পরিবর্তন কর হয়েছে কিনা। অত্যন্ত আনন্দের সাথে দাবী করা যায় যে বাংলাদেশে সরকারী পর্যায়ে এটাই ব্লকচেইন প্রযুক্তির সর্বপ্রথম বাস্তব ও সফল প্রয়োগ!!

NDA টীম আরো বেশকিছু সরকারী অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম/সার্ভিসের সাথে ব্লকচেইন অন্তর্ভুক্তিকরণের বিষয়ে কাজ করছে। যে কোন সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ব্লকচেইন সম্পর্কিত যে কোন ধরনের বিষয়ে NDA টীমের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে এলআইসিটি প্রকল্পের সহযোগিতায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (BCC) এআই (AI) এবং ব্লকচেইনের উপর কর্মশালা (workshop) অনুষ্ঠিত হয় । সেখানে আইবিএম (IBM) এর প্রতিনিধিগণ Hyperledger Fabric Blockchain এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন । NDA টীম Hyperledger ভিত্তিক অবকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়েও চেষ্টা করছে। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন নিউজ/খবর, সর্বশেষ আপডেট প্রভৃতি জানতে NDA টীমের ফেসবুক পাতায় (facebook.com/bnea.bcc) চোখ রাখুন।

পরিশেষে, ব্লকচেইন অপেক্ষাকৃত নতুন ও একটু জটিল প্রযুক্তি । প্রযুক্তি যত নতুনই হোক তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। কেননা আজকাল সবাই আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারি যদিও আমরা অনেকেই জানি না মোবাইল ফোন কিভাবে কাজ করে বা মোবাইল ফোন অভ্যন্তরীণ গঠন কেমন । তেমনি ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে তা না জেনেও আমরা মোটামুটি সবাই ইমেইল ব্যবহার করতে পারি । তবে ব্লকচেইন ব্যাবহারের আগে আমাদের অবশ্যই সমস্যা নিয়ে উপযুক্ত বিশ্লেষণ (analysis) করে নেয়া দরকার যে ব্লকচেইন সেই সমস্যার সঠিক সমাধান কিনা ।

মতামত : nm2.lict@bcc.gov.bd

Md Shariful Islam

Written by

National Enterprise Architect | Certified Blockchain Solution Architect(CBSA) | Blockchain Enthusiastic | Linux Lover