ফ্রেটবোর্ডে নিঃশব্দ সুরের ঝংকারঃ নিলয় দাশ

এ বিশ্বচরাচর ছন্দ, তাল, লয় নিয়ে সুরে সুরে চললেও আমরা প্রায়ঃশই বেসুরো হয়ে পড়ি। আবার, আমাদের মাঝেই অনেকে থেকে যান যারা নিজের সুরলোকে বয়ে চলা সুমধুর স্বরের ধারা অন্যদের মাঝে বইয়ে দিয়ে এক লহরীতে সবাইকে ভাসিয়ে রাখার তাড়নায় নিমগ্ন থাকেন। এভাবে, সেই সুরতরঙ্গে এক অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরী করে জীবন বেয়েবেয়ে গতিময় চলে। আমার বয়ে বেড়ানো জীবনেও এমনই হঠাৎ করেই শব্দে নিঃশব্দে তাঁর আবির্ভাব। ঠিক স্বরে স্বরে একস্বর না হলেও, সে স্বরগুলো পরপর বসে বেসুরো লহরী তৈরী হতে পারে। তবু সেখানে ছন্দ, তাল, লয়ের ব্যঞ্জনা সদা তৈরী হচ্ছে বলেই আমার তরঙ্গময় অস্তিত্ব এখন কিছুটা হয়তো অনুভব করতে পারে। ছয়টি টানা তারের কম্পনে সৃষ্ট গীটারের ধ্বণি তার স্বরূপে ধারণ করে বিশ্বসঙ্গীতের যাবতীয় সব ঝংকার। সেই ঝংকার অনেকের হৃদয়কে কাঁপিয়ে সেই নিবিড়তায় আরো তরঙ্গিত হয়ে পৌঁছেছিল আমার স্নায়ুকোষ পর্যন্ত। আর ফ্রেটবোর্ডে নিঃশব্দে নিপুন হাতের ছোয়ায় সেখানে ক্রমাগত তৈরী হতে থাকে প্রকৃতি ও জীবনের অনন্য মূর্ছনা। সাত স্বর সেখানে সাত রঙ হয়ে ধরা দেয়। দৃশ্য আর শ্রব্যে নান্দনিকতার প্রাচুর্যে ভুবন হয়ে ওঠে সুদর্শন-সুশ্রব্য-সুবাসিত।

নিলয় কুমার দাশ, অনেক পরিচয়ের মাঝে একটি হলো তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীটারবাদকদের একজন। একাধারে গায়ক, সুরকার, সঙ্গীতপরিচালক ও সঙ্গীতশিক্ষক নিলয়’দা নামেই আমাদের কাছে অধিক পরিচিত। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম জ্যাজ, নিওক্ল্যাসিক্যাল, ব্লুজ রক, হার্ডরক, মেটাল মিউজিক চর্চা শুরু করেন। বরেণ্য সঙ্গীত শিল্পী ও নজরুল গবেষক সুধীন দাশ এবং বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ও শিক্ষক নীলিমা দাশের ঘর আরো সুরময় করতেই ১৯৬১ সালের ৩০-শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন নিলয় কুমার দাশ। ছোটবেলা থেকেই ঘরের গান-বাজনার সাথে পরিচিত হতে হতে নিলয়’দা পাশ্চাত্য ভাবধারার সঙ্গীত চেখে দেখতে গিয়ে গীটার শিখতে শুরু করেন। গান গাওয়ার সাথে গীটার বাজিয়ে আনন্দ পেতে পেতে তাঁর বাংলা সঙ্গীত ভুবনে প্রবেশ।

১৯৮৮ সালে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় নিলয় দাশের প্রথম একক অ্যালবাম কত যে খুঁজেছি তোমায় (সারগাম লেভেল — ১৬৫); এই অ্যালবামের গানগুলি ছিল গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা ও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা সুরকার ও সঙ্গীতপরিচালক ফিডব্যাক ব্যান্ডের দলনেতা ফুয়াদ নাসের বাবুর সুরারোপে করা কত যে খুঁজেছি তোমায় গানটি দিয়েই শুরু হয় অ্যালবাম। গানটির কয়েকটা লাইনঃ

সেই যে চলে গেলে
আর হায় এলেনা ফিরে
কত যে খুঁজেছি তোমায়
অকারণ অশ্রুজলে….’

‘৯০ এর দশকে তিনি ‘দ্য জেনমস’, এবং ‘ট্রিলজি’ নামের দুইটি ব্যান্ডের সাথে গিটার বাজিয়েছেন। সে সময়ে স্টারস নামে একটা মিক্সড অ্যালবামে তার গানও বের হয়েছিল। তার দ্বিতীয় অ্যালবামের নাম বিবাগী রাত, বের হয় ১৯৯০ সালে। তার অসম্পূর্ণ আঁধারে আগন্তুক অ্যালবামটি আজও অপ্রকাশিত। কত যে খুঁজেছি তোমায় এবং বিবাগী রাত এই দুটি সলো অ্যালবামের বাইরে বেশ কিছু মিক্সড অ্যালবামে গান করেছেন নিলয় দাশ। আইয়ুব বাচ্চুর সুরে তুমিহীনা সারাবেলা অ্যালবামের দুটি অসম্ভব চমৎকার গানে নিলয়’দা কন্ঠ দিয়েছেন। গানের কথাগুলো-

সেই রাত না যাওয়া ভোরে
আমি খোলা আকাশের নিচে
আলো আর আধারিতে কষ্ট গিয়েছি ভুলে
সেই রাত না যাওয়া ভোরে
পৃথিবীর যত যন্ত্রণা আছে
একদম যাই ভুলে, বেমালুম যাই ভুলে…’

এর বাইরে বাংলাদেশের সাতজন সেরা গীটারিস্ট নিয়ে মিক্সড টুগেদার অ্যালবামে ঢাকার কবিয়াল লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখায় গেয়েছেন লাশ কাটা ঘর শিরোনামের দুর্দান্ত একটি গান। আধুনিক ও ব্যান্ড মিক্সড কেউ সুখী নয় অ্যালবামে বৃষ্টি গানটি অনন্য সাধারণ একটি গান। আহমেদ ইউসুফ সাবেরের লেখা ও ফুয়াদ নাসের বাবুর সুরারোপে করা নিলয় দাশের সঙ্গীতায়োজনে যখনই নিবিড় করে শিরোনামে সংকলিত গানটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের তরুন-তরুনীদের মুখে মুখে ফেরে। বর্তমান সময়ের পপ ঘরানার শিল্পীদের কল্যাণে গানটি নতুন করে গাওয়া হলেও এর আবেদন এখনও কমেনি। গানের কথাগুলো-

যখনই নিবিড় করে পেতে চাই তোমাকে
তখনই দু’চোখ বুঁজি আমি
শয়নে স্বপনে দেখি শুধু তোমায়
বিরহ বরষায়, মেঘেরই ছায়ায়…’

এছাড়া প্রাইম অডিও-র প্রযোজনায় প্রকাশিত ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম দেখা হবে বন্ধু অ্যালবামে এইটুকু খোলা রেখো পথ অনেক শ্রোতারই অসম্ভব প্রিয় গানের একটি। অবহেলা শিরোনামে গান করেছেন আশিকুজ্জামান টুলুর সুরে বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম স্টারস-১ এ। শুধু তোমার জন্য মিক্সড অ্যালবামে ফাহমিদা নবীর সাথে মনে পড়ে গেল শিরোনামের একটি দ্বৈত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। কাছে আসার দিন ভালোবাসার দিন শিরোনামের একটি রোমান্টিক গানের সংকলনের কাজও তিনি করেছিলেন। ভালোবাসার দিন, তোমাকেই প্রয়োজন, ও তুমি মেয়ে শিরোনামের তিনটি গানে কণ্ঠ দেন তিনি। এবং কোন মিক্সড অ্যালবামে সর্বাধিক তিনটি গানে কণ্ঠ দেন একমাত্র এই অ্যালবামটিতেই।

দলছুট ব্যান্ডের গিটারিস্ট ও ভোকাল বাপ্পা মজুমদার, ব্যান্ড দল বাংলা’র বুনো, ওয়ারফেজের কমল ও রাসেল অর্থহীনের সুমন, আর্কের মুন, পঞ্চমই শুধু নয় আরো অনেক জনপ্রিয় গিটারিস্টের গিটার শেখার পিছনে নিলয়’দার উৎসাহ ও সহযোগিতা রয়েছে। বিশেষত, ফ্ল্যামেংকো এবং মেটাল এই দুই ভিন্ন ধারার সঙ্গীতায়োজনকে এদেশে তিনিই প্রথম জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘৮০-র দশকের শুরু থেকেই ঢাকার আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলোতে ইংরেজি গানের শো করতেন নিয়মিত। জনপ্রিয় কান্ট্রি, জ্যাজ, ব্লুজ, রকএন্ডরোল ছাড়াও এরিক ক্লাপ্টন, ডায়ার স্ট্রেইটসহ সমসাময়িক অনেক বিদেশী গান বাজিয়ে-গেয়ে শোনাতেন হোটেলে বলরুমের শ্রোতাদের। আর নিজেদের করা বাংলা গানের সাথে থাকতো গীটারের হৃদয় দোলানো প্রত্যুতপন্ন তান। তাঁর হাত ধরেই রকস্টার্টা, ইন ঢাকা, এইসেস প্রভৃতি ব্যান্ডদলগুলি হোটেলে বাজিয়ে বাজিয়ে তখন বেশ জনপ্রিয়তা পায়। দুইদশকেরও বেশী সময় ধরে বাংলাদেশে প্রগ্রেসিভ মেটাল গান করা ব্যান্ড ওয়ারফেজ সব সময় বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের পিছনে নিলয় দাশের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে আসছে। নিলয়’দার ধ্যান ও জ্ঞান ছিল গীটার নিয়েই। যেখানে যা পেয়েছেন তা দিয়েই শেখার চেষ্টা করেছেন আর তা উজাড়ও করে দিয়েছেন অপর গীটারপ্রেমীদের জন্য। তাঁর কল্যাণে গীটারে হাতেখড়ি হয়েছে এমন গানপ্রেমী খুঁজলেও তা নিতান্ত কম হবে না। তাঁর সংগ্রহ করা গানের ক্যাসেট, সিডি, বই এমনকি গীটার হারিয়ে যাওয়া মানে তা অন্য কাউকে সমৃদ্ধ করছে বলেই তাঁর খেয়াল। সাইন্সল্যাবের পার্শ্বে রেইনবো নামের গানের দোকানটি থেকে গানের সিডি অথবা মেলোডি থেকে গীটার, গীটারের তার এমনকি গীটার বাজানোর পিক পর্যন্ত এখনও যে কেউ নিলয়দা’র কথা বলে ‘দাদা নিতে বলছে’ বলে হাসিমুখে পটিয়ে নিয়ে চলে আসতে পারে। নিলয়’দা গীটার বাজানোকে ঢাকা শহরের তারুণ্যে যেভাবে ছড়াতে পেরেছেন, তার ফলশ্রুতিতে আমাদের ব্যান্ড সঙ্গীত এখন বহুমাত্রিকতা পেয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ড হেভী মেটাল থেকে শুরু করে, প্রগ্রেসিভ রক, ব্লুজ, জ্যাজ, কান্ট্রি, ফোক, এমনকি আমাদের লোকসংগীত ও বাউলগান করতে গিয়েও ব্যান্ড গঠন হচ্ছে, গীটার বাজছে সব ধরণের গানের সাথে। পরিণত হতে চলেছে বাংলা ব্যান্ডের গান।

আবার এলো যে সন্ধ্যা গানের সাথে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে কিংবদন্তী হওয়া আরেকজন প্রথিতযশা গায়ক ও সঙ্গীতজ্ঞ হ্যাপি আকন্দের মৃত্যুতে নিলয় দাশের গাওয়া হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই বাংলা আধুনিক সঙ্গীতে এক কিংবদন্তী এলিজি। এই গানের কথাগুলো এখনও সুর তুলে যায় নিলয় আর হ্যাপীর যুগলবন্দী সময়ের সঙ্গীত ভুবনে।

হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই
একটা গীটার তোলে ঝঙ্কার
পিয়ানোটা বেজে উঠে
তোর সেই নিপুণ হাতে
হ্যাপী তোকে মনে পড়লেই
‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’
মনে পড়ে যায় মাঝরাতে …..’

হ্যাপী আকন্দ আর নিলয়’দার যুগলবন্দী ছিল বাংলা আধুনিক বা ব্যান্ডের গানের জগতে একটা স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিষ্ঠান। বাংলা ব্যান্ড তার স্ব-মহিমায় টিকে থেকে স্বকীয় ঢঙে সব ধরণের শ্রোতার মনে স্থান করতে পারলেই সেই অপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান পুর্ণতা পাবে। গজল সঙ্গীতের বিশ্বনন্দিত শিল্পী গোলাম আলীর সাথে গিটার বাজিয়েও নিলয় দাশ মুগ্ধ করেছিলেন দর্শকশ্রোতাকে। বাবা-মা’র অবাধ্য নিলয়’দা জীবন শেষ করেছেন মিরপুরে বাবা-মা’র ঘরেই। যদিও তাঁর সংসার ছিল ফ্রেটবোর্ডে নিঃশব্দ সুরের পরিচলনে। ২০০৬ সালের ১১ই জানুয়ারী ঢাকার সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে হৃদযন্ত্রে ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ক্ষণজন্মা সঙ্গীতশিল্পী ও বাংলাদেশের গীটারবাদকের স্বপ্ন নিলয়’দা পরলোকগমন করেন।

নিলয়দা’র কয়েকটি গানের লিংকঃ

# যদি ভাবো ফিরে আমায় — http://www.youtube.com/watch?v=XWCUSz7rqsA

# যখনই নিবিড় করে — http://www.youtube.com/watch?v=0mz_4radaq8

# কত যে খুঁজেছি তোমায় — http://www.youtube.com/watch?v=MO1s4eZB7iM

# হ্যাপী তোকে মনে পড়লে — http://www.youtube.com/watch?v=VKFv5oGC87Y

# ফিরে দেখ আমাকে — https://soundcloud.com/odvut-shei-cheleti/firey-dekho-amak

# এ শহর ডুবে যায় — https://soundcloud.com/niaz-aungshu/niloy-das

# লাশ কাটা ঘর — https://soundcloud.com/shibli4/lash-kata-ghar-niloy-das?in=arif-zaman-kishor%2Fsets%2Fbangla-band-80s-90s

# হৃদয়ে যত ব্যাথা — https://soundcloud.com/omi-rahman-pial/jibone-joto-betha-niloy-das?in=ali-imam-5%2Fsets%2Fniloy-das

# নিলয়দা’র কথা — http://www.youtube.com/watch?v=xbbk2uA02k8

তথ্যসুত্রঃ

১।http://archive.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=253792

২।http://www.sachalayatan.com/node/40517

৩।http://online-dhaka.com/newsarchive/ni/11615/

৪।http://www.ebanglamusic.com/banglamusic/476

৫http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%AF%E0%A6%BC_%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B6

৬।https://www.facebook.com/notes/mukhlesur-rahman-sajal/%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%AF%E0%A7%87-%E0%A6%9A%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%B2%E0%A7%9F-%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%83-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%85%E0%A6%A7%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A7%A7/10151523740801866