সব পাখি ঘরে ফিরেঃ ঘর ছেড়ে ঘরে ফেরার বাস্ত দর্শন_ অরিন্দম চক্রবর্তীর কিছু কথা প্রসঙ্গে…

ALL BIRDS FLY BACK HOME:
 HOME & THE DOOR IN PHILOSOPHY OF ARCHITECTURE

 
 বক্তা হলেন অরিন্দম চক্রবর্তী। আজ (১৪ অক্টোবর, ২০১৫) ছায়ানটে হয়ে গেল এই লেকচার বেঙ্গলের আয়োজনে।

লেকচারটা শুরুই করলেন বেশ মজা করে। কথায় আছে, ঘরের কথা বলতে নেই কিন্তু ঘরের কথা বলতেই এই আয়োজন! দারুন দারুন বাংলা বাক্যে বিমোহিত করে কুপোকাত করে ফেললেন! সেগুলো গুলে খেয়ে ফেলেছি, মনে নেই কিচ্ছু!!

পোস্টারে থাকা ছবিটার ব্যাখ্যা দিয়েই শুরু করলেন যতটা মনে পড়ে। পার্বতি আসছে মা-বাবার বাড়ি সিংহের পিঠে চড়ে সামনে ওবিসিটিতে আক্রান্ত ছেলে গণেশ-কে বসিয়ে পাশে জীর্ণ দশায় আসছেন শিব। তো এমন শব্দ প্রয়োগে তার হিউমার আরো আগ্রহ জোটায় বাকি কথা শুনতে। বছরে এই একবার গৃহে ফেরা… এখান থেকেই ঘর, বাসা, নীড় করে কত কি হয়ে গেল!!

অমর পালের একটা গান দিয়ে শুরু হলো বক্তব্য, সেই গানে ভবনের আভাস রয়েছে কি চমৎকার করে!

‘ঘর’ এর নানা সমার্থক শব্দের কথা বলতে বলতে ‘আকার’ শব্দে চলে এলেন। ঘরহীন ঘটনাটা ‘নিরাকার’। সেটা যে সম্ভব না তেমন নয়, কিন্তু দর্শনগত দিক থেকে আলাদা। বুদ্ধের যেমন অনুসারী ছিলেন অনাকারিক ধর্মপাল। মানে তাদের ধারণাই হলো ঘর ভেঙ্গে থাকা। ঘরের কোন অবস্থান তাদের দর্শনে নেই। আবার একেবারেও যে নেই তা নয়। মানে ‘অধাত্মবাদ’-কে সব সময় আমরা ‘বিষয়’ থেকে আলাদা ভাবতে অভ্যস্ত তাই যত মুশকিলটা হয়। আমাদের দেহ-ঘর যেমন ক’দিনের; এই গৃহও ঠিক তেমনি ক’দিনের। এই দর্শন ছিলো মূলত সক্রেটিসের। তাই গৃহ-কে যদি একটি যন্ত্র হিশেবে বিবেচনা করা হয় তবেই সেই ক’দিনের আবাসের কাছাকাছি একটা নাগাল পাওয়া সম্ভব। যেটাকে প্রখ্যাত স্থপতি করবুসিয়ার বলেছেন dwelling machine, efficient machine। সেক্ষেত্রে কোনো গৃহ যন্ত্র হিশেবে ভালো ফাংশন করবে, কোনটা নয়। কী করে ভালো ফাংশন করানো সম্ভব সেটাই স্থপতির লক্ষ্য।

দেহ যেমন খাঁচা তেমনি খাঁচা এই গৃহ। ঘর বানানো , বাঁধা- এ জাতীয় কথার মাঝেই বন্ধনটা খুব স্পষ্ট। বক্তার মতে একটি বাসা’র ১১টি লক্ষণ থাকে। মানে এই এই কারণগুলি থাকলে তাকে বাসা বলা যায় আর কি। সেগুলো হলো-

১. পরিবেশের প্রতিকুল অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে স্থান তাই বাসা। এক্ষেত্রে তাঁর একটি কথা খুব মনে ধরেছে। যেই মাত্র মানুষ রোদ ঠেকাতে কপালের উপরে হাত দিলেন তখন থেকেই আসলে স্থাপত্যের শুরু!

২. ‘আমার’ ঘর। এইখানে ‘আমার’ ঘটনাটা মুখ্য। কারণ তা স্থানের উপরে মালিকানা নিশ্চিত করে। 
 
‘বিঘে দুই
 ছিল মূল ভুঁই’

 
 অহমতা বা মম অনুভূতি যেখানে তীব্র অর্থাৎ I, mine- চেতনা! 
 
 ৩. পারমানেন্ট এড্রেস একটা বড় ব্যাপার। যেকোনো কাজেই লাগে। সেই জায়গাটা থাকা চাই তাই, সেই ঠিকানা। সুকান্তের চিঠি কবিতার কটা লাইন ফটাফট বলে ফেললেন!! 
 
 ৪. ‘আমার’ সম্পত্তি সংরক্ষণের স্থান। ‘আমার’ কেনা যা কিছু, দলিলপত্র যেখানে সুরক্ষিত, সংরক্ষিত। এটাকে তিনি accusative home বা instrumental home বলে তিনি সংজ্ঞায়িত করেছেন।
 
 ৫. এই পয়েন্ট থেকে একটু abstract লক্ষণ শুরু হবে। ঐতিহ্য, অতীত পরম্পরার সাথে সম্পর্কিত আবার ভবিষ্যতের কথাও যা বলে এমন একটি স্থানের কথা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর মতে ভবিষ্যতে যেতে হলে বস্তুত আমাদের অতীতে যেতে হবে কিন্তু with a twist! সেটাই হয়েছিল রেনেসাঁ বিপ্লবে। 
 
 ৬. বিশ্রাম ও রমণের স্থান। বিশ্রাম বা ঘুম বাসা’র একটা অন্যতম ফাংশন। কারণ মৃত মানুষের বাসা’র দরকার পড়েনা। ফলে মানুষকে ঘুমাতে হয় তারপরে তার জাগরণ সম্ভব। তাই বাসাকে home as a repair shop এমন আইডিয়ার জায়গা থেকেও ভেবেছেন আইরিশ ইয়াং। আর প্রেম হাত ধরাধরি বাইরে সম্ভব হলেও রমণের জন্য মানুষকে enclosure এর মাঝে আসতেই হয়। সভ্যতার লক্ষণ বলে কথা।
 
 ৭. আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা, শীতে উষ্ণতা আনা। মোট কথা রান্নাঘরকে heart চিন্তা করে বানানো স্থান।
 
 ৮. স্নানাগার, শৌচালয় ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দৈনন্দিন কাজ করা যায় এমন স্থান।
 
 ৯. নিভৃত একটি জায়গা যেখানে আবরণ খুলে নিজের শারীরিক এক্সপ্রেমেন্ট করা সম্ভব, নিজেকে বিনির্মাণ করা সম্ভব। আত্ম-বিশ্লেষণ এবং কল্পনার জন্য আদর্শ স্থান। 
 
 ১০. সামাজিক মানুষের অসামাজিকতার স্থান অর্থাৎ পলায়নের স্থান।

______________________________________________________
 
এই কতগুলো পয়েন্টের কথা বলে বক্তা ১১ নম্বর পয়েন্ট বলতে সময় নিলেন। আমি ভেবেছিলাম বুঝিবা ভুলে গেছেন! কিন্তু কেন বেশ ভূমিকা করে এই পয়েন্ট উল্লেখ করলেন সেটা ১১ নম্বর পয়েন্ট শুনেই বোঝা যায়। বাসা বাড়ির কিছু সমস্যা আলাপ করেন তিনি এ সময়ে। সেগুলো ভাবুক করিয়ে দেয়।

  • শিশু, নারী এবং কৃতদাস এরাই হলো সবচেয়ে private এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি deprived. বাসা তাই abuse করার একটা জায়গায় রূপান্তরিত হয়েছে।
     
     * home sweet home থেকে Om sweet Om এর বিবর্তন নিয়েও মজা করলেন তিনি। 
     
     * বাসা oppression আর পুরুষতন্ত্র চর্চার অন্যতম প্রাচীন সংগঠন। মা, স্ত্রী, কন্যা, দাসপ্রথা এসবের মধ্য দিয়ে রানাবান্না সেবা যত্ন এই জাতীয় কাজের মাঝে লিঙ্গিয় বৈষম্য এখনো টিকিয়ে রেখেছে বাসা। আজ অবধি কোন best home making এওয়ার্ড নেই জগতে। 
     
     * বাসা হলো প্রাচীন গোড়ামির অন্যতম এক্টিভ স্থান।
     
     এ পর্যন্ত কতগুলো ঋণাত্মক দিক বলে বক্তা বাসা’র দর্শনে চলে আসেন। যে বাসা ছাড়েনি সে নাকি এখনো মানুষ হয়নি! তাই locative home এর ধারণা তিনি বাতিল করেছেন আর বলছেন,
‘’home is a place that we left!’’

পুরাই অপাদান কারক। মজার বিষয় হলো, বাসা তৈরি হওয়ারও এটাই নাকি আসল লক্ষণ! 
 
 জীবনানন্দ দাশ যেরকম বনলতা সেনের চোখ-কে তুলনা করেছেন পাখির নীড়ের সাথে সেটা কিন্তু এই গৃহত্যাগী চেতনা থেকেই! বাংলায় রূপকের অলংকরণের মাঝে এটা অন্যতম। 
 
“পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন”;

যেরকম রাম-কে চলে যেতে দেখার প্রক্রিয়ায় সে যখন দৃষ্টির বাইরে চলে যায় তখন তাঁর পিতা জানাচ্ছেন, তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন কারণ তাঁর দৃষ্টি রামের সাথে চলে গেছে। এরকমই ঘর ছাড়ার ঘরের কথা বোঝাতে চেয়েছেন বক্তা। 
 
 আবারো বাসার সমালোচনা করে বললেন, কলোনিয়াল বৃটিশ বুর্জোয়া চেতনায় যেমন কয়েকজন-কে বাসা ছাড়া না করলে কয়েকজনের বাসা হয়না।
 
 ‘আমার’ বাসা, ‘আমার’ এলাকা, ‘আমার’ টেরিটরি কি করে ফিক্স হয় তা নিয়ে একটা মজার গল্প বললেন। এক আমেরিকান লোকের বিশাল জমি জায়গা। জমির এক কোণে ছোট একটা বাড়ি। এক পাগল শাবল নিয়ে এসে সেই জমিতে চাষ করতে নিলে জমির মালিক ভদ্রলোক এসে বলেন,
 — আপনি এখানে চাষ করছেন কেন?
 — আপনি বলার কে?
 — আমি এই জমির মালিক!
 — কি করে হলেন?
 — আমার বাবা দিয়েছে আমাকে!
 — তাকে কে দিলো?
 — তার বাবা!
 — তাকে?
 — তিনি রেড ইন্ডিয়ান্দের সাথে যুদ্ধ করে পেয়েছেন।
 — বেশ তো! আমার কাছে শাবল আছে আমিও যুদ্ধ করবো এই জমির জন্য!!
 
 অর্থাৎ যেখানে আমার দৈহিক শ্রম মিশে আছে সেটাই আমার জায়গা, সেই জায়গার উপরে আমার অধিকার আছে। তাহলে কে খাটলো? আমি খাটলাম। আমার কে খাটলো? আমার দেহ খাটলো। আমার দেহ কার!!! শরীরের সাথে আমার যে সম্পর্ক আমার ঘরের সাথেই ঠিক ঐ একই সম্পর্কের replication। 
 
 এখন কথা হলো ‘আমি’ আর ‘আমার শরীর’ কি এক? এক হলে আর ‘আমার’ শরীর বলা চলেনা। আলাদা হলে আমার শরীর বলা সম্ভব। আমি আর আমার শরীর একও নই আবার আলাদাও নই তাহলে আমি আর আমার ঘরের সম্পর্কের মাঝে একটা দার্শনিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার সমাধানের আগ অবধি ঘর-কে সঙ্গায়িত করা বেশ কঠিন আছে বলতে হয়। এইটুক বলে বক্তা ১১তম পয়েন্টে এলেন বাসা’র লক্ষণের।

১১. যে স্থানের দ্বার খুলে আমি সবাইকে আমন্ত্রণ করতে পারি সেটাই আমার বাসা। এই সকলের মাঝে প্রাণী জগত থেকে শুরু করে ঋতু পর্যন্ত বিরাজমান। যার কাছে এই অতিথি ঈশ্বর তিনি-ই প্রকৃত গৃহবাসী। রবীন্দ্রনাথ-কে না মনে করে উপায় কি!

‘ওরে গৃহবাসী খোল্‌, দ্বার খোল্‌, লাগল যে দোল।
 স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।
 দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌॥
 রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে,
 রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে,
 নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।
 দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌॥
 বেণুবন মর্মরে দখিন বাতাসে,
 প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে।
 মউমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা,
 পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা,
 মাধবীবিতানে বায়ু গন্ধে বিভোল।
 দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌॥’

ইহজাগতিক চিন্তায় আসলেই ঘর-কে না ছেড়ে তাকে ঘর বলা সম্ভব নয়। আমরা যে ঘরে রোজ ফেরত আসি তা হলো এক ইলিউশনের মতন। সেই চিন্তায় আমরা সকলেই গৃহহীন। কিন্তু এইখানে আমার ঘর ছিলো ভেবে সেই নস্টালজিয়ার সুখ সাথে করে অতীতে ফিরে ভবিষ্যতকে আরো নিকটবর্তী করার ঘটনাটাই হলো ঘরে ফেরার আসল মজাটা। বক্তার পূর্বপুরুষ যেমন কুমিল্লার আর আজ এত বছর বাদে আগামীকাল তিনি সেখানেই যাবেন।
 
 Charles Tomilson এর একটি কবিতাও নিজে অনুবাদ করে বললেন। আমি ইংরেজিটা তুলে দিলাম-
 
 The Door 
 ________
 
 Too little 
 has been said
 of the door, its one 
 face turned to the night’s
 downpour and its other
 to the shift and glisten of firelight.
 
 Air clasped
 by this cover
 into the room’s book
 is filled by the turning
 pages of dark and fire
 as the wind shoulders the panels, or unsteadies that burning.
 
 Not only
 the storm’s
 breakwater, but sudden
 frontier to our concurrences, appearances, 
 and as the full of the offer of space 
 as the view through a cromlech is.
 
 For doors
 are both frame and monument
 to our spent time,
 and too little 
 has been said 
 of our coming through and leaving by them.
 
 এভাবেই ঘর ভেঙ্গে ঘর করা সম্ভব। ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় দেখাচ্ছেন ভাঙ্গা চালের ভেতর দিয়ে তারাভরা আকাশ আর একই সাথে চলছে গান,
 
‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাংল ঝড়ে’
 
 আবার বুদ্ধ ঘর ভেঙ্গেছেন নির্বাণ প্রাপ্তির মাধ্যমে। জন্ম জন্মান্তরের ফাঁদের এই স্থপতি-কে তিনি ধরে ফেলেছেন। তিনি বলছেন,

হে স্থপতি তোমার ঘরের ছাদ ফেটেছে, আমি এখন বে-ঘর, বে-আমি!

অতুল প্রসাদের গান শুনিয়ে আলোচনায় ইতি টানেন অরিন্দম চক্রবর্তী নামের এই দারুন মানুষটি।

‘আবার তুই বাঁধবি বাসা কোন সাহসে?
 আশা কি আছে বাকি হৃদয়-কোষে।
 কতবার গডলি রে ঘর,
 কতবার এল রে ঝড়,
 কতবার ঘরের বাঁধন পড়ল খ’সে
 বাহিরের মুক্ত মাঠে
 যেন তোর জীবন কাটে।
 কেন তুই ক্ষুদ্রে বাটে থাকবি ব’সে,
 সবারে কর রে আপন,
 হ রে তুই সবার আপন;
 ভুলে যা দুখের দাহন
 ডুব দিয়ে গান-সুধার রসে।’

One clap, two clap, three clap, forty?

By clapping more or less, you can signal to us which stories really stand out.