সীরাতে খাতোমুল আম্বিয়া

সীরাতে খাতোমুল আম্বিয়া

ربنا تقبل منّا إنّك انت السميع العليم

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ পরিচিতি

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বংশ গোটা বিশ্বের সবচেয়ে বম্ভ্রন্ত ও পবিত্র বংশ। আর এটি ওই বিষয় যা মক্কার সকল কাফির এবং তাঁর শত্রুরাও অস্বীকার করতে পারেনি। হযরত আবু সুফিয়ান (রা.) কাফির থাকা অবস্থায় রোম সম্রাটের সামনে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। অথচ তিনি সে সময় চেয়েছিলেন যে, যদি কোনো সুযোগ পাওয়া যায় তাহলে নবীজির উপর কোনো দোষ আরোপ করবেন।

পিতার দিক থেকে নবীজির বংশধারা

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম ইবনে আবদে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে বিলাব ইবনে মুররাহ ইবনে কা’ব ইবনে লুয়াই ইবনে গালেব ইবনে ফিহর ইবনে মালেক ইবনুল নযর ইবনে কিনান ইবনে খুযাইমাহ ইবনে মুদরিক ইবনে ইলিয়াস ইবনে মুযার ইবনে নিযার ইবনে মা’আদ ইবনে আদনান।

মাতার দিক থেকে নবীজির বংশধারা

মুহাম্মাদ ইবনে আমেনা বিনতে ওয়াহাব ইবনে আবদে মানাফ ইবনে যুহরা ইবনে কিলাব।

এ দ্বারা বুঝা গেল যে, কিলাব ইবনে মুররাহ’য় এসে নবীজির পিতা ও মাতা উভয়ের বংশধারা একত্রিত হয়ে যায়।

ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বে নবীজির বরকত প্রকাশ

সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বোক্ষণে যেভাবে সবহে সাদিকের দিগন্ত বিস্তৃত আলোকরশ্মি ও তৎপরবর্তী রক্তিমআভা বিশ্বজগতকে সূর্যোদয়ের সময় ঘনিয়ে এল তখন পৃথিবীর দিগ-দিগন্তে এমন সব ঘটনা প্রকাশিত হতে লাগল, যা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনী বর্তার সংবাদ দিচ্ছিল। যেগুলোকে মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের পরিভাষায় ‘ইরহাসাত’ বা অপেক্ষমাণ নিদর্শন বলা হয়।

নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মাতিন মাতার বর্ণনা যে, যখন নবীজি তাঁর গর্ভে আসলেন তখন তাঁকে স্বপ্নে সুসংবাদ দেওয়া হলো যে, তোমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে সে এই উম্মতের সর্দার। যখন সে ভূমিষ্ঠ হবে তখন তুমি এভাবে দুআ করবে, “আমি একে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করছি। “ আর এর নাম রাখবে, ‘মুহাম্মাদ’। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

তিনি আরো বলেন, নবীজি আমার গর্ভে আসার পর আমি একটি নূর দেখতে পেয়েছি। যা দ্বার বসরা শহর ও সিরিয়ার প্রাসাগুলো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ।

তিনি আরো বলেন, আমি কোনো নারীকে মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা অধিক আরামদায়ক ও সহজ গর্ভ ধারণ করতে আর দেখিনি। অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় নারীদের যে, মাথা ঘুরানো, বমিভাব অথবা অলসতা ইত্যাদি দেখা দেয়, আমি সেসব কিছুরই সম্মুখীন হইনি। এ ছাড়া আরো বহু ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল, এই সংক্ষিপ্ত পুস্তিকায় যা উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ জন্ম

এব্যপারে অধিকাংশ আলেম একমত যে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় জন্ম ওই বছরের রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল, যে বছর ‘আসহাবে ফীল’ তথা [আবরাহা বাদশার] হস্তিবাহিনী বাইতুল্লাহ শরীফে আক্রমণ করে। আর মহান আল্লাহ আবাবীল তথা একঝাঁক ক্ষুদ্র পাখি দ্বারা তাদের ধ্বংস করে দেন। যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কুরআন মাজীদেও উল্লেখ রয়েছে। আর বস্তুত ‘আসহবে ফীল’ তথা হস্তি বাহিনীর ঘটনাটিও ছিল নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ জন্মের বরকতসমূহের ভূমিকা। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মস্থান ওই ঘৃহে হয়েছিল, পরবর্তীতে যেটি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ভাই মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফের হাতে এসেছিল।

কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন যে, ‘আসহাবে ফীল’-এর ঘটনাটি ঘটেছিল ৫৭১ খ্রীস্টাব্দের ২০ শে এপ্রিল। যা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মের ৫৭১ বছর পর হয়েছিল।

[পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস]

হাদীসে শাস্ত্রের ইমাম আল্লামা ইবনে আসাকির (রহ.) পৃথিবীর ইতিহাস এভাবে তুলে ধরেছেন-

হযরত আদম (আ.) ও নূহ (আ.)-এর মাঝে ব্যবধান ছিল ১২০০ বছর। হযরত নূহ (আ.) হতে হযরত ইববাহীম (আ.) পর্যন্ত ব্যবধান ছিল ১১৪২ বছর। হযরত ইবরাহীম (আ.) হতে হযরত মূসা (আ.) পর্যন্ত ব্যবধান ছিল ৫৬৫ বছর। হযরত মূসা (আ.) হতে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত ব্যবধান ছিল ১৩৫৬ বছর। আর হযরত ঈসা (আ.) হতে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত ব্যবধান ছিল ৬০০ বছর।

এই হিসেবে হযরত আদাম (আ.) হতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত রাসূলে মাকবূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যকার ব্যবধান হলো, ৫০৩২ বছর। আর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী হযরত আদম (আ.) বয়স পেয়েছিলেন ৯৬০ বছর। অতএব, আদম (আ.) এর পৃথিবীতে আগমনের প্রায় ছয় হাজার বছর পর অর্থাৎ সপ্তম সহস্রাব্দে সর্বশেষ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুভাগমন করেন। (তারিখে ইবনে আসাকির [মুহাম্মাদ ইবনে ইসকাক উদ্ধৃত] : ১ খণ্ড, পৃ : ১৯-২০)

সারকথা, যে বছর ‘আসহাবে ফীল’-এর [কাবা গৃহে] আক্রমণ হয় সে বছরের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার দিনটি ছিল পৃথিবীর জীবনে এক অনন্য দিন। কারণ আজই জগৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য, দিবা-রাত্রির বিবর্তনের মূখ্য উদ্দেশ্য, হযরত আদম ও আদম-সন্তানের গর্ব, হযরত মূহের কিশতী হেফাযতের রহস্য, হযরত ইবরাহীমের দুআ এবং হযরত মূসা ও হযরত ঈসার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যায়ন, আকায়ে-নমাদার হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্বকে আলোকিত করেন।

এদিকে পৃথিবীতে দেবালয়ে নবুওয়াতের সূর্য আত্মপ্রকাশ করতে লাগল আর ওদিকে পারস্য সম্রাটের রাজ প্রাসাদে ভূমিকম্প হতে লাগল। যার ফলে প্রাসাদের চৌদ্দটি গম্বুজ ভেঙ্গে পড়ল। পারস্যের শ্বেত-উপসাগর হটাৎ করেই শুকিয়ে গেল। পারস্যের অগ্নিকুণ্ডের আগুন যা এক হাজার বছরে কখনও নির্বাপিত হয়নি, সেটাও আপনা-আপনিই শীতল হয়ে গেল। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ৫)

আর এটা বস্তুত অগ্নিপূজা এবং অন্য সকল গোমরাহী ো পথভ্রষ্টাতার পরিসমাপ্তির ঘোষণা এবং পরস্য ও রোম সাম্রাজ্যের পতনের প্রতি ইঙ্গিত।

সহীহ হাদীসসমূহে এসেছে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের সময় তাঁর সম্মানিত মাতার পেট হতে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয়েছিল, যার আলোতে উদয়াচল ও অস্তাচল আলোকিত হয়ে গিয়েছিল।

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন তিনি নিজের উভয় হাতের উপর ভর দেওয়া অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর তিনি একমুষ্টি মাটি হাতে নিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। (মাওয়াহিবে লাদুনিয়্যাহ)

নবীজির সম্মানিত পিতার ইন্তেকাল

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখনও ভূমিষ্ঠ হননি। ইতোমধ্যেই তাঁর সম্মানিত পিতা আব্দুল্লাহকে তাঁর পিতা আব্দুল মুত্তালিব [নবীজির দাদা] পবিত্র মদীনা হতে কিছু খেজুর নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। আব্দুল্লাহ নবীজিকে গর্ভাবস্থায় রেখেই মদীনায় চলে গেলেন। ঘটনাক্রমে সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায়। এভাবে জন্মের পূর্বেই পিতার [স্নেহের] ছায়া তাঁর মাথার উপর থেকে উঠে গেল। (মোগলতাঈ)

দুগ্ধপান ও শৈশবকাল

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবার আগে তাঁর সম্মানিত মাতা [আমেনা] দুখ পান করান। অতঃপর আল্লাহ প্রদত্ত এই মহা নিয়ামত হালীমা সা’দিয়ার ভাগ্যে জোটে। (সীরাতে মোগলতাঈ)

আরবের অভিজাত পরিবারগুলোর সাধারণ নিয়ম ছিল যে, দুধ পান করানোর জন্য তারা তাদের নবজাতককে আশ-পাশের পল্লী এলাকগুলেতে পাঠিয়ে দিত। এতে [পল্লী অঞ্চলের আবহাওয়ায়] বাচ্চাদের শারীরিক সুস্থতাও ভালো হয়ে যেত এবং বিশুদ্ধ আরবী ভাষাও তারা শিখে যেত। আর এ উদ্দেশ্যেই গ্রাম্য মহিলারা অধিকাংশই দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা সংগ্রহের জন্য শহরে আসত।

হযরত হালীমা সা’দিয়ার নিজের বর্ণনা যে, আমি তায়েফ হতে বনূ সা’আদ গোত্রের মহিলাদের সাথে দুগ্ধপোষ্য বাচ্চার অনুসন্ধানে মক্কায় দিকে রওয়ানা হই। সে বছর দুর্ভিক্ষ ছিল। আমার কোলে একটি সন্তান ছিল। কিন্তু [অভাব-অনাটনের কারণে] আমার স্তনে এতটুকু দুধ ছিল না, যা ওই বাচ্চার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। রাতভর বাচ্চাটি [দুধের জন্য] ছটফট করত আর আমরা এর জন্য বসে বসে রাত কাটাতাম। আমাদের কাছে একটি উষ্ট্রীও ছিল; কিন্তু সেটারও দুধ ছিল না।

যে বড়-কানবিশিস্ট উষ্ট্রীর উপর চড়ে আমরা মক্কায় রওয়ানা হলাম সেটিও এত দুর্বল ছিল যে, অন্যদের সাথে সমান তালে চলতে পারছিল না। এতে আমার সফর সঙ্গীরাও বিরক্তবোধ করছিল। আবশেষে বেশ কষ্টে সফর শেষ করে আমরা মক্কায় এসে পৌঁছলাম। আমরা লক্ষ্য করলাম, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখে যখন কোনো মহিলা শোনত যে, তিনি ইয়াতীম, তখন কেউ তাকে গ্রহণ করছিল না। [কারণ ইয়াতীম হবার কারণে তার পক্ষ থেকে বেশি পুরষ্কার পাওয়ার আশা ছিল না। ] এ দিকে হালীমার ভাগ্যের তারকা চমকাচ্ছিল। তাঁর দুধের স্বল্পতা তাঁর জন্য রহমতে পরিণত হয়ে গেল। কারণ দুধের স্বল্পতা দেখে কেউ তাকে নিজেদের বাচ্চা দিতে সম্মত হলো না।

হালীমা বলেন, আমি আমার স্বামীকে বললাম, শূন্য হাতে ফেরত যাব এটা আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না। তাই শূন্য হাতে যাওয়ার চেয়ে এটাই উত্তম হবে যে, আমরা এই ইয়াতীম শিশুটিকেই নিয়ে যাই। স্বামী সম্মত হলেন এবং তাঁরা সেই ইয়াতীম রত্নটিকে নিয়ে আসলেন, যার দ্বারা কেবল হালীম ও আমেনার গৃহ নয়; বরং গোটা বিশ্ব আলোকিত হবার ছিল। মহান আল্লাহর অনুগ্রহে হালীমার ভাগ্য খুলে গেল এবং সৃষ্টিজগতের সর্দার সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কোলে এসে গেল। শিশু মুহাম্মাদকে তাঁবুতে নিয়ে এসে দুধ পান করতে বসতেই বরকতসমূহ প্রকাশ পেতে শুরু করল। হালীমার স্তনে এত পরিমাণ দুধ নেমে আসল যে, নবীজি নিজে এবং তাঁর দুধভাই উভয়ে মিলে অত্যন্ত পরিতৃপ্তির সাথে দুধ পান করলেন এবং আরামের সাথে ঘুমিয়ে পড়লেন। এদিকে উষ্ট্রীর দিকে তাকিয়ে দেখেলেন, এর স্তন দুধে পারিপূর্ণ রয়েছে। হালীমা বলেন, আমার স্বামী এর দুধ দোহন করে আনলেন। আমরা সবাই তৃপ্তি সহকারে পান করলাম এবং পুরো রাত আরামের সাথে কাটালাম। দীর্ঘদিন পর এটাই ছিল প্রথম রজনী, যাতে আমরা আরাম ও প্রশান্তির সাথে মনভরে ঘুমাতে পেরেছিলাম।

এখন তো আমার স্বামীও বলতে লাগলেন, হালীমা! তুমি তো বড়ই বরকতময় শিশু নিয়ে এসেছ। আমি বললাম, আমারও এই ধারণা যে, সে অত্যন্ত মুবারক শিশু। এরপর আমরা মক্কা হতে রওয়ানা হলাম। আমি তাকেঁ [নবীজিকে] কোলে নিয়ে ঐ বড় কানবিশিষ্ট উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করলাম। কিন্তু তখনই আমি মহান আল্লাহর কুদরতের এই লীলা প্রত্যক্ষ করলাম যে, এখন সেই দুর্বল উষ্ট্রীটি এতই দ্রুতবেগে চলতে শুরু করল যে, অন্য কারো সওয়ারী এর নিকট পর্যন্ত পৌঁছতেই সক্ষম হচ্ছে না! আমার সহযাত্রী মহিলারা বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগল, এটা কি তোমার সেই উষ্ট্রী যেটাতে চড়ে তুমি এসেছিলে!

ফলকথা, পথ শেষ হলো। আমরা বাড়ি পৌঁছে গেলাম। সেখানে তখন চরম দুভিক্ষ বিরাজ করছিল। দুধের সবগুলো পশু ছিল দুগ্ধশূন্য। কিন্তু আমি ঘরে প্রবেশ করতেই আমার বকরীগুলোর স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এখন থেকে প্রতিদিন আমার বকরীগুলোর স্তন দুধে টইটম্বুর হয়ে আসত আর অন্যরা তাদের পশুগুলো হতে এক ফোঁটা দুধও সংগ্রহ করতে পারছিল না। আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাখালদের বলে দিল, তোমরাও নিজেদের পশুগুলোকে ঐ চারণভূমিতে নিয়ে যাবে, হালীমার বকরীগুলো যেখানে ঘাস খায়। কিন্তু বাস্তবে তো সেখানে চারণভূমি ও ঘাস-পাতার কোন বিশেষত্ব ছিল না। বরং কোনো এক অমূল্য রত্নের খাতিরেই এসব হচ্ছিল, হালীমা ছাড়া অন্যরা তা পেত কোত্থেকে? তাই একই স্থানে চরানোর পরেও তাদের পশুগুলো দুগ্ধশূন্যই থাকত। আর আমার বকরীগুলো দুধে টইটম্বুর হয়ে ফিরত। এভাবে আমরা অনবরত নবীজির বরকতসমূহ প্রতক্ষ করতে থাকলাম। এমন করে দু’বছর কেটে গেল আর আমি নবীজির দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলাম। (আস্ সালিহাত)

নবীজির যবানের প্রথম কথা

হযরত হালীমার বর্ণনা যে, যে সময় আমি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুধ ছাড়ালাম তখন তাঁর পবিত্র যবান হতে এ কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে-

اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ حَمْدًا كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا.

এ বাক্যগুলোই ছিল নবীজির যবান হতে উচ্চারিত প্রথম কথা। (ইমাম বায়হাকী হযরত ইবনে আব্বাস এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন খাসায়িসে কুবরা : প্রথম খণ্ড, পৃ: ৫৫)

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৈহিক ক্রম-বিকাশ অন্যান্য শিশুদের তুলনায় উন্নত ছিল। দু’বছর বয়সেই তাঁকে বেশ বড়সড় দেখাচ্ছিল। এবার আমরা নিয়ম অনুযায়ী নবীজিকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। কিন্তু তাঁর বরকতসমূহের কারণে তাঁকে ছেড়ে আসতে মন চাচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে ঐ বছর মক্কায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ছিল। এ অজুহাতে আমরা পুনরায় নবীজিকে সাথে নিয়ে এলাম। তিনি আমাদের সাথে থাকতে লাগলেন। তিনি ঘরের বাইরে যেতেন এবং ছেলেদের খেলতে দেখতেন; কিন্তু আলাদা থাকতেন, নিজে খেলায় অংশ গ্রহণ করতেন না।

একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার অপর ভাইটিকে সারাদিন দেখতে পাই না, সে কোথায় থাকে? আমি বললাম, সে বকরী চরাতে যায়। তিনি বললেন, আমাকেও তার সাথে পাঠিয়ে দিবেন। এরপর থেকে তিনি তাঁর দুধভাই [আব্দুল্লাহ] এর সাথে বকরী চরাতে যেতেন। (খাসাইস : ১ম খণ্ড, পৃ: ৫৫)

একবার তারা উভয়ে পশুদের মাঝে বিচরণ করছিলেন। হটাৎ আব্দুল্লাহ দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে এসে পৌঁছল এবং তার পিতাকে বলল, সাদা পোশাকধারী দুজন লোক আমার কুরাইশী ভাইকে ধরে মাটিতে শুয়িয়ে তার পেট চিরে ফেলেছে। আমি তাঁকে এ অবস্থায়ই ছেড়ে এসেছি। আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয় মিলে ভীত-শংঙ্কিত হয়ে মাঠের দিকে দৌড়ালাম। মাঠে গিয়ে আমরা দেখতে পেলাম, তিনি বসে রয়েছেন। কিন্তু ভয়ে চেহারা বিবর্ণ হয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে বেটা? কিন্তু তিনি বললেন, সাদা পোশাকধারী দুজন লোক এসে আমাকে ধরে মাটিতে শুয়িয়ে দিলেন এবং আমার পেট চিরে এর মধ্য হতে কি যন খুঁজে বের করলেন। আমি জানি না সেটা কি? আমরা তাঁকে ঘরে নিয়ে আসলাম। (সীরাতে ইবনে হিশাম-হাশিয় যাদুল মাআদ, পৃ : ৮০, আল গায়া, পৃ : ৮৯)। অতঃপর আমরা তাঁকে এক গণকের কাছে নিয়ে গেলাম। গণক তাঁকে দেখতেই নিজ আসন হতে উঠে দাঁড়াল এবং তাঁকে নিজের বুকের উপর উঠিয়ে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, “হে আরববাসীগণ! কোথায় তোমরা? দ্রুত এসো। যে বিপদ অচিরেই তোমাদের উপর আসন্ন, সেটাকে প্রতিহত কর। যার উপায় এই যে, তোমরা এই শিশুটিকে হত্যা কর আর এর সাথে আমাকেও হত্যা কর। আর যদি তোমরা একে [জীবিত] ছেড়ে দাও, তবে স্মরণ রেখো, সে তোমাদের দ্বীনকে নিশ্চিহ্ন করে দিবে এবং তোমাদেরকে এমন এক দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দিবে যার কথা তোমরা আজ পর্যন্ত কখনও শোননি। “

গণকের কথা শুনে হালীমা ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠলেন এবং নবীজিকে ঐ হতভাগার হাত হতে ছিনিয়ে এনে বললেন, “তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ, আগে তো তোমার নিজের মস্তিষ্কের চিকিৎসা করানো উচিত। “হালীমা নবীজিকে নিয়ে ঘরে ফিরে এলেন। কিন্তু এই দ্বিতীয় ঘটনাটি নবীজিকে তাঁর সম্মানিত মায়ের কাছে তুলে দিতে হালীমাকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করল। কেননা তিনি নবীজির যথাযথ নিরাপত্তা দিতে পারছিলেন না। (মাওলানা আল-জামী রচিত ‘শাওয়াহিদুন নবুওয়্যাহ’ ও খাসাইসে কুবরা : ১ম খণ্ড, পৃ : ৫৫)

যখন হালীমা নবীজিকে তাঁর শ্রদ্ধেয়া মাতার নিকট সোপর্দ করলেন তখন তিনি হালিমাকে প্রশ্ন করলেন, এত আগ্রহের সাথে নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এত শীঘ্র ফিরিয়ে নিয়ে আসার কারণ কি? অনেক পীড়াপীড়ির পর হালীমাকে পুরো ঘটনা খুলে বলতে হয়েছে। মা আমেনা শুনে বললেন, নিশ্চয় আমার ছেলের এক বিশেষ মহিমা রয়েছে। অতঃপর তিনি গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন সময়কার বিস্ময়কর ঘটনাবলী শুনালেন। (ইবনে হিশাম, পৃ : ৯)

নবীজির সম্মানিত মাতার ইন্তেকাল

যখন নবীজির বয়স চার কিংবা ছয় বছর তখন মদীনা হতে ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে তাঁর মাতও দুনিয়া হতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন। (মোগলতাঈ, পৃ : ১০)

বল্যকাল। বয়স ছয় বছরের। পিতৃছায়া তো আগেই উঠে গিয়েছিল। মাতৃস্নেহের আশ্রয়েরও এবার পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু এই ইয়াতীম শিশুটি যে রহমতের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হওয়ার প্রতীক্ষায়, তিনি তো এসব সহায়-সম্বলের মুখাপেক্ষী নন।

[দাদা] আব্দুল মুত্তালিবের ইন্তেকাল

পিতা-মাতার পর নবীজি তাঁর পিতামহ বা দাদা আব্দুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহর এটা দেখানো উদ্দেশ্য ছিল যে, এ বলক শুধু রহমতের ক্রোড়েই প্রতিপালিত হবে। সকল কার্য-কারণের আসল নিয়ামক [মহান আল্লাহ] নিজেই তাঁর লালন-পালনের জিম্মাদার হয়েছেন। যখন নবীজির বয়স আট বছর দুই মাস দশদিন পূর্ণ হলো, তখন দাদা আব্দুল মুত্তালিবও দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে গেলেন।

নবীজির সিরিয়া সফর

দাদার ইন্তেকালের পর আপন চাচা আবু তালেব নবীজির অভিভবকত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি তার স্নেহ-ছায়ায় বাস করতে থাকেন। এভাবে যখন নবীজির বয়স বার বছর দুই মাস দশদিন পূর্ণ হলো, তখন আবু তালেব ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফর করার ইচ্ছা করলেন। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে ‘তাইমা’ নামক স্থানে তিনি যাত্রা বিরতি করলেন।

নবীজি সম্পর্কে এক ইহুদী বড় পণ্ডিতের ভবিষ্যদ্বাণী

তিনি যখন ‘তাইমা’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন ঘটনাচক্রে একদিনি বুহায়রা রাহেব নামক এক ইহুদী বড় পণ্ডিত তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নবীজিকে দেখে আবু তালেবকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সাথে যে ছেলেটি রয়েছে সে কে? আবু তালেব বললেন, ছেলেটি আমার ভাতিজা। বুহায়রা বললেন, আপনি কি তাঁর প্রতি স্নেহ পোষণ করেন এবং তাঁকে রক্ষা করতে চান? আবু তালেব বললেন, অবশ্যই। এ কথা শুনে বুহায়রা আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, যদি আপনি এ ছেলেটিকে সিরিয়া নিয়ে যান, তাহলে ইহুদীরা তাকেঁ হত্যা করে ফেলবে। কারণ ইনি হলেন, আল্লাহর [শেষ] নবী, যিনি ইহুদী ধর্মকে রহিত করে দিবেন। আমি তাঁর গুণাবলী স্বীয় আসমানী গ্রন্থে দেখতে পাচ্ছি।

ফায়দা : বুহায়রা রাহেব যেহেতু তাওরাতের পণ্ডিত আলেম ছিলেন আর তাওরাতে নবীজির আকার-অবয়বের পূর্ণ বিবরণ উল্লেখ ছিল, তাই নবীজিকে দেখে তিনি চিনে ফেলেছিলেন যে, এই বালকই সেই শেষ নবী, যিনি তাওরাতকে রহিত করবেন এবং ইহুদী ধর্মযাজকদের রাজত্বের অবসান ঘটাবেন। বুহায়রার কথা শুনে আবু তালেবের মনে শঙ্কা সৃষ্টি হয় এবং নিনি নবীজিকে মক্কায় ফেরত পাঠিয়ে দেন। (মোগলতাঈ, পৃ : ১০)

ব্যবসার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়বার সিরিয়া সফর

সে সময় পবিত্র মক্কায় হযরত খাদীজা ছিলেন একজন বিত্তবান নারী। ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্না। যেসব দরিদ্র লোককে তিনি বুদ্ধিমান ও বিশ্বস্ত বলে মনে করতেন, তাদের হাতে নিজের বাণিজ্য-সম্ভার তুলে দিয়ে বলতেন,এগুলো অমুক স্থানে নিয়ে বিক্রয় করে এসো। তোমাদেরকেও এত পরিমাণ লভ্যাংশ প্রদান করা হবে।

যদিও তখন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের বিকাশ ঘটেছিল না; তথাপি গোটা মক্কাবাসীর মাঝে তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততার সুনাম ছিল। প্রত্যেকের কাছেই তাঁর পছন্দনীয় ও পূত-পবিত্র চরিত্রের মূল্যায়ন ছিল। তিনি ‘আল-আমীন’ তথা অতি বিশ্বাসী’ উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আর এই সুখ্যাতি ও মহত্বের কথা খাদীজার নিকটও গোপন ছিল না। তাই তিনি তাঁর ব্যবসার দায়িত্বভার নবীজির উপর অর্পন করে তাঁর বিশ্বস্ততা দ্বারা উপকৃত হতে চাইলেন।

তিনি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রস্তাব পাঠালেন যে, আপনি যদি আমার ব্যবসার পণ্য সিরিয়ায় নিয়ে যান তাহলে আমি আপনার দেখমতের জন্য আমার একটি গোলামকে আপনার সাথে দিয়ে দিব এবং অন্যান্য লোকদের যে লভ্যাংশ দেওয়া হয় তদপেক্ষা অধিক আপনার দেখমতে দিব। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সত্তা যেহেতু এক উচ্চ সাহসী ও প্রশস্ত চিন্তার অধিকারী ছিল তাই সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই সুদূর সফরের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান এবং হযরত খাদীজার গোলাম মাইসারাকে সাথে নিয়ে ১৬ জিলহজ তারিখে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সিরিয় গিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে অধিক লাভে এই পণ্য বিক্রি করেন এবং সেখান থেকে অন্যান্য পণ্য সমগ্রী ক্রয় করে ফিরে আসেন। পবিত্র মক্কায় এসে সিরিয়া হতে আনা পণ্য সমগ্রী হযরত খাদীজার হাতে সোপর্দ করেন। হযরত খাদীজা সেগুলো এখানে বিক্রি করে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করেন।

সিরিয়ার পথে যখন নবীজি এক স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন ‘নাসতূর’ নামক এক ধর্মযাজক তাঁকে দেখতে গেল। সর্বশেষ নবীর যেসব লক্ষণ পূর্ববর্তী আসমানী গ্রহ্নসমূহে বর্ণিত ছিল হুবহু তা নবীজির মধ্যে দেখতে পেয়ে তাঁকে চিনে ফেলল। ঐ ধর্মযাজক মাইসারাকে আগ থেকেই চিনত। তাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার সাথের এ লোকটি কে? সে বলল, পবিত্র মক্কার অধিবাসী কুরাইশ বংশীয় এক সম্ভ্রান্ত যুবক। সে বলল, এই যুবক ভবিষ্যতে নবী হবেন। (মোগলতাঈ, পৃ : ১১)

হযর খাদীজার সাথে বিবাহ

হযরত খাদীজা ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতী নারী। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আভিজাত্য ও বিস্ময়কর চরিত্র-মাধুর্য দেখে তাঁর প্রতি হযরত খাদীজার অন্তরে এক সত্যিকার বিশ্বাস ও অকৃত্রিম ভালোবাসা জন্ম নেয়। ফলে তিনি নিজেই মনস্থ করেন যে, যদি নবীজি সম্মত হন তাহলে তিনি তাঁর সাথেই বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবেন। যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স ২১ বছর পূর্ণ হলো তখন হযরত খাদীজা (রা.) এর সাথে তাঁর বিবাহ নির্ধারিত হলো। সে সময় হযরত খাদীজা (রা.) এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। আর কোনো কোনো বর্ণনা মতে পঁয়তাল্লিশ বছর।

বিবাহ অনুষ্ঠানে আবু তালেব এবং বনু হাশেম ও মুযার গোত্রের সকল নেতৃবর্গ সমবেত হন। আবু তালেব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন। এ খুতবায় আবু তালেব নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যেসব শব্দগুলো ব্যবহার করেন তা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যার অর্থ নিম্নরূপ :

“ইনি হলেন, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। যিনি ধন-সম্পদের দিক থেকে গরীব হলেও মহান চরিত্র ও অনুপম গুনাবলীর দরুণ যাকেই তাঁর সাথে তুলনা করা হবে, তিনি তার চাইতে অধিক শ্রেষ্ঠ ও উন্নত প্রমাণিত হবেন। কেননা ধন-সম্পদ হলো এক বিলীয়মান ছায়া ও প্রত্যাবর্তনশীল বস্তু বিশেষ। আর এই মুহাম্মাদ [সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] যার আত্মীয়তার সম্পর্কের খবর আপনাদের সবারই জানা, তিনি খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বিবাহ করতে যাচ্ছেন। তাঁর নগদ ও বাকী সমুদয় আমার সম্পদ হতে পরিশোধ করা হবে। আর আল্লাহর শপথ! এরপর তিনি বিপুল সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হবেন”।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে আবু তালেবের এই মন্তব্য সে সময়কার যখন তাঁর বয়স একুশ বছর। আর বাহ্যতঃ তিনি তখনও নবুওয়াত প্রাপ্ত হননি। তদুপরি অধিকতর বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, আবু তালেব তখনও নিজের সেই প্রাচীন ধর্ম-বিশ্বাসের উপর অটল-অবিচল ছিলেন, যা বিলুপ্ত করার জন্য নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোটা জীবন উৎসর্গিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে, সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায় না।

মোটকথা, হযরত খাদীজার সাথে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল। তিনি চব্বিশ বৎসর নবীজির খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। কিছু কাল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে এবং কিছু কাল ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পরে।

হযরত খাদীজার গর্ভ হতে নবীজির সন্তানাদি

হযরত খাদীজা (রা.) এর গর্ভ হতে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুজন পুত্র সন্তান এবং চারজন কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। পুত্র দুজন হলেন, হযরত কাসেম ও তাহের (রা.)। কাসেম (রা.) এর নামনুসারেই তাঁর ‘আবুল কাসেম’ ডাকনাম প্রসিদ্ধ। আর তাহের (রা.) এর ব্যাপারে এ কথাও বলা হয় যে তাঁর নাম ছিল আব্দুল্লাহ।

কন্যা চারজন হলেন, হযরত ফাতেমা, যয়নব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম। সন্তানদের মধ্যে হযরত যয়নব (রা.) ছিলেন সবার বড়।

এ সকল সন্তান ছিলেন হযরত খাদীজা (রা.) এর গর্ভ হতে। অবশ্য তাঁর তৃতীয় পুত্র, যার নাম ছিল ইবরাহীম (রা.)। তিনিই শুধু মারিয়া কিবতিয়া (রা.) এর গর্ভ হতে জন্ম লাভ করেছিলেন। নবীজির তিনজন পুত্র সন্তানই বাল্য বয়সে ইন্তেকাল করেন। তবে হযরত কাসেম সম্পর্কে কোন কোন বর্ণনা হতে জানা যায়, তিনি এতটুকু বড় হয়েছিলেন যে, সওয়ারীতে আরোহণ করতে পারতেন। (মোগলতাঈ)

নবীজির চারজন কন্যা

উম্মতের সর্বসম্মত মতানুসারে নবীজির সকল কন্যার মধ্যে হযরত ফাতেমা (রা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠা। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, “ফাতিমা জান্নাতী নারীগণের সর্দার”। পনের বছর সাড়ে পাঁচ মাস বয়সে হযরত আলীর (রা.) এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের মহরানা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৮০ দিরহাম। যা প্রায় ১৫০ তোলা রূপার সমান। আর এই রমণীকুল সর্দার ফাতেমার বিবাহের উপঢৌকন কি ছিল! একটি চাদর, একটি বালিশ যাতে খেজুর গাছের ছাল ভরা ছিল, একটি চামড়ার গাদি, একটি দড়ির চৌকি, চামড়ার তৈরি একটি পানির পাত্র, দুটি মটির কলস, দুটি মশক ও একটি আটার চাক্কি। (তাবাকাতে ইবনে সা’দ ও অন্যান্য)

চাক্কি পেষাসহ ঘরের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি নিজ হাতেই সম্পন্ন করতেন। এই হলো দুজাহানের সর্দার [নবীজির] সর্বাধিক আদরের দুলালীর বিবাহ, তাঁর উপঢৌকন ও মহর। আর এই হলো তাঁর দরিদ্রপীড়িত জীবনের চিত্র। এটা দেখেও কি সেসব নারীরা লজ্জাবোধ করবে না, যারা বিবাহ-শাদীর রসম-রেওয়াজে নিজেদের দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টাকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেয়?

এর মধ্যে মহান আল্লাহর বিরাট কোনো রহস্য লুকায়িত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুত্র সন্তানদের মধ্যে কেউ জীবিত থাকেননি। শুধু কন্যা সন্তানগণের মাধ্যমে দুনিয়াতে তাঁর বংশ বিস্তার করে। কিন্তু কন্যাগণের মধ্যেও কেবল হযরত ফাতেমা (রা.) এর সন্তানগণই জীবিত ছিলেন। অন্যান্য কন্যাদের মধ্যে কারোও কারোও কোনো সন্তানই জন্মায়নি আর কারোও কারোও সন্তান জীবিত থাকেনি।

হযরত যয়নব (রা.) এর বিবাহ হয়েছিল আবুল আ’স ইবনুল রবী’ এর সাথে। তাঁদের একটি পুত্র সন্তান জন্ম নিয়ে অল্প বয়সেই মৃত্যু বরণ করে। আর তাঁদের একটি কন্যা সন্তানও জন্ম গ্রহণ করে। তার নাম ছিল উমামাহ। হযরত ফাতেমা (রা.) এর ইন্তেকালের পর হযরত আলী (রা.) তাঁকে বিবাহ করেন। কিন্তু তাঁর থেকে কোনো সন্তান জন্ম লাভ করেনি।

হযরত রুকাইয়া (রা.) হযরত উসমান (রা.) এর সাথ বিবাহে আবদ্ধ হন এবং হাবশায় হিজরতের সময় তিনি হযরত উসমানের সাথে থাকেন। দ্বিতীয় হিজরীতে বদর যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তৃতীয় হিজরীতে তাঁর অপর এক বোন হযরত উম্মে কুলসুমকেও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উসমান (রা.) এর সাথে বিবাহ দেন। আর এ কারণেই হযরত উসমান (রা.) এর ‘যিন নূরাইন’ বা ‘দুই নূরের অধিকারী’ উপাধি লাভ হয়। নবম হিযরীতে উম্মে কুলসুমেরও ইন্তেকাল হয়। তখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, আমার যদি তৃতীয় কোনো মেয়ে থাকত তাহলে তাকেও উসামানের সাথে বিবাহ দিতাম। (সীরাতে মোগলতাঈ,পৃ : ১৬-১৭)

নারীদের জন্য স্মরণীয় বিষয় :

সীরাতের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে এসেছে যে, একবার হযরত রুকাইয়া (রা.) হযরত উসমান (রা.) এর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট অভিযোগ করতে আসেন। তখন নবীজি বললেন, “এটা আমার পছন্দ নয় যে, স্ত্রী নিজ স্বামীর ব্যাপারে অভিযোগ-নালিশ করবে। যাও! নিজ ঘরে ফিরে যাও”। এটাই হলো মেয়েদের জন্য ঐ আদর্শ শিক্ষা, যা দ্বারা তাদের ইহ-জীবন ও পর-জীবন উভয়ই সুগঠিত হতে পারে। (ইবনুল ফারেস রচিত ‘আওজাযুস সিয়ার’)

নবীজির অন্যান্য পূত-পবিত্র স্ত্রীগণ

হযরত খাদীজা (রা.) এর জীবদ্দশায় নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কোনো নারীকে বিবাহ করেননি। হিজরতের তিন বছর পূর্বে যখন তাঁর ইন্তেকাল হয়ে যায় এবং নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স উনপঞ্চাশ বছরে উপনীত হয়, তখন আর কয়েকজন মহিলা নবীজির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যাদের সম্মনিত নামসমূহ নিম্নরূপ :

(১) হযরত সাওদা বিনতে যামআহ (রা.)। (২) হযরত আয়েশা (রা.)। (৩) হযরত হাফসা (রা.)। (৪) হযরত যয়নব বিনতে খুযাইমাহ (রা.)। (৫) হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)। (৬) হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)। (৭) হযরত জুওয়াইরিয়া (রা.)। (৮) হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)। (৯) হযরত সাফিয়্যাহ (রা.)। (১০) হযরত মায়মূনাহ (রা.)। [হযরত খাদীজা (রা.) সহ] সর্বমোট এগারজন স্ত্রী। যাদের মধ্য হতে দুজন স্ত্রী নবীজির জীবদ্দশায়ই ইন্তেকাল করেন। আর নয়জন স্ত্রী নবীজির ইন্তেকালের সময় জীবিত ছিলেন। আর এটা শুধুই নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য ছিল বলে উম্মতের ঐক্যমত রয়েছে। উম্মতের মধ্যে হতে কারোও জন্য একই সময়ে চারজনের অধিক স্ত্রী রাখা বৈধ নয়। উপরন্ত নবীজির এই বৈশিষ্টের কিছু তাৎপর্য সামনে আসবে।

হযরত সাওদা (রা.)

তিনি প্রথমে সাকরান ইবনে আমরের স্ত্রী ছিলেন। অতঃপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।

হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)

তিনি হযরত আবু বকর (রা.) এর কন্যা। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যখন তাঁর বিবহা হয় তখন বয়স ছিল ছয় বছর এবং প্রথম হিজরীতে নয় বছর বয়সে নবীজির ঘরে আসেন। আর যখন নবীজি ইন্তেকাল হয় তখন তাঁর বয়স ছিল আঠারো বছর। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এই নয় বছরের সাহচর্য হযরত আয়েশার উপর কেমন প্রভাব ফেলেছিল এবং তাঁর কি অর্জিত হয়েছিল এর অনুমান এ থেকে করা যায় যে, বড় বড় সাহাবাগণ বলতেন, কোন বিষয়ে আমাদের যখন সন্দেহ হতো, তখন আমরা হযরত আয়েশা সিদ্দীকার নিকট গিয়ে এর সমাধান পেতাম। এ কারণেই বড় বড় বিখ্যাত সাহাবা হযরত আয়েশার শিষ্য।

হযরত হাফসা (রা)

তিনি ছিলেন হযরত ওমর (রা.) এর কন্যা। প্রথমে তিনি হযরত উনাইস ইবনে হুযাইফার বিবাহে আবদ্ধ ছিলেন। তারপর হিজরতের দ্বিতীয় আথবা তৃতীয় বছর নবীজির সাথে তাঁর বিবাহ হয়। (মোগলতাঈ, পৃ: ৪৮)

হযরত যয়নব বিনতে খুযাইমাহ হেলালিয়া (রা.)

তিনি ‘উম্মুল মাসাকীন’ বা ‘মিসকীনদের জননী’ নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রথমে তোফায়েল ইবনে হারেসের বিবাহে আবদ্ধ ছিলেন। তোফায়েল তাঁকে তালাক দিলে দ্বিতীয় পর্যায়ে তার ভাই উবায়দার সাথে বিবাহ হয়। যখন তিনিও বদর যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান, তখন তৃতীয় হিজরীতে উহুদ যুদ্ধের এক মাস পূর্বে তিনি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহে আবদ্ধ হন। (মোগলতাঈ, পৃ: ৪৯)

আর তিনি মাত্র দুই মাস নবীজির বিবাহে থেকে ইন্তেকাল করেন। (নশরুত তীব)

হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)

তিনি হযরত আবু সুফিয়ানের কন্যা। প্রথমে তিনি উবায়দুল্লাহ ইবনে জাহাশের বিবাহে ছিলেন এবং উবায়দুল্লাহর ঔরসে তাঁর একাধিক সন্তানও হয়েছিল। তারা উভয়ে মুসলমান হয়ে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে গিয়ে উবায়দুল্লাহ খ্রীস্টান হয়ে যায় আর উম্মে হাবীবা নিজ ঈমানের উপর অনঢ় থাকেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাবশার বাদশা নাজ্জাশীর নিকট এ মর্মে চিঠি লিখে পাঠান যে, তিনি যেন নবীজির পক্ষ হতে উম্মে হাবীবার নিকট বিবাহের প্রস্তাব দেন। সে অনুযায়ী নাজ্জাসী বিবাহের প্রস্তব দেন এবং নিজেই বিবাহের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর নিজেই বিবাহের মহরানা হিসেবে চারশত দীনার আদায় করে দেন।

হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)

তাঁর নাম হিন্দা। প্রথমে তিনি আবু সালামাহ এর বিবাহে ছিলেন এবং ঐ ঔরসে তাঁর একাধিক সন্তানও হয়েছিল। চতুর্থ হিজরীর জুমাদাস সানী, মতান্তরে তৃতীয় হিজরীতে তিনি নবীজির সাথে বিবাহে আবদ্ধ হন। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ: ৫৫)

কথিত আছে যে, হযরত উম্মে সালামাহ (রা.) নবীজির স্ত্রীগণের মধ্যে সবার পরে ইন্তেকাল করেন।

হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)

তিনি ছিলেন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো বোন। নবীজি তাঁকে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) এর সাথে বিবাহ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যিনি ছিলেন নবীজির আযাদকৃত দাস। তিনি তাকে আপন পোষ্য-পুত্রের মর্যাদা দিয়েছিলেন। কিন্তু যেহেতু হযরত যায়েদের উপর একবার দাসত্বের ছাপ লেগেছিল তাই হযরত যয়নব (রা.) এই সম্বন্ধকে হৃদয় থেকে গ্রহণ করত পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত নবীজির আদেশ পালনার্থে সম্মত হয়েছিলেন। প্রায় এক বছর পর্যন্ত তিনি হযরত যায়েদের বিবাহাধীনে ছিলেন। কিন্তু যেহেতু মনের মিল ছিল না তাই পরস্পর সর্বদা মনোমালিন্য লেগেই থাকত। এমনকি হযরত যায়েদ নবীজির খেদমতে উপস্থিত হয়ে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নবীজি তাঁকে বুঝিয়ে তালাক দেওয়া থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু তারপরও যখন কোনোভাবেই বনিবনা হলো না তখন হযরত যায়েদ বাধ্য হয়ে তাঁকে তালাক দেন।

যখন হযরত যয়নব (রা.) হযরত যায়েদের বিবাহ বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে গেলেন তখন তাঁর সান্ত্বনা ও মনোতুষ্টির জন্য নবীজি নিজেই তাঁকে বিবাহ করার মনস্থ করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত আরব সমাজে পালক-পুত্রকে নিজের ঔরসজাত সন্তান মনে করা হতো। তাই সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে নবীজি এই বিবাহ থেকে বিরত থাকেন। পেছনে হয়তো লোকেরা এই সমালোচনা করবে যে, মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন পুত্র-বধুকেই বিবাহ করে ফেলেছেন! কিন্তু যেহেতু এটি ছিল জাহেলী যুগের নিছক একটি কুসংস্কার, যার মূলোৎপাটন করা ছিল ইসলামের অপরিহার্য দায়িত্ব। তাই [এ ব্যাপারে] আয়াত নাযিল হলো যে, “আপনি লোকদের ভয় করছেন! অথচ আপনার শুধু আল্লাহকেই ভয় করা উচিত”। (সূরা আহযাব)

অতএব ৪র্থ হিজরীতে, কোনো কোনো মতানুযায়ী ৩য় অথবা ৫ম হিজরীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং হযরত যয়নাবকে বিবাহ করেন। যাতে মানুষ জানতে পারে যে, পালক-পুত্র আর ঔরসজান পুত্র এক সমান নয়। পালক-পুত্রের স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের পর পিতার জন্য হারাম থাকে না। আর যারা আল্লাহ প্রদত্ত এই হালালকে বিশ্বাসগত কিংবা কার্যত হারাম করে রেখেছে তারা যেন ভবিষ্যতের এই ভুল হতে বেরিয়ে আসে এবং জাহেলী যুগের এই কুসংস্কার সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। আরএই প্রচীন কুসংস্কারের মূলোৎপাটন তখনই সম্ভব ছিল যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং কার্যত এর বাস্তবায়ন ঘটাতেন। হযরত যয়নব (রা.) এর এ বিবাহ সম্পর্কে আমরা যা কিছু লিখেছি তা অত্যন্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাসমূহের আলোকে লিখেছি। সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থে হাফেযে হাদীস আল্লামা ইবনে হাজার তা উল্লেখ করেছন। (দেখুন, ফাতহুল বারী, সূরা আহযাবের তাফসীর)

এ ছাড়া [এ প্রসঙ্গে] যে অনর্থক ভ্রান্ত বর্ণনাসমূহ রটানো হয়েছে তা সবই মুনাফিক ও কাফিরদের মনগড়া গল্প-কাহিনী। যেগুলোর কোনো কোনো মুসলিম ঐতিহাসিক কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই না করেই বর্ণনা করে দিয়েছেন; অথচ মিথ্যা ও অপবাদ বৈ কিছুই নয়।

হযরত সাফিরা বিনতে হুওয়াই (রা.)

তিনি হযরত হারূন (আ.) এর বংশধর। এটা একমাত্র তাঁরই বৈশিষ্ট, যে তিনি একজন নবীর কন্যা এবং অপর একজন নবীর স্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রথমে কিনানা বিন আবুল হাকীকের বিবাহে ছিলেন। তার নিহত হওয়ার পর বনীজির বিবাহে আসেন।

হযরত জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস খুযাইয়াহ (রা.)

তিনি বনী মুস্তালিকের সর্দার হারেসের কন্যা। যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দী হয়ে [মুসলমানদের] হাতে এসেছিলেন। অতঃপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহধীনে আসেন। আর এর অসীলায় তাঁর গোত্রের সকল লোক মুক্তি লাভ করে এবং তাঁর পিতা মুসলমান হয়ে যান।

হযরত মায়মূনা বিনতে হারেস হেলালিয়াহ (রা.)

তিনি প্রথমে মাসউদ ইবনে হেলালের বিবাহে ছিলেন। তিনি তালাক দিলে আবু রেহামের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তার ইন্তেকালের পর তিনি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহে আসেন। (মোগলতাঈ)

হযরত মায়মূনা ছিলেন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বশেষ স্ত্রী। তাঁর পর নবীজি আর কোন বিবাহ করেননি।

উপরোক্ত স্ত্রীগণ ছাড়াও আরো কয়েকজন মাহিলার সাথে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ হয়েছিল। কিন্তু নবীজির পবিত্র সাহচর্য তাদের নসীব হয়নি। নবীজির ঘরে আসার পূর্বেই বিভিন্ন কারণে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। যার বিস্তারিত আলোচনা সীরাতের বড় বড় গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।

নবীজির বহু বিবাহ সম্পর্কে আবশ্যকীয় সতর্কবানী

একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখার প্রচলন ইসলামের পূর্বে দুনিয়ার প্রায় সকল ধর্মেই বৈধ মনে করা হতো। আরব, ভারতবর্ষ, ইরান, মিসর, গ্রীস, ব্যাবিলন ও অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশের প্রত্যেক গোত্রের মধ্যে বহু বিবাহের প্রথা চালু ছিল আর এর স্বাভাবজাত প্রয়োজনীয়তার কথা আজও কোউ অস্বীকার করতে পারে না। সাম্প্রতিক কালে ইউরোপ তাদের পূর্বসূরীদের বিপরীতে বহু বিবাহকে অবৈধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছ। অবশেষে স্বাভাবজত নীতিরই জয় হয়েছে এবং এখন সেটার প্রচলন ঘটানোর চেষ্টা চলছে। ইউরোপের একজন প্রসিদ্ধ খ্রীস্ট্রীয় পণ্ডিত মিঃ ডেভিন পোর্ট বহু বিবাহের সমর্থনে ইনজীল প্রন্থের বেশ কিছু আয়াত বর্ণনা পর লিখেন-

“এই আয়াতগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, একাধিক বিবাহ বেকল পছন্দনীয় নয়; বরং মহান আল্লাহ এতে বিশেষ বরকতও নিহিত রেখেছেন”। (দেখুন, জন ডেভিন পোর্টের জীবনী, পৃ : ১৫৮)

তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ইসলামের পূর্বে বহু বিবাহের কোন সীমা নির্ধারিত ছিল না। এক একজন লোকের অধীনে হাজার হাজার নারী থাকত।

খ্রীস্টান পাদ্রীরা তো বরাবরই বহু বিবাহে অভ্যস্থ ছিলেন। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত জার্মানীতে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। বনষ্টান্টিনোপলের সম্রাট ও তার অত্তরাধিকারীরাও অনেক স্ত্রী গ্রহণ করেছেন।

অনুরূপ বৈদিক ধর্ম-বিধানেও অসংখ্য বহু বিবাহকে বৈধ বলে এবং এ বিধানে একই সময়ে দশ দশ জন, তের জন ও সাতাশ জন পর্যন্ত স্ত্রী রাখার অনুমোদন পাওয়া যা।

মোটকথা, ইসলামের পূর্বে বহু বিবাহ এক সিমাহীন আকারে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন ধর্ম ও রাষ্টের ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায় যে, ইহুদী, কৃস্টান, হিন্দু, আর্য এবং পারসিক কোনো ধর্ম ও বিধানই এর জন্য কোন সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়নি।

ইসলামের প্রথম দিকেও এ প্রথা পূর্বের ন্যায় সীমারেখা নির্ধারণ ছাড়াই প্রচলিত ছিল। কোনো কোনো স্বামীর অধীনে চারজনেরও অধিক স্ত্রী ছিল। হযরত খাদীজা (রা.) এর ইন্তেকালের পর ইসলামের বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনের ভিত্তিতে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ বন্ধনেও দশজন পর্যন্ত স্ত্রী একত্রিত হয়ে যান।

অতঃপর যখন দেখা গেল যে, এই বহু বিবাহের কারণে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে চলেছে। মানুষ প্রথমে তো লোভে পড়ে একাধিক বিবাহ করে নিত; কিন্তু পরে ঐ সকল নারীর অধিকার আদায় করতে সক্ষম হতো না। তখন কুরআনে আযীযের চিরন্তন বিধান, যা পৃথিবীর বুক হতে সর্ব প্রকার জুলুম ও অত্যাচার উৎখাত করার জন্যই অবতীর্ণ হয়েছে, মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে বহু বিবাহকে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ তো করেনি ঠিকই; তবে এক সুনির্দিষ্ট সীমারেখার মাধ্যমে এর অনিষ্ট ও আপকারিতাসমূহের সংশোধন করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর নির্দেশ অবতীর্ণ হলো যে, “এখন তোমরা শুধু চারজন নারীকে একই সময়ে বিবাহ করতে পারবে। আর তাও এ শর্তে যে, যদি তোমরা চারজন স্ত্রীর অধিকারসমূহ সমানভাবে আদায় করতে সক্ষম হও। আর যদিএর [তথা সুবিচার ও সমতা বিধানের] সাহস ও ক্ষমাত না থাকে তাহলে একের অধিক স্ত্রী রাখা অন্যায় ও জুলুম”।

এ ঘোষণার মাধ্যমে একই সময় চারের অধিক স্ত্রী রাখা উম্মতের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হারমা হয়ে গিয়েছিল। যে সকল সাহাবীর বিবাহে চারজনের অধিক স্ত্রী ছল, তাঁরা চারজন রেখে বাকিদের তালাক দিয়ে দেন। হাদীসে এসেছে যে, হযরত গায়লান (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর বিবাহে দশজন স্ত্রী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে নির্দেশ দিলেন যে, চারজন রেখে বাকিদের তালাক দিয়ে দাও। অনুরূপভাবে নওফল ইবনে মুআবিয়া (রা.) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর বিবাহে পাঁচজন স্ত্রী ছিল। নবীজি তাঁকে একজন স্ত্রী তালাক দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (তাফসীরে কাবীর, খণ্ড : ৩, পৃ : ১৩৭)

এই সাধারণ নিয়ম ও বিধান অনুযায়ী নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূত-পবিত্র স্ত্রীগণের সংখ্যাও চারের অধিক না হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানে এটাও স্পষ্ট যে, উম্মাহাতুল মুমিনীন তথা নবীজির স্ত্রীগণ অন্যসব নারীদের মতো নন। স্বয়ং কুরআনের ঘোষণা-

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسْتُنَّ كَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ

“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্যান্য সাধারণ নারীদের মতো নও”।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূত-পতিক্র স্ত্রীগণ হলেন, সমগ্র উম্মতের মাতা। নবীজির পর তাঁরা অন্য কারো স্ত্রী হতে পারেন না। এখন যদি সাধারণ নিয়মানুযায়ী চারজনের অতিরিক্ত স্ত্রীগণকে তালাক দিয়ে পৃথক করে দেওয়া হতো তাহলে তাঁদের উপর কতইনা অবিচার করা হতো যে, সারাটা জীবনের জন্য তাঁদের নিঃসঙ্গ থাকতে হতো। আর রহমাতুল্লিল আলামীন সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু দিনের তাঁদের জন্য এক বিরাট আযাবে পরিণত হতো। একদিকে তো ফখরে আলম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহচর্য ছিন্ন হয়ে যেত আর অপরদিকে অন্য কোথাও স্বীয় দুঃখ মোচনের অনুমতিও তাঁদের থাকত না।

এ জন্য নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূত-পবিত্র স্ত্রীগণকে এ সাধারণ নিয়মের অন্তর্ভূক্ত করা কোন ক্রমেই সঙ্গত ছিল না। বিশেষ করে সে সকল নারী যাদের বিবাহ এ কারণেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে, তাঁদের স্বামীগণ জিহাদের ময়দানে শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং তাঁরা সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই নবীজি তাঁদের বিবাহ করে নিয়েছিলেন। এখন যদি তাঁদেরকে তালাক দিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে তাঁদের অবস্থাটা কি দাঁড়াত? এটা কি কোনো উত্তম সহমর্মিতা হতো যে, এখন তাঁরা গোটা জীবনের জন্য বিবাহ বঞ্চিত হয়ে গেলেন।

এসব কারণে শরীয়তের বিধান ও নির্দেশ অনুযায়ী চারের অধিক স্ত্রী রাখা শুধু নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষত্ব বলে গণ্য হয়। এ ছাড়াও নবীজির ঘরোয়া জীবনের অবস্থাসমূহ যা উম্মতের জন্য দ্বীনি ও দুনিয়াবী সকল কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ আদর্শ হিসেবে গণ্য তা শুধু নবীজির পূত-পবিত্র স্ত্রীগণের মাধ্যমেই আমাদের নিকট পৌঁছেতে পারত। আর এটা এমনই গুরুত্ববহ উদ্দেশ্য যে, নয়জন নারীও সে প্রয়োজনের তুলনায় কম। এসব বাস্তব অবস্থার পেক্ষাপটকে সমানে রেখে কোনো মানুষ কি এ কথা বলতে পারে যে, নবীজি এ বিশেষত্ব [আল্লাহ ক্ষমা করুন] কোনো জৈবিক ভোগ-লালসার উপর ভিত্তিশীল ছিল!

এর সাথে সাথে এ বিষয়টিও লক্ষ্যণীয় যে, যে সময়ে সমগ্র আরব-অনারব নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধীতার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিল। তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল। তাঁর উপর নানা রকম দোষ ও অপবাদ আরোপ করছিল। [নাউযুবিল্লাহ] তাঁকে পাগল ও মিথ্যাবাদী বলা হলো।

এক কথায়, এই দেদীপ্যমান সূর্যের গায়ে কাদা নিক্ষেপ করার জন্য সর্বাত্মক প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে অবশেষে নিজেরাই মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। এসব কিছুই তারা করল; কিন্তু কোনো কাফিরও কি কখনোও তাঁর সম্পর্কে জৈবিক লোভ-লালসা এবং নারী ঘটিত ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেছে? না, অবশ্যই না। এ ক্ষেত্রে অপবাদ আরোপের বিন্দুমাত্র সুযোগও তারা পায়নি। নতুবা সুনামধন্য ব্যক্তির দুর্নাম করার জন্য এরছেয়ে বড় হাতিয়ার আর কি হতে পারত! যদি সামান্য মাত্রও আঙ্গুল রাখার অবকাশ থাকত, তাহলে আরবের কাফিররা, যাদের কাছে নবীজির ঘরের খবর পর্যন্ত গোপন ছিল না, তারা সবচাইতে বেশি বাড়িয়ে-ছাড়িয়ে সেটাকে তাঁর দোষ-ত্রুটির মধ্যে গণ্য করত। কিন্তু তারা এতটা বোকা ছিল না যে, বাস্তবতা অস্বীকার করে নিজের কথার গ্রহণযোগ্যতাকে নস্যাৎ করে দিবে।

কেননা আল্লাহভীরুতার মূর্ত প্রতীক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবন সর্ব সাধারণের চোখের সামনে উপস্থিত ছিল। যার মধ্যে তারা দেখতে পাচ্ছিল যে, তাঁর যৌবনের বৃহত অংশই একাকীত্ব ও নির্জনতার মধ্যে কেটেছে। অতঃপর তাঁর বয়স যখন পঁচিশ বছরে পদার্পণ করেছে তখন হযরত খাদীজা (রা.) এর পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব আসে। যিনি বিধবা ও সন্তানবতী হওয়ার সাথে সাথে জীবনের চল্লিশ বছর অতিক্রম করে তখন বার্ধক্যের জীবন যাপন করছিলেন। তিনি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিবাহের পূর্বে দুজন স্বামীর সংসার করেছিলেন এবং দুই পুত্র ও তিন কন্যার জননীও ছিলেন। নবীজির পক্ষ হতে তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। অতঃপর বয়সের বেশির ভাগ এই এক বিবাহেই পার করে দেওয়া হয়। আবার সেটাও এভাবে যে, তিনি হযরত খাদীজাকে ঘরে রেখে হেরা পর্বতের এক নির্জন গুহায় দীর্ঘ এক মাস পর্যন্ত শুধু মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। আর জীবনের বৃহদাংশ হযরত খাদীজার সাথে কাটানোর ফলেই নবীজির যে ক’জন সন্তান ছিল, সবাই হযরত খাদীজার গর্ভেই জন্ম লাভ করেছিল।

অবশ্য হযরত খাদীজার ইন্তেকালের পর নবীজির বয়স যখন পঞ্চাশের কোঠা অতিক্রম করে তখন এসব কয়টি বিবাহ সংঘটিত হয় এবং বিশেষ বিশেষ শরঈ প্রয়োজনের খাতিরে দশজন পর্যন্ত মহিলা নবীজির বিবাহে আবদ্ধ হন। হযরত আয়েশা (রা.) ব্যতীত যাদের সকলেই ছিলেন বিধবা এবং কেউ কেউ সন্তানবতীও ছিলেন।

এসব পরিস্থিতির প্রতি চোখ রেখে আমি ধারণাও করতে পারি না যে, কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ নবীজির এই বহু বিবাহকে [নাউযুবিল্লাহ] কোন জৈবিক ভোগ-লালসার পরিণতি বলে মন্তব্য করতে পারে! যদি কোনো টেরা চোখ বিশিষ্ট ব্যক্তি নবুওয়াতের জ্যোতি ও মাহাত্ম্যকেও দেখতে না পায় এবং তাঁর চরিত্র, কর্ম, আল্লাহ-ভীরুতা, পবিত্রতা, দুনিয়া বিমুখতা, সাধনা এবং জীবনের খুঁটিনাট যাবতীয় বিষয় হতেও চোখ বন্ধ করে রাখে তবুও এ সব বহু বিবাহের সাথে সম্পৃক্ত ঘটনা প্রবাহই তাকে এ কথা বলতে বাধ্য করবে যে, এই বিবাহগুলো নিশ্চয় কোনো জৈবিক চহিদা কিংবা ভোগ-বিলাসভিত্তিক ছিল না। যদি তাই হতো তাহলে সারাটা জীবন একজন বৃদ্ধার সাথে অতিবাহিত করে প্রায় পঞ্চান্ন বছর বয়সকে এ কাজের জন্য মনোনীত করা কোনো মানুষের বিবেক মেনে নিতে পারে না।

বিশেষ করে যখন আরবের ও কুরাইশের নেতৃবর্গ নবীজির একটি মাত্র ইশারায় নিজেদের নির্বাচিত রূপসী ও সুন্দরীকে তাঁর চরণে উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুতও ছিল। সীরাত ও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য প্রন্থাদিতে এর প্রমাণ রয়েছে।

এতদ্ব্যতীত স্বয়ং মুসলমানদের সংখ্যাও তখন লাখের কোঠায় পৌঁছে গিয়েছিল। যাদের প্রতিটি নারী নবীজির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াকে সঙ্গত কারণেই উভয় জগতের সফলতা ও কল্যাণ বলে মনে করত। এসব কিছু থাকা সত্ত্বেও নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর পঞ্চাশ বছর বয়স বিবাহের সময়ই ছিল চল্লিশ বছর। তারপরেও যে সকল নারীকে বিবাহের জন্য নির্বাচন করা হয়, তাঁদের একজন ব্যতীত সকলেই ছিলেন বিধবা এবং সন্তানের জননী। উম্মতের অসংখ্য কুমারী মেয়েদেরকে তখনও নির্বাচন করা হয়নি।

এই ছোট পুস্তিকায় [এ ব্যাপারে আরো] বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। নতুবা দেখিয়ে দেওয়া যেত যে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু বিবাহ কতটা ইসলাম ও শরঈ প্রয়োজনের উপর ভিত্তিশীল ছিল। বস্তুত যদি নবী-সহধর্মিনীগণ না হতেন তাহলে সেসব আহকাম ও বিধি-বিধান যা শুধু নারীদের মাধ্যমেই উম্মতের নিকট পৌঁছানো সম্ভব ছিল, তা অজানাই থেকে যেত। কাজেই নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু-বিবাহকে জৈবিক লালসা নির্ভর আখ্যা দেওয়া নিতান্ত নিলজ্জতা ও সত্যঘাতী বিষয়। অন্যায় প্রীতি যদি বিবেক বুদ্ধিকে অন্ধ না করে দিয়ে থাকে, তাহলে কোনো কাফিরও এমনটি কলতে পারে না।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নয়জন পূত-পবিত্র স্ত্রী রেখে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পূত-পবিত্র স্ত্রীগণের ইন্তেকাল করেন হযরত উম্মে সালামাহ (রা.)।

নবীজির চাচা ও ফুফুগণ

আব্দুল মুত্তালিবের দশজন পুত্র ছিল। (১) হারিস । (২) যুবায়ের। (৩) হাজল। (৪) দিরার। (৫) মুকাভ্যিম। (৬) আবু লাহাব। (৭) আব্বাস। (৮) হামযা। (৯) আবু তালেব। (১০) আব্দুল্লাহ। এদের মধ্য হতে আব্দুল্লাহ হলেন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত পিতা। অবশিষ্ট নয়জন নবীজির চাচা। হযরত আব্বাস (রা.) ছিলেন ভাইদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছয়জন ফুফু ছিলেন। (১) উমায়মাহ (২) উম্মে হাকীক (৩) বাররাহ (৪) আতিকা (৫) সাফিয়্যাহ (৬) আরওয়া।

নবীজির প্রহরীগণ

(১) হযরত সা’দ বিন মুআয (রা.), যিনি নবীজির পাহারাদারীর [দেহরক্ষীর] দায়িত্ব পালন করেন। (২) হযরত যাকওয়ান ইবনে আবদে কায়েস ও (৩) হযরত মুহাম্মাদ ইবনে সালামাহ আনসারী উহুদ যুদ্ধে, (৪) হযরত যুবাইর (রা.) খন্দকের যুদ্ধে আর (৫) হযরত আব্বাস ইবনে বশীর, (৬) হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) (৭) আবু আইউব (রা.) ও (৮) হযরত বিলাল (রা.) ওয়াদীউল কুরা’র যুদ্ধে নবীজির পাহারাদারীর দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর যখন وَ اللّٰهُ یَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ (অর্থাৎ আর মহান আল্লাহ স্বয়ং লোকদের থেকে আপনকে হেফাযত করবেন) এই আয়াত নাযিল হয় তখন থেকে পাহারাদারীর ব্যবস্থাও তুলে দেওয়া হয়।

কাবাঘর নির্মাণ ও নবীজিকে ‘আল-আমীন’ স্বীকৃতি প্রদান

যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স পঁয়ত্রিশ বছর তখন কুরইইশরা কাবাঘরকে নতুন করে পুনঃনির্মানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাইতুল্লাহ শরীফের নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণ করতে পারাকে প্রত্যেকেই নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করত। আর কুরাইশ গোত্রসমূহ বাইতুল্লাহ নির্মাণে কে কার চাইতে বেশি অংশ নিতে পারে, এর উপর নিজেদের ভাগ্যের ফায়সালা করে রেখেছিল। তাই সম্ভাব্য ঝগড়া এড়ানোর নিমিত্তে এর নির্মাণ কার্যকে গোত্রসমূহের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার সিন্ধান্ত নিতে হল।

এই কর্ম বণ্টন পদ্ধতির মাধ্যমে কাবা ঘরের নির্মাণ কাজ ‘হাজরে আসওয়াদ’ বসানোর স্থান পর্যন্ত সুসম্পন্ন হয়ে গেল। কিন্তু নির্মাণের এ পর্যায়ে এসে হাজরে আসওয়াদকে উঠিয়ে তার নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করার ব্যাপারে তাদের মাঝে চরম মতানৈক্য দেখা দিল। প্রতিটি গোত্র ও ব্যক্তিরই প্রাণের দাবী ছিল যে, সে এ সৌভাগ্য লাভ করবে। এমনকি এর জন্য হত্যা ও লড়াইয়ের উপর ওয়াদা ও অঙ্গীকার আরম্ভ হলো। সম্প্রদায়ের কিছু ভদ্র ও চিন্তাশীল ব্যক্তি চিন্তা করলেন যে শলা-পরামর্শের মাধ্যমে মিমাংসার কোনো পথ বের করবেন। আর এ উদ্দেশ্যে তারা মসজিদে সমবেত হলেন।

পরামর্শে সিদ্ধান্ত হলো, আগামী কাল প্রত্যুষে যে ব্যক্তি সবার আগে মসজিদের এই [নির্দিষ্ট] দরজা দিয়ে [কাবা চত্বরে] প্রবেশ করবেন তিনিই তোমাদের এ ব্যাপারে ফায়সালা দিবেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে কুদরতী ফায়সালা মনে করে প্রত্যেকে তা মেনে নিবে।

মহান আল্লাহর কুদরত যে, সবার আগে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে সবাই একবাক্যে বলে উঠল, “ইনিই ‘আল-আমীন’ আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মানতে সম্মত আছি”। নবীজি এগিয়ে আসলেন এবং সেই প্রজ্ঞাপূর্ণ ফায়সালা দিলেন যার উপর সবাই সন্তুষ্ট হয়ে গেল। অর্থাৎ তিনি একটি চাদর বিছালেন এবং নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদটি তাতে রেখে দিলেন। তারপর নির্দেশ দিলেন যে, প্রত্যেক গোত্রের ব্যক্তিরা যেন চাদারের এক এক কোণ ধরে। এভাবেই করা হলো। যখন তা ভীত পর্যন্ত পৌঁছল তখন নবীজি নিজ হাতে পাথরটি তুলে যথাস্থানে রেখে দিলেন।

এ ঘটনা বর্ণনা করার পর ইবনে হিশাম লিখেন যে, নবুওয়াত প্রপ্তির পূর্বে সমগ্র কুরাইশ একবাক্যে নবীজিকে ‘আল-আমীন বা বিশ্বস্ত’ বলে অভিহিত করত। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃ : ১০৫)

নবুওয়াত লাভ

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বয়স যখন ৪০ বছর একদিন পূর্ণ হলো তখন প্রকাশ্য ও বাহ্যিকভাবেও তাঁকে নিয়মতান্ত্রিক নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির তারিখও জন্ম তারিখের অনুরূপ রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার।

পৃথিবীতে ইসলাম প্রচার

তাবলীগের প্রথম ধাপ : প্রথমত যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ওহী অবতীর্ণ হয় তখন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদিষ্ট ছিলেন না। বরং তাতে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়ে বিধি-বিধান ছিল। অতঃপর কিছুদিন ওহী আগমন বন্ধ থাকার পর যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে পুনরায় তাঁর প্রতি ওহী অবতীর্ণ হতে আরম্ভ করল তখন তাঁকে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ প্রদান করা হল। কিন্তু তখন বিশ্বময় ছিল ধর্মহীনতা ও পথভ্রষ্টতার জয়জয়কার। বিশেষ করে আবরদের অহঙ্কার-অহমিকা ও পূর্ব পুরুষদের অনুসরণ প্রীতি তাদেরকে সত্যের ডাকে কর্ণপাত করার এতটুকুও অনুমতি দিত না। এ কারণেই মহান আল্লাহর প্রজ্ঞার দাবী এটাই ছিল নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ না দেওয়া, যেন গণমানুষ শুরু হতেই ইসলামের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ না হয়ে পড়ে। তাইতো নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমত নিজের চেনা জানা বন্ধু-বান্ধব এবং যাদের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল অথবা দূরদর্শীতার মাধ্যমে যাদের মধ্যে পূণ্য ও কল্যাণের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করতেন, তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান করতে শুরু করেন।

এ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম তাঁর পবিত্র স্ত্রী হযরত খাদীজা (রা.), হযরত আবু বকর (রা.), তাঁর চাচাতো ভাই হযরত আলী (রা.) এবং পালক পুত্র হযরত যায়েদ ইবনে হারেস (রা.) ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন। হযরত আবু বকর (রা.) নবুওয়াত প্রপ্তির পূর্ব হতেই নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বন্ধু ছিলেন এবং তাঁর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। নবীজি তাঁকে নিজের নবুওয়াত প্রপ্তির সুসংবাদ দিলে সাথে সাথে তিনি তার সত্যতা স্বীকার করে নেন এবং কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে যান।

হযরত আবু বাকর ছিলেন স্বীয় গোত্রের সর্বজনস্বীকৃত সম্মানিত ব্যক্তি। যাবতীয় বিষয়ে লোকেরা তাঁর উপর আস্থা রাখত। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি নিজেও সেসব লোককে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিতে আরম্ভ করেন, যাদের মধ্যে তিনি কিছুটা সততা ও কল্যাণের নিদর্শন দেখতে পান। সে সুবাদে হযরত উসমান গনী (রা.), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.), হযরত যুবাইর ইবনে আউয়াম (রা.) এবং হযরত তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) প্রমুখ সাহবী তাঁর আহবানে সাড়া দেন। তিনি তাঁদেরকে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে নিয়ে যান এবং সকলেই মুসলমান হয়ে যান। তাঁদের পর হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.), উবায়দা ইবনুল হারেস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.), সাঈদ ইবনুল আস (রা.), উসমান ইবনে মাযউন (রা.) এবং তাঁর দুই ভাই কুদামাহ (রা.) ও উবায়দুল্লাহ (রা.), আরকাম ইবনে আরকাম (রা.) সকলে ইসলামে গ্রহণে ধন্য হন। এরা সকলেই ছিলেন কুরাইশ বংশের লোক। অকুরাইশীদের মধ্য হতে হযরত সুহাইব রূমী (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসিরি (রা.), আবু যর গিফারী (রা.) ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইসলামে দীক্ষিত হন।

তখন পর্যন্ত ইসলামের এই দাওয়াতের কাজ শুধু গোপনে চলছিল। ইবাদত-বন্দেগী এবং শরীয়তের আচার-অনুষ্ঠানও লুকিয়ে ও গোপনে আদায় করা হতো। এমনকি ছেলে পিতা হতে লুকিয়ে এবং পিতা ছেলে হতে লুকিয়ে নামায আদায় করত। যখন মুসলামানদের সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে গেল তখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের জন্য বড় একটি ঘর নির্ধারণ করে দিলেন, যার মধ্যে তাঁরা সবাই সমবেত হতেন এবং নবীজি তাদেরকে তা’লীম দিতেন।

এ পদ্ধতিতে ইসলামের দাওয়াত তিন বছর পর্যন্ত চলছিল। ততদিনে কুরাইশের উল্লেখযোগ্য লোকও ইসলামে প্রবেশ করতে আরম্ভ করে। আর এ সংবাদ গোটা মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকদের মাঝে বিভিন্ন স্থানে এর আলোচনা হতে থাকে। আর এবার প্রকশ্যে সত্যের দাওয়াত দেওয়ার সময় এসে যায়।

প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত

তিন বছর পর যখন অধিক সংখ্যক নারী ও পুরুষ ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং মানুষের মধ্যে এর আলোচনা হতে থাকে তখন মহান আল্লাহ নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রাকশ্যে ঘোষণা দিয়ে মানুষের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছানোর নির্দেশ দেন।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে সাথে ঐ নির্দেশ পালনে ব্রতী হন। মক্কার সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশের গোক্রসমূহের নাম ধরে আহবান করেন। যখন সমস্ত গোত্রের লোক সমবেত হলো তখন তিনি প্রথমেই তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যদি তোমাদেরকে এ সংবাদ প্রদান করি যে, শত্রু বাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ছুটে আসছে এবং অচিরেই তারা তোমাদের উপর লুটতরাজ শুরু করবে, তাহলে তোমরা সবাই কি আমার এ কথা বিশ্বাস করবে”?

এ কথা শুনে সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, “অবশ্যই আমরা সবাই আপনার সংবাদকে সম্পূর্ণ সত্য বলে বিশ্বাস করব। কোননা আমরা আজ পর্যন্ত কখনোও আপনাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি”। এরপর নবীজি বললেন, “আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ প্রদান করছি যে, তোমরা যদি তোমাদের বাতিল ধর্ম-বিশ্বাসগুলো পরিহার না কর, তাহলে অচিরেই তোমাদের উপর মহান আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি নেমে আসবে”। তিনি আরো বললেন,

“আমি যতদূর জানি, দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত কেউ তার সম্প্রদায়ের জন্য আমার এ উপহার অপেক্ষা উত্তম উপহার নিয়ে আসেনি, যা আমি তোমাদের জন্য নিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ ও সফলতা বহন করে নিয়ে এসেছি। আর মহান আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাদেরকে এই কল্যাণের দিকে আহবান করি। আল্লাহর শপথ! আমি যদি গোটা পৃথিবীর মানুষের সাথে মিথ্যা বলতাম, তবুও তোমাদের সম্মুখে মিথ্যা বলতাম না। আর আমি যদি সারা বিশ্বকে ধোঁকা দিতাম, তবুও তোমাদেরকে ধোঁকা দিতাম না। সেই মহান পূত-পবিত্র সত্তার কসম! যিনি একক এবং যার কোনো শরীক নেই। আমি তোমাদের প্রতি বিশেষভাবে এবং সারা বিশ্ববাসীর প্রতি সাধারণভাবে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল ও বার্তাবাহক”। (দুরূসুস সীরাত, পৃ : ১০)

গোটা আরবের বিরোধীতা, শত্রুতা ও নবীজির দৃঢ়তা

এই দাওয়াত ও তাবলীগের ধারা এভাবে অব্যাহত ছিল। আরবরা যখন এটা জানতে পারল যে, নবীজির প্রতি প্রেরিত ওহীতে তাদের মূর্তিসমূহের বাস্তবতা উদঘাটন করে দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর পূজারীদের নির্বুদ্ধিতা প্রকাশ করে দেওয়া হয়েছে, তখন তারা নবীজির শত্রুতার জন্য উঠে-পড়ে লগল এবং তাদের একটি দল নবীজির চাচা আবু তালেবের কাছে এসে দাবী জানাল যে, তিনি যেন নবীজিকে এ ধরণের কথা বলা হতে বিরত রাখেন অথবা সহায্য সহযোগিতা ছেড়ে দেন।

আবু তালেব এক সুন্দর পন্থায় তাদের উত্তর দিয়ে বিদায় করেন। আর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভবে সত্যের বাণী প্রচার ও প্রসারের কাজ বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে চালিয়ে যেতে থাকেন এবং মূর্তিপূজা হতে মানুষকে বাধা দিতে থাকেন। আরবরা যখন এর উপর ধৈর্য ধরতে পারল না তখন তারা পুনরায় আবু তালেবের নিকট আসে এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তার নিকট দাবী জানায় যে, “আপনি আপনার ভাতিজাকে বিরত রাখুন। অন্যথায় আমরা সম্মিলিতভাবে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব, যতক্ষণ না দু’দলের মধ্য হতে যে কোনো একটি দল ধ্বংস হয়ে যায়”।

গোটা আরব জাতির বিরুদেধ নবীজির জবাব

এবার তো আবু তালেবও চিন্তায় পড়ে যান এবং নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে এ ব্যপারে আলাপ-আলোচনা করেন। নবীজি বললেন-

“হে আমার সম্মানিত চাচাজান! আল্লাহর শপথ, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হতে চন্দ্র এনে রেখে দেয় এবং তার বিনিময়ে তারা এটা চায় যে, আমি আল্লাহর বাণী তাঁর সৃষ্টির নিকট পৌঁছানো থেকে বিরত থাকি, তাহলে আমি তা কখনোও মেনে নিতে প্রস্তুত নই। এ পর্যন্ত যে মহান আল্লাহর সত্য দ্বীন মানুষের মাঝে বিস্তার লাভ করবে অথবা এই চেষ্টা ও সংগ্রামে আমি আমার জীবন বিলিয়ে দেব”।

আবু তালেব যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে এই দৃঢ়তা প্রত্যক্ষ করলেন, তখন তিনি বললেন, আচ্ছা যাও! তুমি তোমার কাজ চালিয়ে যেতে থাক। আমিও তোমার সাহায্য সহযোগিতা হতে কখনোও আমার হাত সংকোচিত করব না।

মানুষের মাঝে ঘৃণা ছড়ানো ও তার বিপরীত ফল

কুরাইশরা যখন দেখল যে, বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিব নবীজির সাথে রয়েছে আর এ দিকে হজের মৌসুমও ঘনিয়ে এসেছে, এ সুযোগে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচারে জোর চেষ্টা চালাবেন। আর তাঁর কথার চুম্বকাকর্ষণের ব্যাপারে তো সকলেই অবগত ছিল। তাই তাদের আশঙ্কা হলো যে, এবার তাঁর ধর্ম পৃথিবীর আনাচে-কানচে ছড়িয়ে পড়বে। তাই সকলে সমবেত হয়ে পরামর্শক্রমে সাব্যস্ত করল যে, মক্কার সমস্ত রাস্তায় তাদের নিজেদের লোক বাসিয়ে দিতে হবে। যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল হতে যেসব লোক হজ আদায়ের উদ্দেশ্যে আগমন করে, তাদেরকে দূরে থাকতেই এ মর্মে সতর্ক করে দেওয়া যায় যে, এখানে একজন যাদুকর রয়েছে যে তার কথার মাধ্যমে পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী এবং সকল আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়, তোমরা তার কাছে যাবে না। কিন্তু-

چراغے را کہ ایزد بروزد

کسےکش تف زند ریشش بسوزد

যে বাতি জ্বলে ওরে নির্দেশে তার বিধাতার

সে বাতি যে নেভাতে চায়, পুড়ে তার দাড়ি হয় সারখার

মহান আল্লাহর কুদরতে তাদের এই কর্মপন্থা প্রকারন্তরে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাবলীগের পক্ষেই কাজ করল। তারা যদি এমনটি না করত তাহলে এমনও হতে পারত যে, বহু লোক হয়তো তাঁর আলোচনাই শুনতো না। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা-মেহনত সবাইকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে তুলল।

কুরাইশদের নির্যাতন ও নবীজির দৃঢ়তা

কুরাইশরা যখন নিজেদের সকল প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলো এবং দিন দিন নবীজির দাওয়াত ব্যাপকতর হতে চলল, দলে দলে লোকেরা ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকল, এবার তারা নবীজিকে সর্ব প্রকার কষ্ট দিতে আরম্ভ করল। মক্কার কিছু লম্পট ও বখাটে লোককে একত্রিত করে এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করল যে, তারা যেন নবীজিকে প্রত্যেকটি মজলিসে গিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে এবং যতভাবে সম্ভব হয় তাঁকে যেন কষ্ট দেয়।

নবীজিকে হত্যার পরিকল্পনা এবং তাঁর তিনটি সুস্পষ্ট মু’জেযা

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার কাবা শরীফের চত্বরে নামায আদায় করছিলেন। যখন তিনি সিজদায় গেলেন তখন আবু জাহেল এটাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে তাঁর মাথা মুবারক প্রস্তরাঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু … …

دشمن اگر قوی ست نگہبان قوی تر ست

শত্রু যদিও শক্তিশালী, তবে হেফাযতকারী এরচেয়েও অধিক শক্তিশালী

পাথর নিয়ে সে নবীজির নিকটবর্তী হতেই তার হাত কাঁপতে শুরু করত এবং হাত থেকে পাথর পড়ে যেত। নিজ দলের লোকদের কাছে ফিরে আসত এবং বলত, “আমি যখনই তাঁর মস্তকের দিকে হাত বাড়ানোর ইচ্ছা করি তখনই অদ্ভুত আকৃতির একটি উট মুখ খুলে আমার দিকে ধাবিত হয় এবং আমাকে যেন গিলে ফেলে! আমি আজ পর্যন্ত এ ধরণের উট কখনও দেখিনি”।

এই ছিল সেই ঘটনা যা সমবেত কাফিরের সম্মুখেই সংঘটিত হয় এবং স্বয়ং কাফিদের সর্দার আবু জাহেল তা স্বীকার করে।

আবু জাহেল, উকবা ইবনে আবী মুআইত, আবু লাহাব, আস ইবনে ওয়ায়িল, আসওয়াদ ইবন আবদে ইয়গুস, আসওয়াদ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব, ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা ও নযর ইবনে হারেস প্রভৃতি কাফির সর্বদা নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার জন্য তাঁর পেছনে লেগে থাকত। এদের মধ্য হতে কারোও ইসলাম গ্রহণের তাওফীক লাভ হয়নি। বরং তারা সকলেই অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় ধ্বংস হয়। কেউ কেউ বদর যুদ্ধে তরবারীর আঘাতে আর কেউ কেউ অত্যন্ত বিশ্রী ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পঁচে-গলে মৃত্যু বরণ করে।

কুরাইশদের সব ধরনের প্রলোভন ও নবীজির জবাব

কুরাইশের কাফিররা যখন দেখল যে তাদের এই প্রচেষ্টা কার্যকর হচ্ছে না, তখন তারা সবাই মিলে পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে, তারা তাদের সবচেয়ে চতুর সর্দার উতবা ইবনে রবীআকে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রেরণ করবে। সে যেন নবীজির সর্ব প্রকার পার্থিব প্রলোভনে ফেলতে পারে। হয়তো বা তিনি এই ফাঁদে পা দিয়ে স্বীয় দাবী তথা ইসলাম প্রচার হতে বিরত থাকবেন।

উতবা ইবনে রাবীআ যখন নবীজির খেদমতে উপস্থিত হয় তখন তিনি মসজিদে নামায পড়ছিলেন। সে নিকটে গিয়ে বলল, “ভাতিজা! তুমি সামাজিক মর্যাদা ও বংশ মর্যাদার দিক থেকে আমাদের সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এতদসত্ত্বেও তুমি তোমার গোত্রের মধ্যে একটা ফাটল সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাদেরকে এবং তাদের দেব-দেবীগুলোকে মন্দ বলেছ। তাদের পূর্বপুরুষদেরেকে মূর্খ প্রতিপন্ন করেছ। তুমি আজ তোমার মনের কথাটি খুলে বল। যদি এসব কার্যকলাপ দ্বারা তোমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে আগাধ ধন-সম্পদের মালিক হওয়া, তবে শুনে রাখ, আমরা তোমার জন্য এত প্রচুর সম্পদ যোগাড় করে দিতে প্রস্তুত যে, তুমি মক্কাবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধনী হয়ে যাবে। আর যদি তুমি নেতৃত্ব চাও তবে আমরা তবে আমরা তোমাকে পুরো কুরাইশের নেতা বানিয়ে দিতে সম্মত আছি। তোমার নির্দেশ ব্যতিরেকে একটি কাণও নড়বে না। আর যদি তোমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে বাদশাহী লাভ করা, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সকলের বাদশাও বানাতে পারি। যাদি তোমার উপর [আল্লাহ না করুন] কোন জ্বীনের প্রভাব থেকে থাকে এবং তুমি যেসব কথা [ওহী] মানুষকে শোনাও, সেগুলো তারই কথা হয়ে থাকে; অথচ তুমি তার হাত হতে পরিত্রাণ লাভ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছ, তাহলে আমরা তোমার জন্য কোনো ডাক্তার তালাশ করব, যে তোমার চিকিৎসা করবে!” (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২০)

উতবা যখন তার বক্তক্য শেষ করল, তখন বনী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সকল প্রস্তাবের জবাবে শুধুমাত্র কুরআনের একটি সূরা শুনিয়ে দেন। যা শুনে উতবা হতভম্ব হয়ে যায়। সে তার গোত্রের নিকট ফিরে এসে বলে, “আল্লাহর শপথ! আজ আমি এমন কালাম শুনেছি, যেমটি ইতিপূর্বে আমি আমার গোটা জীবনেও শুনিনি। আল্লাহর শপথ! এটা না কোনো কবিতা, না কোনো গণকের বাক্য আর না কোনো যাদুমন্ত্র। আমার পরামর্শ হলো, তোমরা এই লোকটির [নবীজির] কষ্ট দেওয়াহতে বিরত থাক। কেননা আমি তাঁর মুখ থেকে যে কলাম শ্রবণ করেছি, আল্লাহর শপথ! অচিরেই তার সুমহান মর্যাদা প্রকাশ পাবে। আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী। তোমরা আমার কথা শোন। আর না হোক, অন্তত কিছুদিন অপেক্ষা কর। যদি আরবরা তার উপর বিজয় হয়ে যায়, তাহলে বিনা পরিশ্রমেই তোমরা এই আপদের হাত হতে রক্ষা পেয়ে যাবে। আর যদি সে আরবদের উপর বিজয়ী হয়ে যায় তাহলে তার সম্মান তো আমাদেরই সম্মান। কেননা সে তো আমাদেরই বংশের লোক”।

কুরাইশরা তাদের সবচেয়ে চতুর সর্দারের এ কথা শুনে অবাক হয়ে যায় এবং এ বলে নিষ্কৃতি লাভ করে যে, মুহাম্মাদ [সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এই লোকটির উপর যাদু চালিয়ে দিয়েছে। (দুরূসুস সীরাত, পৃ : ১৪)

যখন কুরাইশের কোনো কৌশলই ফলপ্রসূ হলো না তখন তারা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে, তাঁর সাহাবাগণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিও নানাভাবে জুলুম-নির্যাতন আরম্ভ করে। হযরত বিলাল (রা) প্রমুখ সাহবীর উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। হযরত আম্মার ইবনে ইয়সিন (রা.) এর সম্মানিত জননীকে এ কারণেই অত্যন্ত মর্মন্তুদ পদ্ধতিতে শহীদ করে দেওয়া হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটিই সর্বপ্রথম শাহাদাতের ঘটনা। (সীরতে মোগলতাঈ, পৃ : ২১)

সাহাদের প্রতি হাবশায় হিজরতের নির্দেশ

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের প্রতি কৃত সর্বপ্রকার অত্যাচার ও নিপীড়ন নীরবে সহ্য করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যখন সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও এই নির্যাতনের ধারা সম্পসারিত হলো এবং দেখলেন যে, তাঁরা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সমস্ত জুলুম-নির্যাতন সহ্য করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন; তবু সেই সত্যের বাণী ও নূরে ইলাহী হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে কোনভাবেই প্রস্তুত নন, নবীজির মাধ্যমে যা তাঁদের লাভ হয়েছে- তখন তিনি তাদেরকে হাবশা বা আবিসিনিয়ার দিকে হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেন।

সুতরাং নবুওয়াতের পঞ্চম বছর রজম মাসে বারজন পুরুষ এবং চারজন মহিলা হাবশায় হিজরত করেন। যাদের মধ্যে হযরত উসমান এবং তাঁর স্ত্রী হযরত রুকাইয়া (রা.) ও ছিলেন। (দুরূসুস সীরাত, পৃ : ১৫)

হাবশার বাদশা নাজ্জাশী এ সকল মুহাজিরগণের প্রতি বেশ সম্মান প্রদর্শন করেন। তাঁরা সবাই সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করতে থাকেন। কুরাইশর যখন এ সংবাদ পায় তখন তারা আমার ইবনে আস ও আব্দুল্লাহ রবীআকে নাজ্জাশীর নিকট এ বলে পাঠায় যে, এই লোকগুলো দৃষ্কৃতিকারী। এদেরেকে নিজের রাজ্যে অবস্থান করার অনুমতি দিবেন না; বরং এদেরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন।

নাজ্জাশী ছিলেন একজন ভদ্র ও বিচক্ষণ লোক। তিনি তাদের প্রস্তাবের জবাবে বললেন, আমি তাদের ধর্ম ও মতাদর্শ সম্পর্কে তদন্ত করার আগে তাদেরকে তোমাদের হাত তুলে দিতে পারি না। তারপর বাদশা নাজ্জাশী তাদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা তোমাদের ধর্মমত এবং এর সত্য সত্য ঘটনাবলী বর্ণনা কর। তখন হযরত জা’ফর ইবনে আবী তালেব সামনে অগ্রসর হলেন এবং বললেন-

“হে বাদশা! আমরা ইতোপূর্বে জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। মূর্তি পূজা করতাম। মৃত প্রাণী ভক্ষণ করতাম। অশ্লীলতা, আত্মীয়াতার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং চরিত্রহীনতায় লিপ্ত ছিলাম। আমাদের সবলরা দুর্বলদের গ্রাস করে ফেলত। এমনি অবস্থায় আল্লাহ তাআলা আমাদেরে নিকট আমাদেরই বংশের একজন রাসূল প্রেরণ করলেন। আমরা তাঁর বংশ, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা সম্পর্কে সবিশেষ অবগত। তিনি আমাদেরকে এই আহবান জানান যে, আমরা যেন মহান আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করি। কাউকেও তাঁর সাথে শরীক না করি। মূর্তি পূজা ত্যাগ করি। সত্য কথা বলি। আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখি এবং প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহার করি। আর তিনি আমাদেরকে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড হতে বারণ করেছেন। আর আমাদেরকে নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা এসব কথা শুনে তার প্রতি ঈমান এনেছি”।

নাজ্জাশী এ ভাষণ শুনে খুবই অভিভূত হয়ে পড়েন এবং কুরাইশের দূতগণকে ফিরিয়ে দেন ও নিজে মুসলমান হয়ে যান।

মুহাজিরগণ প্রায় তিন মাস সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করে [মক্কায়] ফিরে আসেন। এই সময় হযরত ফারুকে আযম [ওমর] (রা.) ও নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর বকরতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সংখ্যা ৪০ জন পুরুষ এবং ১১ জন নারীর চেয়ে বেশি ছল না। ফারুকে আযম হযরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের এক প্রকার শক্তি ও শৌর্য অর্জিত হয়। যে সকল লোক সুস্পষ্ট দলীল প্রমাণের কাল্যাণে ইসলামের সত্যতাকে মনে প্রণে স্বীকার করে নেওয়া সত্ত্বেও কুরাইশের নির্যতনের ভয়ে নিজেদের ইসলাম প্রকাশ করতে পারছিল না; তারাও এখন প্রকাশ্যে ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করেন। এভাবে আরব গোত্রসমূহের মাঝে ইসলাম প্রসার ও উন্নতি লাভ করতে থাকে।

যখন কুরাইশরা দেখল যে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহবাগণের সম্মান ও মার্যাদা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে চলেছে এবং হাবশার বাদশাও মুসলমানদের যথেষ্ট সম্মান করেছেন, তখন তারা নিজেদের পরিণতি দেখতে শুরু করে।

কুরাইশরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বনী আব্দুল মুত্তালিব ও বনী হাশেমের নিকট এই দাবী করা হবে, তারা তাদের ভাতিজা [মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] কে আমাদের হাতে তুলে দিবে। অন্যথায় আমরা তাদের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে দিব।

কিন্তু বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের এই দাবী মঞ্জুর করল না। তখন কুরাইশরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই অঙ্গীকারনামা প্রণয়ন করল যে, বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা হোক। আত্মীয়তা, বিবহ-শাদী এবং বেচাকেনা সব বন্ধ করে দেওয়া হোক। আর এই অঙ্গীকারনামা কাবা ঘরের অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে রেখে দেওয়া হলো।

একটি পাহাড়ের উপত্যকায় নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সকল বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে বন্দী করে দেওয়া হলো। সে সময় আবু লাহাব ব্যতীত নবী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তলিবের মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল ব্যক্তি আবু তালেবের সাথে ঐ উপত্যকায় বন্দী ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। সবদিক থেকে আসা-যাওয়ার পথ বন্ধ ছিল। পানাহারের যা কিছু পাথেয় সাথে ছিল তাও নিঃশেষ হয়ে গেল। তখন তারা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলেন। ক্ষুধার তাড়নায় গাছের পাতা পর্যন্ত ভক্ষণ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো।

এই পরিস্থিতি দেখে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বিতীবার হাবশায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। এবারের হিজরতে মুসলমানদের একটি বড় কাফেলা অংশ গ্রহণ করে। তাদের সংখ্যা ছিল ৮৩ জন পুরুষ এবং ১২ জন নারী। অতঃপর তাদের সাথে ইয়ামানের মুসলমানরাও যোগ দেয়, যাদের মধ্যে হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) এবং তাঁর গোত্রের লোকজনও ছিল।

এ দিকে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর অবশিষ্ট পরিবার-পরিজন ও সাহাগণ প্রায় তিন বছর এই জুলুম-অত্যাচার ও দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করেন। এরপর কিছু লোক এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে এবং নবীজির উপর হতে এই অবরোধ তুলে দিতে উদ্যোগী হন। আর ওদিকে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হলো যে, কুরাইশদের অঙ্গীকারনামা উই পোকায় খেয়ে ফেলেছে এবং মহান আল্লাহর নাম ব্যতীত আর কোনো অক্ষরই তারা অক্ষত ছাড়েনি। নবীজি লোকদেরকে তা জানিয়ে দিলে দেখা গেল অঙ্গীকারনামাটি ঠিক তেমনি রয়েছে, যেমনটি নবীজি বলেছিলেন। মোটকথা, অবশেষে নবীজির উপর থেকে অবরোধ তুলে দেওয়া হলো।

তোফায়েল ইবনে আমর দাওসীর ইসলাম গ্রহণেধন্য হওয়া

এই সময়ে হযরত তোফায়েল ইবনে আমর দাওসী (রা.) [যিনি অত্যন্ত ভদ্র ও নিজ গোত্রের নেতা ছিলেন] নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হন এবং ইসলামের সত্যতার সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রমাধুর্য অবলোকন করে স্বেচ্ছায় আগ্রহে ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যান এবং তিনি আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার গোত্রে আমার কথাকে মান্য করা হয়। আমি ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইসলামের প্রতি আহবান করব। কিন্তু আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন, আমার সাথে যেন এমন কোনো স্পষ্ট নিদর্শন প্রকাশ করিয়ে দেওয়া হয় যার মাধ্যমে আমি তাদেরকে আমার দাবীর স্বপক্ষে বিশ্বাস স্থাপন করাতে পারি। নবীজি দুআ করলে মহান আল্লাহ তাঁর কপালে এমন একটি নূর চমকিয়ে দিলেন, যা অন্ধাকরে এক উজ্জ্বল প্রদীপের ন্যায় জ্বলজ্বল করত। হযরত তোফায়েল ইবনে আমর যখন নিজ গোত্রের কাছাকাছি গমন করেন তখন তাঁর মনে এ চিন্তা আসে যে, না জানি আমার গোত্রের লোকেরা আমার এই নূরকে কোনো বিপদ বা রোগ বলে ধারণা করে এ কথা বলে যে, ইসলাম গ্রহণ করার কারণে এ রোগ আমাকে আক্রান্ত করেছে! তাই তিনি দুআ করলেন যে, এই নূরটি যেন তার লাঠিতে চলে আসে। মহান আল্লাহ তাঁর দুআ কবুল করলেন এবং তাঁর কপালের নূরকে তাঁর লাঠির মধ্যে ঝুলন্ত লণ্ঠনের ন্যায় করে দিলেন। অতঃপর তিনি আপনা গোত্রের লোকদের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিছু সংখ্যক লোক তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু তাদের সংখ্যা তাঁর ধারণা মতো যতেষ্ট ছিল না। তাই তিনি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে নিজের চেষ্টা সফল হওয়ার জন্য দুআর আবেদন করলেন। নবীজি দুআ করলেন এবং বললেন, “যাও, এবার দ্বীনের প্রচার কর এবং নম্র আচরণ বজায় রাখ”।

হযরত তোফায়েল (রা.) ফিরে যান এবং পুনরায় লোকদেরকে ইসলাম প্রতি দাওয়াত দেন। মহান আল্লাহ অনুগ্রহে এবার তিনি এমন সফলকাম হন যে, খন্দক যুদ্ধের পর ৭০/৮০টি পরিবারকে মুসলমান বানিয়ে খায়বারের যুদ্ধের সময় তাদেরকে নিজের সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তারা সকলেই জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন।

আবু তালেবের ইন্তেকাল

ঐ সময়ে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালেবের ইন্তেকাল হয়ে যায় । এই বেদনাদায়ক ঘটনা নবুওয়াতের দশম বছর শাওয়াল মাসের মাঝামাঝিতে সংঘটিত হয়েছিল। আর এর তিন দিন পর হযরত খাদীজা (রা.) ও ইন্তেকাল করেন। এ কারণেই নবীজি এ বছরটিকে শোকের বছর বলে অভিহিত করেন।

তায়েফে হিজরত

আবু তালেবের মৃত্যুর পর কুরাইশরা সুযোগ পেয়ে যায়। নবীজিকে কষ্ট দেওয়া হতে তারা একটি মুহূর্তও বিরত থাকেনি। যখন মক্কাবাসীদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে নৈরাশ্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন নবীজি ওই বছরই তথা নবুওয়াতের দশম বছর শাওয়াল মাসের শেষ দিকে হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাকে সাথে নিয়ে তায়েফে গমন করেন এবং তায়েফবাসীদেরকে তিনি সত্যের বাণীর দিকে আহবান করেন। দীর্ঘ এক মাস কাল যাবত ক্রমাগত তাদের মাঝে তাবলীগ ও হোদায়েতের কাজে নিয়োজিত থাকেন। কিন্তু একটি লোকের ভাগ্যেও সত্য গ্রহণের তাওফীক জোটেনি। বরং যালেমরা শহরের কিছু বখাটে ও লম্পট ছেলেদেরকে নবীজিকে কষ্ট দেওয়ার জন্য লেলিয়ে দেয়। এই পাষাণ হৃদয় হতভাগারা নবীজির পেছনে লেগে যায়। যদি রহমাতুল্লিল আলামীনের দয়া ও অনুগ্রহ প্রতিবন্ধক না হতো তাহলে তাঁর পবিত্র ঠোঁটের ঈষৎ কম্পনেই তদের সকল উম্মাদনা এবং মত্ততার পরিসমাপ্তি ঘটে যেতে পারত এবং তায়েফ ও তায়েফবাসীদের নাম-নিশানা পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ট হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত পারত।

এই হতভাগারা নবীজির প্রতি এমনভাবে পাথর নিক্ষেপ আরম্ভ করত যে, তাঁর পা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যেত। হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) যেদিক হতেই পাথর আসতে দেখতেন, সেদিকেই তিনি দাঁড়িয়ে নবীজিকে রক্ষা করতেন এবং পাথরের আঘাত নিজে মাথা পেতে নিতেন। আবশেষে হযরত যায়েদ (রা.) এর মাথাও আঘাতে আঘানে রক্তাক্ত হয়ে যায়। অবশেষে দীর্ঘ এক মাস পর রহমতে আমল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তায়েফ হতে এমনভাবে প্রত্যাবর্তন করেন যে, তাঁর পা মুবারক ছিল রক্তে রঞ্জিত; কিন্তু তখনও তাঁর পবিত্র যাবান হতে বদ দুআর একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি।

ইসরা ও মিরাজ

নবুওয়াতের পঞ্চম বছরটি ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যার মধ্যে ফখরুল আম্বিয়া সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক মর্যাদাপূর্ণ শোভাযাত্রার মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়। এই সম্মান সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে শুধুমাত্র নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই অনন্য বৈশিষ্ট। যার সংক্ষিপ্ত ঘটনা নিম্নরূপ :

“এক রজনীতে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কা’বার হাতীমে শায়িত ছিলেন। এমন সময় হযরত জিবরাঈল ও মিকাঈল (আ.) আগমন করে বললেন, “আমাদের সাথে চলুন”। নবীজিকে বোরাকে আরোহণ করানো হলো। যার গতি এতই দ্রুত ছিল যে, যেখানে গিয়ে তার দৃষ্টি পড়ত, সেখানেই গিয়ে তার কদম পড়ত। এমনি দ্রুত গতির সাথে তাঁকে প্রথমে সিরিয়ার আল-আকসা মসজিদে নিয় যাওয়া হলো। এখানে মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলগণকে [মু’জেযা স্বরূপ] নবীজির সম্মান প্রদর্শনের জন্য সমবেত করে রেখেছিলেন। এখানে পৌঁছে হযরত জিবরাইল (আ.) আযান দিলেন এবং সকল নবী-রাসূলগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু সকলে এই অপেক্ষায় ছিলেন যে, নামযের ইমামতি কে করবেন? হযরত জিবরাঈল আমীন নবীজির হাত মুবারক ধরে তাঁকে আগে বাড়ি দিলেন। তিনি সকল নবী-রাসূল ও ফেরেশতাগণের নামাযের ইমামতি করলেন।

এ পর্যন্ত ছিল পার্থিব জগতের সফর, যা তিনি বোরাকে আরোহণ করে পাড়ি দিয়েছিলেন। এরপর ত্রমানুযয়ী তাঁকে আসমানসমূহের ভ্রমণ করানো হয় । প্রথম আকাশে হযরত আদম (আ.) এর সাথে সাক্ষাত হয়। দ্বিতীয় আকাশে হযরত ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.), তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীস (আ.), পঞ্চম আকাশে হারূন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হযরত ইদরীস (আ.) এবং সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর সাথে সাক্ষাত লাভ করেন। (সহীহ বুখারী [ফাতহুল বারীসহ], ১৫, পৃ : ৪৮৫)

এরপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিদরাতুল মুনতাহার দিকে তাশরীফ নিয়ে যান। পথিমধ্যে হাউযে কাউসার অতিক্রম করেন। অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করেন। সেখানে মহান আল্লাহর সেসব অপূর্ব সৃষ্টি ও বিস্ময়কর বিষয়সমূহ অবলোকন করেন, যা আজ পর্যন্ত কোনো চক্ষু দেখেনি, কোনো কান শ্রবণ করেনি এবং কোনো মানুষের চিন্তা ও কল্পনা যে পর্যন্ত পৌঁছেনি। অতঃপর জাহান্নামকে তাঁর সামনে উপস্থিক করা হলো। যা সব ধরণের শাস্তি এবং কঠোর ও তীব্র লেলিহান আগুনে ভরপুর ছিল, যার সম্মুখে লোহা ও পাথরের ন্যায় কঠিনতর বস্তুরও কোন অস্তিত্ব ছিল না।

সেখানে তিনি একদল লোককে দেখতে পেলেন যে, তারা মৃত জন্তু ভক্ষণ করছে। তিনি জানতে চাইলেন এরা কারা? হযরত জিবরইল বললেন “এরা সেসব লোক, যারা লোকদের গোশত ভক্ষণ করত। অর্থাৎ গীবত করত বা পরনিন্দা করে বেড়াত”। অতপর জাহান্নমের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো।

তারপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে অগ্রসর হলেন এবং হযরত জিবরঈল আমীন এখানেই থেমে গেলেন। কেননা এরচেয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি তাঁর জন্য ছিল না।

সে সময় নবীজি মহান আল্লাহর দীদার বা দর্শন লাভ করেন। সঠিক মতানুযায়ী এই দর্শন কেবল অন্তর দ্বারাই নয়; বরং চোখের দ্বারও সম্পন্ন হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সহ সকল মুহাক্কিক সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামগণের অভিমতও তাই।

সেখানে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় লুটে পড়েন এবং মহান আল্লহর সাথে কথোপকথনের সৌভাগ্য লাভ করেন। তখনই [পাঁচ ওয়াক্ত] নামায ফরয হয়।

এরপর তিনি প্রত্যাবর্তন করেন। সেখান থেকে পুনরায় বোরাকে আরোহণ করে মক্কা মোয়াযযমার দিকে ফিরে আসেন।

পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে কুরাইশদের তিনটি বাণিজ্যিক কাফেলার পাশ দিয়ে তিনি অতিক্রম করেন। এদের কোনো কোনো ব্যক্তিকে তিনি সালামও করেন। তাঁরা নবীজির কণ্ঠ চিনতে পারে এবং মক্কায় ফিরে আসার পর এর সাক্ষ্যও প্রদান করে। ভোর হওয়ার পূর্বেই এই বরকতময় সফর সম্পন্ন হয়ে যায়।

নবীজির ইসরা সম্পর্কে চাক্ষুষ সাক্ষ্য

সকাল বেলা কুরাইশদের মধ্যে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয়। কেই হাততালি দিতে থাকে আবার কেউ হতবাক হয়ে মাথায় হাত রাখে। আর কেউ কেউ বিদ্রূপের হাসি হাসতে থাকে। তারপর পরীক্ষার উদ্দেশ্যে সবাই নবীজিকে প্রশ্ন করতে আরম্ভ করে। তারা জানতে চায়, আচ্ছা বলুন দেখি, বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণশৈলী ও তা দেখত কেমন? এবং তা পাহাড় হতে কতটুকু দূরে অবস্থিত? নবীজি এর পুরো নকশা বর্ণনা করে দিলেন। এমনিভাবে তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে আর নবীজি সেগুলোর উত্তর দিতে থাকেন। এমনকি এক পর্যায়ে তারা এমনসব প্রশ্ন করতে আরম্ভ করে, একবার দেখে নেওয়ার দেখে নেওয়ার পরও যেগুলোর উত্তর কেউ দিতে সক্ষম হবে না। যেমন এই মসজিদটির কয়টি দরজা, কতটি তাক ইত্যাদি ইত্যাদি।

বলাবহুল্য যে, এ সকল বিষয় কে গণনা করে রাখে? তাই নবীজি খুবই অস্বস্তি অনুভক করেন। কিন্তু তখনই মু’জেযা স্বরূপ মসজিদে আকসাকে নবীজির সম্মুখে তুলে ধরা হয়। আর তিনি গুণে গুণে সবকিছু বলতে থাকেন। হযরত আবু বকর (রা.) বলে উঠলেন- اَشْهَدُ اَنَّكَ رَسُوْلُ الله অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।

কুরাইশরাও সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল এবং বলতে লাগল যে, মসজিদে আকসার বর্ণনা অবস্থা ও বিবরণ তো তিনি ঠিক ঠিকই বর্ণনা করেছেন। তারপর তারা হযরত আবু বকর (রা.) কে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ [সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এক রাত্রিতে মসজিদে আকসায় পৌঁছে পুনরায় ফিরে এসেছেন? হযরত আবু বকর (রা.) উত্তরে বললেন, আমি তো এর চোইতেও বিস্ময়কর বিষয়ে তাঁকে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি যে, যেখানে সকাল-সন্ধার সামান্য ব্যবধানে আসমানী সংবাদসমূহ তাঁর কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে এই সামান্য ব্যাপারে কি সংশয় হতে পারে? এ কারণেও তাঁর উপধি ‘সিদ্দীক’ রাখা হয়েছে।

স্বয়ং কুরাইশ কাফিরদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য

অতঃপর কুরাইশরা পুনরায় পরীক্ষার উদ্দেশ্যে নবীজিকে প্রশ্ন করল, আচ্ছা বলুন তো, আমাদের অমুক কাফেলাটি যারা সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল, তারা এখন কোথায় আছে? নবীজি বললেন, অমুক গোত্রের একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে আমি ‘রাওহা’ নামক স্থানে অতিক্রম করে এসেছি। তাদের একটি উট হারিয়ে গিয়েছে গিয়েছিল। তারা সবাই উটটির খোঁজে বের হয়েছিল। আমি তাদের হাওদার নিকট গেলে সেখানে কেউ উপস্থিত ছিল না এবং একটি সুরাহীতে পানি রাখা ছিল, আমি তা পান করেছিলাম।

এরপর অমুক গোত্রের বাণিজ্যিক কাফেলাটি আমি অমুক স্থানে অতিক্রম করে আসি। যখন বোরাক তাদের নিকটবর্তী হয়, তখন উটগুলো ভয়ে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে। এদেরে মধ্য হতে যে লাল রংয়ের উটটি সাদা ও কালো রংয়ের দুটি থলে বহন করে চলছিল, সেটি অজ্ঞান হয়ে পড়েই গেল।

তারপর অমুক গোত্রের বাণিজ্যিক কাফেলাটি আমি অতিক্রম করেছি ‘তানঈম’ নামক স্থনে। যার মধ্যে খারী রংয়ের একটি উট ছিল এবং এর পেঠে কালো চট ও দুটি কালো থলে ছিল। এই কাফেলাটি অচিরেই তোমাদের কাছে ফিরে আসবে। লোকেরা প্রশ্ন করল, কবে নাগাদ? নবীজি বললেন, বুধবার নাগাদ এসে যাবে।

সুতরাং ঠিক তেমনি ঘটল, নবীজি যেমনটি বলেছিলেন এবং ঐ কাফেলাগুলোও নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বর্ণনা সত্যতা স্বীকার করল।

যখন কুরাইশদের উপর মহান আল্লাহর সকল দলীল-প্রমাণ সম্পূর্ণ হলো এবং এই বিস্ময়কার ভ্রমণ সম্পর্কে স্বয়ং তাদের জাতি সম্প্রদায়ও সাক্ষ্য প্রদান করল, তখন ঐ বিরুদ্ধবাদীদের জন্যও এ ছাড়া অস্বীকারের আর কোন পথই অবশিষ্ট থাকল না যে, তারা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বরকতময় সফরকে নিছক যাদু এবং তাঁকে [মাআযাল্লাহ] যাদুকর আখ্যা দিয়ে মজলিস হতে উঠে পড়ল।

পবিত্র মদীনায় ইসলাম

একটানা দীর্ঘ দশটি বছর পর্যন্ত নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবের গোত্রসমূহকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। আরবের এমন কোনো মজলিস ও সভা-সম্মেলন তিনি ছাড়েননি, যেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি তাদেরকে সত্যের দাওয়াত দেননি। হজের মৌসুমে, উকায বাজরে এবং যিল-মাজায ইত্যাদিতে ঘরে ঘরে গিয়ে লোকদেরকে সত্যের প্রতি আহবান করতে থাকেন। কিন্তু তারা এর প্রতিউত্তরে নবীজিকে সর্ব প্রকার কষ্ট দিতে এবং ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাকে। তারা বলত, “প্রথমে নিজের গোত্রকে মুসলমান বানান, তারপর আমাদেরকে হেদায়াত করতে আসুন”। এভাবে দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। যখন মহান আল্লাহর ইচ্ছা করলেন যে, ইসলামের প্রচার ও উন্নতি হোক তখন তিনি মদীনার আউস গোত্রের কতিপয় লোককে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন। যাদের মধ্য হতে আসআদ ইবনে যুরারা এবং যাকওয়ান ইবনে আবদে কায়েস এই দুই ব্যক্তি ঐ বছর ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন।

অতঃপর পরবতী বছর ঐ গোত্রেরই আরো কিছু লোক আগমন করেন। যাদের মধ্য হতে ছয় বা আটজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে প্রশ্ন করেন, তোমরা কি আল্লাহর সত্য বাণীর প্রচারে আমার সাহায্য করতে প্রস্তুত আছ? তারা আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! বর্তমানে আমাদের পরস্পরের মধ্যে আউস ও খাযরাজ গোত্রের মাঝে গৃহযুদ্ধ চলছে। আপনি যদি এ সময়ে মদীনায় তাশরীফ নিয়ে যান তাহলে আপনার হাতে বায়আতের ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত হবে না। আপনি আপাততঃ এক বছরের জন্য এ সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখুন। হতে পারে আমাদের পরস্পরে সন্ধি হয়ে যাবে এবং আউস ও খাযরাজ উভয় মিলে ইসলাম গ্রহণ করে নিবে। আগামী বছর আমরা আবার আপনার খেদমতে উপস্থিত হব। তখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। অতঃপর তাঁরা সকলে মদীনায় ফিরে আসেন। মদীনায় সর্বপ্রথম বনূ যুরাইকের মসজিদে কুরআন পাঠ করা হয়।

মদীনায় ইসলামের প্রসার ঘটুক এটাই ছিল মহান আল্লাহর ইচ্ছা। সুতরাং ঐ এক বছরের ভেতরেই আউস ও খাযরাজের অধিকাংশ ঝগড়ার মীমাংসা হয়ে গেল এবং ওয়াদা মাফিক আগামী বছর হজের মৌসুমে ১২ জন লোক মক্কায় নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন। যাদের মধ্য হতে দশজন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের আর দুজন ছিলেন আউস গোত্রের। এদের মধ্য হতে যারা বিগত বছর মুসলমান হননি, তারাও এবার মুসলমান হয়ে গেলেন এবং সবাই নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। এই বায়আত যেহেতু সর্বপ্রথমে আকাবা নামক স্থানের নিকট সম্পন্ন হয়েছিল তাই এটাকে ‘বায়াতে আকাবায়ে উলা বা আকাবার প্রথম বায়আত’ নামে অভিহিত করা হয়। (সীরাতে হালবিয়া : ১ম খণ্ড, পৃ : ৪২)

এই লোকাগুলো মুসলমান হয়ে মদীনায় ফিরে আসলে মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের চর্চা শুরু হয়ে যায় এবং প্রতিটি আসরে-মজলিসে এই একটি কথারই আলোচনা হতে থাকে।

পবিত্র মদীনায় মাদরাসা

মদীনায় পৌঁছে আউস ও খাযরাজের দায়িত্বশীলগণ নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট চিঠি লিখেন যে, আল-হামদুলিল্লাহ! এখানে ইসলামের প্রচার হয়ে গিয়েছে। এখন এমন একজন সাহাবীকে আমাদের নিকট পাঠিয়ে দিন, যিনি আমাদেরকে কুরআন শরীফ পড়াবেন। লোকদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিবেন। আমাদেরকে শরীয়তের আহকাম সম্পর্কে অবহিত করবেন এবং নামাযে আমাদের ইমামতি করবেন। নবীজি হযরত মুসআব ইবনে উমায়ির (রা.) কে কুরআনের শিক্ষা দেওয়ার জন্য মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে ইসলামের সর্বপ্রথম মাদরাসার ভিত্তি মদীনায় স্থাপিত হয়ে গেলে। (সীরাতে হালবিয়া : ১ম খণ্ড, পৃ : ৪০৩)

পরবর্তী বছর হজের মৌসুমে পবিত্র মদীন হতে বিরাট এক কাফেলা মক্কা মোকাররমায় এসে পৌঁছল। যার মধ্যে ৭০ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা ছিলেন। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের স্বাগত জানান এবং রাতের বেলা আকাবার নিকট তাদের সাথে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মধ্যরাতে সবাই জমায়েত হন। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) তাশরীফ নিয়ে এসেছিলেন। [যদিও তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। ]

যখন সবাই সমবেত হলেন তখন হযরত আব্বাস (রা.) উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করে বললেন-

“এই আমার ভাতিজা! [মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সর্বদা নিজ গোত্রে সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করে আসছে। আপনারা যারা তাঁকে মদীনায় নিয়ে যেতে চাইছেন তারা ভেবে দেখুন, যদি আপনারা তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করতে এবং শত্রুদের হাত হতে তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবেন বলে মনে করেন, তবেই কেবল এ দায়িত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসুন। অন্যথায় তাঁকে তাঁর নিজের গোত্রেই থাকতে দিন।

উত্তরে মদীনার কাফেলার সর্দার বলে উঠলেন, নিশ্চয় আমরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করছি এবং তাঁর সাথে কৃত বায়আতের পূর্ণ বাস্তবায়নই আমাদের একমাত্র কাম্য। এ কথা শুনে [অঙ্গীকার এবং বায়আতকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে] হযরত আসআদ ইবনে যুরারা (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, হে মদীনাবাসী! একটু অপেক্ষা কর। তোমরা কি বুঝতে পারছ যে, আজ তোমরা কি বিষয়ে উপর বায়আত করতে যাচ্ছ? বুঝে নাও এই বায়আত গোটা আরব ও অনারবের বিরোধীতা এবং মুকাবিলার অঙ্গীকার। যদি তোমরা এটাকে পূরণ করতে পার তবেই কেবল বায়আত সম্পাদন কর। অন্যথায় নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করে দাও। এ কথা শুনে সাবই এক বাক্যে বলে উঠল, আমরা কোনো অবস্থাতেই এ বায়আত হতে পিছু হটব না। অতঃপর তারা আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি এই অঙ্গীকার পূরণ করি তাহলে আমরা এর কি প্রতিদান লাভ করব? নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত। এ কথা শুনে সবাই বলে উঠল, আমরা এর উপরই সন্তুষ্ট আছি। আপনি আপনার পবিত্র হস্ত প্রসারিত করুন, আমরা বায়আত করব। নবীজি স্বীয় হাত বাড়ালেন আর সকলেই বায়আত লাভে ধন্য হলেন।

মহান আল্লাহই ভালো জানেন এই রাসূলে আমীন সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শুভ দুষ্টি ও সামান্য কয়েকটি কথা ওই লোকগুলোর উপর ক যে প্রভাব বিস্তার করেছিল, একটি মাত্র সাহচর্যের বরকতেই সকল পার্থিব সম্পর্ক এবং সম্মান ও সম্পদের মোহ অন্তর থেকে বের হয়ে দিয়ে সেখানে শুধুমাত্র এক মহান আল্লাহর ভালোবাসার রঙ এতটাই গাঢ় হয়ে উঠল যে, জান মাল, মান-সম্মান সবকিছু এর বিনিময়ে কুরবান করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত হয়ে গেলেন। আর এর ছাপ তাঁদের পরবর্তী সন্তান-সন্ততি পর্যন্ত অব্যাহত থাকল।

এ প্রসঙ্গে উক্ত বায়আতে উপস্থিত হযরত উম্মে আম্মারার সন্তান হযরত হুবাইবের ঘটনা যে, মিথ্যা নবুওয়াতের দাবীদার মুসাইলামা কাযযাব তাঁকে গ্রেফতার করে নেয় এবং নানা রকমের অকথ্য নির্যাতনের মধ্যে লিপ্ত রেখে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাঁকে হত্যা করে ফেলে। কিন্তু এই অঙ্গীকারের বিপক্ষে একটি শব্দও তাঁর মুখ হতে বের করাতে সক্ষম হয়নি। এই জালেম তাঁকে জিজ্ঞেস করত, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ [সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] আল্লাহর রাসূল? তিনি বলতেন, অবশ্যই। তখন সে পুনরায় জিজ্ঞেস করত, তুমি কি এ কথারও সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসূল? তখন তিনি উত্তরে বলতেন, কখনোই আমি এ সাক্ষ্য দেই না। তখন সে তাঁর অঙ্গ কেটে ফেলতে। অতঃপর আবারও সে এভাবে প্রশ্ন করত আর তিনি তার নবুওয়াতের অস্বীকার করতেন। তখন ঐ হতভাগা তাঁর আরেকটি অঙ্গ কেটে ফেলত। এভাবে একটি একটি অঙ্গ করে তাঁর সমস্ত শরীর টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল। (সীরাতে হালবিয়া, পৃ : ৪৭০৯)

মোটকথা, তিনি শহীদ হয়ে গেলেন; অথচ শরীয়তের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও তিনি ইসলামের অঙ্গিকারের বিপক্ষে একটি শব্দও যবান থেকে বের করেননি।

اگرچہ خر من عمرم غم تو بباد ۞ بخاک فائے عزیزت کہ عہد نشکستم

তোমার বাসনা বিলাস, যদিও আমায় করেছে বিনাশ,

তব চরণের শপথ তোমার, ভঙ্গ করব না আমি অঙ্গীকার।

অতঃপর তাঁরা সকলেই বায়আত গ্রহণ করলেন। এই বায়আতে অংশ গ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন মহিলা। এই বায়আতের নাম, ‘বায়আতে আকাবায়ে ছানিয়াহ’ বা আকাবার দ্বিতীয় বায়আত। এরপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের মধ্য হতে ১২ জন ব্যক্তিকে পুরো কাফেলার দায়িত্বশীল বানিয়ে দিলেন। (হালবিয়া, পৃ : ৪১১)

মদীনায় হিজরতের সূচনা

কুরাইশরা যখন এই বায়আত সম্পর্কে সংবাদ পেল তখন তাদের ক্রোধের অন্ত রইল না। তারা মুসলমানদের কষ্ট ও নির্যাতনের কোনো পন্থা ও সুযোগই আর বাকী রাখল না। তখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের মদীনায় হিজরতের পরমর্শ দিলেন। সাহাবাগণ কুরাইশদের দৃষ্টি এড়িয়ে গোপনে গোপনে একজন দুজন করে মক্কা হতে মদীনায় দিকে হিজরত করতে আরম্ভ করলেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত মক্কায় শুধু নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.), হযরত আলী (রা.) এবং কিছু সংখ্যক অক্ষম লোক ব্যতীত আর কোন মুসলমানই অবশিষ্ট থাকল না। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.)ও হিজরতের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; কিন্তু তাঁকে বললেন, এখন থেকে যাও, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ আমাকেও হিজরতের অনুমতি প্রদান করেন। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) এই অপেক্ষায়ই থাকলেন এবং এ সফরের উদ্দেশ্যে দুটি উষ্ট্রীও প্রস্তুত করে রাখলেন। একটি নিজের জন্য আর অপরটি নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ৩১)

নবীজির মদীনায় হিজরত

কুরাইশের কাফিররা কখন সমগ্রিক বিষয় জানতে পারল, তখন তারা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘দারুন নাদওয়া’তে সমবেত হলো। কেউ তাঁকে বন্দী করার পরামর্শ দিল। আর কেউ তাঁকে দেশান্তর করে দেওয়ার পরামর্শ দিল। তবে তাদের ধূর্ত লোকেরা বলল, এগুলোর কোনটিই করা উচিত হবে না। কেননা বন্দী করা হলে তাঁর সমর্থক ও সাথীগণ আমাদের উপর চড়াও হবে এবং আমাদের কাছ থেকে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। আর দেশান্তর করা হলে তা হবে আমাদের জন্য একেবারেই ক্ষতিকর। কেননা এমতাবস্থায় মক্কার আশ-পাশের সমস্ত আরবরা তাঁর উত্তম চরিত্র, মিষ্টি কথা এবং পবিত্র কালামের অনুরক্ত হয়ে উঠবে এবং তিনি তাদের সবাইকে নিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করে বসবেন। (সীরাতে মোগলতাঈ)

তাই হতভাগা আবু জাহল এ পরামর্শ দিল যে, তাঁকে হত্যা করা হোক এবং এ হত্যায় প্রত্যেক গোত্রের একজন করে লোক অংশ গ্রহণ করুক। যাতে বনূ আবদে-মানাফ [নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গোত্র] এ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে যায়। উপস্থিত সবাই এ প্রস্তাব পছন্দ করল এবং প্রত্যেক গোত্র হতে একজন করে যুবককে এ কাজের জন্য নিযুক্ত করা হলো। তাদেরকে বলে দেওয়া হলো যে, অমুক রাতে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে।

এ দিকে মহান আল্লাহ তাআলা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলেন এবং তাঁকে হিজরতের নির্দেশ দিলেন। যে রাতে কুরাইশ কাফিরা নিজেদের হীন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করার ইচ্ছা করল এবং বিভিন্ন গোত্রের বহু যুবক নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরের চারদিক ঘেরাও করে বসল, ঠিক সেই মুহূর্তেই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং হযরত আলী (রা.) কে নির্দেশ দলেন, তিনি যেন নবীজির চাদর মুড়ি দিয়ে নবীজির খাটিয়ায় শুয়ে থাকেন। যেন কাফিররা তাঁর ঘরে না থাকার ব্যাপারটি আঁচ করতে না পারে।

এরপর যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন, তখন তাঁর দরজায় কুরাইশ কাফিরদের এক মেলা জমে গিয়েছিল। তিনি সূরা ইয়াসীন পড়তে পড়তে বের হলেন। যখন فَاَغْشَیْنٰهُمْ فَهُمْ لَا یُبْصِرُوْنَ এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন এই আয়াতটিকে তিনি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলেন। ফলে মহান আল্লাহ কাফিরদের চোখের উপর পর্দা ফেলে দিলেন। তারা নবীজিকে দেখতে পেল না। তিনি হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) এর ঘরে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। হযরত সিদ্দিকে আকবর (রা.) আগ থেকেই প্রস্তুত ছিলেন এবং একজন রাহবরকেও নিজের সাথে চলার জন্য প্রস্তুত করে রাখলেন। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) নবীজির সঙ্গী হলেন এবং তাঁরা উভয়ে বাড়ির পেছন দিকের একটি ছোট দারজার পথে বের হয়ে সাওর পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। [সাওর হলো মক্কার নিকটবর্তী একটি পাহাড়]

সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থান

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম [হযরত আবু বকরসহ] সাওর পাহাড়ের একটি গুহায় গিয়ে অবস্থান করেন। এ দিকে কুরাইশ যুবকরা সকাল পর্যন্ত নবীজির ঘর হতে বের হয়ে আসার অপেক্ষা করতে থাকল। অবশেষে তারা যখন জানতে পারল যে, সেখানে নবীজির বিছানায় হযরত আলী (রা.) শুয়ে আছেন তখন তারা সীমাহীন পেরেশান হয়ে গেল এবং চতুর্দিকে নবীজির সন্ধানে নিজেদের চর প্রেরণ করল। নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে গ্রেফতার করে নিয়ে আসতে পারবে, তাকে উপহার হিসেবে একশত উট প্রদানের সিদ্ধান্ত হলো। বহু লোক নবীজির তালাশে নেমে পড়ল। কতিপয় পদচিহ্ন বিশারদ ব্যক্তি নবীজির পদ-চিহ্ন ধরে খোঁজ করতে করতে ঠিক ঐ গুহার কিণারা পর্যন্তও পৌঁছে গেল। সামান্য একটু নুয়ে তাকালেই তারা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরিষ্কার দেখতে পেত। ঐ সময়ে হযরত সিদ্দীকে আকবর বিচলিত হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, “ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় মহান আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন”। মহান আল্লাহর কি মহিমা! কাফিরদের দৃষ্টি ঐ গুহা হতে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হল এবং কেউ এতটুকুও ঝুঁকে তাকায়নি। বরং তাদের সব চাইতে ধূর্ত ব্যক্তি উমাইয়া বিন খলফ বলে উঠল, “এখানে তাঁর থাকাটা অসম্ভব”। কেননা মহান আল্লাহ নির্দেশে এই গুহার প্রবেশ পথে রাতারাতি মাকড়শা জাল বুনে রেখেছিল এবং বন্য কবুতর কোথা হতে এসে বাসা তৈরি করে ফেলেছিল।

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত আবু বকর (রা.) ঐ গুহায় একটানা তিনরাত আত্মগোপন করে থাকলেন। এমনকি অন্বেষণকারীও নিরাশ হয়ে বসে পড়ল।

এই তিনি দিনই প্রত্যেহ রাতের অন্ধকারে হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) এর পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ গোপনে তাঁদের কাছে আসতেন এবং ভোর হবার আগেই আবার মক্কায় ফিরে যেতেন। দিনভর কুরাইশদের খবরাদী সংগ্রহ করে রাতে গিয়ে তা নবীজির নিকট বর্ণনা করতেন। আর তাঁর বোন হযরত আসমা বিনতে আবী বকর (রা.) প্রতি রাতে তাঁদের নিকট খানা পৌঁছে দিতেন। যেহেতু আরবের লোকেরা পদচিহ্ন খুব ভালো করে চিনত তাই পদচিহ্নগুলো যেন মুছ যায় এই উদ্দেশ্যে হযরত আব্দুল্লাহ প্রত্যেহ ঐ গুহা পর্যন্ত বকরীগুলো চরাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর গোলামকে বলে রেখেছিলেন।

সাওর গুহা হতে মদীনার দিকে যাত্রা

সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থানের তৃতীয় দিন ৪ঠা রবিউল আউয়াল সোমবার দিন হযরত সিদ্দীকে আকবরের আযাকৃত গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা (রা.) সেই দুটি উষ্ট্রী নিয়ে পৌঁছলেন, যেগুলোকে এই সফরের জন্যই হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) প্রস্তু করে রেখেছিলেন। তাঁর সাথে আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকীতও গিয়ে পৌঁছেছেন, যাকে তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পথ দেখানোর জন্য সাথে নিয়েছিলেন।

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি উষ্ট্রীর উপর সওয়ার হলেন এবং হযরত আবু বরক (রা.) অপরটির উপর। হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.) খেদমতের জন্য আমের ইবনে ফুহাইরকেও নিজের সাথ বসিয়ে নিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকীত রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে আগে চলছিল। (হালবীয়া)

সুরাকা’র উপস্থিতি ও তার ঘোড়ার মাটিতে ধসে যাওয়া

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় কুরাইশী দূতগণের মধ্য হতে সুরাকা ইবনে মালেক নবীজির সন্ধান করতে করতে সেখান পর্যন্ত পৌঁছে গেল। যখন সে নবীজির নকটবর্তী হল তার ঘোড়াটি হোঁচট খেল এবং সুরাকা ঘোড়ার পিঠ হতে পড়ে গেল। কিন্তু সে পুনরায় ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে নবীজির পেছনে ধাওয়া করল এবং এতটুকু কাছে চলে এল যে, নবীজির কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ সে শুনতে পাচ্ছিল। ঐ সময় সিদ্দিকে আকবর (রা.) বারবার পেছনে ফিরে তার গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। কিন্তু নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রতি ভ্রূক্ষেপও করলেন না। যখন সে একেবারে কাছে এসে গেল তখন তার ঘোড়ার চারটি পা-ই শুষ্ক ও শক্ত মাটিতেই হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে গেল এবং সুরাকা আবারও যমীনে ছিটকে পড়ল।

সে প্রাণপণ চেষ্টা করেও ঘোড়াটিকে বের করতে ব্যর্থ হলো। অবশেষে বাধ্য হয়ে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সাহায্য চাইল। তিনি থেমে গেলেন এবং তাঁর বরকতে ঘোড়টি মাটির ভেতর হতে উঠে আসল। (সীরাতে মোগলতাঈ)

যখন ঘোড়াটি পা যমীন হতে বের হলো তখন তার পায়ের জায়গা হতে এ ধরনের ধোঁয়া বের হতে দেখা গেল। এটা দেখে সুরাকা আরো বেশি হতবাক হয়ে গেল এবং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তার সমুদয় পাথেয়, উপস্থিত আসবাব-পত্র এবং উট ইত্যাদি সবকিছু রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পেশ করতে লাগল। নবীজি এসব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, যেহেতু তুমি ইসলাম গ্রহণ করনি, তাই আমি তোমার সম্পদ গ্রহণ করতে পারি না। ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট যে তুমি আমাদের অবস্থান কাউকেও বলবে না। সুরাকা সেদিক হতে ফিরে আসল এবং সেয পর্যন্ত নবীজির ক্ষতির আশঙ্কা ছিল, সে কারও নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করেনি। (হলবিয়া, ১ম খণ্ড, পৃ : ৪৩৬)

সুরাকার যাবনে নবীজির নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি

কিছু দিন যাওয়ার পর সুরাকা আবু জাহেলের নিকট উক্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছিল। যেগুলোর অনুবাদ নিম্নরূপ-

হে আবু হিকাম! লাত দেবতার শপথ করে বলছি, তুমি যদি আমার ঘোড়াটির পা হাঁটু পর্যন্ত যমীনে ঢুকে পড়ার দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে, তাহলে তুমি বুঝতে পারতে এবং এব্যাপারে তোমার কোনো সন্দেহ থাকত না যে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সুস্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং এমন কে আছে যে তার সমকক্ষ হতে পারে? কাজেই আমার মতে তোমরা জন্য উচিত হবে লোকদেরকে তাঁর বিরোধীতা হতে ফিরিয়ে রাখা। কেননা আমি দেখতে পাচ্ছি যে একদিন তাঁর বিজয়ের নিদর্শনসমূহ ভাস্বর হয়ে উঠবে। তখন সকল মানুষই এই কামনা করবে যে, যদি আমরা তাঁর সাথে সন্ধি করে নিতাম তাহলে কতইনা ভালো হতো! (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ৩৫)

নবীজির মু’জেযা এবং উম্মে মা’বাদ ও তাঁর স্বামীর ইসলাম গ্রহণ

মদীনার পথে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে মা’বাদ বিনতে খালেদ নাম্নি জনৈক মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তার যে বকরীগুলো ইতিপূর্বে একদম দুধ দিত না, নবীজি সেগুলোর স্তনে হাত বুলিয়ে দিলে তা দুধে ভরে উঠল। যা থেকে তিনি নিজেও পান করলেন এবং তাঁর সফর সঙ্গীদেরও পান করালেন। আর এই বরকত তেমনি অব্যাহত থাকল। নবীজি বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর উম্মে মা’বাদের স্বামী বাড়ি ফিরলেন এবং বকরীর দুধ সম্পর্কিত এ আশ্চর্য ঘটনা দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে উম্মে মা’বাদ বললেন, আজ আমাদের এখানে অত্যন্ত ভদ্র ও সম্মাতিন এক যুবক কিছুক্ষণের জন্য মেহমান হয়েছিলেন। এসব তাঁরই পবিত্র হাতের বরকত। এ কথা শুনে তার স্বামী বললেন, আল্লাহর শপথ! একে তো মক্কার সেই বুযর্গ বলেই মনে হচ্ছে। এক বর্ণনায় রয়েছে, এরপর এই বেদুইন দম্পতিও হিজরত করে মদীনায় চলে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

কুবায় অবতরণ

এখনে থেকে রওয়ানা হয়ে নবীজি কুবায় পৌঁছলেন। [এটা মদীনার অদূরে একটি স্থান]। আনসারগণ যখন থেকে নবীজির আগমনের সংবাদ পেয়েছিলেন তখন থেকেই প্রত্যেহ তাঁর সম্বর্ধনার জন্য নিজেদের মহল্লা হতে বের হয়ে আসতেন। সেদিনও তারা যথারীতি অপেক্ষা করে ফিরে গিয়েছিলেন। তখন হটাৎ একটি আওয়াজ শোনা গেল যে, এতদিন পর্যন্ত তারা যার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি তাশরীফ নিয়ে এসেছেন।

নবীজিকে তাশরীফ নিয়ে আসতে দেখে সকলেই বিপুল উদ্দীপনার সাথে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করলেন। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সহচরগণ কুবায় ১৪ দিন অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি কুবায় একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এটাই সর্বপ্রথম মসজিদ যা ইসলাম প্রচারিত হবার পর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

হযরত আলী (রা.)-এর হিজরত ও কুবায় সাক্ষাৎ

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমানদারী যেহেতু কাফিরদের মাঝেও স্বীকৃত ছিল তাই অধিকাংশই তাঁর নিকট আমানত গচ্ছিত রাখত। হিজরতের সময় এ কারণেই তিনি হযরত আলী (রা.) এক মক্কায় ছেড়ে এসেছিলেন যে, তাঁর নিকট গচ্ছিত আমানতসমূহ মানুষর হাতে পৌঁছে যান।

ইসলামী সন ও তারীখের সূচনা

ঐ সময় নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে হযরত ওমর (রা.) ইসলামী সন ও তারিখের সূচনা করেন এবং ‘মুহাররম’কে এর প্রথম মাস নির্ধারণ করেন।

নবীজির পবিত্র মদীনায় প্রবেশ

রবিউল আউয়াল মাসের জুমআর দিন কুবা হতে বিদায় নিয়ে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। মদীনার আনসারগণ আনন্দে উদ্ধেলিত হয়ে নবীজির সওয়ারী চারপাশ ঘিরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কেউ পায়ে হেঁটে আবার কেউ বা বাহনে সাওয়ার হয়ে চলছিলেন। নবীজির উষ্ট্রীর লাগাম ধরার জন্য প্রত্যেকেই সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। নবীজি যেন তাদের ঘরেই অবস্থান করেন এটাই ছিল প্রতিটি আনসারীরর মনের বাসনা। নারী ও শিশুরা আনন্দে তারাণা গাইছিল। যেহেতু এই দিনটি ছিল জুমআর দিন তাই বনী সালেম ইবনে আউফের বসতীর নিকট জুমআর নাযের সময় হয়ে গেলে তিনি সাওয়ারী থেকে নেমে জুমআর নামায আদায় করে পুনরায় সওয়ার হয়ে সামনের দিকে চললেন। এখন যে আনসারীর বাড়িই সামনে পড়ত তিনি নবীজিকে অনুরোধ করে বলতেন, আমর গরিবখানায় অবস্থান করুন হে রাসূলুল্লাহ! কিন্তু নাবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা আমার উষ্ট্রীকে নিজের মতো চলতে দাও, সে মহান আল্লাহর পক্ষ হতে আদেশ প্রাপ্ত। যে জায়গায় অবস্থানের জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়ে নিজেই থেমে যাবে। সুতরাং উষ্ট্রীটি সেভাবেই চলতে থাকল। অবশেষে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতুল বংশ বনী আদী ইবনে নাজজারের এলাকায় হযরত আবু আইউব আনসারী (রা.) এর বাড়ির সমনে গিয়ে উষ্ট্রী বসে পড়ল। নবীজি হযরত আবু আইউব আনসারী (রা.) এর মেহমান হলেন এবং বেশ কিছুদিন তাঁর ঘরেই অবস্থান করলেন।

মসজিদে নববী নির্মাণ

তখন পর্যন্ত মদীনায় কোনো মসজিদ ছিল না। যেখানে সুযোগ হতো সেখানেই নমায আদায় করে নেওয়া হতো। এরপর ঐ জায়গাটি ক্রয় করে নেওয়া হল যেখানে উষ্ট্রীটি বসেছিল। আর সে জায়গায় মসজিদে নববী নির্মাণ করা হল। এর দেওয়ালগুলো ছিল কাঁচা ইটের তৈরি, খুঁটি ছিল খেজুর বৃক্ষের আর ছাদ ছিল খেজুর শাখা দ্বারা নির্মিত। কিবলার রুখ রাখা হয়েছিল বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে। [যা তখন মুসলমানদের কিবলা ছিল। ]

মসজিদের সাথে দুটি হুজরাও তৈরি করা হলো। একটি হযরত আয়েশার (রা.)এর জন্য আর অপরটি হলো হযরত সাওদা (রা.)-এর জন্য। এরপর নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পরিবার পরিজনকে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য এক ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করেন। ঐ সময় হযরত আবু বকর (রা.)ও নিজের পরিবার-পরিজনের সবাইকে মদীনায় ডেকে নিয়ে আসেন।

সুতরাং উম্মুল মুমিনীন হযরত সাওদা (রা.) এবং দুই কন্যা হযরত ফাতেমা ও উম্মে কুলসুম (রা.) মদীনায় এসে যান। তৃতীয় কন্যা হযরত যয়নবকে তাঁর স্বামী আবুল আস [যিনি তখনও মুসলমান হননি] মদীনায় আসতে দেননি। এদিকে হযরত সিদ্দীকে আকবর (রা.)এর ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ তাঁর মাতা এবং দুই বোন হযরত আয়েশা (রা.) ও হযরত আসমা (রা.) কে সাথে নিয়ে মদীনায় এসে পৌঁছেন। এখন মক্কায় শুধু এরূপ কতিপয় মুসলমান অবশিষ্ট রয়ে যান, যারা শরীরিকভাবে সফর করতে অক্ষম। বরং এদের মধ্য হতে এমন কিছু লোকও মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন, পথিমধ্যে যাদের মৃত্যু এসে যায়।

প্রথম হিজরী

ইসলামে জিহাদের নির্দেশ ও অনুমোদন

নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ৫৩ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন-চিত্র পাঠকের সামনে চলে এসেছে। যার মধ্যে কিছুটা বিশ্লেষণসহ জানা গিয়েছে যে, পৃথিবীতে ইসলামের প্রসার কিভাবে হয়েছিল? হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত এই যে প্রতিটি শ্রেণী ও গোত্রের হাজার হাজার মানুষ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে এমন পাগলপারা হয়ে ছিলেন যে, তারা ইসলাম ও ইসলামের নবীকে নিজেদের সহয়-সম্পত্তি, বাপ-দাদা, স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষা বরং নিজের প্রাণের চাইতেও অধিক প্রিয় মনে করতেন। তাদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কারণ কি ছিল? রাষ্ট্রীয় পার্যয়ে জোর-জবরদস্তি? ধন-ম্পদের লোভ? সম্মান-প্রতিপত্তির মোহ কিংবা কোনো সশস্ত্র বাহিনীর তারবারীর ভয় তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিল? নাকি পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল?

কিন্তু যখন ঐ নিরক্ষর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম [তাঁর উপর আমার পিতা মাতা কুরবান হোক] এর পবিত্র জীবনীর অবস্থাদির প্রতি দৃষ্টি বুলানো হয় তখন দ্ব্যর্থহীনভাবেই এগুলোর নেতিবাচক উত্তরই পাওয়া যায়। এটাতো একেবারে স্পষ্ট যে, ঐ ইয়াতীম সন্তানটি, যার দুনিয়ায় আগমনের পূর্বেই আপন পিতার স্নেহছায়া মাথার উপর থেকে উঠে গিয়েছিল, যাকে শৈশবের ছয় বছর বয়সে মা জননীর স্নেহ-মমতার ক্রোড় হতেও বঞ্চিত হতে হয়েছিল, যার ঘরে মাসের পর মাস পর্যন্ত আগুন জ্বালানোর সুযোগ আসত না, যার পরিবার-পরিজন কোন দিন পেট ভরে খেতে পারত না, যার হাতেগোনা জীবিত আত্মীয়-স্বজনও একটিমাত্র সত্যের বাণী উচ্চারণ করার অপরাধে শুধু যে তাঁর কাছ হতে দূরে সরে গিয়েছে তাই নয়; বরং তাঁর কঠিন শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। তিনি কি কারো উপর রাজত্ব কায়েম করার লোভ করতে পারেন? অথবা সম্পদের লোভ দেখিয়ে কিংবা তরবারীর জোর খাটিয়ে কাউকেও স্বীয় মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন?

এতদ্ব্যতীত ইতিহাসের বিরাট দফতার আমাদের সামনে পড়ে আছে যার মধ্যে সর্বসম্মতভাকে বিদ্যমান রয়েছে যে, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের ৫৩ টি বছর এমনভাবে অতিবাহিত হয়েছে যে, প্রথম জীবনের সহায়-সম্বলহীনতা ও অসহায়ত্বের পরে ইসলাম যখন অনেকটা প্রকাশ্য-শক্তির অধিকারীও হয়ে উঠেছিল এবং বড় বড় বীরযোদ্ধা ও বিত্তশালী সাহাবী ইসলামে দীক্ষিতও হয়েছিলেন তখনও ইসলাম কোনো কাফিরের গায়ে হাত উঠায়নি; বরং অত্যাচারীদের অত্যাচারের কোনো জবাব পর্যন্ত দেয়নি।

অথচ মক্কার কাফিরদের পক্ষ হতে শুধু নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই নয়; বরং তাঁর সংশ্লিষ্ট সকল আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন এবং বন্ধু-বান্ধব ও অনুসারী-অনুরাগীদের উপর এমন অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে যা বলে বা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সব ধরনের শক্তি ও সামর্থ্যের অধিকারী কুরাইশ কাফিররা নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্যাতনে; এমনকি তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে সম্ভাব্য কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেনি। যেমন তিন বছর পর্যন্ত নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের সকল অনুসারী অনুরাগীগণসহ অবরুদ্ধ থাকা, তাঁর সাথে গোটা কুরাইশের পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদ, তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র এবং সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বিভিন্ন প্রকার নির্যাতন ইত্যাদি যা আপনারা অবহিত হয়েছেন।

এসব কিছু সত্ত্বেও কুরআন তার অনুসারীদেরকে ধৈর্য ও দৃঢ়তা অবলম্বন ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতিই দিচ্ছিল না। অবশ্য তখন যে জিহাদের নির্দেশ ছিল তা হলো, কাফিরদেরকে হেকমত ও উপদেশমূলক কথার মাধ্যমে স্বীয় রবের দিকে আহবান কর। আর যদি পারস্পরিক বিতর্কের উদ্ভব হয়, তাহলে উত্তম কৌশল ও নম্র কথার মাধ্যমেই তাদের মুকাবিলা কর। আর কুরআনের প্রকাশ্য দলীল প্রমাণের মাধ্যমে তাদের সাথে পূর্ণ জিহাদ কর, যেন তারা সত্যকে অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

এই সময় পর্যন্ত যে হাজারো মানুষ ইসলামের দলভুক্ত হয়ে সব ধরণের নিপীড়নের নিশানায় পরিণত হওয়ার উপর সম্মত হয়েছিলেন, বলা বাহুল্য যে, তারা দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসা অথবা রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ কিংবা তরবারীর জোরে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য হতে পারেন না। এই প্রকাশ্য বাস্তবতা দেখার পরেও কি ঐ লোকগুলো মহান আল্লাহর নিকট লজ্জিত হবে না, যারা ইসলামের প্রকৃত বাস্তবতার উপর পর্দা নিক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে বলে বেড়ায় যে, ইসলাম তরবারীর জোরে প্রসারিত হয়েছে! তারা কি এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারবে যে, ঐ সকল তরবারী চালনাকারীদের উপর কে তরবারী চলিয়েছিল? যারা কেবল মুসলমান হয়নি; বরং ইসলামের প্রয়োজনে তরবারী পর্যন্ত ধারণ করতে এবং হাসিমুখে নিজের জবিন পর্যন্ত বিপন্ন করতে সদা প্রস্তুত ছিলেন। তারা কি বলতে পারে যে, হযরত আব বকর (রা.), ফারুকে আযম (রা.), উসমান গনী (রা.) এবং আলী মুরতাযা (রা.) এর উপর কে তারবারী চালিয়ে তাদেরকে মুসলমান বানিয়েছিল? হযরত আবু যর (রা.), হযরত উনাইস (রা.) এবং তাঁদের গোত্রকে কে বাধ্য করেছিল যে, তাঁরা সবাই এসে মুসলমান হয়ে গেলেন? যামাদ আযদীকে কে বাধ্য করেছিল? তোফায়েল ইবনে আমর দাওসী ও তাঁর গোত্রের উপর কে তরবারী চালিয়েছিল? বনী আব্দুল আশহালের উপর কে চাপ সৃষ্টি করেছিল? মদীনার আনাসরগণের উপর কে শক্তি প্রয়োগ করেছিল যে, তাঁরা শুধু ইসলাম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি; বরং নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজেদের কাছে ডেকে এনে সকল দায়িত্ব নিজেদের মাথায় তুলে নিলেন এবং নিজেদের জান-মাল তাঁর জন্য উৎসর্গ করে দিলেন? বুরাইদা আসলামীকে কে বাধ্য করেছিল যে, তিনি ৭০ জন লোকের বিরাট কাফেলাসহ মদীনার পথে নবীজির খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং স্বেচ্চায় ও সাগ্রহে মুসলমান হয়ে গেলেন? হবশার বাদশা নাজ্জশীর উপর কোন তরবারী চলছিল যে, তিনি তাঁর বাদশাহী ও দোর্দণ্ড প্রতিপত্তি সত্ত্বেও হিজরতের পূর্বেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন? আবু হিন্দ, তমীম এবং নাঈম প্রমুখের উপর কে শক্তি প্রয়োগ করেছিল যে, তাঁরা সিরিয়া হতে সফর করে নবীজির খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর গোলামী বরণ করে নিলেন? এ ধরনের শত শত ঘটনা রয়েছে, যেগুলো দ্বারা ইতিহাসের পাতা পরিপূর্ণ হয়ে আছে। এগুলো এমন অনস্বীকার্য বাস্তব যা প্রতক্ষ করার পর কেউ এ বিশ্বাস পোষণ না করে থাকতে পারে না যে, “ইসলাম স্বীয় মহিমা প্রচারে তরবারীর মুখাপেক্ষী নয়”।

ইসলাম স্বীয় মহিমা প্রচারে তরবারীর মুখাপেক্ষী নয়

জিহাদ ফরজ হওয়ার উদ্দেশ্য কস্মিনকালেও এটা হতে পারে না যে, মানুষের গলায় তরবারী রেখে তাদেরকে মুসলামন হওয়ার জন্য বাধ্য করা হবে অথবা কোনো ধরনের বল প্রয়োগ করে তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করানো হবে। জিহাদের সাথে সাথে জিযিয়া-করের বিধি-বিধান এবং কাফিরদেরকে যিম্মী ব্যবস্থার অন্তুর্ভুক্ত করে ঠিক মুসলমানের মতোই তাদের জান-মাল হেফাযত সংক্রান্ত ইসলামী বিধি-বিধান নিজেই এর সাক্ষ্য বহন করে যে, জিহাদ ফরজ হওয়ার পরও ইসলাম কখনও কোনো কাফিরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বাধ্য করেনি। তাই একজন ন্যায়-নিষ্ঠবান ব্যক্তির জন্য অবশ্য কর্তব্য হলো, তিনি শান্ত মনে চিন্তা করবেন যে, ইসলামে কি উদ্দেশ্যে এবং কি কি উপকারিতার নিমিত্তে জিহাদ ফরজ করা হয়েছে? তাহলে তিনি অবশ্যই বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, যেমনিভাবে সেই ধর্মমতকে পূর্ণাঙ্গ মনে করা যায় না, যা মানুষের গলায় ফাঁস লাগিয়ে বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের নিজের মতাদর্শের দিকে টেনে নিয়েছে। তেমনিভাবে ঐ ধর্মও পরিপূর্ণ নয়, যার মধ্যে রাজনীতির স্থান নেই। আর সেই রাজনীতিও পূর্ণঙ্গ নয় যার সাথে তরবারীর সম্পর্ক নেই।

রাজনীতি বিবর্জিত ধর্ম এবং অস্ত্রবিবর্জিত রাজনীতি পূর্ণাঙ্গ নয়

ঐ চিকিৎসক নিজের পেশায় কখনও দক্ষ হতে পারে না, যে শুধু মলম লাগাতেই কিংবা ব্যাণ্ডেজ বাঁধতেই জানে; কিন্তু গলিত-অকেজো অঙ্গসমূহের অপারেশন বা অস্ত্রপাচার জানে না।

كوئی عرب کی ساتھ ہو یا عجم کی ساتھ

کچھ بھی نہیں ہے تیغ نہ ہو جب قلم کی ساتھ

আরব বা অনারব থাক যে দলেরই সাথে

হবে না কিছুই, যদি না থাক তারবারী কলমের সাথে।

বুঝুন এবং খুব ভালো করে অনুধাবনের চেষ্টা করুন, যখন পৃথিবীর গোটা দেহ জুড়ে শিরকের বিষাক্ত রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা একটি ব্যাধিগ্রস্ত দেহের ন্যায় হয়ে পড়েছে তখন পরম করুণাময় আল্লাহ এটাকে ব্যাধিমুক্ত করার লক্ষ্যে একজন সংস্কারক ও দরদী চিকিৎসক [মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-কে প্রেরণ করলেন। তিনি তার জীবনের ৫৩ বছর বিরামহীনভাবে প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ ও প্রতিটি শিরা-উপশিরা নিরাময় করে তোলার জন্য চিন্তা ও চেষ্টা-সাধনা করেছেন। যার ফলে সংশোধনযোগ্য অঙ্গগুলো সুস্থ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিছু অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেগুলো একেবারেই পঁচে গিয়েছিল এবং সেগুলোর সেরে উঠার আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকল না। বরং প্রতি মুহূর্তে এগুলোর সেরে উঠার আর কোন উপায়ই অবশিষ্ট থাকল না। বরং প্রতি মুহূর্তে এগুলোর বিষক্রিয়া সমগ্র দেহে সংক্রমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিল, তখন প্রাজ্ঞময় মূলনীতি অনুযায়ী অপারেশনের মাধ্যমে ঐ ব্যধিগ্রস্ত অঙ্গসমূহকে কেটে ফেলাই ছিল যথার্থ করুণা ও প্রজ্ঞার তাগিদ। এটাই জিহাদের প্রকৃত তাৎপর্য এবং সকল আক্রণাত্মক ও প্রতিরোধমূলক অভিযানের উদ্দেশ্য।

এ কারণেই সমর ক্ষেত্রে তুমুল যুদ্ধ চলাকলেও ইসলাম তার প্রতিপক্ষের কেবল ঐ সকল লোককেই হত্যার অনুমতি প্রদান করেছে, যাদের ব্যাধি ছিল সংক্রামক। অর্থাৎ যারা ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা করত এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো। কিন্তু তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত নারী, শিশু এবং সে সকল বৃদ্ধ ও ধর্মীয় পণ্ডিতগণ যারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করত না, তারা তখনও মুসলমানদের তরবারী হতে নিরাপদ ছিল। এমনকি যেসব লোক কোনো চাপোর মুখে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে আগমন করত তারাও মুসলমানদের হাত থেকে নিরাপদ থাকত। হযরত ইকরামাহ (রা.) বলেন, বদর যুদ্ধে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদি বনী হাশেম গোত্রের কোনো লোক তোমাদের সামনে এসে পড়ে, তবে হত্যা করবে না। কারণ সে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়নি; বরং তাকে জোর করে আনা হয়েছে। (কানযুল উম্মাল : ৫ম খণ্ড, পৃ : ২৭২)

বস্তুত রণাঙ্গনে উপস্থিত ও সরাসরি যুদ্ধে লিপ্তদের মধ্য হতেও যথা সম্ভব সে সকল লোকদের রক্ষা করা হতো, যাদের উত্তম চরিত্র ও সুন্দর শিষ্টাচার সম্পর্কে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবহিত হতেন। নিম্নের ঘটনাটি আমাদের দাবীর পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ :

অষ্টম হিজরী সালে যখন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন পথিমধ্যে এক ব্যক্তি উপস্থিত হলো। সে নবীজির পবিত্র জিহাদকে সাধারণ জাহেলিয়াত যুগে আরবদের যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে তুলনা করে আরয করল যে, আপনি যদি সুন্দরী নারী এবং লাল বর্ণের উট লাভ করতে চান তবে বনী মুদাল্লাজ গোত্রের উপর আক্রমণ করুন। [কেননা তাদের মধ্যে এ দুটি প্রচুর রয়েছে] কিন্তু এখানে যুদ্ধ আর সন্ধির উদ্দেশ্যই ছিল অন্য রকম। অতএব, নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ আমাকে বনী মুদাল্লাজ গোত্রের উপর আক্রমণ করতে এ কারণে বারণ করেছেন যে, তারা পরস্পর আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (এহইয়াউল উলূম, গাযালী)

হযরত আলী (রা.) বলেন, একদিন নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সাতজন যুদ্ধবন্দীকে উপস্থিত করা হলো। নবীজি তাদেরকে হত্যার জন্য আমাকেই নির্দেশ দিলেন। ঠিক এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আ.) আগমন করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছয়জনের ব্যাপারে তো এই নির্দেশই বহাল রাখুন; কিন্তু ঐ লোকটিকে মুক্ত করে দিন। নবীজি কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, এ লোকটি উত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং দানশীল। নবীজি বললেন, আপনি কি নিজের পক্ষ হতে এই সুপারিশ করছেন নাকি এটা মহান আল্লহর নির্দেশ? জিবরাঈল (আ.) বললেন, মহান আল্লাহই আমাকে এর আদেশ করেছেন। (কানযুল উম্মাল, পৃ : ১৩৫, ইবনুল যাওযীর উদ্ধৃতি সংবলিত)

ইসলামী জিহাদ তথাকথিত সভ্যতার দাবীদার ইউরোপীয় জাতিসমূহের পৃথিবী-বিধ্বংসী যুদ্ধ ছিল না। যার মধ্যে শুধু নিজের খেয়াল-খুশী চরিতার্থ করার জন্য নারী-পুরুষ, দোষী-নির্দোষ নির্বিশেষে শহরকে শহর অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে ধ্বংস ও বিনাশ করে দেওয়া হয়। মরহুম আকবর এলাহবাদী কি সুন্দরই না বলেছেন-

ہو رہا ہے نفاذ حکم فنا

نہ مکیں اس سے بچتے ہیں نہ مکان

تو پیں خود آکے اب تو میدان میں

پڑھتی ہیں کل من عليها فان

ধ্বংসের ফরমান বিনাশ করছে, ঘর-দোর আর মানুষের প্রাণ

তোপের আঘাতে কেঁপে অস্থির ‘কুল্লু মান আলাইহা ফাণ।

কিন্তু বাস্তব সত্য এটাই যে, মানুষ অন্যের চোখে সমান্য খড় পড়লেও তা দেখতে পয়; কিন্তু নিজের চোখের কড়িকাঠকেও উপেক্ষা করে।

কবি আকবর এলাহবাদী যথার্থই বলেছেন-

اپنے عیبوں کی نہ کچھ پروا ہے

غلط الزام بس اور ونپہ لکا رکھا ہے

یہی فرماتے رہے تیغ سے پھیلا اسلام

یہ نہ ارشاد ہوا توپ سے کیا پھیلا ہے

আপনার দোষের নেইকো পরোয়া, অপবাদ ছোড়ে অন্যের গায়

ছড়ালো ইসলাম তরবারীর জোরে, এমন কুৎসাও তারা রটিয়ে বেড়ায়।

এতকিছু বলেও এটা না বলল তোপ কামান অবশেষে কি ছড়ালো?

মোট কথা, আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় প্রকার জিহাদেরই উদ্দেশ্য ছিল, শুধু উত্তম চরিত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটানো, ইসলামের নিরাপত্তা বিধান আর ইসলামের প্রচারের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা হতো সেগুলোর আপসারণ।

এসকল ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করার পর যেমনিভাবে সাধারণ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এবং মার্গোলিউস ও অন্যান্যের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা অপবাদ প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী জিহাদের উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে জোরপূর্বক মুসলমান বানানো এবং লুট-তরাজের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকার সংস্থান করা, তেমনি ভাবে ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সাহাবীগণের দীর্ঘদিনের আচার-অভ্যাস ও কর্মসমূহ একত্রিত করার পর এতে আর কোন সন্দেহ থাকে না যে, ইসলামে যেমন নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে আত্মরক্ষামূলক জিহাদ ফরজ করা হয়েছে তেমনিভাবে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ইসলাম প্রচারের প্রতিবন্ধকতাসমূহ অপসারিত করার নিমিত্ত আক্রমণাত্মক জিহাদও কিয়ামত পর্যন্ত আবশ্যক করা হয়েছে। আত্মরক্ষামূলক জিহাদের উদ্দেশ্য যেমন মানুষকে বলপূর্বক মুসলমান বানানো নয়, তেমনিভাবে আক্রমণাত্মক জিহাদের উদ্দেশ্যও কস্মিনকালে তা হতে পারে না। বিশেষ করে যেখানে উপস্থিত সমরক্ষেত্রেও ইসলামের প্রশস্ত আঁচল কাফিরদেরকে নিজের আশ্রয়ে স্থান দিতে এবং কুফরীর উপর বহাল থাকা সত্ত্বেও তাদের জান-মাল ও সম্ভ্রমকে সেভাবেই রক্ষা করার জন্য প্রসারিত রয়েছে, যেভাবে একজন মুসলমানকে রক্ষা করা হয়ে থাকে, যার মধ্যে আত্মরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় জিহাদই সমান। এতদ্ব্যতীত পৃথিবীতে সত্যিকার শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা এবং দুর্বলদেরকে অত্যাচারকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি যা জিহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, এতেও উভয় প্রকার জিহাদেরই ভূমিকা সমান। অতএব, এর কোনো কারণ নেই যে, ইসলামী ঐতিহ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে আক্রমণাত্মক জিহাদকে অস্বীকার করতে হবে, যেমনটি আমাদের কোনো কোনো মুক্ত-বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাবিদগণ করেছেন।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর আমরা আমাদের আসল উদ্দেশ্যের অবতারণা করছি-

হিজরতের পর জিহাদ ও গাযওয়াহসমূহের ধারাবাহিকতা শুরু হয় যার কোনো কোনোটিতে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সশরীরে অংশ গ্রহণ করেন। আর কোনো কোনোটিতে বিশেষ বিশেষ সাহাবীর নেতৃত্বে সৈন্য প্রেরণ করেন। ঐতিহাসিকদের পরিভাষায় প্রথম প্রকার জিহাদকে ‘গাযওয়াহ’ এবং দ্বিতীয় প্রকার জিহাদকে ‘সারিয়াহ’ বলা হয়। গাযওয়াহর মোট সংখ্যা ২৩ টি। ৯ টিতে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল অন্যগুলোতে নয়। আর সারিয়াহর মোট সংখ্যা ৪৩ টি। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার যে, এসকল গাযওয়াহ ও সারিয়াহ-র মধ্যে মুসলমানদের যুদ্ধাস্ত্রের অপ্রতুলতা ও সৈন্য সংখ্যার স্বল্পতা সত্ত্বেও সর্বদা বিজয় তাদের পক্ষেই থাকে। অবশ্য কেবল ওহুদ যুদ্ধে প্রথমে বিজয় লাভ করার পর মুসলমানদের সাময়িক পরাজয় হয়, তাও এজন্য যে, সৈন্যদের একটি অংশ নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল।

আমরা এ সকল গাযওয়াহ ও সারিয়াহকে অধিকতর সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করার জন্য সন আকারে ধারাবাহিকভাবে নিম্নে উল্লেখ করছি। আর যেহেতু গাযওয়াহ ও সারিয়াহসমূহের তারিখ ও সংখ্যার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, তাই আমরা সেসব মতভেদ পরিহার করে সকল বর্ণনায় হাফেযে হাদিস আল্লামা মোগলতাঈ রচিত সীরাতের উপর নির্ভর করেছি।

গাযওয়াহ ও সারিয়াহসমূহ

১ম হিজরী

সারিয়াহ : এ বছর দু্টি সারিয়াহ সংঘটিত হয়েছিল।

১. সারিয়ায়ে হামযা (রা.)। ২. সারিয়ায়ে উবায়দা (রা.)।

[এ বছর কোনো গাযওয়াহ সংঘটিত হয়নি]

২য় হিজরী

গাযওয়াহ : এ বছর ৫ টি গাযওয়াহ সংঘটিত হয়েছিল।

১. গাযওয়ায়ে আবওয়া। এটাকে গাযওয়ায়ে ওয়াদ্দানও বলা হয়। ২. গাযওয়ায়ে বাওয়াত। ৩. গাযওয়ায়ে বদরে কুবরা। ৪. গাযওয়ায়ে বনী কায়নুকা। ৫. গাযওয়ায়ে সাভীক।

সারিয়াহ : এ বছর ৩ টি সারিয়াহ সংঘটিত হয়েছিল।

১. সারিয়ায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.)। ২. সারিয়ায়ে উমাইর (রা.)। ৩. সারিয়ায়ে সালেম (রা.)।

এবছরের গাযওয়াহসমূহের মধ্যে গাযওয়ায়ে বদরই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৩য় হিজরী

গাযওয়াহ : এ বছর ৩ টি গাযওয়াহ সংঘটিত হয়েছিল।

১. গাযওয়ায়ে গাতফান। ২. গাযওয়ায়ে উহুদ। ৩. গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদ।

সারিয়াহ : এ বছর ২ টি সারিয়াহ সংঘটিত হয়েছিল।

১. সারিয়ায়ে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ (রা.)। ২. সারিয়ায়ে যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)। এবছরের গাযওয়াহসমূহের মধ্যে গাযওয়ায়ে উহুদই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৪র্থ হিজরী

দালায়িলে আবু নাআইম-এ মারপূ সূত্রে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিবরাঈল (আ.) বলেছেন, আমি পৃথিবীর পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত [তথা সমগ্র বিশ্ব] ভ্রমন করেছি; কিন্তু বনী হাশেম অপেক্ষা উত্তম কোনো বংশ দেখিনি। (মাওয়াহিব)

সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ:

দুরূসুত তারিখ আল-ইসলামী লিল হাইয়াত, পৃ : ১৪

এই বিবরণ সম্পর্কে আরো বিভিন্ন মতামত রয়েছে; তবে ইমাম ইবনে আসাকির এটাকেই সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। (১ম খণ্ড, পৃ : ২১)

সর্বসম্মত মতানুসারে নবীজির বরকতময় জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের [কোনো এক] সোমবারে হয়েছে। কিন্তু তারিখ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চারটি মত প্রসিদ্ধ রয়েছে- ২, ৮, ১০ ও ১২ রবিউল আউয়াল। হাফেয মোগলতাই ‘২য় তারিখ’ গ্রহণ করেছেন এবং কামিলে ইবনে আছীরেও এ মতটিকেই গ্রহণ করা হয়েছে। আর মিসরের মাহমূদ পাশা হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে যে ৯ তারিখ নির্ধারণ করেছেন, এটা অধিকাংশের মতের বিরোধী সনদবিহীন একটি উক্তি। উদয়াচলের বিভিন্নতার দরূন হিসাব-নিকাশের উপর এতটুকু নির্ভরশীল হওয়া যায়া না, যার ভিত্তিতে অধিকাংশের মতের বিরোধীতা করা যায়।

মাওয়াহিব

একটি বর্ণনায় এটাও এসেছে যে, নবীজির জন্মের ৭ মাস পর তাঁর পিতার ইন্তেকাল হয়। কিন্তু ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থে আল্লামা ইবনে কায়্যিম (রহ.) এই মতটিকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। (যাদুল মাআদ)

শিশু বয়সেই এমন সাম্য-চেতনা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, “যখন আমার ভাই কাজ করছে, তখন আমি কেন করব না?”

ইসলামের পূর্বে কিছু লোক জীব ও শয়তানের সাহয্যে আসমানী খবর এবং গোপন কথাবার্তা জেনে নিয়ে নিজেকে গায়েবের খবরের দাবীদার মনে করত। এদের কে কাহেন বা গণক বলা হয়।

ঐ সময়ে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বসয় সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে : ২১, ২৯, ৩০ ও ৩৭। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ১৪)

যাদুল মাআদ গ্রন্থে রয়েছে যে, তাঁর আসল নাম ছিল আব্দুল্লাহ। আর তাইয়েব ও তাহের এ দুটি ছিল তাঁর উপাধি।

হাফেয ইবনে কায়্যিম যাদুম মাআদ গ্রন্থে এ ব্যপারে বিভিন্ন মত উল্লেখ করেছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রুকাইয়া (রা.) ছিলেন সবার বড় আর উম্মে কুলসুম (রা.) ছিলেন সবার ছোট। (যাদুল মাআদ, খণ্ড : ১ পৃ : ২৫)

হযরত ফাতেমা (রা.) সম্পর্কে বিস্তারিত জীবনী জানতে হলে হযরত মাওলানা সাইয়িদ আসগার হুসাইন (রহ.) রচিত ‘নেক বীবিয়াঁ’ পুস্তিকাটি দারুল ইশাআন দেওবন্দ হতে সংগ্রহ করে পড়ুন। যা পড়লে ঈমান তাজা হয়।

হযরত আয়েশা (রা) এর বিস্তারি জীবনী জানতে হলে ‘নেক বীবিয়াঁ’ পুস্তিকাটি অধ্যায়ন করুন।

অনুরূপভাবে পাদ্রী ফিকস, জন মিল্টন আইজেক টেলরসহ আরো অনেকে অত্যন্ত বলিষ্ট ভাষায় এর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন।

বর্তমান বাইবেল থেকে জানা যায় যে, হযরত সুলাইমান (আ.) এর সাতশত স্ত্রী এবং তিনশত হেরেম ছিল। (আওয়াল সালাতীন, খণ্ড : ত, পৃ : ১১), হযরত দাউদ (আ.) এর নিরানব্বই জন স্ত্রী, হযরত ইবরাহীম (আ.) এর তিন স্ত্রী এবং হযরত ইয়াকুব (আ.) ও মূসা (আ.) এর চার চার জন স্ত্রী ছিল। (বাইবেল, জন্ম অধ্যায় ২৯ ও ৩০)

মনু জী যাকে হিন্দু ও আর্যাদের সর্বজন স্বীকৃত মনীষী ও নেতা বলে গণ্য করা হয়। তিনি ধর্ম শাস্ত্রের লিখেন, “যদি কোনো ব্যক্তির চার পাঁচ জন স্ত্রী থাকে এবং তাদের মধ্য হতে একজন সন্তানবতী হয়, তাহলে বাকিদেরকেও সন্তানবতী বলা হয়”। (মনু অধ্যায় ৯, শ্লোক ১৮৩ এবং রিসালায়ে তাআদ্দুদে আযওয়াজ, অমৃতসর) শ্রী কৃষ্ণ, যাকে হিন্দুদের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত মনে করা হয় তার হাজার হাজার স্ত্রী ছিল।

এটা এই আয়াতের ব্যাখ্যা :

فَانْکِحُوْا مَا طَابَ لَکُمْ مِّنَ النِّسَآءِ مَثْنٰی وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ ۚ فَاِنْ خِفْتُمْ اَلَّا تَعْدِلُوْا فَوَاحِدَةً

সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ১২

আল-হামদুলিল্লাহ, হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এ প্রয়োজনীয়তা এভাবে পূর্ণ করেছেন যে, পারিবারিক জীবন সম্পর্কে পূত-পবিত্র স্ত্রীগণের মাধ্যমে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তা একটি সংকলনে একত্রিত করেছেন। ঐ সংকলনের নাম হলো-تعداد الأزواج لصاحب المعراج

এর নামেই আব্দুল মুত্তালিবের উপনাম ‘আবুল হারিস’ প্রসিদ্ধ ছিল।

কেননা বাতেনীভাবে তো নবীজিকে সকল নবীদের পূবেই নবুওয়াত প্রদান করা হয়েছিল। (খাসাইসে কুবরা)

এই অংশটুকু ‘দুরুসুস সীরাতুল মুহাম্মাদিয়্যাহ’ গ্রন্থের ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত।

পবিত্র কুরআনের আয়াত فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَ اَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِکِیْنَ এর মর্মার্থ এটাই

আল্লাহর ঘরের হজের নিয়ম জাহেলিয়াতের যুগেও চালু ছিল। মক্কার মুশরিকরাও হজ পালন করত। তবে তাদের মনগড়া বাতিল পন্থায় তারা তা করত।

সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২১। মুহাজিরগণের সংখ্যার ব্যাপারে আরো বিভিন্ন মত হয়েছে।

হবাশার সকল বাদশাকেই নাজ্জাশী বলা হতো। (মোগলতাঈ)

ইউরোপের কোনো কোনো রাজনীতিবিদ [সম্ভবত লর্ড ক্রোমার] বলেছেন, যদি প্রচ্য ও পশ্চাত্যের সকল আলেম একত্রিত হয়ে দ্বীন-ইসলামের হাকীকত বর্ণনা করতে চায় তবে এরচেয়ে উত্তম বর্ণনা করতে সক্ষম হবেন না, যেমনটি বর্ণনা করেছেন হাবশার মুহজিরগণ। (দুরুসুত তারীখ, পৃ : ২১)

এই নাজ্জাশী অন্য কোনো ব্যক্তি হবেন। যিনি নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর ‘আসহামা’ নামক নাজ্জাশী যার ষষ্ঠ হিজরী সনে ইসলাম গ্রহণের বিবরণ পরে বর্ণিত হতে যাচ্ছে, তিনি অন্য ব্যক্তি।

দুরুসুত তারীখুল ইসলামী, পৃ : ২২

এই অঙ্গীকারনামা মানসূর ইবনে ইকরামাহ লিখে ছিল এবং পরিণতিতে তার হাত অবশ হয়ে গিয়েছিল। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২৪)

সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২৪

কোন কোন বর্ণনায় দুই বছর এবং কোনো কোনো বর্ণনায় কয়েক বছরের কথা বলা হয়েছ।

সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২৫

ইন্তেকালের তারিখ সম্পর্কে আরো বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। যেমন : ৫ই রমযান, হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে, হিজরতের চার বছর পূর্বে এবং মিরাজের পরে, ইত্যাদি। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২৬)

এ বছরই হযরত সাওদা (রা.) এর সাথে নবী কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিবাহ সম্পাদিত হয়েছিল। কোনো কোনো বর্ণনা মতে হযরত আয়েশা (রা.) এর পরে তাঁর সাথে বিবাহ সংঘটিত হয়েছিল। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ২৬)

মাওয়াহিবে লাদুনিয়্যাহ গ্রন্থে ইমাম যুহরীর বর্ণনা মতে এমনি বলা হয়েছে। (নশরুত তীব)

বুখারীর বর্ণনা মতে। বুখারীর কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে যে, নিজ গৃহে শায়িত ছিলেন।

এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, এই আসমানী সফরও কি বোরাকের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল, না অন্য কোনো সোপান ইত্যাদির মাধ্যমে। হফেয নাজমুদ্দীন গায়তী ‘কিসসাতুল মিরাজ’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করেছেন। পৃ : ১২

তখন মদীনার অধিবাসীরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। (১) মুশরিকরা। (২) আহলে কিতাব। মুশরিকরা আবার বিরাট দুটি গোত্রে বিভক্ত ছিল। ১. আউস ২. খাযরাজ। এ দুটি গোত্র সর্বদা সরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত থাকত এবং প্রায় ১২০ বছর পর্যন্ত তাদের পারস্পরিক যুদ্ধের জের চলে আসছিল। (সীরাতে হালবিয়া : ১ম খণ্ড, পৃ : ৪০)

অর্থাৎ জামরায়ে আকাবা, যা মীনার প্রথম অংশে অবস্থি। হজ আদায়কারীগণ এর উপর কঙ্কর নিক্ষেপ করে থাকেন। পরে এখানে একটি মসজিদও নির্মিত হয়েছিল, যা ‘মসজিদে বায়াত’ নামে পরিচিত ছিল। (সীরাতে হালবিয় : ১ম খণ্ড, পৃ : ৪২)

আমি তাদের চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছি, ফলে তারা দেখতে পায় না।

হযরত সুহাইল (রা.) বলেন, হেরেম শরীফের কবুতরসমূহের বংশ পরস্পরা ঐ কবুতর থেকেই শুরু হয়।

যা নবীজির জন্ম তারিখ হতে ৫৩ বছর এবং নবুওয়াতের সময় হতে ১৩ বছর হয়।

أبا حكم والله لو كنتَ شاهداً ۞ لأمر جوادي إذ تسوخ قوائمه

علمت ولم تَشْكُك بأن محمداً ۞ رسول وبرهان فمن ذا يقاومه؟

عليك فكُف القوم عنه فإنني ۞ أرى أمره يوماً ستبدو معالمه

بأمر تود الناس فيه بأسرهم ۞ بأن جميع الناس طُراً مسالمه

আসল কবিতা এগুলো নয়। এই কবিতাগুলো সীরাতে মোগলতাঈ গ্রন্থে ত্রুটিযুক্ত ছিল। ‘আর রাওযুল উনফ’ প্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের ১৪১ পৃষ্ঠা হতে এগুলোকে সংশোধন করা হয়েছে।

আবু জাহেলের উপাধি গোটা আরবে ‘আবুল হিকাম’ বলে প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু কঠোর ইসলাম বিদ্বেসী হবার কারণে তাকে ‘আবু জাহেল’ উপাধি প্রদান করা হয়। এ ব্যাপারে জনৈক ব্যক্তি কবিতার ভাষায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন-

الناس كناه ابا حكم ۞ والله كناه ابا جهل

কুবায় অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে আরো কয়েকটি মত রয়েছে। ৩ দিন, ৪ দিন, ৫ দিন এবং কোনো কোনো বর্ণনায় ২২ দিনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ৩৬)

শায়খ জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.) স্বীয় গ্রন্থ الشماريخ في علم التاريخ এ এটাকেই সমর্থন করেছেন।

অতঃপর হযরত ওমর নিজের খেলাফাত কালে আরো জায়গার সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু নির্মাণশৈলী আগের মতোই বহাল রাখেন। এরপর উসমান (রা.) তাঁর খেলাফাত কালে এতে বিরাট পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেন। জায়গা অনেক বাড়িয়ে দেন এবং দেওয়ালসমূহকে সকশাযুক্ত পাথর ও রূপার কারুকার্য দ্বারা, থামসমূহ নকশাযুক্ত পাথর আর ছাদ শাল কাঠ দ্বারা তৈরি করেন। এরপর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয ওলীদ ইবনে আব্দুল মালেকের খেলাফতকালে তদীয় নির্দেশে মসজিদের আরো পরিবর্ধন করেন এবং নবীজির পূত-পবিত্র স্ত্রীগণের বাসস্থানসমূহকে এর মধ্যে শামিল করে দেন। এরপর ১৬০ হিজিরীতে খলীফা মাহদী এবং ২০২ হিজরীতে খলীফা মামুন এতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন এরং এর ভিত্তিকে খুবই মজবুত করে দেন। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃ : ৩৭)

এরপর উসমানী খলীফাগণ এটাকে অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম করে নির্মাণ করেন, যা আজও বহাল রয়েছে।

পবিত্র কুরআনের আয়াত اُدْعُ اِلٰی سَبِیْلِ رَبِّكَ بِالْحِکْمَةِ وَ الْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَ جَادِلْهُمْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ এর মর্মার্থ এটাই।

পবিত্র কুরআনের আয়াত وَ جَاهِدْهُمْ بِهٖ جِهَادًا كَبِیْرًا এর মর্মার্থ এটাই।

এ সকল ঘটনা সংক্ষিপ্তভাবে ‘রিসালায়ে হামীদিয়া’ পুস্তক হতে সংগৃহীত।

সেই ‘কর’ যা কাফিরদের নিকট হতে তাদের নিরাপত্তার বিনিময়ে গ্রহণ করা হয় সেটাকে জিযিয়া বা সামরিক কর বলা হয়।

যমীনে যা কিছু বিদ্যমান আছে, সবই ধ্বংস হযে যাবে।

যদি ইউরোপের রক্তাক্ত ইতিহাসের সেসব অধ্যায় সামনে রাখা হয়, যা স্পেনের উত্থান ও পতনের সাথে সম্পৃক্ত, তাহলে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির মুখোশ খুলে যাবে। কেননা স্বয়ং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা ও স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সেখানে দেখা যায়, নবম শতাব্দী হতে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত গোলাগুলি, হত্যা, আপহরণ, প্রভৃতিসহ বিভিন্ন রকম জুলুম অত্যাচারের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে খ্রীস্ট ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল। আল্লাহর লক্ষ লক্ষ বান্দাদেরকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে। লাখ লাখ মুসলমান স্বীয় ধর্ম রক্ষার জন্য হিজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। গ্রানাডার ময়দানে মুসলমানদের লিখিত অত্যন্ত মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য ৮০ হাজার গ্রন্থের পাণ্ডুলিপির এক বিপুল ভাণ্ডারকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীতে রাজা ফিলীপ স্বীয় শাসন এলাকায় আরবী ভাষার একটি বাক্য উচ্চারণ করাও অপরাধ বলে ঘোষণা করেছেন। মুসলমানদের স্মৃতি ও নিদর্শনসমূহকে একে একে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছিল। কর্ডোভার অদ্বিতীয় জামে মসজিদে একাধিক গির্জ তৈরি করা হয়েছে। সেখানকার আল-হামরা ও যোহরা প্রাসাদ, যা গোটা বিশ্বের মধ্যে অদ্বিতীয় ইমারত ছিল এবং ১২ হাজার গম্বুজ বিশিষ্ট আর أشهد أن لاإله إلا الله এর ধ্বনিতে সরব ও সরগরম ছিল, এর ত্রিকোণ বিশষ্ট স্তম্ভ ও গির্জা তৈরি করা হয়েছে, যা আজও বিদ্যমান রয়েছে। (এ সকল বর্ণনা আল্লামা মুহাম্মাদ করদে আলী রচিত, غابر الأنس وحاضرها গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে। এতে তিনি স্পেনের অতীত ও বর্তমান কালের তুলনামূলক আলোচনা করে দেখিয়েছেন।

নবীজির বাণী الجهاد ماض إلى يوم القيامة এর মর্মার্থ এটাই।

One clap, two clap, three clap, forty?

By clapping more or less, you can signal to us which stories really stand out.