জন্ম- নারী-লাথি

খামোশ পানি সিনেমার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের পরাবাস্তবতায় নারী

Migration of 1947 partition of India

‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা’- কবির সুমন
ধর্ম, যা কিনা পশ্চিমে রিলিজিয়ন (Religion) তা আসলে কি? ব্যাকরনের অআকখ-তে ফিরে গেলে দেখা যাবে সংস্কৃত শব্দ ধর্মের গঠন এভাবে, ধৃ+ম (মন্‌)। ধৃ ধাতুর অর্থ ধারণ। অর্থাৎ যে যা ধারণ করে তাই-ই ধর্ম, অন্য কথায় মানুষ যা ধারণ করে সেইটাই তার ধর্ম। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, হিন্দু-ইসলাম-খ্রিস্টান প্রভৃতি বলতে আমরা যা দেখি তা আসলে কি? পৃথিবী জুড়ে ধর্মের এই নামগুলোর নামে ট্যাগ লাগানোকে কি বলব তাহলে? সৃস্টিকর্তায় বিশ্বাসী লোকগুলো বলবে উনার কাছে পৌছুনোর তরিকা, তবে আলাদা আলাদা পথে। কিন্তু বর্তমান যুগে কি এই সরল জবানবন্দি গ্রহণযোগ্য? মানুষকে এক করার জাদুকরি টোটকা কতটা সহজ মানুষের কাছে? এর সাথে কি অন্য কিছুর সম্পৃক্ততা নেই?

সেই অনেকদিন আগে থেকেই নারীদেহ এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে দিনের পর দিন সামাজিক-রাজনৈতিক খন্ড খন্ড লড়াইগুলো জমাট বেধেছে। নারী দেহের সাথে ধর্মের (হালের সংজ্ঞানুসারে) সংযোগ আছে কি? থাকলে কোথায়? ধর্মের ভিন্নতায় নারীর মুল্য কি ওঠানামা করে? এক ধর্ম অন্য ধর্মের নারীকে কি চোখে দেখে? ধর্মকে যেভাবেই ব্যাখা করাই হোক, নারীর সবচেয়ে বড় ধর্ম হয়ত পুরুষের লোলুপ দৃস্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করা!

পরিচয় (Identity) গঠনে ধর্মের হাত কতটুকু? নারীর পরিচয় গঠনে ধর্মের ভূমিকা কি? একজন মানুষের পরিচয় কি ধর্মের ট্যাগের মধ্যে দিয়ে? নাকি এর বাইরে কি আর কোন উপাদান নেই? নামহীন যুদ্ধের ময়দানে যে শিশু জন্ম নেয় যুদ্ধ জয়ের পরে স্বীকৃত ভুখন্ডে তার পরিচয় কি? কি তার দেশ? কী তার পরিচয়?

মানুষ যদিল হয়, তার ধর্ম কি? পরিচয় কি?

এবার সরাসরি মূল বক্তব্যে। ‘খামোশ পানি’ শিরোনামের চলচ্চিত্র, নয়নিকা মুখার্জি ও বিনা দাসের লেখা থেকে যে বক্তব্য পাওয়া যায় তা ভিন্ন ভিন্ন পটভুমির হলেও এরা কোথায় এসে যেন এক হয়ে মিলে যায়।

১৯৪৭ সাল আদপে এক মহা বৈরাগের নাম। মানুষকে আলাদা করে দেবার কি এক প্রবল শক্তির সাল। হয়ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় নির্ধারক। শুধু পরিচয় নির্ধারকই না বরং অন্যতম এক লুণ্ঠন-ধর্ষণ-হত্যার এক নজির। বাংলা ভাষায় কৃষণ চন্দরের ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’এর অনুবাদক জাফর আলম বইয়ের শুরুতে লিখেছেন যে ’৪৭ এর বিভাগের সময়, ‘প্রাণ হারায় লাখ লাখ অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশু। ধর্ষিত হয় অসংখ্য নারী। উদ্বাস্তু হয় পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও বাংলার লাখ লাখ মানুষ। এই বিভাজনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাঞ্জাবের অগণিত শিখ ও মুসলমান’। ক্ষতিগ্রস্ত এই মুসলমান আর শিখদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘খামোশ পানি’ সিনেমার প্লট। ‘খামোশ পানি’র মূল চরিত্র ভীরো (বাংলা তর্জমায় বিরু) মূলত শিখ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। দেশভাগের যাঁতাকলে পড়ে নিজের সম্ভ্রম বাঁচাতে কুয়োর মধ্যে ঝাপ না দিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন একদল মুসলমান পুরুষের হাতে এবং ধর্ষণের শিকার হন। কিন্তু এক মুসলমান যুবক তাকে বিয়ে করে তাকে সমাজে স্থান দেন এবং নাম পরিবর্তন করে শিখ যুবতী হয়ে ওঠেন পুরদস্তুর এক মুসলমান। এই পর্যায়ে বিনা দাসের লেখা থেকে উদ্ধৃত করে বলা যায়, পরিবার হয়ে ওঠে ভীরোর মত নারীদের আস্রয় দেবার এক প্রধান প্রতিষ্ঠান।

ভীরোকে এই পর্যায়ে রেখে ঘুরে আসা যাক বাংলাদেশ থেকে যেখানে ’৪৭ পরবর্তী আরেক হত্যাযজ্ঞ ১৯৭১ এ তিন মহিলার কথা উঠে এসেছে যারা কিনা ’৪৭ এর ভীরোর মতই ধর্ষণের শিকার। এবং তারা পরবর্তীতে তাদের ধর্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দেন কিন্তু সমাজে তারা খোটার শিকার। তাদের অবস্থা সমাজে যে আগে থেকে খুব একটা পরিবর্তিত হয়েছে তা বলা চলে না। শারীরিকভাবে হয়ত না কিন্তু মানসিকভাবে তারা সব সময়ই নিগৃহীত। অন্যদিকে বিনা দাসের লেখায় এসেছে যুদ্ধের ময়দানের জন্ম নেওয়া শিশু আর মহিলাদের আত্নপরিচয়ের কথা। যার সাথে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া দৃশ্যপটের মিল অনেক। এদের কথা বলতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে বলেন, ‘ … what happnes when women are impregnent by ‘other’ men and give birth to the ‘wrong’ children?’, যা আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে পাকিস্তানের ঘুপচি গলির এক সাধারণ মহিলা ভীরোর বাড়িতে। একজন শিখের ঔরসে মুসলমান জনকের সন্তান। তার সঠিক পরিচয় কি? সন্দিহান মানুষের কাতারে সে হয় অধিকাংশ মুসলমানের একজন। কিন্তু একদিন যে ধর্ম তাকে স্থান দেয় সেই ধর্মই তার থেকে কেড়ে নেয় দুনিয়া থেকে।

আবার অন্য প্রসঙ্গে গেলে দেখা যাবে ১৯৭১ এ ধর্ষিত নারীদের পরিবারে এক প্রকার ‘নাক সিটকানো’ ভাব কাজ করেছে। এবং সেই সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরবর্তীতে পরিচয়হীনতায় ভুগেছে। কিন্তু সে সময়ে পরিবারই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা তাদেরকে সমাজে মাথা উঁচু করে রাখবার কারণ।

‘আল্লাহু আকবর’ ‘সাত শ্রী আকাল’ ‘হর হর মহাদেব’

কৃষন চন্দরে ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’ পড়ে মনে হয় এই তিনটি শব্দগুচ্ছই দেশভাগের সময়ে সবচেয়ে বেশি শোনা স্লোগান। এই ডাকে ধর্ষণ হয়েছে, উলঙ্গ নারীদের মিছিল বের হয়েছে, এমনকি শিশুদের মাথা কেটে বর্শার ফলায় গেঁথে অট্টহাসিও শোনা গেছে। এই ডাকেই প্রেয়সি তার প্রিয়কে হারিয়েছে, মা হারিয়েছে তার সন্তানকে। তবে ঘটনাগুলোকে, তা ৪৭ এর দেশভাগই হোক বা ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধই হোক, একসাথে বিচার করলে ও এর সাথে নারীর সম্পৃক্ততা ধরতে গেলে দেখা যাবে, নারী দেহ এখানে একখণ্ড জমি কিনতে ব্যাবহার হয়েছে। সেই এক চিলতে জমিকে রাষ্ট্র বললেও খুব একটা ভুল হবে না। তাহলে সমীকরন কি এই দাঁড়াচ্ছে যে রাষ্ট্র কিনতে নারীকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে? আর এর অঞ্চলের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এখানে ধর্মই ছিল অনেক লড়াইয়ের মূলে। এই শেকলেই বন্দি ইতিহাস, যেখানে নারীদেহ কখনোবা ‘কাফের’ মুছে ফেলে সাচ্চা মুসলমান রাষ্ট্র গড়ার কাঁচামাল আবার কখনোবা প্রতিশোধ নেবার মোক্ষম স্থান আবার কোন কোন বেলায় তা শুধুমাত্র শত্রুর বিরুদ্ধে আনন্দ উপভোগের উপাদান। বিনা দাস বলেন, ‘The lives of women were framed by notion that they were to bear permanent witness to the violence of Partition. Thus, the political programme of creating two nations of India and Pakistan was inscribed upon the bodies of women.’। এই কথা শুধুমাত্র দেশভাগ নয় বরং আজ পর্যন্ত সকল যুদ্ধের জন্যই সত্য।

শেষ হয়েও হইলোনা শেষ…

এক্কেবারে শুরুতেই করে বসা প্রশ্নর উত্তর দেয়া সহজ হবে বলে মনে হয় না। তাই মন্তব্য করেই খান্ত দেব। সিনেমা এবং বাকি দুইটি লেখার মাঝে যে সরল সত্যটি বিদ্যমান তা হল একটি রাষ্ট্রের জন্ম এবং তার বিনিময়ে নারীর অবস্থান এবং এই অবস্থান ধর্ম ও পরিচয়ের দ্বারা কিভাবে প্রভাবিত হয়। এর সাথে যোগ করা যায় স্বাধীন রাষ্ট্রে সেই নারীদের অবস্থান ও সন্মান। রাষ্ট্র তাদের সন্মান দেবে কিন্তু এর মাঝেও এক চতুর খেলা থাকে। নিজের ঢোল বাজানোর উপলক্ষ হয়ে ওঠে ত্যাগস্বীকার করা সেই সব নারীরা। পুঁজিবাদী রাস্ট্রের কাছে তারাও পণ্য।

আর ‘সুরির সাক্ষী গাঁটকাটা’র মত আছে ধর্মের মারপ্যাঁচ। অরাজক সময় তো অবশ্যই কিন্তু পরবর্তী সময়েও ধর্মকে এক অব্যর্থ অস্ত্র বানিয়ে তার প্রয়োগ রধ করা যায়নি। এই ধর্মই নারীকে তার পরিচয় দান করে সমাজে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাকে জায়গা করে নিতে হলে হয়ত ধর্মই একমাত্র সহজ পথ। কিন্তু সেইখানেও পুরুষের চোখ রাঙ্গানি। তার মত করে নির্ধারিত ফরমায়েশে তৈরি হয় নারীর পরিচয়। নিজ ধর্ম হোক বা অন্য ধর্মের অনুসারিই হোক পুরুষ নারীকে তার অধস্তনেই রাখতে চায়। তাই এক পর্যায়ে এসে খটকা লাগে, যে নারী স্বাধীন রাস্ট্রের পরিচয় জন্মদানের পিছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এক সময়ে তাকেই পড়তে হয় পরিচয় নির্ধারণের বেড়াজালে যখন রাস্ট্র ঠিক করে দেয় তার পরিচয়, অবস্থান আর মূল্য। সম্মান ব্যাপারটাকে তারা আদতে গোনার মধ্যে আনে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে বৈকি!

কিন্তু রাষ্ট্র বা রাজনীতিই কি শেষ কথা? সব কিছুর উপরে তো স্থান মানবিকতার। কিন্তু মানুষ যখন তার মানবিকতা হারিয়ে ফেলে তখন এগিয়ে আসতে হবে কি কোন দানব বা পশুকে? ভূপেন হাজারিকা হয়ত এমনটা ভেবেই বলেছিলেন,

যদি দানব কখনোবা হয় মানুষ
 লজ্জা কি তুমি পাবে না?

One clap, two clap, three clap, forty?

By clapping more or less, you can signal to us which stories really stand out.