Whatsapp আর Happy New Year

৩১ তারিক, ডিসেম্বর মাস। দুপুর শেষ, বিকেলও বলা যেতে পারে। তবে কলকাতায় নেই এবারে আমি, আমেরিকাতে থাকি। একা-ই থাকি। ছোটবেলায় এই দিনটাতে মা মাংস করতো, হাইফাই কিছুই না, এমনি মুরগির মাংসর ঝোল। আমিও করেছিলাম আজকে। ভাতটা বেশি হয়ে গেছিলো একটু, হয় এরম মাঝে মাঝে একজনের মতো রান্না করতে গেলে। খাওয়াটা চাপ হলো। নতুন শিফট করেছি এই এপার্টমেন্টটাতে, সেরম বন্ধুবান্ধব বিশেষ নেই আসেপাশে। বাইরেও বরফ আর খুব ঠান্ডা। ভাত খেয়ে জাস্ট একটু ঝিমুনি ধরেছে … ব্যাস ফোনের সব নোটিফিকেশন তখনি আসতে হবে! হোয়াটস্যাপায় নমোঃ। কলকাতায় New Year হয়ে গেছে খানিক্ষন আগে, সবাই খুব হ্যাপি। আর আমাকেও দুপুরের কাঁচা ঘুমে গুলি মেরে সকলের হ্যাপিনেস এ সামিল হতে হবে। লোকজন উইশ করছে ফোনটা সাইলেন্ট করে দিতেও কিরম রুড রুড লাগে। একটা উত্তর দিয়ে রাখছি, চোখটা বোজার চেষ্টা করছি, আবার অন্যটা ঢুকছে। অনেকটা সেই রাতে অল-আউট না জালিয়ে শুলে মশাগুলো যেমন প্যানপ্যান করে। মারতে গেলে পালায়, একটু স্বস্তি আবার একটু পরেই প্যানপ্যানানি শুরু।

এবার আসল কথায় আসি। যেটা লক্ষ্য করলাম, আমার মোটামুটি একটা মেসেজ লিখে পাঠাতে এক মিনিট মতো লাগছে। কাউকে প্রণাম জানাচ্ছি; কাউকে ভালোবাসা শুভেচ্ছা জানাচ্ছি; কারো শরীর ভালো না থাকলে সেব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি এইসব আর কি। তাতে দেখলাম আমি চার-পাঁচ টা মেসেজ পাঠাইনি, গোটা বিশেক ঢুকে পড়েছে। লোকে এতো তাড়াতাড়ি এতকিছু লেখে কিকরে বাবাঃ! কততকে পাঠিয়েছে, কয়েকজনকে ঠিক চিনিও না, আমাকেও সেরম চেনে বলে তো মনে হয়না। তাছাড়া আবার দু-চারটে গ্রুপ আছে পুরোনো স্কুল কলেজের। সেখানেও ঢুকে চলেছে ক্রমাগত, অর্পণ লিখলো “Happy New Year”, আবার ১০-সেকেন্ড এর মধ্যেই রক্তিম লিখলো, “Happy New Year guys …”। রোল কলের মতো শোনাচ্ছে কিছুটা, “প্রেসেন্ট”, “প্রেসেন্ট ম্যাম”, “প্রেসেন্ট প্লিস”। আবার প্রসঙ্গে ফিরি। মেসেজগুলো মন দিয়ে দেখতে একটা জিনিস ক্লিয়ার হলো। বুজতে পারলাম আমি এতো স্লো কেন আর সকলে কেন এতো ফাস্ট। আসলে একটা মেসেজও কেউ নিজে লেখেনি। এখানেও কপি আর চিটিং চলছে বেপক হারে। হটাৎ দেখলে বোঝার উপায় নেই, সুন্দর সুন্দর ইংরাজি ছড়া, দারুন দারুন ছবি আবার ভিডিও। একই ছবি বা ছড়াও অনেকে পাঠিয়েছে দেখলাম। তবে যেটা দেখে আরও অবাক হলাম সেটা হলো একটা দিদির মেসেজ পেয়ে। আত্মীয় না, এমনি ছোট থেকে চিনি আর কি। ইনি কি করেছেন? এনাকে পাঠানো অন্যকারো একটা মেসেজ একেবারে ফরওয়ার্ড করে দিয়েছেন। আমার নাম তো ইপ্সিতা নয়, আর যে পাঠিয়েছে তাকেও চিনি না। প্রায় সব মেসেজই তাই, কোনোটাই আমায় ব্যক্তিগত ভাবে পাঠানো না, কোনোটাই ব্যক্তিগত ভাবে আমার জন্য লেখা না। এতে কি সত্যিই দুটো মানুষের মধ্যে কোনো ভাবের আদান প্রদান হলো? উন্নত টেকনোলজির জোরে যেকোনো কাজ যত সহজ সাধ্য হয়ে উঠছে, ঠিক ততটাই হারিয়ে গেছে তার গুরুত্ব, জিনিসটাও হয়ে গেছে সস্তা। চিঠি তো বাদই দিলাম, নিজের হাতে বানানো বা আঁকা গ্রিটিংস কার্ড গেছে, ফোন করা শ্মশানযাত্রী, sms-ও মৃতপ্রায়, হোয়াটস্যাপ এ কপি-পেস্ট ও করতে লাগে না উইশ টা ফরওয়ার্ড করে দিলেই হলো, এক এক করেও করবার দরকার নেই, চাইলে একসাথে ২০ জন কে। একঘন্টার কাজটা এক টুস্কিতে শেষ। এবার বোঝা গেলো আমি কেন এতো স্লো। ইতিমধ্যে যাদের উত্তর দিয়েছিলাম তারা অনেকে আবার লিখেছে। নাঃ এখনো কিছু লেখেনি, আমার কোনো প্রশ্নের উত্তরও দেয়নি, শুধু দুটো smiley, কোনটা হাসছে, কোনটা জিভ বের করে আছে। অনেক হলো, উইশ এর চোটে ঘুমের বারোটা। ফোন সাইলেন্ট করে ঘুম লাগালাম।