“সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে যত্ন করতে হয়”-এম এ মোমেন

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন। শিক্ষকতা ছাড়াও দেশের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি। ২৬ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে Avenue29 মোহাম্মদ এ মোমেনের মুখোমুখি হয়েছিল তাঁর ভাবনা জানতে। সঙ্গে ছিলেন ফরেন এক্সপোর্ট বিশেষজ্ঞ ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের অপারেশন ম্যানেজার জিল্লুর রহমান।)

এক সময় আমরা বলতাম দেশে পাঁচ হাজারের বেশি গার্মেন্টস আছে। গেল কয়েক বছর ধরে এ কথা একটু কম শোনা যাচ্ছে। আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথ রেট এখন ০.৬ পার্সেন্ট, এটা নিঃসন্দেহে শিল্পায়নের জন্য মঙ্গল নয়।

ভারত আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে ৩০ বিলিয়ন এক্সপোর্টের মাত্রা অতিক্রম করতে চাচ্ছে। নতুন করে বাজার তৈরির মাধ্যমে ভারতের এই মাত্রা অতিক্রম করা বেশ কঠিন হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়লে ভারতে সামনে এগোবে বলে ধারণা করা যায়। আমাদের দেশের আইন-কানুন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির জন্য অনেকক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয় না।

আসলে, আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তিন শ্রেণির মানুষ। প্রথম শ্রেণি যারা ফরেন রেমিটেন্স আনছে। দ্বিতীয় শ্রেণি যারা এদেশে ব্লু কলার জব করে সেই শ্রমিক মানুষরা। আর তৃতীয় শ্রেণি বিজনেজ এন্টারপ্রাইজ বা উদ্যোক্তারা। শেষ শ্রেণিটির মানুষরা তুলনামুলকভাবে মজুতদার বা সুদখোর হিসেবে সমাজের বদনাম কামাচ্ছে, যা আসলে শ্রেণি বৈষম্যের সংশয় বলা যায়। এক সময় আমাদের দেশে ৭ কোটি মানুষ ছিল, তখন আমাদের যে গ্রোথ ছিল, এখন তার মাত্রা বেড়েছে এই তিন শ্রেণির মানুষের।

আশির দশক থেকে গার্মেন্টস শিল্প যেভাবে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, সেই হিসেবে এই খাতে পৃষ্ঠপোষকতা বেশ কম। আমার খেয়াল আছে, বেশ আগে একবার দেশে বেশ অস্থিরতা চলছিল। তখন আমি নিজে আমার গার্মেন্টসের এক ড্রাইভারকে দিয়ে রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে এক ফ্যাক্টরি থেকে আরেক ফ্যাক্টরিতে মালামাল পরিবহন করিয়েছি। এই খাত থেকে গত ৩০ বছরে যে অর্থ আয় হয়েছে তাকে বিবেচনা করে খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ে নি। সুযোগ সুবিধা পরের বিষয়, অনেকে তো গার্মেন্টস করার জন্য গ্যাসই পায় নি! যে হাঁসটি আপনাকে স্বর্ণডিম দিচ্ছে তাকে কেন অবহেলা? সোনার ডিম পাড়া হাঁসকে তো যত্ন করতে হয়! কাল থেকে জাতীয় ক্রিকেট দলের সুযোগ সুবিধা কমিয়ে দিলে তার যে নেতিবাচক ফলাফলের প্রেক্ষিত তৈরি হবে, তা গার্মেন্টস খাতের জন্যও একই হবে কিন্তু। গেল ৪০ বছরে দেশের জমি বাড়ে নি, ফসলের মাঠ কিন্তু কমে গেছে। এই ১৬-১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে দেশ যেভাবে এগোচ্ছে তা মিরাকেল বলা যায় কিন্তু।

আমাদের নামে কিন্তু অপবাদও এখন কম না! কয়েক সপ্তাহ আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক পদস্থ কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। যে কোন সময় ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসার জন্য বাংলাদেশের উপর খড়গ নেমে আসতে পারে। ইইউয়ের সেই কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারি, অনেক আগে থেকে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে, যা আসলে আমাদের দেশের সুনামের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

আমি সৌদি আরবে গিয়ে আরবি আর চিটাইংগা ভাষায় কথা বলা এক লোকের মাধ্যমে জানতে পারি, সে দ্বিতীয় প্রজন্মের রোহিঙ্গা যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে আছে। এধরণের ঘটনা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ক্ষতিকর।

আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিল্পায়ন পর্যায়টি শেষ হওয়ার আগেই নগরায়ন বিষয়ই শুরু হয়ে যায়। যা এক দিক থেকে ক্ষতিকর। ক্যাপিটালিজমের এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রথমে শিল্পায়নের পূর্ণ বিকাশ হয়,তারপরে নগরায়ন হয়। ইউরোপের দিকে তাকালে বিষয়টি ভালোমত খেয়াল করা যায়। সুইডেনে ১৯৬০-১৯৭০ এর দশকে শিল্পায়নের প্রভাব পরে, এখন সুইডেন নগরায়ন ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পারছে। আফ্রিকার অনেক দেশে শিল্পায়ন পর্বটির বিকাশের আগেই নগরায়ন পর্বটি শুরু হয়ে যায়, যে কারণে আফ্রিকার অনেক দেশ আগামীতে ঝুঁকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে ১৯৮০-১৯৯০ সময়টিকে শিল্পায়নের বিকাশ পর্ব বলা যায়। এখন যে গার্মেন্টস শিল্প বা অন্য সব শিল্পের বিকাশটা তখনই। শিল্প বিকাশের পরের পর্ব কিন্তু নগরায়ন। নগরায়নের সঙ্গে শুধু নগর বিকাশ-বিস্তৃতি বিষয়টি জড়িত নয়, নাগরিক অধিকার, নাগরিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিষয়টি জড়িত।

ইউরোপ আমেরিকার সমাজ ও সময়ের দিকে তাকালে একটা স্থির চিত্র বোঝা সম্ভব। সেখানকার মানুষের দুই-তিন পুরুষ ধরে শ্রেণি অবস্থান বোঝা যায়। শরনার্থী কেউ হয়তো একশ বছর আগে আমেরিকায় পাড়ি জমায়, তারপরে দ্বিতীয় প্রজন্মে শিল্পকারখানায় কাজ করে, তৃতীয় প্রজন্ম ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং চতুর্থ-পঞ্চম প্রজন্ম চাকরি-বাকরিতে যুক্ত। আমাদের দেশে খুব কম ক্ষেত্রে প্রজন্মের ক্রম বিকাশ দেখা যায়। প্রথম প্রজন্ম হয়তো কৃষি কাজে সম্পৃক্ত ছিল, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় প্রজন্ম সরাসরি চাকরিতে চলে এসেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ক্রমবিকাশ দ্রুত হওয়ার কারণে আমাদের সামাজিক অবস্থান বেশ দুর্বল। একারণে আমাদের আসলে দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আমাদের দেশের প্রতিটি জায়গাতে দায়িত্ববোধের মাত্রা বেশ সঙ্গীন। আমরা খুব সহজে অন্যের ভুল খুঁজে বের করা, কিংবা সমালোচনাপ্রেমি একটি জাতি তৈরি করছি; যা আসলে খারাপ আমাদের জন্য। এখন পৃথিবীর অনেক দেশ যেখানে জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীলতা গুরুত্ব দেয়, সেখানে আমরা সামাজিক যোগাযোগ সাইটের হুজুগে পড়ে থাকি। আমাদের আইন-কানুন যারা তৈরি করেন তারা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতাবিমুখী মনে হয়। ব্রিটিশ আইনগুলো ছিল একমুখী, এখন আইন তৈরির ক্ষেত্রে বহুক্ষেত্রেই জনমত উপেক্ষিত হয়। যা আসলে আমাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহ দেয় না। আমাদের নিয়মনীতি তারা তৈরি করেন তাদের আসলে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া উচিত। যিনি ক্রিকেট খেলেন না কিংবা ক্রিকেট খেলা বোঝেন না তিনি আইসিসির মাধ্যমে নতুন আইনের অবতারণা করলে তার প্রভাব কি হতে পারে তা তো আন্দাজ করা যায়।

আমাদের সুশীল সমাজকে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন, সেই সঙ্গে আমাদের শিক্ষকদেরও। আমাদের দেশের শিক্ষকরা বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের দেশি কোম্পানিগুলোতে যোগদানে উৎসাহ দেন না, যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বিদেশ এমএনসিমুখি হয়ে পড়ে। আমাদের যে গার্মেন্টস শিল্প আছে, তার বয়স ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। সে হিসেবে এখানে এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের কাজ করার কথা। বাস্তবে তা হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা দেশীয় শিল্প-কারখানা বিমুখি বলে বিদেশি নাগরিকদের আমাদের দেশে কাজ করতে দেখা যায়। আমেরিকা আজ আমেরিকা হয়েছে দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ প্রজন্মের আমেরিকানদের দিয়ে। আমাদের দেশের শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপরিমন্ডলে সার্বিকভাবে প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্ম সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অনেক কম দেখা যায়।

Avenue29-এর পক্ষে অনুলিখন: জাহিদ হোসাইন খান আশা, রিসার্চার, যমুনা টেলিভিশন; এক্সচেঞ্জ ফেলো, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

ছবি: সংগৃহীত

One clap, two clap, three clap, forty?

By clapping more or less, you can signal to us which stories really stand out.