কাসাউকি খাতাউরা


ঘণ্টা খানের ধরে ধুমায়ে বৃষ্টি পড়ছে এবং আমি ঘণ্টা খানেক ধরে মন খারাপ করে বসে আছি। না, বাসায়ে নেট আছে। লিঙ্ক ৩ এভাবে আমাকে বাঁশ মারতে পারে না। কোন কারন ছাড়া। বৃষ্টির শব্দটা সুন্দর, থপ থপ শব্দে আমার বারান্দায়ে পড়ছে। বাতাস হু হু করে আমার রুমের বন্ধ দরজায় বাড়ি দিচ্ছে। বারান্দা আর জানালা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। এবং আমার আবারও মনে হল বেচে থাকার মত করে বেচে থাকা অনেক মধুর। অনেকদিন আমি অনেক গভীরে ছিলাম, আমি ঠাণ্ডা শীতে দাড়ায়ে ছিলাম যাতে আমি কুয়াসার টেস্টটা পাই। আমি বৃষ্টিকে আমার গা বেয়ে পড়তে দিয়েছি। আমি রাতের পর রাত জেগে ছিলাম হালসিনেশন হয় নাকি দেখার জন্য। :p

অনেকদিন কোন ভিতরের কোন ইমশান এই ভাবে এক্সপ্রেস করি নাই। করতে কষ্ট লাগে। এখনও লাগছে। বাট, হোয়াট ডা হেল :p :D

— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — -

কাসাহারা পর্বতমালা। হু হু করে হিমেল বাতাস বইছে। এই পাহাড়গুলোতে এই সময়টায়ে তাপমাত্রা হঠাৎ করে অনেক নেমে যায়। পাহারের শৃঙ্গ এর খাদে বাতাসের ধাক্কা লেগে হো হো করে এক ধরনের শব্দ হয়। কেমন ভয় মাখান অনুভূতি। বড়ু মাসাউকি উত্তর দক্ষিণের পঞ্চম পাহাড়ের একটি খাদে গুড়িশুরি মেরে বসে আছে। তার ছেড়া কাপড় চোপড়ের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ধুঁকতে শুরু করেছে। তার ছেলে কাসাউকি অবশ্য একটা ভারি চাদরের মত কিছু একটা তার গায়ে জরিয়ে দিয়ে গেছে। তাতে কাজ হচ্ছে না। মাসাউকি কাপা কাপা হাতে মাথার টুপিটা আরেকটু নামানোর চেষ্টা করল। তার ভয় হচ্ছে তার তরুণ ছেলে কাসাউকি কি ঠিক মত গ্রামে পৌছাতে পারবে। পথে পাহাড়ি নেকড়ে আক্রমন করতে পারে। তারপর আছে ভয়ঙ্কর শিক্কি দেবতা। কতরকম বিপদ এই পাহাড়ে। বড়ু মাসাউকি উপরের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে, তার ছানি পড়া চোখে ভাল করে দেখা যায় না। তারপরও সে আলোর ধরন দেখে বুঝতে পারে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাসাউকি চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার নাতনির মুখ টা ভেসে উঠল। সে কি ঘুম থেকে উঠে দাদাকে খুজবে?

মাসাউকি হাত বাড়িয়ে লাঠিটা মুঠর মধ্যে শক্ত করে ধরে। যদি নেকড়েরা আশে। তারপর তার হাসি পায়, কি বোকা সে। এইসব পাহাড়ি নেক্রের সঙ্গে সে পারবে কি করে? তার বয়স বিরান্নবই বছর। আর তারা আসে দল বেধে। এই শুকন লাঠি দিয়ে কি হবে? অবশ্য নেকড়ে আসার আগে ঠাণ্ডায়ে তার মৃত্যু হবে। এই পাহাড়ের এটাই নিয়ম। তরুনরা তাদের অথর্ব বড়ু বাবা-মাদের এইখানেই রেখে যায়। এই কাসাহারা পাহাড়ের খাদে কর বড়ু মারা গেছে তার হিসেব কে রাখে।

বাবা তুমি তৈরি? হু। তাহলে ঝুড়িতে উঠে বস।

তাকাহাসিকে দেখে যাই একটু?

না। সে কাদতে পারে।

তা অবশ্য। বড়ু মাসাউকি কোনমতে উঠে গোল ঝুড়িটাতে বসলেন। ছেলে এক ঝটকায়ে সেটা কাধে তুলে নিল। বড় ছেলের বউ কতুজি ছুটে তার হাতে একটা পোঁটলা ধরায়ে দিল। কতুজির মনটা নরম। মনে মনে স্বীকার করলেন মাসাউকি। তিনি বাম হাতে শক্ত করে পোটলাটা ধরলেন। নিশ্চয়ই তার প্রিয় পিঠা আছে আর চামড়ার থলেতে একটু পানি।

যাই। হাত নাড়েন মাসাউকি। তিনি একটু অবাক হলেন তাকে কেউ বিদায় জানাতে এল না কেন? পাড়া-পড়শিরাত এ সময় আসে। বড় ছেলে হাসাউকিকেও দেখলেন না। তিনি ঘোলা চোখে তাকান বাড়ির দিকে। আবার হাত নাড়েন কার উদ্দেশে কে জানে। ছোট ছেলে চলতে শুরু করেছে। তরুণ ছেলের শক্ত পেশি অনুভব করে তার গর্ব হয়। বয়সকালে তারও এমনটা ছিল।

বড়ু মাসাউকি অবশ্য টের পায়নি। তাকে বিদায় জানাতে অনেকেই এসেছিল। তার ছানি পড়া চোখে তার দৃষ্টি সীমায়ে তারা পড়েনি। আর এই ধরনের বিদায়ে কথা বলার নিয়ম নেই। আর কথা বললেই বা কি বড়ু মাসাউকি কানেও ভাল শুনে না এখন আর।

কাসাউকি দ্রুত নামছিল কাসাহারা পাহাড় থেকে। অনেকটা পাহাড়ি ছাগলের মত তার গতি। সন্ধ্যা নামাড় আগে নিচের মাল্ভুমিতে পৌছাতে না পারলে নেকড়ের কবলে পড়তে হবে। এরা দল বেধে আসে… ধূসর চামড়ার এই নেকড়ে গুলার চোয়ালে সমতল ভুমির হায়নার শক্তি, একবার কামড়ে ধরলে আর রক্ষে নেই। ডান হাতে শক্ত করে তামায় বাধান বর্শাটা ধরে আরও দ্রুত গতিতে নামতে থাকল কাসাউকি। একটু বেচাল পা পরলেই ছিটকে পড়তে হবে গভীর কোন খাদে। সূর্য ডুবতে বসেছে পশ্চিম আকাশে।

সূর্যদয়ের দেশে সূর্য ডুবছে। তরুণ কাসাউকি নামছে পাহাড় বেয়ে… কাসাহারা পাহাড়। যেন আকাশ ছুয়ে দাড়িয়ে থাকা এক পাথুরে দানব।

কাসাউকি যখন মাল্ভুমিতে নেমে এল তখন একটা আর্তচিৎকার শুনল। সে থমকে দাঁড়াল। এইটা কি তার বাবার চিৎকার? তবে কি ধুসর হিংস্র নেকড়ের দল আক্রমন করে তাকে ছিন্ন ভিন্ন করছে? ঠাণ্ডায়ে মরার আগেই মৃত্যু? এটাই কি এই গোত্রের নিয়তি। কিন্তু হঠাৎ কি হল কাসাউকির, একটা সৃতি মনে পড়ল তার।

… তার তরুণ বাবার সঙ্গে শিকারে গিয়েছে হঠাৎ ভয়ানক দুটো পাহাড়ি ভালুক আক্রমন করল তাদের। ছোট কাসাউকিকে বাঁ হাতে কাধে তুলে নিলেন বাবা মাসাউকি খাতাউরা। আর ডান হাতে তুলে নিলেন পাথুরে ফলার বর্শা। ছোট্ট ভীত কাসাউকি বাবার মাথার লম্বা চুল জাপটে ধরে রইল। আর তার তরুণ বাবা? … হাঁ সেই সময় তার বাবাই তাকে অসম সাহসে রক্ষা করেছিল। একটা ভালুক মারা পরে, আরেকটি পালিয়ে যায়ে…

কাসাউকির কি হল, সে মাল্ভুমিতে ঘুরে দাঁড়াল। তার সামনে দাড়িয়ে থাকা স্পর্ধিত কাসাহারা পর্বত রাতের অন্ধকারে গ্রাস করতে শুরু করেছে তাকে… কাসাউকি হঠাৎ উঠতে লাগল পাহাড়ে। তার হরিণের চামড়ার ফিতে বাঁধা পাতলা জুতা কাসাহারার শক্ত পাথরে থপ থপ শব্দ করতে করতে উঠতে লাগল আরও উপরের দিকে। ধুসর নেকড়ের দল তখন পাহাড়ের খাদ থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। কাসাউকি কি তার বাবার কাছে পৌছাতে পারবে?

বড়ু মাসাউকি মৃত্যুর গন্ধ পেলেন। বোটকা গন্ধ। তার পরিচিত গন্ধ এইটা। তরুণ বয়সে যতবার বিপদে পড়েছেন এই গন্ধ তার নাকে এসেছে। তাকিয়ে দেখেন তার চারিদিকে ধূসর নেকড়েরা। আশ্চর্য বেপার হল দিনের চেয়ে রাতে জেন আজ ভাল দেখছেন তিনি। তাদের লাল চোখ গুলা জোরায়ে জোরায়ে এগিয়ে আসছে। তিনি প্রচণ্ড শিতে আগেই কাবু হয়ে গেছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে নেকড়ের হাতেই তাকে মরতে হবে। তিনি দুর্বল হাতে লাঠিটা নিয়ে পাথুরে মাটিতে দুবার বাড়ি দিলেন…মুখে বললেন হেই হেই… ওরা এক বিন্দুও পিছাল না। তবে দাড়িয়ে থাকল। গ্ররররর করে এক ধরনের শব্দ করল তারা। অর্থাৎ তাদের শিকার যে মৃত নয় এটায়ে তারা খুশি। তাজা রক্তের স্বাদই যে আলাদা।

বড়ু মাসাউকি তার প্রপিতামহো’র কাছ থেকে শুনা একটা হাইকু বিড় বিড় করলেন।

‘মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই…। মৃত্যুতো জিবনের সঙ্গেই ছিল… হাইকুর পরের লাইনটা মনে করার চেষ্টা করলেন মাসাউকি, মনে পড়ছে না…। লাল চোখগুলো ঘন হয়ে এগিয়ে আসছে। মাসাউকি অপেক্ষা করেন… মৃত্যুর। তার ফেলে আসা জীবন তাকে অনেক কিছু দিয়েছে মৃত্যু কি দেয় সেটা এবার দেখা দরকার।

নেকড়ের দল ঝাপিয়ে পড়ার আগে তাদের মাঝে ঝাপিয়ে পড়ল পুত্র কাসাউকি, মাসাউকি ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না অন্ধকারে। শুধু অনুভব করলেন বাতাসে সাঁই সাঁই করে ধারালো বর্শার কোপ পড়ছে সামুরাইর মতো। এই শব্দ তার চেনা। তবে কি শিপ্পি দেবতা তাকে রক্ষা করতে এলেন। এই দেবতা কারও জন্য ভাল, কারও জন্য খারাপ। তিনি চোখ খুলে যা বুঝলেন লাল বিন্দুগুলু আর নেই। মৃত্যুর গন্ধটাও যেন মুছে গেছে। শুধু প্রবল শীত আর কাসাহারা পর্বতের এক টানা হো হো বাতাসের আর্তনাদ তখনও শোনা যাচ্ছে।

কাসাউকি তার বাবাকে নিয়ে ফিরে এসেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। সবাই ছুটে এল এই দৃশ্য দেখতে। প্রবীণরা পঞ্চায়েত বসালেন। এতো ঘরতর অনিয়ম। এমনটা কখনো হয়নি। কাসাহারার শিক্কি দেবতা এটা মেনে নিতে পারেন না… এ ভয়ানক অনিয়ম। এ হতে পারে না।

আমি এ নিয়ম মানি না!

তার বর্শার ফলা মাটিতে গেঁথে চিৎকার করে বলল কাসাউকি। মাটিতে গাঁথা বর্শার ফলাটা দুলতে দুলতে যেন তাকে সমর্থন দিল। মাসাউকি তখন ক্লান্ত। তখনও ঝুড়িতে বসে আছেন। তিনি বুঝতে পারলেন ভয়ঙ্কর একটা অনিয়ম ঘটিয়েছে তার ছেলে। তাকে তার গোত্রে ফিরিয়ে এনেছে। তিনি এদিক অদিক তাকালেন। তাকাহাসিকে দেখা যাচ্ছে না। ছোট্ট তাকাহাসিকি বুঝতে পারছে তার দাদু ফিরে এসেছে কাসাহারা পর্বত থেকে।

কতুজি ছুটে এসে এক বাটি সূপ খেতে দিল তাকে। তিনি ধন্যবাদ দিয়ে সূপের বাটিটা হাতে নিলেন। এই সময়ে ছুটে এল ছোট্ট তাকাহাসি।

দাদু?

তাকাহাসি

তুমি কোথায়ে গিয়েছিলে?

ওই দুরের এক পাহাড়ে…কাসাহারা। তিনি এক হাতে তাকে কাছে টানেন। তারপর তাকাহাসির কানে ফিস ফিস করে বলেন “তোমার বাবা আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।”

সে রাতে বড়ু মাসাউকি খাতাউরা তার মলিন বিছানায় শুয়ে মারা গেলেন বিরান্নব্বই বছর বয়সে। তবে তার মৃত্যু হল অনেক আনন্দের সাথে। নিজ পরিবার, নিজ গোত্রে…কাসাহারা পর্বতের গুহায়ে শীতে কাপতে কাপতে নয়… ধুসর নেকড়েদের হিংস্র কাপড়েও নয়।

কাসাউকি নিয়ম ভেঙ্গে নুতুন এক নিয়ম বানাল এই গোত্রে। না আর কোনও বড়ু পিতা বা মাতাকে মরতে হবে না কাসাহারা পর্বতের গুহায়।

পৃথিবীর সব ইতিহাস নাকি লেখা হয়েছে তলোয়ার দিয়ে, কলম দিয়ে নয়। তবে কাসাউকি তার ইতিহাস লিখেছে বর্শার ফলায়।