এই প্রযুক্তি আর সেই প্রযুক্তি নাই — যেসব প্রযুক্তি আমাদের নস্টালজিক করে দেয়

নতুন জেনারেশনরা বেড়ে উঠছে হাইপার টেকনোলজি বা মারাত্নক লেভেলের প্রযুক্তি ইমারশনে।

যেমন জন্মে থেকেই স্মার্ট ফোন, আইপ্যাড আর ইউটিউব থাকার ফলে প্রযুক্তির যে গুটি গুটি পায়ে বেড়ে ওঠা এবং প্রযুক্তি বিহীন বনাম প্রযুক্তির যে কনট্র্যাস্ট সেটা অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে।


আরিফ আর হোসেনের ফেসবুক পোস্টে এরকম প্রযুক্তি নিয়ে নস্টালজিক কিছু কথা এখানে তুলে আনার লোভ সামলানো গেলো না:

“আমার এখনও মনে আছে একদিন ছোট চাচা বললেন, “চল … তোকে ‘এসি-অন-কিন্তু-দরজা-নাই’ টেকনোলোজি দেখাই… বিজ্ঞান আজ কোথায় গেছে তা সচক্ষে দেখবি… চল”

চাচা আমাকে ইস্টার্ন-প্লাজার মেইন গেটের, উপর থেকে সজোরে নিচে নামা বাতাসের নিচ দিয়ে ১০ বার হাঁটালেন

..জ্ঞান অর্জনের পথে আমার চুল আজিজুল হাকিমের চুলের স্টাইলের মতো লেপ্টে গেল

মুগ্ধ হয়ে বাসায় ফিরলাম

আর আজকের পোলাপাইন জন্মের পর যে নার্সারিতে থাকে, সেখানেই নাকি 24/7 এসি

টেকনোলোজি চেইঞ্জ, এরা কি বুঝবে

প্রথম চলন্ত সিঁড়ি (এস্ক্যালেটার) দেখতে আমরা মাইক্রবাস ভর্তি করে গিয়েছিলাম মগবাজারের সেঞ্চুরি-আর্কেড নামের এক শপিং মলে

সে কি উত্তেজনা… আমার দুবাই ফেরত ফুফা তার সাফারির প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত উঠিয়ে কিভাবে এই চলন্ত সিঁড়িতে উঠতে হবে তা প্রেক্টিকালি দেখালেন

সেই শিক্ষা সফর শেষ করে সেখান থেকে প্রথম অটোম্যাটিক দরজা দেখতে গিয়েছিলাম আমরা চাংপাই চাইনিজ রেস্টুরেন্টে

কি অবাক কান্ড… গেটের সামনে দাঁড়ালেই গেট খুলে যায়… দারোয়ান লাগে না

তখন আবার বিটিভিতে চলত আরব্য রজনীর আলিবাবা ৪০ চোরের এপিসোড… গল্পে দেখা সেই গুহার সামনে দাঁড়িয়ে ‘চিচিং ফাঁক’ বলার সাথে সাথে গুহা খুলে যাওয়া আজ আর কল্পনা নয়… চোখের সামনে… ভাবা যায়?

আহ সেই দিনগুলো

একসময় আমরা ডায়াল-আপ ব্যবহার করতাম নেট কানেকশানের জন্য

রাতেরবেলা নেট কানেকশান নিতে গেলেই মডেম থেকে শেয়ালের ডাকের মতো আওয়াজ বের হতো

পুরা এলাকা বুঝে যেত এই বাসা থেকে নেটে ঢুকা হচ্ছে

আব্বায় বুকে হাত দিয়ে খাট থেকে উঠে বসত… এলাকার চোর ‘আজ থাউক’ বলে বাড়ি ফিরে আসত

আমরা নোকিয়া-৩৩১০ ব্যবহার করা জাতি …ক্লাসে লুকিয়ে স্নেইক-গেম খেলতাম

এরপর আসলো, সেটের ভিতর টর্চ-লাইট

অবাক ব্যাপার

তারপর আসলো সেটের ভিতরে ক্যামেরা

আজ নর্মাল ক্যামেরার থেকে পাওয়ারফুল ক্যামেরা মোবাইল সেটের ভিতরে

আফসোস এখানে নেই… আফসোস লাগে যখন বাসার এ্যালবাম গুলো অযত্নে পরে থাকতে দেখি

লাস্ট কবে এ্যালবাম কিনেছি?

ছোটবেলায় এ্যালবামের আঠালো পাতা সরিয়ে একটা একটা করে ছবি, আঁকাবাঁকা করে রাখতাম… এই ফিলিংটা আজকের ছেলেরা কোথায় পাবে

এই জেনারেশানের কে কবে প্রেমপত্র পেয়েছেন বলেন তো?

পেলে কিভাবে পেয়েছেন শুনি?

ইনবক্সে?…এসএমএস’এ??

আমাদের সময় নিউ মার্কেটে প্রেমপত্র লেখার প্যাড পাওয়া যেত… এক একটা পাতা টিস্যু-পেপারের মতো মসৃণ

সুগন্ধি কলমও পাওয়া যেত…

আজকের ছেলেরা যতগুলো প্রেমপত্র দেখাতে পারবে (তাও স্ক্রিনশটে), তার থেকে ৩গুণ বেশী আকর্ষণীয় হাতে ধরে দেখার মতো প্রেমপত্র আমি একাই, এই বয়সে দেখাতে পারব

হ্যাঁ জমিয়ে রেখেছি

এগুলো জমিয়ে রাখারই নিয়ম ছিল

ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়াল করা টেলিফোন সেটগুলো দেখেছেন জীবনে?

কত যে স্মৃতি আছে এগুলোতে

মিসড-কল দেয়া আপনারা কি আবিষ্কার করেছেন? এগুলো আমরা সেই ৮০ সাল থেকে চিনি

১টা রিং বেজে লাইন কেটে যাওয়া মানে… “কি করো লক্ষ্মীটি?”

২ টা রিং বেজে লাইন কেটে যাওয়া মানে… “মিস-ইউ, পারলে ফোন দিও”

৩ টা রিং বেজে লাইন কেটে যাওয়া মানে… না এটা হতো না… কারণ আব্বা ফোন ধরে ফেলতেন ততক্ষনে

‘এই কে?’

“স্লামালিকুম আঙ্কেল…এটা কি চাঁদনি চক?”

‘এই মেয়ে কালকে না তুমি ফোন করে শায়লাকে চাইলা? আমি বললাম রং নম্বর… আজকে আবার চাঁদনিচক খুঁজো কেন? কে তুমি? …এইই?’

এই সময়গুলো কোনভাবেই ফিরে আসার নয়

ক্রস-কানেকশনের নাম শুনেছেন?

হয়তো রাতে ফিসফিস করে আলাপ করছি, মাঝখান থেকে হুট করে ক্রস-কানেকশন হয়ে গেলো

“এই নটির-পুত তোর বালির ট্রাক পৌঁছায় নাই কেন? আমি কি সারারাত খাড়ায়ে থাকুম তোর মিহি বালুর জন্য?”

ট্রাঙ্কল-বুকিঙ্গের নাম শুনেছেন?

বাবা হয়তো ফোন ধরে বাড়ি কাঁপিয়ে ‘হ্যালো হ্যালো’ করে যাচ্ছে

পাশ থেকে মা বলল, “এমনে চিল্লাছো কেন?”

বাবা ফিসফিস করে বলল; ‘আমেরিকা থেকে ভুঁইয়া সাহেবের ফোন এসেছে’

“আমেরিকা থেকে !!”

…এবার মা’ও ফোন ধরে বাড়ি কাঁপিয়ে ‘হ্যালো হ্যালো’ করে যাচ্ছে

ভিসিআর দেখেছেন? আমাদের একটা ভিসিআর ছিলো… সেটার সাথে একটা রিমোট-কন্ট্রোলও ছিলো… মজার ব্যাপার হলো রিমোট-কন্ট্রোলটা তার দিয়ে ভিসিআরের সাথে লাগানো ছিলো

মজা না? ওয়্যার-ওয়ালা ওয়্যারলেস

না বাচ্চা না…আমরা অনেক দিক দিয়ে এগিয়ে…অনেকক

টেকনোলোজি দেখা এক জিনিষ… আর টেকনোলোজি নিজ চোখে চেইঞ্জড হতে দেখা, আরেক জিনিষ”

এই পোস্টের কমেন্টে সেই নস্টালজিয়ার আরো কিছু বিবরণ:

“আমরা তখন তরুনী। সব কিছু ঠিকঠাক আছে তবে একটা সিক্রেট তোমরা বাচ্চারা জানতে না। আর তাহল আমরা সব বান্ধবী, কাজিনরা সবাই যখন একসাথে হতাম তখন বান্দরামী করার জন্য ল্যান্ড ফোনের জিরো ঘুরাতাম, ঘুরালেই ক্রসকানেকশনে ঢোকা যেত। আমরা তখন ক্রকানেকশনে যাদের পেতাম তাদের সাথেই উল্টা পাল্টা কথা বলে বিভ্রান্ত করতাম। কত যে মজার মজার ঘটনা হতো, তা লিখলে উপন্যাস হয়ে যাবে।”

“কে আর বুঝবে! আরো আছে… মোবাইল আসার পরে এসএমএস স্টোর্ড থাকতো মাত্র ২০-৩০টা মনে হয়! পুরানো গুলো ডিলিট না করলে, নতুন গুলো আসবে না! আবার স্রেফ ‘কি করো’ এসএমএস ও ডিলিট করতে কষ্ট লাগতো! এরপর শুরু করেছিলাম লিখে রাখা। কালের বিবর্তনে দুই ডায়েরি ভর্তি করে লিখে রাখতে রাখতেই মোবাইল উচ্চবংশীয় হয়ে গেলো! ভিতরে স্পেস বেশি! এসএমএস আর লিখে রাখা লাগলো না!”

“টেকনোলোজি দেখা এক জিনিষ… আর টেকনোলোজি নিজ চোখে চেইঞ্জড হতে দেখা, আরেক জিনিষ”… এই লাইনটাই অনেককে বুঝাতে পারিনা।”

“আর আমরাতো মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেয়েছি উচ্চ মাধ্যমিকে। এর আগে বন্ধুর বাবা ঢাকা চাকুরী করতেন সেখান থেকে মোবাইল এনেছিল সিটিসেল।আমরা লেকের পাশে নয়তো পাহাড়ে উঠে নেটওয়ার্ক খুজতাম।হঠাত এক দাগ আসতো।শুধু নেটওয়ার্ক এর সেই একটা দাগ যে মনে কি আনন্দ এনে দিত।একটা ওয়াকমেন কিনেছিলাম স্কুল থেকে এক বৃত্তি পেয়ে।ওই ওয়াকমেনের ব্যাটারী টাকা বাসা থেকে খোজাটা ছিল অসম্ভব প্রায়।বাবা পছন্দ করতেননা।টর্চ লাইটের সাথে কানেক্ট করে এক পকেটে ওয়াকমেন আর অন্য পকেটে টর্চলাইট নিয়ে ঘুরতাম কানে একটা হেডফোন দিয়ে।ওই অয়াকমেনে রেডিও ছিলনা,কিন্তু আমি তার দিয়ে সার্কিট থেকে সার্কিটের সংযোগ করে রেডিও চালানো বের করেছিলাম।স্পিকার বা এম না থাকায় টিভির স্পিকারের সাথে সংযোগ করে লাউড সাউন্ড এ গান শুনতাম।মাঠের পর মাঠ ছিল আমাদের।খেলাধুলা করিনি হয়তো এমন কোন বাংলাদেশে প্রচলিত খেলা নেই।খেলাধুলার ফাকে ক্ষুদা মিটাতাম পাশেই থাকা ফলের বাগানের ফল খেয়ে।হরেক হরেক রকমের ফল।উফ। আমরাই হয়তো শেষ জেনারেশন যারা আপনাদের সেই শৈশবের ছোয়া অনেকটা পেয়েছি।”

“আমাদের জেনারেশনটা এনালগ আর ডিজিটাল যুগের মাঝে সেতুবন্ধনের মত। ১টাকা ৭০ পয়সা তে সারাদিন T&T তে কথা বলেছি, ডিজুসে সারা রাত ফ্রি কথা বলেছি, এখন ভাইবার-হোয়াটসয়াপে ফ্রি কথা বলি। আগে ইদের সময় নিজ হাতে কার্ড বানিয়ে বন্ধুদের দিতাম, তারপর এসএমএসের যুগে কত শত এসএমএস দিয়েছি, আর এখন ডিজিটাল কার্ড দেই।”

“ভিসিয়ারে গুষ্টির সব ভাইবোন একসাথে ১৫/১৬ জন মিলে ছিনামা দেখার সেই মজাটা আর এখন কোনো কিছুতেই পাই না”


প্রযুক্তির এই ব্যাপক বিবর্তন এবং সর্বগ্রাসীতা আসলে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমরা হয়তো কেউই সঠিকভাবে কল্পনা করতে পারি না। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ৮০ ও ৯০এর দশকে যারা এর শুরুটা দেখেছেন তাদেরকে অসম্ভব নস্টালজিক করে দেয় এতে কোন সন্দেহ নেই।

Facebook Post and Comment Credit: https://www.facebook.com/Conceptologist/posts/10156905047530844