Netra News
Published in

Netra News

ফেসবুক সাক্ষাৎকারে সেনাপ্রধান ও সরকারের সমালোচনার পর আত্মগোপনে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল

(১৬ জুলাই ইংরেজিতে প্রথম প্রকাশিত।)

শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান হতে শুরু করে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদাতিক ডিভিশন এর নেতৃত্ব দেয়ার মতো তাৎপর্যপূর্ণ পদে নিয়োজিত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল গত মঙ্গলবার এক ভিডিও সাক্ষাৎকার দেবার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশংকায় পড়েছেন। আইনরক্ষা বাহিনীর দ্বারা অপহৃত এবং গুম হবার সম্ভাবনায় তিনি এখন ভীত।

১৪ জুলাই ফেসবুকে লাইভ দেখানো সাক্ষাৎকারে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী তীক্ষ্ণ ভাষায় বর্তমান সেনাপ্রধান এর সমালোচনা সহ সরকারের দুর্নীতি ও দেশে স্বচ্ছ, স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যার্থ হবারও তীব্র সমালোচনা করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম ও ভূমিকারও নিন্দা করেন।

বুধবার, সাক্ষাৎকার প্রচারিত হবার পরদিন সারওয়ার্দী নেত্র নিউজকে বলেন তিনি আত্মগোপন করেছেন। তবে খুব বেশি সময় এভাবে নিরাপদ থাকা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে তাকে সাহায্য না করা হলে দ্রুতই তিনি পাকড়াও হয়ে যাবেন।

“এক শুভাকাংখী, যে হয়তো [সেনাবাহিনীর] ভেতরের লোক, তার কাছ থেকে মেসেজ পাই, সাথে সাথে ওই মেসেজ ডিলিটও করে দেয়া হয়; বলা হয় ‘তারা মারাত্মক কিছু করবে আপনাকে, আপনি এখন সিরিয়াস একজন টার্গেট।’ এই টার্গেট মানে কি সেটা আমি বুঝি। মানুষকে উঠিয়ে নেয়া হয়, অপহরণ করা হয়, নিয়ে যায় তারপর কোনো হদিস থাকেনা। অথবা নিয়ে যায়, তার কিছুদিন পর মামলা হয়। এই দুরকম ঘটনা ঘটতে পারে [আমার ক্ষেত্রে]।” বলেন সারওয়ার্দী।

“আমার মনে হয়না এমন কোনো জায়গা আছে যেখানে আমি নিরাপদ। আমি একজায়গায় আছি, কিন্তু সেটা যে নিরাপদ এমন না। আমি নিশ্চিত তারা ভালোমতই জানে [আমি কোথায়] কিন্তু ওরা টপ বসের থেকে সিগনালের অপেক্ষা করছে। সেটা পেলেই তারা আমাকে তুলে নিবে, কেউ জানবেনা কোথায় তারা নিয়েছে আমাকে,” তিনি বলেন। “সবাই বলছে ‘আজকেই আপনার জীবনে শেষ দিন ।’”

সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম সম্পর্ক বিভাগ, ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস ডিরেক্টরেট এর একজন মুখপাত্র “সারওয়ার্দীর বক্তব্য বিষয়ে কিছু জানিনা” মন্তব্য করেন। তিনি এ বিষয়ে জানার জন্য সংস্থার ডিরেক্টর এর সাথে যোগাযোগ এ সাহায্য করবেন জানালেও ডিরেক্টর এর সাথে যোগাযোগের কোন তথ্য আর পাঠান নি।

বুধবার দিনই নেত্র নিউজের সাথে কথা বলার আগে সারওয়ার্দীকে তার ‘চিফ এডভাইজার’ পদ থেকে বরখাস্ত করে ওয়াল্টনস, যেখানে তিনি দুই বছর এ পদে কর্মরত ছিলেন। “কোম্পানি থেকে আমাকে বলা হয়েছে যে এজেন্সি এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাদের হুমকি দেয়া হয়েছে। আমাকে যেন আর চাকরি করতে দেয়া না হয় তার জন্য তাদের চাপ দেয়া হয়েছে। সরকার আমার কাজ করার, উপার্জন করার এবং জীবন যাপনের অধিকার কেড়ে নিয়েছে,” তিনি বলেন। এই প্ৰতিবেদন প্রকাশিত হবার সময় পর্যন্ত ওয়াল্টনস এর কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সেনাবাহিনীর সিনিয়ার ও অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা মনে করছেন দেশে বাকস্বাধীনতা হরণকারী কঠোর আইনে তিনি এখন অবরুদ্ধ। “সত্য বলার অধিকার মানুষের এখন নেই।”

সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ পেতে ব্যার্থ হবার পর মে ২০১৮ তে সারওয়ার্দী অবসর গ্রহণ করেন। ২০১১ সাল থেকে শুরু করে দু বছর তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্ত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স এর ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন। তারপর তিনি সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার হন। ৯ম পদাতিক ডিভিশনকে সেনাবাহিনীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফর্মেশন ধরা হয় যেহেতু রাজধানী ঢাকাকে রক্ষার দায়িত্ত্ব পালন করে এই ডিভিশন। অবসরের পূর্বে সর্বশেষ তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেবার পর সর্বসাধারণের মাঝে পরিচিত হয়ে ওঠেন সারওয়ার্দী।

যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী সাংবাদিক কনক সারওয়ারের সাথে তার মঙ্গলবারের সাক্ষাৎকারে সারওয়ার্দী সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন স্বাধীন ও স্বচ্ছ নির্বাচন বাংলাদেশে আর নেই এবং বাংলাদেশের মানুষ আর কখনো ভোট দিতে যেন না পারেন সেভাবেই সব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীন কাঠামো তৈরী করে ফেলা হয়েছে। “আমি নিশ্চিত করে বলছি বাংলাদেশে নির্বাচন মানে একটি প্রহসন; এই দেশে…কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে এদের অধীনে এটা অসম্ভব, অলৌকিক কল্পনা,” তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন।

জাল কোভিড-১৯ সনদ প্রদান করা দুই হাসপাতালের সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত দুজন মালিকদের বিষয়ে এ অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল বলেন এমন আরো অনেক ব্যাক্তি রয়েছে তাদের মতোই যারা “পুলিশ প্রহরায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়, সামনে পিছে এস্কর্ট, বাঁশি বাজে, এবং গাড়িতে পতাকার স্ট্যান্ড আছে। ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে যায়, বঙ্গভবনে যায়, গণভবনে যায়, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে…ফুলের তোড়া দেয়। বিষয়টা হলো, এই লোকগুলা কিন্তু সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আমার মতো এরকম হাজারো দেশপ্রেমিক অবসরপ্রাপ্ত, কিংবা দেশের…জন্য যারা রক্ত দিয়েছে, শ্রম দিয়েছে, সেই সব ব্যাক্তিরা কিন্তু ওই সব জায়গায় যেতে পারছেনা। রাষ্ট্র এদেরকে সহযোগিতা করছে দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়ন করতে।”

তিনি সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন যে তিনি ও তার স্ত্রী একটি দর্জির দোকানে থাকাকালীন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্থানটি ঘিরে ফেলে সবাইকে বের হয়ে যাবার নির্দেশ দেয়, এবং একজন ভিআইপি আসবে ব’লে জানায়। একটু খোঁজ নিয়ে সারওয়ার্দী জানতে পারেন যে ভিআইপি হলো জোসেফ, সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই। ২০০৪ এ জোসেফ খুনের অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত হন। ২০১৮ সালের মে’ তে রাষ্ট্রপতি তাকে বিরল রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রদান করেন।

“আমি জোসেফকে চিনি একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী,” সাক্ষাৎকারে বলেন সারওয়ার্দী, “রাষ্ট্রের অত্যন্ত উঁচু মানের একটা শীর্ষ সন্ত্রাসী, খুনি; জেলে ছিল, জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। তার আরো…চারটি ভাই ছিল, হারিস, আনিস, টিপু, এবং বর্তমান সেনাপ্রধান। বাকিদের মধ্যে একজন নিহত বন্দুকযুদ্ধে এবং দুইজন পলাতক। জনাব জোসেফকে এই সরকার জেল থেকে সসম্মানে মুক্তি দিয়ে…। তিনি এখন দেশেই আছেন, বিদেশে থাকেন, ইত্যাদি।”

সারওয়ার্দী বলেন জোসেফের ভিআইপি মর্যাদা ও পুলিশ প্রহরা দেখে তিনি “বিব্রত” কারন সন্ত্রাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এক ব্যাক্তি পুলিশ পাহাড়ার ঘুরে বেড়ায় যেখানে তাকে সম্প্রতি সেনা সদস্যরা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে দুই ঘন্টা আটকে রাখে। “আমি ৪০ বছর চাকরি করলাম, আমার প্রতি এক আচরন, আর তিনি সন্ত্রাসী হয়ে তার প্রতি এক আচরন!”

সাক্ষাৎকারে তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থারও সমালোচনা করে দাবি করেন তারা বাংলাদেশে সরকারি আমলা ও সেনাবাহিনীতে কে কোথায় নিয়োগ হবে তাতে হস্তক্ষেপ করে।

সাক্ষাৎকারের শেষে সারওয়ার্দী বলেন, “আমি মনে করিনা যে আরেকটি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে এগুলোর পরিবর্তন হবে বা তৃতীয় শক্তির [আবির্ভাব হবে], সেটা আমি আশাও করিনা। আজীবন আমি এর বিপক্ষে ছিলাম এবং এর [ফলে] কোনো সুবিধা আনেনা।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সমালোচনার সব পথ কঠোর হাতে রুদ্ধ করেছে। গত ৬ মাসেই, আর্টিকেল ১৯ এর তথ্যানুসারে, পুলিশ ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) এর অধীনে ১১৩ টি ফৌজদারি মামলা করেছে মোট ২০৮ জন ব্যাক্তির বিরুদ্ধে। এর মাঝে ৫৩ জন সাংবাদিক। অভিযুক্তদের মাঝে ১১৪ জন তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার হন এবং বর্তমানে বেশিরভাগই জামিন পাবার অপেক্ষায় আছেন।

সরকারের নীতিমালা ও পদ্ধতির সমালোচনার শাস্তি দিতে কোভিড-১৯ মহামারীর মাঝে নতুন করে গ্রেফতারের এক প্রবাহ শুরু হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এর অনুসন্ধানে প্রকাশ হয় যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ এর মাল চুরি ও আত্মসাৎ এর প্রতিবেদন তৈরী করেছিলেন এমন ৩৭ জন সাংবাদিকের নামে ৬৭ টি ডিএসএ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিএসএ’র অধীনে সম্প্রতি কার্টুনিস্ট, ব্যাঙ্গলেখক এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। এর মাঝে নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদকও রয়েছেন।

সেনাবাহিনী বিশেষভাবে সমালোচনা অসহিষ্ণু। ২০১৫ তে দেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রে চিটাগং হিল ট্রাক্টে সেনাবাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ প্রকাশের অপরাধে সামরিক বাহিনীর অধীনস্ত ডিরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) দেশের বৃহত্তম কোম্পানিদের জোর করে দেশের দুই প্রধান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া বন্ধ করায়।

আইনপ্রয়োগ সংস্থার দ্বারা গুপ্ত গ্রেফতার ও গুম — যাতে ডিজিএফআই ও জড়িত — বাংলাদেশে একটি নিত্যনৈমত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এ বছর জ্ঞাত ঘটনার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম। কর্নেল (অব) শাহেদ খানের পরিবার ও অধীনস্ত কর্মচারীদের গুপ্ত গ্রেফতার ও গুম এর খবর প্রকাশ করে নেত্র নিউজ। প্রাপ্ত তথ্য নির্দেশ করে যে এর পেছনেও রয়েছে ডিজিএফআই।

//ডেভিড বার্গম্যান

--

--

Netra News is an independent, non-partisan and non-profit platform of reportage, analysis and debate on Bangladeshi politics, society and culture.

Get the Medium app

A button that says 'Download on the App Store', and if clicked it will lead you to the iOS App store
A button that says 'Get it on, Google Play', and if clicked it will lead you to the Google Play store