মেঘালয় - পর্ব : ২ || ডাউকি টু চেরাপুঞ্জির পথে…

ভোরে ঘুম ভাঙ্গার কথা থাকলেও রাতের একটু টাল্টিবাল্টিতে(!) অন্যদের ঘুম ভাঙ্গলো বেশ দেরিতেই। যদিও আমি সেই ৬ টার দিক উঠে বসে আছি। স্নোনেংপেডেং এর গত হওয়া রাতে খানিকটা ঠাণ্ডা পড়ায় একটু জ্বর জ্বর ভাব হচ্ছিলো। পৌনে আট টার দিকে ব্রেকফাস্ট হিসেবে পাশের রেস্ট্যুরেন্টে বসে দুটো আলু পরোটা আর এক কাপ চিনি বেশি দিয়ে দুধ চা এর সাথে প্যারাসিটামল দুই বেলার জায়গায় একবেলা করে মেরে দিলাম!

রেস্ট্যুরেন্টে বাংলাদেশী ভাই-বেরাদার, কোলকাতার দাদা-দিদি আর ফ্রেঞ্চ-কানাডিয়ান বিদিশি ব্রো-সিস দের সাথে এক চিলতে ছাইপাশ বাতচিত সেরে বেড়িয়ে পড়লাম ক্যাব ঠিক করতে। এদিক সেদিক ঘুরে খুব একটা সুবিধে করতে না পেরে শেষতক ট্যাক্সিস্ট্যাণ্ডের দিকে পদব্রজে এগুলাম। সেখানে গিয়ে কয়েকজনকে সেটিং দিয়ে অবশেষে একটা ট্যাক্সি ঠিক করে ফেললাম সারাদিনের জন্য। প্রথম গন্তব্য ক্রাংসুরি ফলস, আমলারেম, মেঘালয়।

ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখা অপরূপা ক্রাংসুরি ঝর্ণা

ঝর্ণা দৃষ্টিগোচর হওয়ার সাথে সাথেই মুগ্ধতা গ্রাস করে নিলো। বিশালাকৃতির সাথে স্বচ্ছ নীল পানির ধারা আর তার নিচেই নীলচে জলের আধার। কতগুলো মুহূর্ত যে ওভাবে চেয়ে থেকেই কেটে গেলো তার ইয়ত্তা নেই! ঝর্ণার নিচ থেকে উঠে আসা কোলকাতার এক দিদির(!) ধাক্কা খেয়ে সতবিৎ ফিরে, তক্ষুনি নিচে নেমে, আরো কাছে থেকে, আরো কিছুটা আয়েশ করে বসে, অনেকটা সময় ধরে, মুগ্ধ চোখে গিলে খেলাম ক্রাংসুরির রূপসুধা। আমাদের রাঙ্গামাটির ধুপপানি ঝর্ণার মতো এর নিচেও একটা গুহার মতো জায়গা আছে। গুহামুখে বসে ঝর্ণাধারা দেখতে বেশ লাগে। ভুলে সাথে করে এক্সট্রা কাপড়চোপড় না নিয়ে যাওয়ায়, নীল জলের এই পুলে নেমে কিছুক্ষণ মাতামাতি না করতে পারার আক্ষেপ নিয়ে আর এই ভুলের জন্য নিজের গালে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেই দুটো কষে থাপ্পড় দিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম এবারের মতো! তবে শেষবারের জন্য নয়! আক্ষেপ মিটাতে আবার শীঘ্রই ফিরে আসবো ইনশাআল্লাহ!

স্বচ্ছ নীলজলের ক্রাংসুরি ফলস
গুহামুখে বসে ক্রাংসুরির রূপসুধা পান
সাইড ভিউ ক্রাংসুরির

গাড়ি আবার ফিরে আসলো ডাউকি বাজারে। রবি-জিপি-টেলিটক সবগুলো সিমেরই নেটওয়ার্ক মিলে এখানে। স্বল্পমেয়াদী একটা চা-বিড়ি বিরতি নিয়ে আবার শুরু হলো ছুটে চলা। অল্পক্ষণের মধ্যেই ডাউকি ব্রীজে চলে আসলাম। এটাই সেই বিখ্যাত ব্রীজ যা আমাদের জাফলং থেকে দেখে আমরা হা-হুতাশ করি! ব্রীজে ছবি তোলা নিষেধ। নীচের সবুজ জলের নদীতে পর্যটকবাহী নৌকা ঘুরেফিরে চলছে। ব্রীজ পেড়িয়ে একটু আগাতেই সামনে পড়লো বাংলাদেশ ভিউ পয়েন্ট। ওপারেই জাফলং, ঈদের ছুটি পড়ায় ভীষণ ভিড় ওপারে। ইন্ডিয়ান ট্যুরিস্টরা এখানে থেমে বাংলাদেশ দর্শন করে। এখানেও রবি, জিপি, টেলিটক সবগুলোরই থ্রিজি নেটওয়ার্ক পেয়েছিলাম।

আবার শুরু হলো যাত্রা। পাহাড় বেয়ে ছোট বড় অসংখ্য ঝর্ণার দেখা মিলবে। রাস্তার উপর দিয়েই পানির ধারা গড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই আমরা এসে পড়লাম নেক্সট স্টপেজ উমক্রেম ফলসে। মেইন রোডের পাশেই হওয়ায় অনেক টুরিস্টের ভিড়। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আমরা আবার ছুটে চললাম পরবর্তী স্পটের উদ্দেশ্যে।

উমক্রেম ফলস
বড়হিল ফলস

মিনিট বিশেকের মধ্যেই চলে এলাম বড়হিল ফলসে। এটাও রাস্তার পাশে হওয়ায় ট্যুরিস্টের ভিড় লেগেই আছে। আকারে বিশাল সাইজের হওয়ায় এর নামধামও অনেক। বেশ জনপ্রিয়। সুন্দর তো বটেই। আর এটাই আমাদের দেশের সিলেটের পাংত্তুমাই গ্রাম থেকে দেখা যায়। দূর থেকে দেখে আমরা আফসোস করি ইশ্ এটা আমাদের দেশে পড়লে কার কি এমন ক্ষতি হয়ে যেতো! রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে এসব জায়গা আমাদের হতে হতেও হলোনা!

গাড়ি ছুটে চলছে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায়ও স্পিডোমিটারের কাঁটা আশির দশকের ঘরের আশেপাশে নড়াচড়া করছে! পিচঢালা মসৃণ রাস্তা আর নিয়মমাফিক ড্রাইভিং-এর অবদানই বেশি এই স্পীডের পেছনে। নিজের দেশের রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা চোখে ফুটে উঠলো একবার। কবে যে এমন রাস্তাঘাট হবে আমাদেরও! হায়!

পাহাড়ি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলছে গাড়ি। রাস্তার দু’পাশে থেকে থেকেই চোখে পড়ছে আনারসের খেত, আম-কাঁঠাল-সুপারি গাছের সারি। সামনের একটা মোড় ঘুরতে হঠাৎ একটা মাচাং এর মতো ঘরের দেখা পেয়ে গাড়ি থামিয়ে দেখি কাঁঠাল-আনারসের পসরা সাজিয়ে বসেছে। দরদাম করে ৪০ রুপিতে একটা আস্ত কাঁঠাল আর ২৫ রুপিতে আনারস নিয়ে পাক্কা ৬৫ রুপিতে চারজনের লাঞ্চটা সেরে ফেললাম!

প্রায় ৩ টের আশেপাশে বাজে এমন সময় আমরা এসে পৌঁছলাম রাওয়াই ভিলেজের সিঙ্গেল ডেকার লিভিং র‍্যুট ব্রীজের পার্কিং স্পটে। এখানেও নিচের দিকে সিঁড়ি বেয়ে ট্রেক করে কিছুটা নামতে হয় ব্রীজটা দেখার জন্য। জনপ্রতি ১০ রুপি টিকেট চার্জ দিয়ে নেমে গেলাম। বড় বড় কয়েকটা জীবিত গাছের শেকড় দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ব্রীজটা তৈরি হয়ে গেছে। এটাই বৈশিষ্ট্য এই ব্রীজের। পুরো মেঘালয় জুড়ে এরকম অসংখ্য ব্রীজের দেখা মিলবে আনাচেকানাচে। এই এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের চলাচলের সুবিধার জন্যই এসব ব্রীজ বানাতো এখানে। প্রথমে বাঁশ বা গাছের শক্ত ডালপালা দিয়ে ব্রীজের মোটামুটি একটা অবয়ব তৈরি করে তাতে এই বিশেষ প্রকারের গাছ লাগিয়ে দিতো। কালক্রমে সেটা এরকম লিভিং র‍্যুট ব্রীজে রূপ নেয়।

রিওয়াই লিভিং র‍্যুট ব্রীজ
রিওয়াই লিভিং র‍্যুট ব্রীজ

এখান থেকে বের হয়ে চলে গেলাম এশিয়ার সবচেয়ে পরিস্কার গ্রাম নামে পরিচিত মাওলিনং ভিলেজে। পার্কিং ফি দিয়ে ঢুকে গেলাম ভিতরের এড়িয়ায়। অনেক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে আর কিছু ফ্যান্সি জিনিসপাতি কিনে ফিরতি পথ ধরলাম।

মাওলিনং এর সাজানো গোছানো গ্রামীন পথ
মাওলিনং গ্রামের বাসিন্দা

চেরাপুঞ্জি পৌঁছতে হলে এখনও প্রায় ৫০ কিলোর মতো অতিক্রম করতে হবে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সাথে নেমে এসেছে পাহাড়ি এলাকার ট্রেডমার্ক ঘন কুয়াশা। দু’হাত সামনেও ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। এর মধ্য দিয়েই হেডলাইট, ইন্ডিকেটর, ডিপার সব জ্বালিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তায় ছুটে চলেছে গাড়ি। বারবার ঘোলা হয়ে আসা উইন্ডশীল্ডটাকে ঠিক রাখতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ওয়াইপার দু’টোকে। সামনের দু’হাত রাস্তাও ঠিকমতো দৃষ্টি গোচর না এরকম অবস্থায় একটু পরপরই তীক্ষ্ণ বাঁক পেড়োতে গেলেই আত্মারাম খাঁচার মধ্যে ডুগডুগি বাজানো শুরু করে দিচ্ছে, কোনোরকমে খাঁচা আটকে ধরে রাখার মতো অবস্থা!

শেষপর্যন্ত চেরাপুঞ্জি শহরে এসে পৌঁছলাম রাত ৮ টার দিক। ট্যাক্সিস্ট্যাণ্ডে নেমে ভাড়া চুকিয়ে এদিক ওদিক একটু ইতিউতি করতেই নজরে এলো আড্ডারত একটা দেশী ট্যুরিস্ট গ্রুপের। ভাই-বেরাদরদের সাথে খানিক আলাপ সেড়ে আমরা কাছের একটা রেস্ট্যুরেন্টে ঢুকে ফিশথালির অর্ডার দিয়ে দিলাম। খাবার আসতে আসতেই আমি আর রেজা মিলে স্থানীয় এক আন্টির হোমস্টেতে রাতটা থাকার বন্দোবস্ত করে ফেললাম আন্টির জাতিজার মাধ্যমে। ছেলেটার সাথে হঠাৎ করেই পরিচয় রেস্ট্যুরেন্টের পাশেই। স্থানীয় ছেলে। খুবই মিশুক, ফ্রেন্ডলি আর ভদ্র। অল্প আলাপেই ভালো ফ্রেন্ড হয়ে গেলো। বাংলাদেশ থেকে আসছি শুনে খুব খুশি হলো ও, আগে কখনো বাংলাদেশী মানুষের সাথে ওর সাক্ষাৎ হয়নি!

হোমস্টেটা খুব সুন্দর। আন্টিও খুব অমায়িক। দুই রুম নিয়ে বেশ আরামেই রাতটা পার করে দিলাম।

খরচাঃ

  • সারাদিনের ট্যাক্সি রিজার্ভ (শ্নোনেংপেডেং থেকে ক্রাংসুরি, ক্রাংসুরি থেকে ডাউকি ব্রিজ, উমক্রেম ফলস, বড়হিল ফলস, লিভিং র‍্যুট ব্রিজ, মাওলিং ভিলেজ হয়ে চেরাপুঞ্জি ড্রপ) — ৩৫০০ রুপি।
  • ক্রাংসুরি, লিভিং র‍্যুট ব্রীজ আর মাওলিনং এ টিকেট/পার্কিং চার্জ আছে ১০/২০ রুপি করে পারহেড।
  • ১০০ রুপির মধ্যে ফিশ/চিকেন থালি মিলবে, ভেজ মিলবে ৬০/৭০ রুপিতে।
  • হোমস্টে মিলবে ১৫০০-২০০০ রুপিতে।
  • ডাউকি বাজার, উমক্রেম ফলস, বড়হিল ফলস, মাওলিনং ভিলেজ সব জায়গায়ই বাংলাদেশের সীমের নেটওয়ার্ক পেয়েছিলাম। নেটও চলেছিলো থ্রিজিতে!
  • ঘুরতে গেলে অবশ্যই পরিবেশ পরিস্কার রাখবেন।

হ্যাপী ট্রাভেলিং! ❤️

চলবে…

Muhammad Shafiul Islam

Written by

Studying B.Sc in Electrical & Electronic Engineering at Rajshahi University of Engineering & Technology

tripsharebd

Share your travel experiences and let everyone feel the breeze of travelling.

Welcome to a place where words matter. On Medium, smart voices and original ideas take center stage - with no ads in sight. Watch
Follow all the topics you care about, and we’ll deliver the best stories for you to your homepage and inbox. Explore
Get unlimited access to the best stories on Medium — and support writers while you’re at it. Just $5/month. Upgrade